৫৩তম বিজয় দিবসে (২০২৩) মানুষের মনে বয়ে চলা আনন্দময় সুবাতাসে আগুন সন্ত্রাসীদের উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। সন্ত্রাসীরা ছদ্মবেশে স্মৃতিসৌধে উপস্থিত হবে হয়ত এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনাধারক সরকারপ্রধান জননেত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগানও দেবে — কিন্তু তাদের অপতৎপরতা সম্পর্কে আমাদের সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। বিজয় দিবসকে উৎসবমুখরিত করার জন্য আগুন সন্ত্রাসীদের স্বরূপ উন্মোচন করাও জরুরি। ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদন শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বলেছিলেন — ‘রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে আগুন দিয়ে সাধারণ নাগরিক হত্যার ঘটনা বর্বরোচিত ও মর্মান্তিক।’ আগের দিন সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শনের অভিজ্ঞতাও সেসময় তুলে ধরেছিলেন পিয়েরে মায়াদন। “একজন মানুষ কিভাবে এই বর্বরোচিত কাজ করতে পারে,” প্রশ্ন রেখেছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বিএনপি পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করে। তাদের হাত থেকে শিশু এবং অসুস্থ নারীরাও রেহাই পায় নি সে দিনগুলোতে। ২০১৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবে অভিহিত করেছিলেন পিয়েরে মায়াদন। ভালো সম্পর্কের সেই অবস্থা এখনো বজায় আছে। কিন্তু তখন থেকেই বিএনপি’র যে অসুস্থ রাজনৈতিক ধারার সূচনা হয় তা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে ২০২৩ সালে এসে।
গত মাসে (নভেম্বর ২০২৩) লেটস টক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, ‘আন্দোলনের নামে তারা সন্ত্রাস চালাচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বিশ্বের যে কোন দেশে একটি রাজনৈতিক দল এভাবে রাস্তায় সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারলে সন্ত্রাসী দল হিসেবে ঘোষণা করে তাদের রাজনীতি বাতিল করে দেয়া হতো। এখন বিএনপি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি দলে পরিণত হয়েছে।’… তাঁর মতে, ‘শুধু মাত্র ২৮ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগীদের ডাকা ছয় দিনের হরতাল ও অবরোধে দেশের অর্থনীতির আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘জামায়াত একটি যুদ্ধাপরাধীদের দল, জঙ্গি দল, তবে পশ্চিমারা তাদেরকে জঙ্গি সন্ত্রাসী বলবে না। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকারের কোন চিহ্ন নেই’। তিনি বলেন, গত তিন নির্বাচন পর্যালোচনা করে দেখেছি। এদেরকে এভাবে যানবাহনে আগুন দিতে একটি শ্রেণি উৎসাহ দিচ্ছে। বিএনপি আগুন জ্বালাচ্ছে, মানুষ পোড়াচ্ছে। কিন্তু বিএনপি সন্ত্রাসী দল-এটা এখন দিবালোকের মতো সত্য। বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করতে চাইলে নৌকাকে ভোট দিতে হবে। প্রতি নির্বাচনে নৌকাকে ভোট দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বিএনপি বলে কিছু থাকবে না। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা যায়, বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসী দল, জঙ্গিবাদের মদদদাতা। এজন্য দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা কেবল নয়, এই দুটি দলের নেতাকর্মীকে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিচারের সম্মুখীন করা দরকার।
দুই.
১০ ডিসেম্বর ছিল বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। ২০২৩ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আমরা দেখতে পাচ্ছি ফের আগুন সন্ত্রাসের পথে হাঁটছে বিএনপি-জামায়াত। তাদের হরতাল-অবরোধে বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি। শিক্ষা জীবনে শিশু ও তরুণ সমাজ সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। শ্রমজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জীবিকা নির্বাহের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত। যেন ২০১৩ ও ১৪ সাল ফিরে এসেছে। সেসময়ের মতোই টানা হরতাল, অবরোধ, ভাঙচুর, পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীর ওপর হামলা এবং চলন্ত বাসে অগ্নিসংযোগ করে বিএনপি-জামায়াত মানুষের মৌলিক অধিকার হরণে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। মানুষকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রেখে মজা দেখার মতো তামাসা আরেকটি নেই। কিন্তু তাদেরও মনে রাখা দরকার ‘নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়’? তারা যে হাতে আগুন নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, সেই আগুনে তাদের নিজেদের ঘরও পুড়তে পারে। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, মাঠের রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির কর্মসূচিতে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই। গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ‘মহাসমাবেশ’ সফল না হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই জনগণের মন জয় করতে না পারা।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, যানবাহনে আগুন দেয়ার জন্য ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় ভাড়া করা হচ্ছে সমমনা সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ও মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারকারীদের। ফিলিং স্টেশন থেকে মোটরসাইকেলে অকটেন নিয়ে পরে তা বের করা হচ্ছে। আর সেই অকটেন বা পেট্রোলে পোড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন যানবাহন। ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশের নামে বিএনপি-জামায়াত এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করে।রাজধানীর কাকরাইলে বাসে আগুন দেয়। সাংবাদিক ও প্রধান বিচারপতির বাসভবন লক্ষ্য করে হামলা চালায়। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্তত ৭টি গাড়িতে আগুন দেয়।
২৮ অক্টোবরের পর থেকে ধাপে ধাপে হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচি দিচ্ছে দলটি। দশম দফায় ৬ এবং ৭ ডিসেম্বর ভোর ৬টা থেকে শুক্রবার (৮ ডিসেম্বর) ভোর পর্যন্ত অবরোধের ডাক দিয়েছিল বিএনপি। গত ২৯ অক্টোবর থেকে এর বাইরে চারটি হরতালও করেছে তারা। আজ রোববার মানবাধিকার দিবসে তারা মানববন্ধন করেছে।পুনরায় ৩৬ ঘণ্টা (১২ তারিখ থেকে) অবরোধ ডেকেছে। বিএনপি-জামায়াত অবরোধের মধ্যে গাড়িতে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজপথে পুলিশ থাকলেও আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। শেখ হাসিনা সরকারের উপর মানুষের অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস আছে বলে দেশকে অচল করতে পারছে না বিএনপি নামক সন্ত্রাসী দলটি।
নির্বাচনকে ইস্যু বানিয়ে বিএনপি-জামায়াত যে সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে তা স্পষ্টত মানবাধিকার লঙ্ঘন। ২০১৩ ও ২০১৪ সালেও তারা এমন সংঘর্ষে জড়িয়েছিল। ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত ৯০ দিন হরতাল-অবরোধ করেছে। তখনও তারা সারা দেশে ব্যাপক নৈরাজ্য চালিয়েছে। এবারো তারা একই কাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে। আগুনসন্ত্রাস ও ভাঙচুরকে সম্বল করে বিএনপি-জামায়াত তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে — এটা বলাবাহুল্য।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে ১৭ জন পুলিশ, ২ জন বিজিবি ও ২ জন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যকে হত্যা করে জামায়াত-বিএনপি সন্ত্রাসীরা। এ ছাড়া অসংখ্য সাধারণ জনতাকে হত্যা ও আহত করে আগুন দিয়ে, সে সব ঘটনা আমরা সবাই জানি। অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান লিখেছেন, ‘রেললাইন উপড়ে ফেলা, বোমা মেরে মানুষ মারা, গুলি করে বিজিবি হত্যা, সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন গাড়িচালকের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের হাত-পায়ের রগ ও কব্জি কর্তন ইত্যাদি সহিংস ঘটনা যে কোনো সুস্থ মানুষের বোধের বাইরে। এভাবে একটা নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবেই। এতে জামায়াত-শিবিরই যে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে, সে ব্যাপারে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। কাজেই শেখ হাসিনা তার নির্বাহী ক্ষমতা অনেকাংশে বা সম্পূর্ণ ত্যাগ করলেই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে কি-না, সে ব্যাপারে কিন্তু সন্দেহ থেকে যাবে। আমার মতে, এসব করলেও বর্তমান সহিংসতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না দেশবাসী। কারণ, বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিক এবং এভাবে ক্ষমতায় যাক — এটা জামায়াত ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীরা চায় না। একটি গণতান্ত্রিক দল ক্ষমতায় গেলে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বাতিল করতে পারবে না। যেমন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বাঁচাতে পারেনি। তবে বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করেছিল তারা। মূলত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দোষীদের বিচার বানচাল করতে হলে একটি অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি করে অগণতান্ত্রিক সরকারের দ্বারস্থ হতে হবে জামায়াতকে। এ জন্যই দেশের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বাহিনী সশস্ত্র তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। আমার অভিমত হলো, দৃঢ়হস্তে এই অপরাধীদের দমন করতে হবে। বর্তমান সরকারকে একটি সুন্দর নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হলে নাশকতা সৃষ্টিকারীদের কঠোরহস্তে দমন করা ছাড়া উপায় নেই। আর জনগণের জানমালের নিশ্চয়তা বিধান করা শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তাবে। তাই এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করে থাকলে চলবে না। কারণ, এই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশ ভয়ানক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হতে পারে। তখন সন্ত্রাসের রাজত্ব দীর্ঘকালের জন্য আমাদের বুকের ওপর চেপে বসতে পারে। তাই সন্ত্রাস দমনে সরকারের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক দৃঢ় পদক্ষেপ আশা করছি।’ (সমস্যা প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে না, অন্য কোথাও?) ড. মীজানুর রহমানের কথার সূত্রে বলা দরকার — ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিরোধিতা করে বিএনপি-জামায়াত জোট দেশব্যাপী সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগ তাণ্ডব চালিয়েছিল। নির্বাচনের দিন সহিংসতায় প্রিসাইডিং অফিসারসহ মারা যান কয়েকজন। সারা দেশে ৫৮২টি স্কুলের ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা হয়। নির্বাচন ঘিরে হরতাল-অবরোধে প্রতিদিন দেশের ১৬০০ কোটি টাকা বা জিডিপির ০.২ শতাংশ ক্ষতি হয়।
সেই সময়ের মতো চলতি বছর দেশে আবারো হরতাল-অবরোধের নামে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। হরতাল ও অবরোধ রাজনৈতিক দাবি আদায়ের কৌশল হলেও দেশের অর্থনীতির জন্য এটি চরম ক্ষতিকর। ১০ বছর আগে ঢাকা চেম্বারের এক গবেষণায় দেখা গেছে — একদিনের হরতালে তখন আর্থিক ক্ষতি হতো ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে অর্থনীতির আকার ৪ গুণ বেড়েছে। ফলে এ সময়ের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে ক্ষতিও সেই হারেই বাড়বে। একদিকে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে মানবাধিকার লঙ্ঘন অন্যদিকে আর্থিক খাতে ক্ষতি সাধন করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেছে বিএনপি-জামায়াত। ২৪ দিনে পরিবহণ খাতে ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তিন.
বিএনপি আন্দোলনের নামে ‘সন্ত্রাস করছে’। বিএনপি অবরোধের নামে নৃশংস হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসন্ত্রাসের ‘মহোৎসবে’ মেতে উঠেছে।আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপি শুধু সন্ত্রাস চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের মাধ্যমে তথ্য-সন্ত্রাস অব্যাহত রেখেছে। যার মধ্য দিয়ে তাদের চিরাচরিত মিথ্যাচার-অপপ্রচার ও গুজবের প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে।’ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উগ্র-সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাস বিএনপির রাজনীতির মূল অস্ত্র। এখন তারা তথাকথিত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের আড়ালে পুনরায় সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। বিএনপির ‘বেপরোয়া সন্ত্রাসীবাহিনী’ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপরও হামলা চালিয়েছে। তারা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর এবং অসংখ্য যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করেছে। তাদের নারকীয় হামলায় লালমনিরহাটে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম শাহদাত বরণ করেছে, তাদের অগ্নিসন্ত্রাসে একজন নিরীহ পরিবহণ শ্রমিক নাইম অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। এছাড়াও সারা দেশে আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে।
অবরোধকারীদের আগুন সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যাদের বেশিরভাগই নিম্নবৃত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাসে আগুন দিতে গিয়ে হাতেনাতে আটক হয়েছে বেশ কয়েকজন। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দেয়ার জন্যই হরতাল-অবরোধের নামে ঘটানো হচ্ছে বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা। যেখানে আগুন সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ।
চার.
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে যারা সন্ত্রাস সংঘটনে ইন্ধন দিয়েছে, সক্রিয়ভাবে নাশকতায় জড়িত থেকেছে এবং সহিংসতাকে রাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত করেছিল তারা এবং তাদের সমর্থকরা সেই সময়ের মতো বর্তমানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করছে। নভেম্বরে (২০২৩) চতুর্থ দফা অবরোধের আগের রাতে শুধু রাজধানীতেই আটটি বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর বাইরেও ঘটেছে একই ঘটনা। ৬ ডিসেম্বর শুরু হওয়া অবরোধের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্নস্থানে ১২টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী আগুন-সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো সংলাপ করা যায় না বলেছেন — আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। অর্থাৎ তাদের আন্দোলন কোনো সুস্থ ধারার রাজনীতি নয়। কারণ জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ এবং ভোগান্তি কোনো সুস্থ ধারার রাজনীতি হতে পারে না। মানবাধিকার রক্ষার জন্য আমাদের সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। বিএনপি-জামায়াতের কোনো জনসমর্থন নেই। তবু তারা বিদেশিদের কাঁধে চড়ে সহিংসতা করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে মানুষকে এখনো চেয়ে থাকতে হচ্ছে আওয়ামী লীগের দিকে। আদর্শগত ও সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার সুযোগ দলটির অভ্যন্তরে রয়েছে।
পুনরায় ফিরে দেখতে হবে অতীতের ইতিহাস। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সম্পন্ন হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সন্ত্রাসের মুখে অসাধারণ সংগ্রাম ও বিজয়। বিএনপি-জামায়াতের সহিংস মারমুখী অবস্থানের মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার ঘটনা আমাদের দেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। সন্ত্রাস ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষের সেই নির্বাচন দেশবাসীকে স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু জামায়াত-বিএনপির অপতৎপরতা, হঠকারিতা থেমে থাকেনি।
সুস্থধারার রাজনীতি অবশ্যই হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত। থাকবে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস এবং আপামর জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে দলের নীতি নির্ধারণে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর দৃঢ় আস্থা প্রদর্শন করেছে। আর বিএনপি-জামায়াতকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেছে। কারণ বর্তমান প্রজন্মের কাছে শেখ হাসিনা এক আশ্চর্য সাহসী রাজনীতিকের নাম; যার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া শেখ হাসিনাবিহীন যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ জন্য তরুণ প্রজন্ম প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি-জামায়াতকে। আবার নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার বীভৎস চিত্র গণমানুষকে আতঙ্কিত করে তোলায় তারা আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করে।এদিক থেকে ৭ জানুয়ারির (২০২৩) নির্বাচন আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। বিএনপির অবরোধের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ২০২৩-এর শেষও হবে নাশকতার মধ্য দিয়ে।কিন্তু সহিংসতা আর জ্বালাও-পোড়াও করে তারা থামাতে পারবে না নির্বাচন। বরং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে তাদের বাঁচা-মরার আন্দোলনও দমে যাবে।
অন্যদিকে গত কয়েক বছর ধরে বিএনপি কয়েক দফা আন্দোলনের হুঙ্কার দিয়েও মাঠ গরম করতে পারেনি। বরং জামায়াতের প্রধান মিত্র তারা হরহামেশাই বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘জামায়াতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্বাচনী রাজনীতি’র হলেও তা এখন কাজে লাগছে না। শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, কূটনীতিক দিক থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। তিনি মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সব বিরূপ পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছেন।গত আমলে তাঁর মন্ত্রিসভায় যুক্ত হন অভিজ্ঞ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিকরা। কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও উন্নয়ন সহযোগী ও অংশীদার বানিয়ে ফেলেছেন রাশিয়া ও জাপানকে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়েছে। পূর্বমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা দেখা যাচ্ছে।নিজের সরকারের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে উপস্থাপন করে প্রশংসিত হয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী।
পাঁচ.
বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের কথা স্মরণে রেখেই বলতে হচ্ছে, ৭ জানুয়ারির (২০২৩) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে বিএনপি সন্ত্রাসীদের নিয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়ে যাচ্ছে; ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারের চেষ্টা করছে। একারণে আন্দোলনের নামে সামান্যতম নৈরাজ্য-সহিংসতা চালানোর চেষ্টা করা হলে ‘জিরো টলারেন্স’অবস্থানের ঘোষণা এসেছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। বিএনপির আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে রাজপথে সক্রিয় থাকছে আওয়ামী লীগ। এ কথা প্রমাণিত যে, বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে জানমালের ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। দেশের মানুষ যেখানে স্বস্তি ও শান্তিতে থাকতে চায়; যেখানে মানুষ নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে ইচ্ছুক সেখানে জ্বালাও-পোড়াও, পেট্রল ঢেলে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য কাজ করতে চাইলে পুলিশ প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেবে এটাই স্বাভাবিক।
বিএনপি’র আন্দোলনের সঙ্গে জনগণ নেই। কারণ আন্দোলন করার মতো কোনো সংকট দেশে তৈরি হয়নি। দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। তাই জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আন্দোলনের ডাক দিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। জনগণ তো দূরের কথা বিএনপির কর্মীরাই প্রস্তুত নয়; আর কর্মী তো দূরের কথা তাদের দলের নেতারা প্রস্তুত নন। আর আন্দোলন কখনো অঙ্ক কষে হয় না। যাদের নিয়ে কুচকাওয়াজ করে বিএনপি আন্দোলন করবে সেই জামায়াত নির্বাচন করতে পারছে না। তাদের অবস্থা এখন নাজুক। এই জামায়াত-হেফাজতরা বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করেছে। অতীতে নির্বাচনের আগে-পরে সারা দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ, হামলা, নির্যাতনের ঘটনাকে হেফাজতে ইসলাম আন্তর্জাতিক চক্রের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে দাবি করেছিল।
আসলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলাকে ইসলামবিরোধী আন্তর্জাতিক চক্রের কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সন্ত্রাস দমনে সরকারের দায়িত্ব রয়েছে বেশি। সেখানে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কি করে আধিপত্য বিস্তার করেছে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। বরং খোদ রাজধানীসহ অনেক জায়গায় জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীসহ ছাত্রশিবির ক্যাডারদের গোপন বৈঠকের সংবাদ আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।অবরোধের মধ্যে ছাত্র শিবিরের ঝটিকা মিছিলও দেখা গেছে।দেশজুড়ে নাশকতায় লিপ্ত দলের এই গোপন বৈঠক ও মিছিল নির্বাচনের আগে নাগরিক সমাজের শান্তি বিঘ্নিত করছে এটা স্পষ্ট।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পক্ষ নিয়ে বিএনপি যে রাজনীতি করছে এবং অবরোধ, হরতাল ও নাশকতাকে বেছে নিয়েছে তা আজকে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরা দরকার। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের মানবাধিকারের বয়ান দিয়ে রক্ষা করা যাবে না। বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা হিরো আলমের উপর হামলা হলে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেন কিন্তু পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীকে বিএনপি যখন পিটিয়ে হত্যা করা হলে তখন নিশ্চুপ থাকেন।এজন্য তাদের মানবাধিকারের বয়ান বা ভাষ্য নিরপেক্ষ নয়।
মনে রাখতে হবে, একসময় গাড়ি-বাড়িতে আগুন, পেট্রল বোমা, পুলিশকে মারধর ও হত্যা করা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করেছিল বিএনপি-জামায়াত। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে হত্যা ও পঙ্গু করা হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। সহিংসতায় নতুন মাত্রা যুক্ত করে ফায়দা লুটতে চেয়েছে বিএনপি-জামায়াত। টানা হরতাল-অবরোধে শিক্ষা, ব্যবসা, আর বিদেশে দেশের ভাবমূর্তির অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হয়েছে।
সুস্থ ধারার রাজনীতি থেকে এই বিচ্যুতি দেশের তরুণ প্রজন্মকে দিশাহারা করতে পারে সাময়িকভাবে। কিন্তু নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ইতিহাসকে স্মরণ করা দরকার।
প্রকৃতপক্ষে রাজপথে সরকার পতনের মতো আন্দোলনের সাংগঠনিক ক্ষমতা না থাকায় এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো হওয়ায় বিএনপি জনগণের কোনো আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকার সামাজিক দুর্বৃত্তায়নকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় অতীতে (২০০১-২০০৬) দেশ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও লাগামহীন দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় উন্মত্ত জোটের মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের তাণ্ডবের কথা আমাদের সবারই মনে আছে।রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপক।
ছয়.
গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়েছে তাতে কোনো ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য পরিবেশিত হচ্ছে না। এমনকি বিভিন্ন ফোরামে উপস্থাপিত তথ্যাদি বা সরকারের উন্নয়ন না হওয়ার ব্যাপারে কোনো কথা বলেছেন না কেউ। এজন্য সরকারের উন্নয়নের ব্যাপারে কোনো চ্যালেঞ্জ না করে নির্বাচনকে ভণ্ডুল করার জন্য উদ্ভট আর মিথ্যাচারের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। শেষ পর্যন্ত তারা সরকারের উন্নয়নকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। আর সব দিক দিয়ে তাদের পরাজয় ঘটেছে বলেই দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা রক্ষায় ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। বিএনপি এটা স্বীকার না করলে সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চা কখনো সম্ভব নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন করা দলটির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিএনপি নামক দলটির আগুন সন্ত্রাসীদের অন্তর্ধান ঘটুক এবং ৫৩তম বিজয় দিবস মহিমান্বিত হয়ে উঠুক-এই প্রত্যাশা সকলের।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com