“পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নেই।”
হুমায়ূন আহমেদের এই উক্তিটি দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া, একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তিনি যেমনই হোক না কেন, বাবা হিসেবে সবসময় দশে দশ। “বাবা” শব্দটার মধ্যেই কেমন যেন একটা মায়ামেশানো নির্ভরতা আর আত্মবিশ্বাস জড়িয়ে আছে। তিনি কখনো কঠোর, কখনও কুসুম কোমল… প্রথম হাত ধরে চলতে শেখা, শাশ্বত, চির আপন বিশাল বৃক্ষের সুশীতল ছায়া বাবা।
অনেক সময় বাবা বলতেই পুরনো সাদা-কালো বাংলা সিনেমার সেই প্রতাপশালী ‘দেয়া-নেয়া’র কমল মিত্র, ‘সপ্তপদী’র ছবি বিশ্বাস গোছের একজন রাশভারী চেহারার মানুষকে মনে হয়। এঁদের দাপটে দুই সিনেমাতেই ছেলে ম্যাটিনি আইডল উত্তমকুমারের অবস্থা ছিলো বেশ ঢিলে। কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সঙ্গে প্রেম করছে, জবাবদিহি করতে করতে ছেলে জেরবার। পিতা-পুত্রের ‘মেলোড্রামাটিক’ টানাপড়েন অবশ্য আম-বাঙালি টানটান হয়ে উপভোগ করতো। তবে, সিনেমায় যেমন হয়, বাস্তবে কি তা হয় না? হয়, অন্য রকম ভাবে।
আমাদের ছেলেবেলায় ‘ফাদার্স ডে’ বা ‘বাবা দিবস’ বলে বিশেষ কোনো দিনের কথা জানা ছিলো না। তবে যাঁর উপস্থিতি জীবন-সর্বত্র, প্রতিনিয়ত … তার জন্য যদি একটি বিশেষ দিন উদযাপন করা হয়, তবে মন্দ কী! তারও প্রয়োজন আছে। প্রতিদিনের কাজের ভিড়ে তিনি যেন হারিয়ে না যান।
কারো বাবা এখনো আছে, কারো নেই আবার কারোর থেকেও নেই। এই বিশেষ দিনে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে, জীবনে তাঁর অবদানকে স্বীকার করার সুখ অনুভব করার শান্তি যদি পাওয়া যায়, তবে এমন দিবস পালিত হক রোজ।
সোশ্যাল মিডিয়াতে (ফেসবুক) একটা গল্প পড়লাম। পড়ে, আজকের দিনে খুব প্রাসঙ্গিক মনে হলো। গল্পটা এরকম—
নিউইয়র্কে একদিন এক সাংবাদিক রামকৃষ্ণ মিশনের এক সন্ন্যাসীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন।
সাংবাদিক— আপনার গতকালের বক্তৃতায় আপনি বলেছেন, … কনট্যাক্ট এবং কানেকশন। আমি দ্বিধায় আছি। একটু ব্যাখ্যা করবেন?
সন্ন্যাসী মৃদু হাসলেন এবং আপাত দৃষ্টিতে প্রশ্ন থেকে নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে বললেন— আপনি নিউইয়র্কে থাকেন?
— হ্যাঁ।
— বাড়িতে কে কে আছেন?
সাংবাদিক ভাবলেন উনি প্রশ্নটা এড়াতে চাইছেন, তাই এরকম ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করছেন। তবুও বললেন— মা মারা গেছেন। বাবা আছেন। আর তিন ভাই ও এক বোন। সবাই বিবাহিত।
সন্ন্যাসী মৃদু হেসে বললেন— বাবার সঙ্গে কথা হয়?
সাংবাদিক বিভ্রান্ত।
সন্ন্যাসী জিজ্ঞেস করলেন
— বাবার সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছে?
সাংবাদিক নিজের বিরক্তি চেপে রেখে বললেন— মাস খানেক হবে।
সন্ন্যাসী— তোমাদের ভাইবোনদের মাঝে মধ্যেই দেখা হয়? শেষ কবে ফ্যামিলি গেট-টু-গেদার হয়েছে?
সাংবাদিক যথেষ্ট ঘামতে শুরু করেছেন।
মনে হচ্ছিল যেন সন্ন্যাসীই সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
লজ্জাবনত হয়ে উত্তর দিলেন— দুবছর আগে খ্রিস্টমাসের সময়।
— সবাই একসঙ্গে কদিন কাটিয়েছিলেন?
— দুদিন।
—বাবার পাশে বসে ছিলেন কতক্ষণ?
সাংবাদিক বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
— আপনারা কি একসঙ্গে ব্রেকফাসট, লাঞ্চ, ডিনার করেছিলেন? উনি কেমন আছেন জিজ্ঞেস করেছিলেন? মা মারা যাওয়ার পর কি ভাবে উনি সময় কাটাচ্ছেন, জিজ্ঞাসা করেছিলেন?
সাংবাদিকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
সন্ন্যাসী তাঁর হাত ধরে বললেন— লজ্জিত হবেন না। অনুশোচনা করবেন না। আমি দুঃখিত আপনাকে অজান্তে আঘাত দিয়ে থাকলে। আসলে এটাই আপনার প্রশ্নের উত্তর।
বাবার সঙ্গে আপনার কনট্যাক্ট আছে কিন্তু কানেকশন নেই। কানেকশন হৃদয়ে হৃদয়ে হয়। একসঙ্গে বসা, খাবার ভাগা ভাগি করে খাওয়া। একে অপরের খেয়াল রাখা, স্পর্শ করা, হ্যান্ডশেক করা, চোখে চোখ রাখা, একসঙ্গে সময় কাটানো। আপনাদের সব ভাই বোনের কনট্যাক্ট আছে কিন্তু কানেকশন নেই।
সাংবাদিক চোখ মুছে বললেন— এই সুক্ষ্ম ও অবিস্মরণীয় শিক্ষার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই ।
ঐ সন্ন্যাসী আর কেউ নন, স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ।
আজকে এটাই বাস্তব যে আমাদের অনেক কনট্যাক্ট আছে কিন্তু কানেকশন কই? অনেকেই গর্ব করে বলি আমার এত হাজার কনট্যাক্ট আছে। কানেকশন? সবাই নিজের জগত নিয়েই মশগুল।
জীবনের শেষপ্রান্তে এখন বাবাদের কাছে সবকিছু থেকেও নেই। বিত্ত-বৈভব, সন্তান-সন্ততি, নাতি-নাতনি সবই আছে। তার সঙ্গে আছে বাড়ির সামনের সুসজ্জিত ড্রয়িংরুম আর একাকিত্ব। বাবার সকাল কেটে বিকাল হয় না, রাত শেষ হতে চায় না, দিন কাটে না। মনে হয় যেন জীবনের সবচেয়ে অলস সময় এখন তার বয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে বয়সের ভার, একাকিত্ব, রুগ্নতা তাকে করে তোলে আরো নিঃসঙ্গ।
কোভিড পরিস্থিতিতে খবরে অনেকবার দেখেছি অসহায় বাবাকে সন্তান হাসপাতালে ফেলে চলে যাচ্ছে। খোঁজ অবধি নেয় না। মূক-বধির, দৃষ্টিহীন, দুর্বল, জীবনবোধহীন সন্তানকে বুকে আগলে পিতা তার কর্তব্য আমৃত্যু পালন করে। তবে সন্তানদের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হবে কেন!!
প্রত্যেকটি সন্তানকে অনুরোধ করব, বাবাদের একটু সময় দিন। তারা হয়ত নিজেদের একটু রিজার্ভ করে রাখেন। আমরা সন্তানরাই না হয় বাবাদের কাছে যাবো। হয়ত বাবারা একটু কম কথা বলবে কিন্তু বিশ্বাস করুন তাদের মনটা আনন্দে ভরে উঠবে। রাশভারী বাবার স্নেহের ফল্গুধারা বয়ে যায় গোপনে। ইহকালের ভিত্তিভূমি তো তিনিই।
ভালোবাসি নাইবা বলা হলো। তার ব্যাপ্তি রয়ে যাবে জীবনের প্রতিটি শিক্ষায়। তা সে সাধ্যের মাঝে জীবন ধারণের শিক্ষাই হোক বা দেশপ্রেম।
কিছু কথা না বলাতেই বলা হয়ে যায় বহুকিছু … মনে মনে।
বাবা, তোমাকে প্রণাম।।
আমার বাবা নেই 2 বছরের কিছু বেশি সময়। অনেক সময় মনে হয় সামনে রয়েছেন।
বাবাকে আমার প্রনাম।
ধন্যবাদ।
খুব ভালো প্রতিবেদন। সোশ্যাল মিডিয়ার গল্পটা আগেও পড়েছি। ভালো লাগল।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
খুব সুন্দর লিখেছেন????????????
থ্যাঙ্ক ইউ