| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অকালবোধন : নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

Reporter
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি / ১৮২৭ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২১

‘অকাল’ শব্দটির মধ্যে একটা অদ্ভুত এবং প্রায় বিপরীত ব্যঞ্জনা আছে। যেমন একটি কৈশোরগন্ধি যুবক ছেলেকে যদি বলি ‘অকালপক্ব’, তাহলে অবধারিতভাবে কথাটির মানে দাঁড়াবে যে, ছেলেটির যা বয়স এবং তদনুযায়ী যা তার বিদ্যাবুদ্ধি হওয়া উচিত কিংবা বয়স অনুযায়ী তার যা কথাবার্তার ধরন তৈরি হওয়া উচিত, তার চাইতে বেশি বয়সের বহু-অভিজ্ঞ মানুষের মতো সে কথা বলছে, বা তেমন ভাবসাব দেখাচ্ছে। অর্থাৎ কালপক্বতার মধ্যে পরিণতি থাকে এবং গ্রহণযোগ্যতা থাকে সেটি অকালপক্বের মধ্যে থাকে না।

আবার ‘অকাল’ শব্দটির মধ্যে কখনও অদ্ভুত এক আকস্মিকতা থাকে, যে আকস্মিকতা চরম আনন্দও দিতে পারে, অথবা তা চরম দুঃখও দিতে পারে। অকাল মৃত্যু, অকাল-বৈধব্য যদি সেই আকস্মিকতার চরম দুঃখরূপ হয়, তবে প্রবাসী পুত্রের সময়-পূর্ব আগমন, কর্মস্থলে দুটি ধাপ টপকে পদোন্নতি এগুলো অকালে প্রেম আসার মতো তুরীয় আনন্দ দান করতে পারে। অতএব আশ্চর্য না হয়েই এটা মন্তব্য করা যেতে পারে যে, বাঙালির জীবনে শরৎকালের এই দুর্গাপূজা সেই আকস্মিক এক উৎসবের দিন উপহার দেয়, যা হওয়ার কথা ছিল না।

মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর শেষপর্যায়ে আমরা সুরথ রাজা আর সমাধি বৈশ্যকে দেখেছি—দেবীর এই পূজা-তপস্যার ফল কী—তা দেবীর মুখেই আমরা শুনতে পেয়েছি। কোন কোন তিথিতে দেবীপূজার কথা মাহাত্ম্য, সেই প্রসঙ্গে শরৎকালের বার্ষিক পূজা-মহোৎসবের কথাও এসেছে। সেখানে চণ্ডীপাঠের ফলের কথা বলতে গিয়ে দেবী এমনভাবে সেটা বর্ণনা করেছেন, যাতে বোঝা যায়—প্রতি বৎসরের শরৎকালেই দুর্গাপূজা হয়ে থাকে—শরৎকালে মহাপূজা ক্রিয়তে যা চ বার্ষিকী।

কিন্তু চিরকালীন এই শারদোৎসবের মধ্যেও যে একটা অকালবোধনের সংবাদ চলে এল—তার জন্য দায়ী আমাদের কৃত্তিবাস। কৃত্তিবাস কীর্তিবাস কবি। কৃত্তিবাস যে বাঙালির হৃদয় কতটা অধিকার করেছেন, তা এই ঘটনায় প্রমাণ হয়। কবি ঠিক রাবণবধের আগে রামচন্দ্রকে দিয়ে একটা দুর্গাপূজা করিয়ে নিলেন এবং বললেন—এখন দুর্গাপূজার সময় নয়, কিন্তু বিপন্ন হয়ে রাবণবধের জন্য রামচন্দ্র দেবী দুর্গার অকাল-বোধন করেছেন। অতএব শরৎকালের এই দুর্গাপূজা রামচন্দ্রের স্মৃতি মাখানো। কৃত্তিবাসের কবিত্বশক্তি এমনই, তাঁর ছন্দোবদ্ধ শব্দমন্ত্রে এমনই জাদু আছে যে, বাঙালি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করছে—এ পুজো শরৎকালে হতই না এবং রামচন্দ্রের কৃপায় হাতছোঁয়া পুজো আমরা বছর বছর করে যাচ্ছি।

কৃত্তিবাসে দেখা যাচ্ছে—লঙ্কাকাণ্ডের শেষ পর্যায়ে রাবণ যুদ্ধে এসেছেন, কিন্তু অসংখ্য পুত্র-মিত্র হারিয়ে হীনবল রাবণ আর যুদ্ধে পেরে উঠছেন না রামচন্দ্রের সঙ্গে। এই অবস্থায় রাবণ জগজ্জননী কালী-ভবানীকে স্মরণ করলেন। রাবণের স্তবে তুষ্ট হয়ে মা ভবানী একেবারে রাবণকে কোলে করে রাবণের রথে বসলেন—অসিতবরণা কাল কোলে দশানন। এটা কিছুই আশ্চর্য নয়—কৃত্তিবাসের লেখনীতে ডাকাত কিংবা অন্যান্য দস্যুজাতিরা যে কালীপুজো করত, তারই প্রতিরূপ ধরা পড়েছে। রাবণ প্রধানত শিবের উপাসক ছিলেন, কিন্তু এই অসীম বিপন্নতার মধ্যে শিবানীও তাঁর কাছে রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। যাই হোক, রাবণের রথে ‘জলদবরণী’ শ্যামাকে দেখে রামচন্দ্র ধনুক-বাণ ফেলে বসে পড়লেন।

রামচন্দ্রের অবস্থা দেখে স্বর্গের দেবতারা মহাচিন্তায় পড়ে গেলেন। কারণ, রাবণবধে তাঁদেরও স্বার্থ আছে। দেবতাদের রাজা ইন্দ্র স্বয়ং ব্রহ্মাকে অনুরোধ করলেন—কোনও উপায় চিন্তা করার জন্য। ব্রহ্মা বললেন—দুর্গাপূজা করতে হবে, কিন্তু দুর্গাপূজার এখন সময় নয়, তাঁকে অকালে বোধন করতে হবে—

বিধি কন বিধি আছে চণ্ডী আরাধনে।

হইবে রাবণ-বধ অকালবোধনে।।

রামচন্দ্রের সুবিধের জন্য ব্রহ্মা তখন স্বর্গরাজ্যেই—অকাল শরতে কৈল চণ্ডীর বোধন। এখানে দুটি কথা আছে।

কৃত্তিবাস যে বলেছিলেন—

রাবণবধের জন্য বিধাতা তখন।

আর শ্রীরামেরে অনুগ্রহের কারণ।।

ব্রহ্মার এই দুটি কাজের জন্যই যে অকালবোধন—এই কথাটা কৃত্তিবাস সরাসরি প্রায় অনুবাদ করে দিয়েছেন কালিকাপুরাণ থেকে। এই পুরাণে বলা হয়েছে—রামের প্রতি অনুগ্রহ এবং রাবণবধের জন্য ব্রহ্মা রাত্রিতেই দেবীর বোধন করেছিলেন—

রামস্যনুগ্রহার্থায় রাবণস্য বধায় চ।

রাত্রাবেব মহাদেবী ব্রহ্মণা বোধিতা পুরা।।

আসলে এই রাতের বেলায় দেবীর বোধনই কৃত্তিবাসকে মহা ফাঁপরে ফেলে দিয়েছে। কেননা, রাত্রির এই আকালিক বোধনই কৃত্তিবাসে শরৎকালের আকালিকতায় পরিণত। এমনিতে শরৎকালের দুর্গাপূজা যে মোটেই আকালিক নয়, সে কথা ওই কালিকাপুরাণ থেকে আরম্ভ করে সব পুরাণেই খুব স্পষ্ট। কিন্তু ব্রহ্মার এই রাত্রিপূজা যেহেতু স্বাভাবিক নয়, অতএব কৃত্তিবাসে শরৎকালের সম্পূর্ণ দুর্গাপুজোটাই অকালবোধন হয়ে গেল।

ব্রহ্মার এই রাত্রিকালীন অকালবোধনের সূত্র ধরেই যে একটা ভুল বোঝবার সম্ভাবনা রয়ে গেছে, সে কথা বিধানদাতা স্মার্ত পণ্ডিতরাও বুঝেছিলেন। বুঝেছিলেন বলেই রঘুনন্দনের মতো স্মার্ত ধুরন্ধর তাঁর দুর্গাপূজার তিথিতত্ত্বে এই রাত্রির আকালিকতার প্রশ্ন ভুলে বলেছেন—বাপু ওটা দেবতাদের রাত্রি বটে, কিন্তু মানুষের গড়া জগতে ওটা রাত্রি নয়, দিনই। রঘুনন্দনের মতে, সূর্যের সমস্ত দক্ষিণায়নের সময়কালটাই দেবতাদের রাত্রি। কাজেই মানুষের পূজায় শারদোৎসব কোনও অকালবোধন নয়। বরঞ্চ ব্রহ্মা যে দেবলোকের রাত্রিতে দেবীকে পূজার মন্ত্রে প্রবুদ্ধ করলেন, সেটা অকাল বটে—অকাল ইতি ত রাত্রিত্বেন দক্ষিণায়নস্য অথৈতদ দক্ষিণায়নং দেবানং রাত্রিঃ ইতি। অতএব মানুষের বেলায় কন্যারাশির শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে দিনের বেলাতেই দেবীর বোধন চলবে—এই হল রঘুনন্দনের মত।

স্মৃতিশাস্ত্রের এই ব্যাপারগুলো, দুর্গাপূজার তিথিতত্ত্ব কৃত্তিবাস যে কিছুই জানতেন না, তা নয়। কারণ, ব্রহ্মা যখন রামচন্দ্রকে নিজ পূজার অনুকরণে অকালবোধন করতে বললেন, তখন রামচন্দ্র তিথির প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন—দুর্গাপূজার পক্ষে বসন্তকালই ‘শুদ্ধ সময়’। অর্থাৎ বঙ্গদেশে যে বাসন্তী পূজা চালু আছে সেটাই যে দুর্গাপূজার পক্ষে প্রশস্ত সময়—সেটা রামচন্দ্র কৃত্তিবাসের কল্যাণে জানেন। তিনি আরও জানেন যে,

বিধি আছে নিরূপণ নিদ্রা ভাঙ্গিতে বোধন

কৃষ্ণা নবমীর দিনে তার।

কিন্তু কৃষ্ণা নবমী পার হয়ে গিয়েছে। দুর্গাপূজার আরও বিকল্প তারিখ ছিল। কারণ মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে সুরথ-রাজা শুক্লা প্রতিপদে দেবীপূজার কল্পারম্ভ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রামচন্দ্র এমন একটা সময়ে দেবীপূজার কথা ভাবছেন, যখন আগামীকাল হল শুক্লা ষষ্ঠী—

শুক্লা ষষ্ঠী মিলিবে প্রভাতে।

কন্যারাশি মাস বটে কিন্তু পূজা নাহি ঘটে

অত্র যোগ, সব হৈল যাতে।

অর্থাৎ সবগুলি তিথিযোগই যখন চলে গিয়েছে, তখন ব্রহ্মার মতে শুক্লা ষষ্ঠীতেই রামচন্দ্রের পক্ষে বোধন করা ভালো। কারণ, সুরথ রাজা যদি নিয়ম ভেঙে প্রতিপদে কল্পারম্ভ করে থাকেন, তাহলে রামচন্দ্রের মতো বিশাল ব্যক্তিত্বই বা তা পারবেন না কেন—

