জঙ্গলমহলে ত্রাসের অন্য নাম হাতি। বলা হয়, “বন্যেরা বনে সুন্দর; শিশুরা মাতৃক্রোড়ে” অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়মে যার যথা স্থান তার সৌন্দর্য বিকশিত হয় তথায়। পরিবেশ পাল্টালে পরিবর্তন হয় সহজাত স্বভাবের।
মানুষের আগ্রাসি বসতি স্থাপনের কারণে, বন কেটে মানুষ বসতি তৈরি করছে। তার ফলে হাতির করিডর, বাসভূমি, খাবারের যোগানে টান পড়ছে। সেই কারণেই তারা লোকালয়ে ঢুকছে—বাড়ছে মানুষ-পশুর সংঘাত। তার সবচেয়ে বড়ো উদাহরন হচ্ছে মূরথি (মূর্তি)। প্রায় ২১ জন মানুষকে মেরেছিলো এই হাতিটি।
কেরালা জঙ্গলের এই হাতিটি জঙ্গল পেরিয়ে গ্রামে ঢুকলেই খেদাত মানুষ। ফলে রাগে মূরথি ‘রণমূর্তি’ ধারণ করে শুঁড়ে আছাড় দিয়ে মারতো মানুষজনকে। ১১ জনকে পায়ে পিষে মারার পর, তাকে দেখা মাত্র মেরে দেওয়ার সাজা ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু বনকর্মীদের নজর এড়িয়ে সীমানা পেরিয়ে তামিলনাড়ুতে পালিয়ে আসে মূরথি। এখানে এসেও তার রণমূর্তি পরিবর্তন হলোনা। অল্পদিনের মধ্যে মারলো ১০ জনকে। তামিলনাড়ু প্রশাসন ৫৮ বছর বয়সী মূরথিকে মৃত্যুর সাজা শোনাল না। ১৯৯৮ সালে পাঠালো তাকে থেপ্পাকাড়ু ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ পরিবর্তন করে স্বভাবের। হাতিটির প্রশিক্ষক কিরুমারন এম. এর কথায়, “যখন থেকে আমি মূর্তিকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, এত বছর ধরে, সে একজন নিষ্পাপ শিশুর মতো এবং কাউকে আঘাত করে না।”

১৯২৭ সালে তৈরি হওয়া থেপ্পাকাড়ু ক্যাম্পটি ভারতের বৃহত্তম হাতি প্রশিক্ষণ শিবির। মূর্তির মতো অনেক কুনকি হাতি (বুনো বা অন্য হাতি ধরতে সাহায্য করে এমন পোষা হস্তিনী কে বলে কুনকিহাতি) লোকালয়ে মাহুতের সঙ্গে এসে মালপত্র বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করে। মানুষের খাটনি লাঘব করা ছাড়াও মূর্তির মতো রগচটা বুনো হাতিরাই এখন ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের রক্ষা করেছে।
সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৪-২০১৯ সালের মধ্যে হাতির হামলায় ২৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আবার অন্যদিকে বিদ্যুৎপিষ্ট হয়ে এবং বিষ প্রয়োগে প্রাণ গিয়েছে প্রায় ৬০০ হাতির।
গত বছর মে মাসের শেষে, বিস্ফোরক ঠাসা আনারস খেয়ে কেরলের অন্তঃসত্ত্বা হাতির মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় হয় দেশ, সোশ্যাল মিডিয়া। গ্রামে খাবার পাওয়া যাবে একটু বেশি, এই আশাতেই লোকালয়ে এসেছিল ১৫ বছর বয়সী হাতিটি। ঈশ্বরের আপন দেশে সকল মানুষ যে ঐশ্বরিক নয় সেটা বুঝে উঠতে পারেনি অবলা হাতিটি।

এই নিয়ে কেরলের বনদফতরের আধিকারিকরা মুখ খুলেছিলেন সংবাদমাধ্যমে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে কেরলের এক বনকর্তা বলেছেন, বুনো শুয়োর বা ওই জাতীয় প্রাণীকে মারার জন্য অনেক সময়ে জঙ্গলে বসবাস করা মানুষ বিস্ফোরক বা দেশি বোমা ব্যবহার করেন। তাঁদের আন্দাজ, ভুল করে হয়তো সেটিই খেয়ে ফেলেছিল মৃত হাতিটি।
১৯৮৬ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ ভারতীয় হাতিকে (এলিফাস মাঙ্কিমাগ ইনডিবাস) ‘এনডেঞ্জার স্পিসিস’ ঘোষণা করে। কারণ হাতির সংখ্যা তখন প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। ফলে অনেক পর্যালোচনার পরে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সরকার নিয়ে আসে ‘প্রোজেক্ট এলিফ্যান্ট’। পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল নিয়ে শুরু হয় হাতি সংরক্ষণ ও তার মানোন্নয়ন।
পশু-প্রাণীর উপরে অত্যাচার, হত্যার বিরুদ্ধে যে আইন রয়েছে তা বহু পুরনো। আইন আরও কড়া হলে তবেই অবলা জীবদের উপরে অত্যাচার বন্ধ হবে। অবলা জীবগুলি কে রক্ষা করতে হলে সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে।।

হাতি-মানুষের সংঘাত কাটাতে হাতির বাসভূমির করিডর বাড়াতে হবে। বসতি বিস্তারের অনুমতি বুঝে শুনে দিতে হবে। সরবরাহ করতে হবে পর্যাপ্ত খাদ্যের তবেই দু-পক্ষ বাঁচবে।
৪ ডিসেম্বর ছিলো বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ দিবস। এই বৈশ্বিক অনুষ্ঠানটি প্রত্যেককে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে আরও জানার এবং বন্যপ্রাণী অপরাধের সমাধানের অংশ হওয়ার সুযোগ দেয়। বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ দিবসের ওয়েবসাইটে গিয়ে সচেতনতা বাড়ান এবং হাতি, গন্ডার এবং বাঘের মতো বিপন্ন প্রজাতির সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় অবদান রাখুন।
Good Post indeed
বাহ খুব ভালো
Apnar lekha ta onek notun kichu jante parlam….khub darun lekha Rinki…congratulations
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।