এক বা একাধিক দাবি আদায়ের যে কোনও আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে আন্দোলনকারী এবং সরকার দুপক্ষের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হয়৷ প্রথমত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে চালাতে গিয়ে আন্দোলনকারীদের পক্ষে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলার সম্ভবনা থেকেই যায়। আর সেটাকেই আন্দোলনের দুর্বলতা ধরে নিয়ে সরকার নানা দিক থেকে হাতিয়ার করে। তারা আন্দোলনকারীদের সাংগঠনিক শক্তিকে কমজোরি ধরে নিয়ে দমন পীড়ন নামিয়ে আনার চেষ্টা করে। অথবা আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে আন্দোলন ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চালায়।
অন্যদিকে; কোনও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে চললে সেই আন্দোলেনের কথা জাতীয় স্তর থেকে আন্তর্জাতিক স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে আন্দোলনকারীরা দেশের পাশাপাশি বিদেশের মানুষেরও সহানুভূতি আদায় করে নিতে সমর্থ হয়। এরই বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে সরকারের ওপর। সরকারের জনপ্রিয়তা এতে ধাক্কা খায়৷ অস্বীকার করার উপায় নেই যে নোট বন্দী হওয়ার আগে পর্যন্ত মোদী সরকার এদেশে জনপ্রিয়তার হাওয়াকে বিপুলভাবেই নিজেদের পক্ষে আনতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু তারপরই সেই হাওয়ার মুখ ঘুরতে শুরু করে। বিশেষ করে গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কৃষকরা কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধভাবে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে এসেছেন। তাদের আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে গিয়েছে গোটা বিশ্বে। পাশাপাশি গত এক বছরে গোটা দেশে যেসব জায়গায় নির্বাচন হয়েছে তার অধিকাংশতেই শাসক বিজেপি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কেবল তাই নয়, কোনও কোনও জায়গায় বিজেপির শরিক দল তাদের সঙ্গ ত্যাগ করে চলে গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, টানা দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষকরা নিজেদের দাবিতে মরণপণ সংগ্রাম চালিয়েছেন। কিন্তু মোদী সরকার কৃষকদের দাবি মানেনি, বরং কৃষি আইনকে ‘যুগান্তকারী’ সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করেছে। কেবল তাই নয় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কৃষক আত্মহননের পথও বেছে নিয়েছেন। এছাড়াও শীত-গ্রীষ্ম-বৃষ্টিতে কয়েকশো কৃষকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। একাধিকবার দু’পক্ষের বৈঠক হয়েছে কিন্তু প্রতিবারই তা নিস্ফলা থেকে গিয়েছে মোদী সরকার অনমনীয় থাকায়। আচমকা শুক্রবার সকালে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে মোদী তিন কৃষি আইন বাতিলের ঘোষণা করেন। এমনকী কেন্দ্রের ভুল ক্রুটির জন্য আন্দোলনরত কৃষকদের কাছে ‘ক্ষমাও’ চান প্রধানমন্ত্রী।

কৃষকরা আন্দোলনের বিনিময়ে জয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছেন তাই তাদের পক্ষে খুশি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মোদীর এই বোধদয়ে গলে যাওয়ার তো কোনও কারণ ঘটেনি। কিছুদিন আগে পর্যন্ত শাসক বিজেপি নেতারা অজুহাত দেখাতেন এই যুক্তিতে, আইন যখন হয়ে গিয়েছে তখন তা আর প্রত্যাহারের উপায় নেই– এই বলে৷ আন্দোলনকারীরা মোদী সরকারের নীতির বিরোধিতা করায় তাদের গায়ে দেশ বিরোধী তকমাও সাঁটা হয়েছিল৷ আজ মোদী পিছু হটেছেন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। পাঞ্জার ও উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোট শিয়রে সেই ভয়ে। তাই এআইকেএমএসএর তরফের বক্তব্য, কৃষি আইন প্রত্যাহার হলেও চলবে আন্দোলন। লিখিত ভাবে আইন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামছে না। সংসদীয় মঞ্চে আইন বাতিল না হওয়া পর্যন্ত চলবে আন্দোলন। এছাড়াও বিদ্যুৎ বিল, এমএসপি-র একাধিক ইস্যু নিয়েও জারি থাকবে আন্দোলন, এমনটাই মত কৃষক নেতাদের। তাদের বক্তব্য, এই জয় শুধুমাত্র নতুন এক যাত্রার সূচনা। এখনও অনেক লড়াই বাকি রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে ১৯ নভেম্বর সকালে মোদী ঘুম থেকে ওঠার পরই তার মনে হয়েছে বহু ক্রিষকের প্রাণ গিয়েছে, এবার তিন কৃষি আইন বাতিল করা দরকার। আসল কথা পাঞ্জাব রক্ষা অসম্ভব, পাশাপাশি কৃষক আন্দোলন চলতে থাকলে উত্তরপ্রদেশও হাতছাড়া হবে। তারমানে কিন্তু এও নয় যে ক্রিষকদের লাগাতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন মোদী সরকারকে চাপে ফেলেনি। কৃষক আন্দোলনের মধ্যে এক ধরণের তুষের আগুন খেয়াল করেছেন মোদী ও তাঁর দল। সেই আগুনের তেজে মোদী সরকার মাতা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে। মোদী সরকার পণ করেছিল কৃষকদের সত্যাগ্রহের সামনে মাথা নোয়াবে না। উলটে হামলা, মামলা চাপিয়ে, অন্নদাতাদের পাকিস্তানি, খলিস্তানি, দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাদের মর্যাদা হানি করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের আন্দোলনই যে শেষ কথা বলে তা আরও একবার প্রমানিত হল।
কৃষকদের মিছিল কিম্বা সমাবেশে লাঠিচার্জ, প্রচণ্ড ঠান্ডায় জলকামান থেকে জল ছেড়ে, আরও নানাভাবে দমন-পীড়ন চালিয়ে কৃষক আন্দোলনকে পর্যুদস্ত করা তো দূরের কথা বিন্দুমাত্র দুর্বল করা যায়নি। বরং আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। সরকারের নানাবিধ বাধায় আরও মনোবল সঞ্চয় করে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছিল, শেষপর্যন্ত মোদী সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। এটা কিন্তু মানতে হবে বিশ্বের ইতিহাসেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশে এ ধরণের গণআন্দোলনের উদাহরণ যেমন দুর্লভ, কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসেও এমনটা খুজেপাওয়া যাবে না।