চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে ইন্ডিয়া জোট বলে আদৌ কি কিছু আছে? বিহার, মহারাষ্ট্র (মহারাষ্ট্র আগাড়ি), তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ডে জোট আগেও ছিল, এখনও জোট আছে, যদিও সেই জোটে বামেরা নেই। তেলঙ্গানাতে কংগ্রেসের সঙ্গে বামেদের সমঝোতা না হওয়ায় কংগ্রেস প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে। কেরালাতে জোটের প্রশ্ন নেই তাই আগেই বামেরা প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অসমেও আসন নিয়ে বাম-কংগ্রেস সমঝোতা হয়নি। উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী দলের সঙ্গে কংগ্রেসের একরকম সমঝোতা হয়েছে, দিল্লি, গুজরাতে আপ কংগ্রেস জোট হয়েছে।এদিকে বাংলায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৪২টা আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করেছেন, অতএব এখানেও কংগ্রেস তৃণমূল জোট হল না। কিন্তু মালদা উত্তর আর মালদা দক্ষিণে কি ঘটছে? এটা ঠিক কোন ধরণের সমঝোতা সেটা আপাতত স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, যদিও এটা স্পষ্ট হবে কিন্তু তার জন্য কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এখন ফোকাশ বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ সমঝোতা হচ্ছে কিনা তাই নিয়ে, জোট যে হচ্ছে না সেটা বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু জোর গলাতেই জানিয়েছেন, জোট বলে কিছু হচ্ছে না, যা হচ্ছে তা আসন সমঝোতা।
বাংলায় বামেরা প্রথম দফায় ১৬টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে, অবশ্য বামফ্রন্ট বলতে ১৩টিতে সিপিএম আর মাত্র তিনটি আসনে শরিক দল ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি এবং সিপিআই। ১৬ কেন্দ্রের লড়াইতে বামেরা এবার ১৪টিতেই নতুন প্রার্থী বেছে নিয়েছে আর দু’জন প্রার্থী রয়েছেন, যাঁরা আগে লোকসভা ভোটে লড়েছেন। আলিমুদ্দিনে বিমানবাবু যখম সাংবাদিক বৈঠক করছেন, তখন লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী দিল্লি থেকেই জানান, আসন সমঝোতার পথ খোলা আছে। বামেদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর একবারই কথা হয়েছিল। পরবর্তীতে কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা ‘ফলপ্রসূ’ হবে বলে আশা রাখেন সেলিম। অন্যদিকে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যানও বলছেন, ৪২টা আসনের মধ্যে তারা মাত্র ১৬টি ঘোষণা করেছে। কংগ্রেস যদি আসন সমঝোতা চায়, তাদের আপত্তি থাকবে না। কংগ্রেস সূত্রের খবর, কংগ্রেস সিপিএম-এর কাছে ১৪টি আসন দাবি করেছে। বলা বাহুল্য, বঙ্গের সব আসনে লড়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কংগ্রেসের নেই, তাই অন্য রাজ্যে প্রার্থী ঘোষণা করলেও বাংলা তারা এখনও চুপ। ঠিক এই অবস্থান থেকেই রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলায় বিরোধী ভোট ভাগ হচ্ছে আর তাতে কোথাও বিজেপি, কোথাও তৃণমূলের লাভ।
বঙ্গে বামেদের প্রথম তালিকা ঘোষণার পরও কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে সিপিএম কংগ্রেস দুই শিবির আশাবাদী হলেও আইএসএফের সঙ্গে বামেদের সমঝোতার সম্ভবনা কিন্তু যথেষ্ট ক্ষীণ। কারণ, নওসাদ সিদ্দিকীর দল ৮টি কেন্দ্রের দাবি জানিয়েছেন। তারা বারাসত, বসিরহাট, মথুরাপুর, যাদবপুর, উলুবেড়িয়া, শ্রীরামপুর, মালদা দক্ষিণ ও মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী দিতে চায়। কেবল তাই নয়, আইএসএফ চেয়ারম্যান নওশাদ সিদ্দিকী ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র থেকে দাড়াতে চান। অন্যদিকে শ্রীরামপুর থেকে দিপ্সীতা ধর, যাদবপুর থেকে সৃজন ভট্টাচার্য বামেদের প্রার্থী হয়ে লড়বেন বলে ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এখানে আইএসএফের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে সঙ্কট দেখছেন। তবে বামেরা কিন্তু ঘোষিত প্রথম তালিকায় ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র থেকে কোনও প্রার্থীর নাম জানাননি। তাহলে কী সেটা নওশাদ সিদ্দিকির কথা ভেবেই? অন্যদিকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী আইএসএফ-এর সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে বল ঠেলছেন বামেদের কোর্টেই।
আসন রফা নিয়ে বঙ্গে সিপিএম এবং প্রদেশ কংগ্রেসের মধ্যে এখন পর্যন্ত সমঝোতা বজায় থাকলেও শরিকেরা কিন্তু বামফ্রন্টকে বেজায় চাপ দিচ্ছে! শরিকেরা নিজেদের ভাগের একটি আসনও ছাড়তে চাইছে না। এবার বসিরহাট কেন্দ্রে প্রার্থী দিতে চেয়ে সিপিএম সিপিআইয়ের কাছে প্রস্তাব রেখেছিল, পরিবর্তে তাদের অন্যত্র আসন দেওয়ার প্রস্তাবও রেখেছিল কিন্তু সিপিআই সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। এই নিয়ে বিতর্ক বহুদূর গড়িয়েছে। অন্য দুই শরিকদের সঙ্গেও বিতণ্ডা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যাতে ফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন একে অপরের দিকে! সূত্রের খবর, ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায় তামিলনাড়ু গিয়ে বিজেপির সঙ্গী এডিএমকে-র সঙ্গে জোটের আলোচনায় বসেছেন। পুরুলিয়া শরিক দল ফরওয়ার্ড ব্লকের আসন, বসিরহাট সিপিআই-এর আসন, কেউ কারও জমি ছাড়তে নারাজ। ওদিকে নওয়াজ সিদ্দিকিও বসিরহাট আসন চান, সিপিএম নিরাপদ সর্দারকে সামনে রেখেই বসিরহাটে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। ফলে আসন সমঝোতা নিয়েও জোটে ঘোট লেগে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কি হবে এখনও বোঝা যাচ্ছে না।