কর ষষ্ঠী-কল্পেতে বোধন।

ব্যাঘাত না হবে তায় বিধি খণ্ডি পুনরায়—

কল্প খণ্ডে সুরথ রাজন।

লক্ষণীয় বিষয় হল, ব্রহ্মা অকালে বোধন করার জন্য যে সময় নির্দেশ করলেন, সেই দুর্গাপূজা বাঙালির ঘরে ঘরে আপনিই হয়। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে এই পূজারই বিধান—শরৎকালে মহাপূজা ক্রিয়তে যা চ বার্ষিকী। এই শ্লোকের টীকায় নাগজীভট্ট পরিষ্কার জানিয়েছেন—‘শরৎকালে’ মানে হল, আশ্বিনমাসের শুক্ল প্রতিপদ থেকে দুর্গাপূজার যে কল্পারম্ভ হয়। সেই পূজা শরৎকালে আশ্বিন প্রতিপদমারভ্য দুর্গোৎসবরূপা। অন্যদিকে, স্মার্তরঘুনন্দনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। তিনি বলেছেন কন্যারাশি মানে, ওই আশ্বিন মাসের নবমী তিথিতেই দেবী প্রবুদ্ধা হবেন।

আসলে কালিকাপুরাণে দেখা যাবে—নবমীর বোধনের পরেই দেবী প্রবোধিতা হয়ে নিজের মায়ায় রামচন্দ্র এবং রাবণকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেন। কিন্তু এখানে বোধন ছিল ব্রহ্মার এবং কাল ছিল রাত্রি, স্থান দেবলোক। দেবী ব্রহ্মার বোধনে তুষ্ট হয়ে, নিজের ঘুম নষ্ট করে, সাত দিন লঙ্কায় বাঁদর আর রাক্ষসদের রক্তমাংস খেয়ে দিন কাটালেন—রক্ষসাং বানরানাঞ্চ জগধ্বা সামাংসশোণিতে। তারপর কৃপা করে রামের মাধ্যমে যেন দেবীই মারলেন রাবণকে—রামেন ঘাতয়ামাস। এখানে এই খবর ছাড়া আরও একটা খবর জরুরি। সেটা হল রাবণ-হত্যার দিনটি ছিল নবমী তিথি— নবম্যাং রাবণং ততঃ।

কৃত্তিবাস কালিকাপুরাণের সংকেত প্রায় মানলেও ঈশ্বররূপে চিহ্নিত রামচন্দ্রকে তিনি করণ কারক বানিয়ে রাখেননি। অন্যদিকে, রামচন্দ্রের মনুষ্যায়নের তাগিদে তাঁকে দিয়ে দুর্গাপূজা করালেও রাবণবধের ব্যাপারে কর্তৃত্ব দিয়েছেন। আর তিথির ব্যাপারে কৃত্তিবাস কালিকাপুরাণের মত মেনেওছেন, আবার মানেনওনি। কালিকাপুরাণে নবমীতে রাবণবধ, দশমীতে বিজয়োৎসব এবং দেবীর বিসর্জন। কিন্তু কৃত্তিবাসে নবমীতে দেবী রাতের স্তুতিতেই প্রবুদ্ধা হয়েছেন এবং তাঁকে আর লঙ্কায় বাঁদর-রাক্ষস খেয়ে সময় নষ্ট করতে হয়নি। নবমীতে প্রবুদ্ধা হয়েই তিনি রামকে কৃপা করেন এবং দশমীতেই রাবণবধ। অপিচ সেই রাবণবধ রামই করেছেন।

আসল কথা হল, কৃত্তিবাস বাঙালির দুর্গাপূজা পদ্ধতি এড়াতে পারেননি। কৃত্তিবাসে ঠিক বাঙালি মতে রামচন্দ্র চণ্ডীপাঠ শুরু করেন, তারপর ষষ্ঠীতে বেলগাছের তলায় দেবীর বোধন-অধিবাস করেন। সপ্তমীতে যেমন পুজো হয় তেমনি পুজো হল। অষ্টমী পুজোর পর—নিশাকালে সন্ধিপূজা কৈল রঘুনাথ। তারপর নবমীতে সেই একশো-আট নীলপদ্ম জোগাড়ের কাহিনি। রাম পদ্মের বদলে নিজের চোখ উপড়ে দিতে যাবেন—

