একবার টুকরো হয়েছিল তার বীভৎস ও দুঃসহ জিঘাংসাস্মৃতি এখনও মুছে যায়নি। সেই বিষাদস্মৃতি সঙ্গী করেই যেন কাটে দুর্বিষহ মানবেতর জীবন। ফের মাথাচারা দিয়ে উঠেছে ভাগাভাগির চক্রান্ত। লোকসভা এবং বিধানসভা উপনির্বাচনে পদ্মশিবিরের ভরাডুবির পর বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও কেন্দ্রীয় উত্তর–পূর্ব ভারত উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার চিঠি লিখে প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাব দিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের অবহেলিত আট জেলাকে উন্নয়ন করার লক্ষ্যে উত্তর–পূর্ব ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হোক। উল্লেখ্য, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ এবং নতুন করে তৈরি হওয়া কালিম্পং হল উত্তরবঙ্গের আট জেলা। যদিও উত্তরবঙ্গ নামে প্রশাসনিকভাবে কোনো বঙ্গ বা বাংলা নেই, সেখানে বেশিরভাগই তপশিলি জাতি উপজাতির বাস। এছাড়া একাধিক জেলায় রয়েছে নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সীমান্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির গেটওয়েতে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে উত্তরবঙ্গের নানা জেলা উত্তাল হয়েছে নানা আন্দোলনের জেরে। বাম আমলে্ পাহাড় উত্তাল হয়েছিল সুবাস ঘিসিং-র নেতৃত্বে। তারপর গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে পাহাড় উত্তাল হয়। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন বিমল গুরুং। ঘিসিং পাহাড় ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। গুরুংকেও দীর্ঘদিন পাহাড় ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। ফের ২০২১ সাল তিনি পাহাড়ে ফিরে আসেন শাসক দলের সমর্থন নিয়ে। তারপর আবার গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে তাঁকে সক্রিয় হতে দেখা যায়। এছাড়া উত্তরবঙ্গ উত্তাল হয়েছে কামতাপুর আন্দোলনে, গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনে। এর মধ্যে কেএলও জঙ্গিদের তৎপরতাও রয়েছে। বিজেপি পাহাড়ে যে পরপর দু’বার লোকসভা ভোটে জিতেছে সেও বিমাল গুরুংয়ের সমর্থনে। অন্যদিকে আবার রাজবংশী সম্প্রদায়ের গুরু নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজও রাজ্যসভায় সাংসদ পদে রয়েছেন। দীর্ঘ দিন ধরেই গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের এই নেতা কোচবিহারকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পরে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ জন বার্লা বঙ্গভঙ্গের দাবিতে সরব হয়েছিলেন। সেই সময় বিজেপির রাজ্য সভাপতি ছিলেন দিলীপ ঘোষ। উত্তরবঙ্গের অনেক সাংসদই সেই সময় বঙ্গভঙ্গের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন কিন্তু বাংলা ভাগের দাবি তেমন সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। উল্লেখ্য, বাংলা ভেঙে আলাদা রাজ্য গড়ার একাধিক দাবি গত কয়েক দশক ধরে উঠেছে। গোর্খাল্যান্ড থেকে কামতাপুরি আন্দোলন নানা সময়ে রাজ্যে উত্তাপ ছড়িয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে রাজ্য ভাগ বিতর্কে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতি। সংসদেই গ্রেটার কোচবিহারের দাবিতে সরব হয়েছেন বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ। তিনি জানান, গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন চায় বাংলা থেকে আলাদা করে গ্রেটার কোচবিহার তৈরি হোক। গত ২০১৫ থেকে এই দাবিতে সংগঠন এককাট্টা বলেও দাবি অনন্তর। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর থেকে কোচবিহারের মানুষের উন্নয়নে তেমন কোনও কাজ হয়নি। পরিবর্তে বঞ্চনার শিকার কোচবিহারবাসী। সেই কারণেই পৃথক রাজ্যের দাবি। এই নিয়ে নাকি তাঁর সঙ্গে অমিত শাহেরও কথা হয়েছে, কেন্দ্রের তরফ থেকে তিনি নাকি মৌখিক আশ্বাসও পেয়েছেন। ওদিকে ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে ‘জনবিন্যাসের ভারসাম্য’ বজায় রাখার কারণ দেখিয়ে তিনি বাংলার মালদহ, মুর্শিদাবাদ জেলাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে একই সঙ্গে বিহারের কিষাণগঞ্জ, অরারিয়া এবং কাটিহার জেলাকে ওই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্তর্গত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
নিশিকান্ত দুবের প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন বহরমপুরের বিজেপির বিধায়ক সুব্রত মৈত্র। তিনি নিশিকান্ত দুবের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গড়ার প্রস্তাবের সঙ্গে নতুন করে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং নদীয়ার একটি অংশকে যুক্ত করার দাবি তুলেছেন। ওই তিনটি জেলায় এত বেশি অনুপ্রবেশ ঘটছে যে পাল্টে যাচ্ছে জনবিন্যাস। তাই পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি জেলাকে প্রস্তাবিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা হোক, এমনটাই তাঁর দাবি। উল্লেখ্য, বিজেপি রাজ্য সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী উত্তরবঙ্গকে উত্তর-পূর্ব ভারতে জুড়তে প্রধানমন্ত্রীকে যে অনুরোধ জানিয়েছেন সেখানে তিনি বাংলার উত্তরাংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির অনেক মিল থাকার কথা বলেছেন এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাজের সুবিধা হওয়ার কথাও বলেছেন। সুকান্ত শিক্ষা মন্ত্রকের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব উন্নয়ন মন্ত্রকেরও প্রতিমন্ত্রী।ওই মন্ত্রকের পূর্ণমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। তবে মোদীর কাছে সুকান্ত একাই এই প্রস্তাব দিয়েছেন, হতে পারে নিজের দফতরের এলাকা বাড়ানোই সুকান্তের লক্ষ্য। কিন্তু নিশিকান্ত দুবে অথবা সুব্রত মৈত্রদের মাথায় কেন হঠাৎ বাংলা ভাগের দাবি ঠেলে উঠল? লোকসভায় গোটা রাজ্যে ভাল ফল করতে না পারলেও উত্তরবঙ্গে কিন্তু বিজেপি ভাল ফল করেছে। তারপরেই হঠাৎ অনন্ত মহারাজ বলছেন উত্তরবঙ্গ কোনও দিনই বাংলার অংশ ছিল না। বিজেপির রাজ্যসভাপতি প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চিঠি লিখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে নতুন রাজ্যের দাবির নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণের কথা বলছেন।
বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, বিজেপি একদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ঘাঁটার চেষ্টা যেমন করছে একই সঙ্গে সেই ঘোলাটে পরিস্থিতির ফায়দা নিতে চাইছে। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভরাডুবি তারপর ছ’টি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে গোহারা হওয়াতে তারা যে বাংলার রাজনীতিতে ক্রমাগত ব্যর্থ এবং গুরুত্বহীন তা প্রমানিত। কিন্তু সবথেকে বড় দলটি তো হাল ছেড়ে দিতে পারে না, তাই রাজ্য রাজনীতিতে নিজেদের অস্তিত্ব জিইয়ে রাখতে নতুন রাজ্যের ধুয়ো তুলে বিতর্কের সৃষ্টি করে আলোচনায় থাকতে চাইছে। নতুন রাজ্যের দাবির মধ্যে আছে সংখ্যালঘু মুসলিম অধ্যুষিত জেলা নিয়ে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গড়া। যার মধ্যে দিয়ে তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পোক্ত করার একটা প্রচেষ্টা থেকেই যায়। চারশো আসন পারের স্বপ্ন দেখেছিলেন মোদী, বাস্তবে ফল হলো উল্টো। মোদী ক্ষমতায় থাকতেই জোট সরকার গড়তে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে বাংলায় আসন ১৮ থেকে কমে হয়েছে ১২। তৃণমূলের দুর্নীতিকে ইস্যু করেও কোনো কাজ হলনা। আর এখন বাংলায় বিজেপির হাতে আর নতুন কোনো ইস্যু নেই। তাই নতুন রাজ্যের দাবি তুলে পরিস্থিতি গরম করা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।