রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা করেন। এর জন্য প্রচুর অর্থব্যয়ও করেন। নেতার এই ভাবমূর্তি যখন সর্বব্যাপী হয়, তখনই জন্ম হয় কাল্টের (cult)। কাল্ট সম্বন্ধে উইকিপিডিয়া লিখছে : “Cult is a term, considered pejorative by some, for a relatively small group which is typically led by charismatic and self-appointed leader, who excessively controls its members, requiring unwavering devotion to set of a set of acts and practices which are considered deviant।” অর্থাৎ যখন কোন দলে বা সংগঠনে ঐন্দ্রজালিক শক্তিসম্পন্ন নেতার আবির্ভাব ঘটে, দল বা সংগঠনের সদস্যরা অন্ধভাবে তাঁকে পুজো করেন, তখনই জন্ম হয় কাল্টের। সহজভাবে বললে বলতে হয়, নেতাকে যখন ভগবানের মতো সর্বদর্শী, সর্বত্রগামী, সর্বগুণনিধি, সর্বকর্মপারংগম ও সর্বগ্রাসী বলে মনে করা হয়, তখনই তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠে কাল্ট।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে ইতালির বেনিতো মুসোলিনি, জার্মানির অ্যাডলফ হিটলারকে ঘিরে এ রকম কাল্ট তৈরি হয়েছিল। তারপর কি আশ্চর্য, যা হবার কথা নয় তাই হতে লাগল। কমিউনিস্ট দেশগুলিতেও কাল্টের নিদর্শন তৈরি হল। প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন রাশিয়ার জোসেফ স্টালিন। তারপর একে একে অনেক; চিনের মাও-জে-দঙ, ভিয়েতনামের হো-চ-মিন, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, আলবানিয়ার এনভার হোক্সা, উত্তর কোরিয়ার কিম সুঙ (২য়)। রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন, তুর্কির এরদোগান, হাঙ্গেরির ওর্বান, ব্রাজিলের বলসোনারো, আমরিকার ডোনাল্ড ট্র্যাম্পকে ঘিরেও কাল্টের বিস্তার ঘটে।
আমাদের দেশে নরেন্দ্র মোদির আগে কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল কাল্ট, যদিও তা ছিল স্বল্পস্থায়ী। ইন্দিরাকে দেবী দুর্গার নবতম সংস্করণ মনে করা হত। ১৯৭১ সালের মার্চের নির্বাচনে বিপুল জয়, এবং ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় ইন্দিরাকাল্টকে দিয়েছিল শক্তভিত্তি। তখন বলা হত ‘ইন্দিরাই ভারত, আর ভারতই ইন্দিরা’। কিন্তু সে কাল্ট ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরে, পরবর্তী নির্বাচনে হল বিপুল পরাজয়।
কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অন্য কারোর তুলনা করা যাবে না। স্টাইলে, নিত্য পরিবর্তনশীল পোশাকে, উপস্থিত বুদ্ধিতে, দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায়, শাঠ্যে, চাতুর্যে, বাগমিতায় তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম। বিজেপি নেতা জে.পি. নড্ডা ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’য় বলেছেন, ‘Modi is the only leader who has an electrifying effect on the masses and in whose call the entire nation gets united. His stupendous success is the result of absolute dedication to people’s welfare and well-being. His only aim is to make India a Biswaguru. ‘অর্থাৎ মোদি একমাত্র নেতা, জনতাকে যিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারেন এবং যাঁর ডাকে মানুষ ঐক্যবব্ধ হয়। মানুষের মঙ্গলের জন্য তিনি নিবেদিতপ্রাণ আর তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হল ভারতকে বিশ্বগুরু করে তোলা।
শুধু নড্ডা নন, মোদির দলের সব সাংসদ, সব বিধায়ক, সব নেতা, সব কর্মী চোখ বন্ধ করে মোদি ভজনা করে চলেছেন: মোদিং শরণং গচ্ছামি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ নয়, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নয়, ভারতীয় জনতা দল নয়, বীর সাভারকর নয়, দীন দয়াল নয়, অটলবিহারী নয়, আদবানি নয়, শুধু নরেন্দ্র মোদি। শুধুই মোদি মোদি মোদি। সাংবাদিক, অধ্যাপক, আমলা, বিচারক সকলের মুখে তাঁর নাম। সকলেই নতজানু। এই তো সেদিন, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বললেন যে মোদি এক “versatile genius who thinks globaly and acts locally ‘ . দেবতার মতো সর্বশক্তিমান এই মানুষটির ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। আধারে, কোভিড টিকার শংসাপত্র, গ্যাস সিলিণ্ডারে, জ্যাকেট-কুর্তায় এবং আরও কত কিছুতে তাঁর মুখের ছবি। মোদি কাল্টের মূল কথা : মোদিই ভারত, ভারতই মোদি। নিজে বিশ্বগুরু হয়ে তিনি ভারতকে বিশ্বগুরু বানাতে চান।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক