সৌম্য সিংহ
এটাই হয়। গালওয়ানে গাজোয়ারি দেখাতে গিয়ে সুদূর হংকং-এ মারাত্মক চাপে পড়ে গিয়েছে চিন। চাপ মানে একেবারে ঘরে বাইরে সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে কমিউনিস্ট চিন। আর সব জায়গার মতো হংকং-এও নিজেদের বিপদটা নিজেরাই ডেকে এনেছে তারা। নাগরিকদের ওপরে চাপিয়ে দিচ্ছে ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি ল’ বা জাতীয় নিরাপত্তা আইন। উদ্দেশ্য, স্পষ্টতই গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করা। চিনের নাগরিকরা যেমন রাষ্ট্রের কড়া নজরদারির আওতায় তটস্থ, ঠিক তেমনভাবেই হংকং এর নাগরিকদেরও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে চিনের কমিউনিস্ট শাসককূল। আর এটা করতে গিয়েই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে গেছে চিন। বিক্ষোভে উত্তাল হংকংও।
অথচ ১৯৯৭-এর ১ জুলাই ব্রিটেন থেকে চিনে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর পর্বে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছিল হংকং-এর স্বশাসন, বিশেষ মর্যাদা এবং মানুষের অধিকারের কথা। কিন্তু চিন-পার্লামেন্টে জাতীয় নিরাপত্তা আইন সম্প্রতি পাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যত পরিষ্কার হয়ে গেল এই অধিকার কেড়ে নেওয়ার পথ। অনেক আগে থেকেই এর বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন হংকং-এর মানুষ। কোভিড আতঙ্কের মধ্যেই সেই প্রতিবাদ আন্দোলন জোরদার হয়েছে ভিন্ন ধারায়। প্ল্যাকার্ড হাতে দীর্ঘ মৌন মিছিলে হাঁটছেন হাজারো জনতা। এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপানের মতো শক্তিধর দেশ। আছে ভিয়েতনামও। এবং অবশ্যই কড়া নজর রাখছে ভারত। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে। সামগ্রিকভাবে চিনের আগ্রাসী মনোভাবের সমুচিত জবাব দিতে শুরু হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী তৈরির ভাবনাও।
আসলে সীমান্ত-শত্রুতা ছাড়াও, হংকং-এর স্পেশ্যাল অ্যাডমিনিস্ট্রিটিভ রিজিওনে কমিউনিস্ট চিনের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ভারতের রুখে দাঁড়ানোর নেপথ্যে রয়েছে আরও একটা বিশেষ কারণ। কী সেই কারণ? মনে রাখতে হবে, হংকং বসবাসকারী ভারতীয়র সংখ্যাটা কিন্তু বড় কম নয়। কমপক্ষে ৩৮,০০০। এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে তাঁদের অবদানটাও কিন্তু বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত তথা রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাজীব কে চন্দর জানিয়েছেন, সম্প্রতিক ঘটনাবলী এবং সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপরে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যে সব বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে, তাও শোনা হচ্ছে গুরুত্ব দিয়ে। অর্থাৎ, এটা পরিষ্কার যে চিনের ওপরে ভারতের পাল্টা চাপ তৈরির সুযোগ এনে দিয়েছে হংকং।

এদিকে করোনা-সহ বিভিন্ন ইস্যুতে এমনিতেই চিনের ওপরে বেজায় খাপ্পা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লাদাখ সীমান্তে ভারতের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাঁধানোয় চিনের ওপরে আরও চটেছেন ট্রাম্প। সেই ক্রোধকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে হংকং-এ চিনের কান্ড-কারখানা। ভারত এবং অন্যান্য দেশের প্রতি চিনের আগ্রাসী মনোভাবে বিরক্ত ট্রাম্পের মন্তব্য, চিনা কমিউনিস্টদের আসল চরিত্র এটাই। চিনকে উচিত শিক্ষা দিতে হংকং-এ বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছে মার্কিন-মুলূক। যার মধ্যে থাকতে পারে আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ভাবনাও। শুধু আমেরিকা নয়, চিনের ওপরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ব্রিটেনও। উদ্বিগ্ন রাষ্ট্রপুঞ্জের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও। আশঙ্কা একটাই, চিনের মূল ভূখন্ডে যেভাবে ভিন্ন মতাবলম্বীদের পদদলিত করে কমিউনিস্ট শাসকরা, দেশদ্রোহীতার মিথ্যে অভিযোগে জেলে পোরা হয় প্রতিবাদীদের, ঠিক সেভাবেই হংকং-এও গণতন্ত্রের ওপরে রোলার চালানোর জন্য নয়া জাতীয় নিরাপত্তা আইন চালু করছে চিন। এই পরিস্থিতিতে কিন্তু শত্রু চিনকে চাপে রাখার সুযোগ হারাতে চায় না জাপানও। ভারতের সঙ্গে যৌথ নৌ-মহড়ার মধ্যে দিয়েই সেই বার্তা ইতিমধ্যেই দিয়েছে জাপান। কারণ, দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের দাদাগিরির অপচেষ্টায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে জাপান, ভিয়েতনাম-সহ বেশ কয়েকটা দেশে। রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সও স্পষ্ট করে দিয়েছে ভারতের পক্ষে এবং চিনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান।
এদিকে অত্যাধুনিক সামরিক-সজ্জার পাশাপাশি চিনের ওপরে অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ব্যাপারে ভারতের কৌশলগত পদক্ষেপও লক্ষণীয়। ৫৯টি চিনা অ্যাপ বাতিলের পরে 4G Up gradation এর trial থেকেও বাদ চিন। সড়ক তৈরির কাজে এখন থেকে আর নতুন কোনও টেন্ডারেও অংশ নিতে পারবে না কোনও চিনা সংস্থা। ভারত সরকার মনে করলে বাতিল করতে পারে পুরনো টেন্ডারও। এখানেই শেষ নয়, এদেশে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পোদ্যোগেও অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে চলেছে চিন। স্বাভাবিকভাবেই প্রবল অস্বস্তিতে তারা।
অন্যদিকে করোনা-সঙ্কটের দায়ও প্রবলভাবে চেপে বসেছে প্রেসিডেন্ট জিনপিং-এর ঘাড়ে। আমেরিকা তো বটেই, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, জার্মানির মতো অনেক দেশই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, এই বিশ্ব-বিপর্যয়ের জন্য দায়ী আসলে চিনই। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাই চিনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষপাতি তারা। কিছু দেশ আবার করোনায় প্রবল আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে চিনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবির পক্ষেও সওয়াল করছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ১০০টা দেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে দাবি তুলেছে, করোনা-বিপর্যয়ের আসল কারণ খুঁজে বের করতে বসানো হোক তদন্ত কমিটি। ফলে বেশ অস্বস্তিতে চিন। কারণ, যে কোনও মুহূর্তেই একঘরে হওয়ার সম্ভাবনা।
এত কিছুর পরেও আবার হংকং-এ গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করার স্বভাবসুলভ বাসনা। এবং সেই বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য জাতীয় নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন। একের পর এক উদ্ধত পদক্ষেপ সত্যিই এবারে চরম বিপদ ডেকে আনছে চিনের সামনে।