লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে কাশ্মীরে তেমন আগ্রহ থাকে না। সাধারণত এখানে ভোট বয়কটের ডাক দেওয়া হয়, তবে এবার ওই উপত্যকার নির্বাচনে একটা আগ্রহ রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে শেষবার জম্মু ও কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল। কাশ্মীরের প্রধান দুই বিরোধী দল জম্মু-কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি পৃথকভাবে এই নির্বাচনে লড়ছে। তবে দুই দলই বলছে, তারা হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির বিরোধী। দুই দল এও বলছে, এবারের নির্বাচন কেবলমাত্র সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়, তাদের বক্তব্য, ২০১৯-এর ৫ আগস্ট কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা (৭০ বছর ধরে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা ও কিছু অতিরিক্ত সুবিধা) তুলে দেয়। এবারের নির্বাচন তারই জবাব দেওয়ার ভোট। তাই এবারের নির্বাচনকে অন্যরকম বলেই মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া এনসি এবং পিডিপি এবারের লোকসভাকে যখন বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নির্বাচন বলে জানাচ্ছে, তখন কাশ্মীরের ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কাশ্মীর উপত্যকায় বারামুল্লা, শ্রীনগর ও অনন্তনাগ-রাজৌরি; জম্মুতে উধমপুর ও জম্মু এবং লাদাখ, মোট ছ-টি লোকসভা আসন। কিন্তু ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম বিজেপি কাশ্মীরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না। প্রশ্ন, বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে চারশোর বেশি আসন জয়ের ঘোষণা করলেও, এমনকি দেশের প্রত্যেকটি রাজ্যেই তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কাশ্মীরে তারা লড়াইতে নেই কেন? মোদির বিজেপি সরকার ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের আধা-স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা রদ করে, তাদের পৃথক সংবিধান বাতিল করে কাশ্মীরকে কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটিকে দুটি ফেডারেল শাসিত এলাকায় ভাগ করে। প্রসঙ্গত, জম্মুতে হিন্দু ধর্মীয় মানুষ থাকলেও কাশ্মীর উপত্যকা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে লাদাখ বৌদ্ধ অধ্যুষিত। এখানে এবারের নির্বাচন ৩৭০ ধারার পক্ষ-বিপক্ষের। আর উপত্যকায় মুসলমান সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এখানে বিজেপি কোনো সুবিধাই করতে পারবে না। তাছাড়া ২০১৯ সালেও বিজেপি কাশ্মীরের তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ন্যাশনাল কনফারেন্সের কাছে হেরেছিল।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা অবলুপ্তির পর জম্মু-কাশ্মীরে এনসি, পিডিপি ও কংগ্রেসবিরোধী এক শক্তির উত্থান হয়েছে। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের বক্তব্য, এই নতুন শক্তি আসলে বিজেপি। এছাড়া আছে সাজ্জাদ লোনের জম্মু-কাশ্মীর পিপলস কনফারেন্স। এনসি-পিডিপি-কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রয়েছে আরও একটি দল- জম্মু-কাশ্মীর আপনি পার্টি। আসলে বিজেপি কাশ্মীর উপত্যকায় যতই ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা চালাক না কেন, সরাসরি সামনে থেকে বিজেপি নেতৃত্ব দিলেই ফল উল্টো হয়ে যাবে। তাই আড়ালে থেকে জোট গঠন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যদিও লাদাখ আসনটিতে সরাসরি কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। কিন্তু দেশজুড়ে যিনি ম্যারাথন নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন সেই নরেন্দ্র মোদী একবারের জন্যও কাশ্মীর উপত্যকায় প্রচারে গেলেন না। প্রশ্ন, এত উন্নয়ন, এত বিকাশের পরও কাশ্মীরের তিনটি আসনের একটিতেও একজন প্রার্থী দাঁড় করালেন না কেন? আসলে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি প্রচারের ফারাক যে বিস্তর সেটা হয়তো মোদী বুঝতে পারছেন। তাই অমিত শাহ জানিয়েছেন, যে কাশ্মীর উপত্যকায় বিজেপি ‘দেশপ্রেমিক’ দল ও তাদের প্রার্থীকে সমর্থন করবে। দেশপ্রেমিক বলতে বিজেপির আজাদ, লোন ও বুখারির দলকেই বোঝাচ্ছে।
বিজেপি মুখে নতুন কাশ্মীর এবং উন্নত লাদাখ উপহার দেওয়ার দাবি করলেও এই দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের লোকসভা ভোটে অংশ নিচ্ছে না। কারণ, কাশ্মীর উপত্যকায় এখনও বিজেপির সংগঠন সেই অর্থে এমন শক্তিশালী নয় যে অনায়াসে প্রধান দুই বিরোধী দল জম্মু-কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টিকে হারিয়ে দিতে পারবে। অন্যদিকে লাদাখে সোনাম ওয়াংচুক এবং আরও একঝাঁক সংগঠনের কেন্দ্রবিরোধী আন্দোলন যথেষ্ট বড় আকার নিয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় মানুষ লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে সরব। একইসঙ্গে ষষ্ঠ তফসিলের দাবি করা হচ্ছে। গত এক বছর ধরে লাদাখে কেন্দ্রবিরোধী ক্ষোভও দানা বেঁধেছে। ফলে জয়ের কোনো আশা না দেখেই বিজেপি কাশ্মীর থেকে নির্বাচন লড়াই বাতিল করেছে। মোদীর সফর তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখ।