নিমতলা শ্মশানে এর আগে একবার নয় বহুবার এসেছি। কিন্তু এতটা সুন্দর লাগেনি। আজকে কেমন যেন একটা আলাদা অনুভূতি আমার চারপাশে খেলা করে বেড়াচ্ছে। একটু আগেই বাবার নিথর শরীরটা বয়ে নিয়ে আসা হয়েছে শবাবাহী গাড়িতে। তিন নম্বর দরজাটার সামনে বাবাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। কারা যেন বললো, একটু অপেক্ষা করুন ব্রাহ্মণ চলে আসবে এখুনি। জানলা দিয়ে গঙ্গার ফিনফিনে হাওয়া সঙ্গে সামান্য রোদ্দুর এসে পরেছে। গতকাল ঠিক এই সময় বাবার কাছে ছিলাম। আজ শ্মশানে।
পারিবারিক কারনে বাবা দিদির কাছে থাকতো। বার্ধক্য জনিত কারনে বাবা বেশ কিছুদিন ধরেই শয্যাশায়ী। তবু আমার খোঁজ করতো বাবা। মা প্রায়ই ফোন করে বলতো কেমন আছিস, তোর বাবা একবার তোকে ডেকে পাঠিয়েছে। এসে দেখা করে যাস। … যাব। এই যাবটা আমার হয়ে ওঠে নি, নানা ঝামেলায়। আজ কেন যেন ঋতজাও জোর করলো চলো বাবাকে একবার দেখে আসি। আজ আমার অন ডিউটি বাবার সঙ্গে দেখে করে ওই পথে বিকাশভাবন চলে যাব।
ঘরে ঢুকতেই দেখলাম বাবা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। মা বললো, এই খাইয়ে দিয়ে ওষুধ খাওয়ালাম। আমি বললাম, তাহলে এখন থাক ডাকতে হবে না। মা বললো, জাগার পর আমার রক্ষে রাখবে। আমি ডাকলাম, বাবা, ও বাবা…। কে? বাবার ঘরঘরে গলার আওয়াজ। আমি আত্মজিৎ।
জ্ঞান পড়া অবস্থায় আমি কোনও দিন বাবাকে নাম ধরে ডাকতে দেখি নি। আমাকে বড়ো ছেলে বলেই ডাকতো। মা বললো, বড়ো ছেলে এসেছে। বাবা চোখ চাইলো। সামান্য ঘোলাটে একটু সময় নিল আমাকে চিনে ওঠার জন্য। কেমন আছিস? বড়ো বউমা এসেছে?
হ্যাঁ।
টাকাটা দে।
আমি ঋতজার দিকে তাকালাম। ঋতজা মুচকি হাসলো। বাড়ি থেকে বেরবার সময় ওকে বলেছিলাম, সঙ্গে করে কিছু টাকা নিয়ে নাও।
ঋতজা আমার দিকে বিষ্ময়ে তাকিয়ে বলেছিল, কেন!
নাও না, দেখবে কাজে লাগবে।
মা চেঁচিয়ে উঠলো, তোমার টাকার কি হবে? বড়ো ছেলে টাকা কোথায় পাবে?
আছে।
ঋতজা ব্যাগ থেকে টাকাটা বার করে আমার হাতে দিল। মা রাগারাগি করছে বাবার ওপর, আমি বললাম, থাক না। তুমি এমন করছো কেন।
ঋতজা টাকাটা বাবার হাতে দিল। বাবা কিছুক্ষণ বড়ো বউমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর টাকাটা হাতে নিয়ে আমার হাতে দিল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে বাবার দিকে।
আমি টাকা নিয়ে কি করবো?
রাখ, কাজে লাগবে।
তোমার কাছে রাখো।
না।
মা-র কাছে।
না। আমার এখন ঘুম পাচ্ছে। তুই যা, কাল আসিসি।
ঘরের সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। মা বললো, তুই টাকা নিয়ে এসেছিলি কেন?
কি জানি এখানে আসার সময় কি মনে হলো, তাই ঋতজাকে বললাম, কিছু টাকা নিয়ে চলো।
ওই টাকা তোর কাছে রেখে দে।
কথা আর বারাই নি। বেশ কিছুক্ষণ ওখানে ছিলাম। সবার সঙ্গে হইহুল্লোড় করলাম। ওঠার সময় দিদি, মা, ভাগ্না, ভাগ্নী সবাই বললো আবার কবে আসবি। আসবো। বাবার গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম, বাবা আমি আসছি। বাবা চোখ মেলে একবার তাকাল, সেই ঘর ঘরে আওয়াজ, এসো। বাবার পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করতে গেলাম, মা বললো শুয়ে থাকা মানুষকে নমস্কার করতে নেই।
পরের দিন কাক ভোরে দিদি ফোন করে জানিয়েছিল বাবা গত হয়েছেন। দিদির বাড়িতে যেতে, মা বলেছিল, তুই আরও কয়েকদিন পরে এলে তোর বাবা আর কয়েকটা দিন বাঁচতো।
চলো ব্রাহ্মণ মশাই এসেছে ডাকছেন। ঋতজার দিকে তাকালাম।
বাবার মুখাগ্নির কাজটা শেষ করলাম। যে যেরকম ভাবে বললো সেই রকমভাবেই করলাম। এবার কিছুক্ষণ অপেক্ষার পালা। তারপর ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢোকানো হবে। শ্মশানে অনেক ছোট ছোট কাজ থাকে যেমন শ্মশান যাত্রীদের একটু মিষ্টি মুখ করানো, সাদা কাপড়, উত্তরীয় কেনা ইত্যাদি ইত্যাদি। সেগুলো আমার আত্মীয়েরাই সব করলেন। আমি শুধু টাকা ধরে ধরে দিলাম। তারপর সেই মহেন্দ্রক্ষণ, ইলেকট্রিক চুল্লিতে ঢোকার মুহূর্তে কান্নার রোল, সবাই বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো, কেন জানি না আমার ইচ্ছে হলো না বাবাকে প্রণাম করতে, করিও নি। মরা মানুষটাকে কেন প্রণাম করতে যাব, জ্যান্ত থাকাকালীন আমার সাধ্যমতো তাঁকে যতটুকু করার আমি করেছি।
পায়ে পায়ে একেবারে গঙ্গার ধারে চলে এলাম। কেউ আমার পেছনে আসছিল, আমি বললাম, আমাকে একটু একা থাকতে দাও।
গঙ্গা তার আপন খেয়ালে বয়ে চলেছে। এলাহাবাদে সবাই সঙ্গমে যায় পূণ্যস্নান করতে। আমি গেছিলাম, কিন্তু স্নান করি নি। মানুষ দেখতে গেছিলাম। আর তিনটে নদী দেখতে গেছিলাম। গঙ্গা-যমুনা পেয়েছি কিন্তু সরস্বতীকে খুঁজে পাই নি। পুরাণমতে, এই ত্রিবেণীতে সরস্বতী নদী অন্তঃসলিলা অবস্থায় যমুনার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আমার বাবা আমার সরস্বতী নদী। জীবনে প্রথম সিনেমা দেখা বাবার হাত ধরে। বৃত্তি পরীক্ষার শেষ দিন বাবার হাত ধরে দর্পণা সিনেমাতে দেশবন্ধু দেখতে গেছিলাম। সেটা ষাটের দশকের প্রথম দিক। রাতে প্রবল জড়ে বিছানায় শুয়ে যখন কোঁকাচ্ছি, মা হয়তো সারাদিনের পরিশ্রান্তিতে ঝিমিয়ে পরেছে, বাবা নিস্তব্ধে মাথায় জল পট্টি দিত, আর তাল পাতার পাখা দিয়ে হাওয়া দিত। সেই সময় বাবার চোখে দেখেছি, প্রবল উৎকণ্ঠা। আবার সেই বাবাই পড়া না পারলে কিংবা দুষ্টুমি করলে যখন বেদম মার মেরেছে। মা এসে বাবার হাত থেকে বাঁচাত। গায়ে লাঠির লাল দাগড়া দাগড়া দাগে হাত বুলোতে বুলোতে বাবাকে মনে মনে গালি দিয়েছি।
ঋতজাকে আমি পছন্দ করে বিয়ে করেছিলাম। বেচাল হলেই বাবা ঋতজাকে ভীষন বকাবকি করতো। আমার কাছে ঋতজা বাবার নামে অভিযোগ করতো, আমি চুপচাপ থাকতাম। কোনও কথা বলতাম না। তবে বেশ লক্ষ্য করতাম বাবার সঙ্গে ঋতজা ফিস ফিস করে কথা বলে। দু-জনের তালমিলও খুব একটা খারপ ছিল না। একদিন বাড়িতে কেউ ছিল না, আমি বাবা বাড়িতে ছিলাম। বাবা ঘন ঘন চা খেতে ভালোবাসতেন। আমিও বাবার কাছ থেকে এই গুণটা পেয়েছি। বাবা বললো, একটু চা কর। চা করলাম। বাবাকে চা দিতে গিয়ে বললো, চা-টা নিয়ে এখানে আয়, তোর সঙ্গে কিছু কথা আছে। বাবার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম! তবু চায়ের কাপটা নিয়ে বাবার মুখোমুখি গিয়ে বসলাম। বাবা সেদিন অনেক কথা বলেছিলেন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থেকে পারিবারিক অনেক গোপন কথা। শেষে বললেন, আমি কখন কোথায় কিভাবে থাকি সেটা নিয়ে ভাববি না। নিজে যা করছিস তাই করে যা। তুই আমাদের বংশের প্রথম এমএ পাশ করা ছেলে। আমাদের পাঁচ পুরুষের কেউ স্কুলের গন্ডি পেরোয় নি। আর একটা কথা…
বাবার মুখের দিকে তাকালাম। বড়ো বউমার কাছে আমার কিছু টাকা গচ্ছিত আছে। ওই টাকাটা দিয়ে আমার সৎকার এবং পারলৌকিক কাজ করবি।
তার মানে! আমি…
আমার বাবাও এই কাজ করে গেছিলেন। তাই আমিও করলাম।
চলো, তোমায় ডাকছে। ডোম বিদায় করতে হবে।
ঋতজার মুখের দিয়ে তাকালাম। কালকে যে টাকাটা বাবাকে দিয়েছিলে সেটা তো তোমার হাতে দিলাম, ওতে আর নেই।
ওটা তোমার বাবার টাকা আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন। কেন বলতে পারবো না। তুমি বলতে তাই পুরো টাকাটাই নিয়ে গেছিলাম।
আর আছে কি?
আছে।
ওখান থেকে দিয়ে দাও।
বাবার অতো বড়ো শরীরটা এখন একগামলা হারগোড়ে পরিণত হয়েছে। ডোম ছেলেটি আমার হাতে একটা মাটির সরা ধরিয়ে দিলেন।
যান এই সরাটা গঙ্গায় ভাসিয়ে দিন—
ঋতজা আমায় ছুঁয়ে রইলো।
গঙ্গায় এসে সরাটা ভাসিয়ে দিলাম। চোখটা ঝাপসা হয়ে গেল।
মনে মনে বললাম, বাবা, তোমাকে বলা হয়নি, আমি কাউকে বলি নি।
মন ছুঁয়ে গেলো। অসাধারণ লেখা।
চোখ ভিজিয়ে দেওয়া এক অসাধারণ লেখা।
মন কেমন করা লেখা। অসাধারণ।
চোখের জল ধরে রাখা যাচ্ছে না।????
Sir,
একটা অনুরোধ ছিল। Please, কাজলদিঘী উপন্যাসটা আবার restart করুন না।????????। খুব কষ্ট লাগে এই ভেবে যে এত সুন্দর একটা কাহিনি but there’s not happy ending। Please Sir, কাহিনিটার একটা Happy Ending করুন।???????????????????????? এইটা শুধু আমার নয়। কাজলদিঘী উপন্যাসের সমগ্র fanbase এর request from the heart।????????????
একটি অসাধারণ ছোটগল্পও বটে। গতিময় ও আন্তরিক।
বাবা নামক মানুষটাকে আমরা যতটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি তাঁর অবর্তমানে তাকেই ভীষণ রকম কাছে পেতে চাই।
অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে গেল লেখাটা।