হেনকালে কাত্যায়নী ধরিলেন হাতে।।

কি কর কি কর প্রভু জগৎ-গোঁসাই।

সংকল্প তোমার পূর্ণ চক্ষু নাহি চাই।।

দেবী নবমীতেই প্রবোধিতা হলেন এবং এখানে রামচন্দ্রের ব্যাপারে দেবীর ‘জগৎ-গোঁসাই’ বোধটিও আছে। রামচন্দ্র বরাভয় নিয়ে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন দশমীতে—

দশমীতে পূজা করি বিসর্জিয়া মহেশ্বরী

সংগ্রামে চ লিলা রঘুপতি।

কৃত্তিবাসী রামায়ণে কালিকাপুরাণের অবদানের কথাটা আমরা এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝেছি। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে, বাল্মীকি যে মূল রামায়ণ রচনা করেছিলেন, যাঁর নায়ককে কৃত্তিবাস ঈশ্বরপদবীতে উঠিয়ে তাঁর অমর কাব্য রচনা করেছেন, যে বাল্মীকিকে পদে পদে অনুসরণ করে কৃত্তিবাস পয়ার-ত্রিপদী গেঁথেছেন, সেই কৃত্তিবাস রামায়ণ রচনার এই চরম মুহূর্তে—যখন রাবণ বধ হবে—তখন বাল্মীকিকে মনেই রাখলেন না—এ কেমন কথা! স্বীকার করি, বাংলাদেশে শক্তিপূজার প্রভাব যথেষ্ট ছিল, এও স্বীকার করি গদ্য-পদ্য রচনায় কবির সেই স্বাতন্ত্র আছে, যাতে তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর আকর-গ্রন্থ ত্যাগ করতে পারেন, কিন্তু তাই বলে রাবণ-বধের আগে মূল রামায়ণে যে দেবীপূজার নাম-গন্ধ নেই, সেই দেবীপূজা নির্দ্বিধায় কৃত্তিবাস আমদানি করেছেন রাবণ-বধের মতো বিপন্ন সময়ে। বেশ বুঝতে পারি— বাঙালির শারদোৎসব এবং তার আড়ম্বর কবির কাছে এতই প্রিয় ছিল যে, একজন সমাজসচেতন কবি হিসাবে কৃত্তিবাস সেই উৎসব-চিত্র নিরুচ্চারে ছেড়ে দিতে পারেননি।

বস্তুত মূল বাল্মীকি রামায়ণে রাবণবধের আগে রামচন্দ্র কোনও দুর্গাপূজা বা দেবীপূজা করেননি। সেখানে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে রাবণের সঙ্গে লড়াই করতে করতে রামচন্দ্র যখন আর পেরে উঠছেন না, তখন চিন্তাকুল পরিশ্রান্ত তো যুদ্ধ পরিশ্রান্তং সমরে চিন্তায়া স্থিতম—রামচন্দ্রকে অগস্ত্য মুনি ‘আদিত্য-হৃদয়’ নামে এ মন্ত্র-স্তবক জপ করতে বলেছিলেন। এই মন্ত্রজপে শত্রুবিনাশ হয়। সংগ্রামে বিজয়লাভ হয়। যখন রামায়ণ রচনা হচ্ছে, তখন বৈদিক যুগের কল্পান্তর ঘটে থাকলেও সূর্য-মন্ত্র জপের বিধানই বিশেষ সংগত। মহামতি কৃত্তিবাস বাঙালির হৃদয় মন্থন করে আদিত্য-হৃদয়ের পরিবর্তে বাঙালির দুর্গোৎসবের বিধান দিয়েছেন রামচন্দ্রকে। বাঙালি কবির কল্পনা যাই হোক, মহাকবির কল্পনাতেও ছিল না সেই ছবি।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev