বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বা এবিভিপি পেশি আস্ফালন ক্রমশ বাড়ছে। হিন্দুত্ববাদীরাও পিছিয়ে নেই। দিল্লির রামযশ কলেজের থিয়েটার ফেস্টিভাল থামিয়ে দিয়েছিলো এবিভিপি। দুটো নাটকেই নাকি শ্রীরামচন্দ্র এবং মহাবীর হনুমানকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য আছে। অনেকেরই মনে পড়বে, কয়েক বছর আগে এ কে রামানুজনের তিন শত রামায়ণ প্রবন্ধটা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস থেকে সরানোর দাবিতে ধনুকভাঙা পণ করেছিল এই এবিভিপি। দিল্লির বিভিন্ন কলেজের সামনে বিক্ষোভ দেখানো, টায়ার পোড়ানো, ভাঙচুর এসব চলেছিল। সদ্য দেশ জুড়ে রামনবমী পালিত হলো। তিন শত রামায়ণ এই প্রবন্ধ নিয়ে এবিভিপির এত আপত্তি কিসে হলো, সে বিষয়ে দু-একটা কথা বলা যায়।
এ কে রামানুজনের পুরো নাম আত্তিপত কৃষ্ণস্বামী রামানুজন। তিনি বিখ্যাত কবি-অধ্যাপক অনুবাদক এবং লোকসংস্কৃতি গবেষক। তাঁর ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতের বহু ভক্তি আন্দোলনে কবিদের লেখা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে গেছে। রামায়ণ নিয়ে তিনি কী এমন লিখলেন, যা রামচন্দ্রের পক্ষে মর্যাদাহানিকর হলো!
রামানুজনের প্রবন্ধের নাম তিন শত রামায়ণ। আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একটি বক্তৃতার লিখিত রূপ এই প্রবন্ধ। রামানুজন দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতিবিদ্যার একজন বড়ো বিশেষজ্ঞ। তিনি তামিল, কন্নড়, সংস্কৃত এবং ইংরেজি এই প্রত্যেকটি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর সম্পর্কে বলতে গিয়ে একজন বড়ো পণ্ডিত বলেছেন, আগে ভাবা হতো ধ্রুপদী ভাষা মানে ভারতে সংস্কৃত আর ইউরোপে ল্যাটিন ও গ্রিক। মহাকাব্য বা রামায়ণ-মহাভারত ভারতের সম্পদ আর পাশ্চাত্যে হলো ইলিয়াড-ওডিসি। গোটা বিষয়টা এরকম সরলীকরণে ভাবা হতো।
এখানে বাংলা ভাষায় রামায়ণ কাহিনি কীভাবে বলা হয়, কেন বলা হয় তা নিয়ে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হতো না। তামিল বা কন্নড়ভাষী মানুষের কাছে রামায়ণ কাহিনি কেমনভাবে আলোচিত হয় তা-ও গুরুত্ব পেতো না এইসব আলোচনায়। ভারতবর্ষ ছাড়াও তিব্বত, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, লাওস, কাম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, জাভা, ইন্দোনেশিয়া এসব দেশেও যে রামায়ণ কাহিনি প্রচলিত আছে, সে কথা তুলে ধরেছিলেন এ কে রামানুজন।
ধরা যাক, রামের হাতের আংটি খুলে মাটিতে পড়ে সোজা পৌঁছে গেল পাতালে। রামচন্দ্র হনুমানকে বললেন, আমার আংটি খুঁজে নিয়ে এসো। হনুমান গেলেন পাতালে। সেখানে এক রাজার সঙ্গে তার দেখা হলো। তিনি খবর দিলেন, একটি সোনার থালায় রামচন্দ্রের আংটি রয়েছে। হনুমান দেখলেন, সোনার থালায় কয়েকশো আংটি। অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এর মধ্যে কোনটি রামচন্দ্রের। পাতালের রাজা বললেন, প্রত্যেকটাই রামচন্দ্রের। রামচন্দ্র কি একজন নাকি? শত শত রামচন্দ্র, তাই শত শত আংটি।

দক্ষিণ ভারতে এক অন্ধ অচ্ছুত কবি রামায়ণ গান বেঁধেছিলেন পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাষায়। সেই গান শুরু হয় রাভুলা এবং তাঁর স্ত্রী মন্দোদরীর কথা দিয়ে। কে এই রাভুলা? বাল্মীকি রামায়ণে যিনি দশানন রাবণ, তিনিই দক্ষিণ ভারতের প্রান্তিক মানুষের ভাষায় রাভুলা।
বাল্মীকি রামায়ণে যে বীর যোদ্ধা রামচন্দ্রের পরিচয় আমরা পাই তার একেবারে ভিন্ন চরিত্রায়ণ বাংলার শ্রীরাম পাঁচালিতে। কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণকে তো শ্রীরাম পাঁচালি বলা হতো। গল্পেগাথায় যাত্রাপালায়, পালাগানে, পাঁচালি গানে, তরজা গানে রামায়ণ কথা ফিরে ফিরে ফিরে এসেছে। মুদ্রণ বা ছাপাখানার বয়স তো সবে দুশো বছরের কাছাকাছি। আর রামায়ণ কাহিনি মানুষের মুখে মুখে ফিরছে হাজার বছর ধরে। তাহলে রামায়ণের একটি কোনও রূপ শুধুমাত্র কেন মান্যতা পাবে?
সেভাবে দেখলে আদি কবি বাল্মীকি তো গোড়ায় দস্যু রত্নাকর ছিলেন। সে কাহিনি আলাদা। এই প্রত্যেক কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত শত উপকাহিনি। তার শাখা-প্রশাখা বিস্তারিত হয়েছে দিকে দিগন্তরে। এক দেশ থেকে কাহিনি পৌঁছেছে আরেক দেশে। এক ভাষা থেকে ভিন্ন ভাষায়। এক ধর্ম থেকে আরেক ধর্মে। জৈন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও রামায়ণ কাহিনি প্রচলিত আছে। বৌদ্ধরা মনে করেন, বুদ্ধের বিভিন্ন জন্মের কাহিনি বা জাতক কাহিনির সঙ্গে রামায়ণের বহু মিল আছে।
কন্নড় ভাষায় রামায়ণে দেখা গেছে, হাঁচি থেকে নাকি সীতার জন্ম হয়েছিল। রাজা জনক হাঁচি দিলেন, সেখান থেকে এক পালক বেরিয়ে এলো। সেই পালকটিই ক্রমশ সীতার রূপ নিলো। এখানে আবার আরেক বিপত্তি। রাজা জনক যখন সীতার স্বয়ম্বর আয়োজন করেছিলেন, সেখানে নাকি উপস্থিত হয়েছিলেন লঙ্কার রাজা রাবণ। যদিও সেই হরধনু বা শিবধনুক রাবণ তুলতে পারেননি। কিন্তু সীতার ওপর তার নজর নাকি তখন থেকে।
তামিল ভাষায় অত্যন্ত জনপ্রিয় কম্পনের রামায়ণ। সেখানেও রাম-রাবণের যুদ্ধও মোটে সহজ ব্যাপার নয়। এই রাম পিছিয়ে পড়েন তো এগিয়ে যান। রাবণের সঙ্গে তার সমানে সমানে টক্কর।
একে রামানুজন দেখিয়েছেন একে কাশ্মীরি, মারাঠি, ওড়িয়া, প্রাকৃত, সাঁওতালি, সিংহলি এমন কত ভাষায় রামকাহিনি বিস্তার লাভ করেছে। কেউ যদি বলেন, তিনশো নয়, রামকাহিনি তিন সহস্র তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়? রামায়ণ সেই প্রাচীন বৃক্ষের মতো। যে বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা বেড়েই চলেছে, কোনটা মূল, কোনটা কাণ্ড বোঝাই দুষ্কর। এখানে রামকাহিনির কোনও কেন্দ্রীয় ধরন তৈরি করতে গেলে মুশকিল হবে। বাংলার ঘরে ঘরে কৃত্তিবাসী রামায়ণের কী বিপুল জনপ্রিয়তা। ধরা যাক, তরণীসেন বধের গল্প। বিভীষণ-এর পুত্র তরণীসেন রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছেন সারা শরীরে চন্দন দিয়ে রামনাম লিখে। ফলে রামচন্দ্রের একটি তিরও তাঁর গায়ে বিধছে না। এই গল্পগাথায় চোখের জল ফেলেছেন বাংলার মানুষ হাজার বছর ধরে। অথচ এই কাহিনিতে বাল্মীকি রামায়ণ অনুপস্থিত।
মধ্য তথা উত্তরভারত গোস্বামী তুলসীদাসের রামচরিত মানসের রসে নিমজ্জিত। সেই কাহিনি এক এক অঞ্চলে এক এক রকমভাবে গৃহীত হয়েছে। মানুষের শোনারও একটা ইতিহাস আছে। এই নিয়ে এ কে রামানুজন একটা গল্পের অবতারণা করেছেন। এক ব্যক্তি যাঁর গান, শিল্প এসবে কোনও রুচি নেই। তার বিয়ে হলো গল্পপাগল এক মেয়ের সঙ্গে। সে তাঁর স্বামীকে রোজ বলে অমুক গাছতলায় নিয়ে চলো যেখানে তমুক নামের কথক রামকথার হাজারো গল্প শোনাচ্ছে। এরকমই রয়েছে হাজারো কাহিনি।
সম্প্রতি এক হিন্দুত্ববাদী নেতা বলেছেন, গোস্বামী তুলসীদাস তাঁর সমকালীন সম্রাট আকবরকে দেশের প্রধান বলে মানতেন না। এই কাহিনির অর্থ দাঁড়িয়েছে এরকম যে, রামভক্ত (পড়ুন হিন্দু) তুলসীদাস সম্রাট আকবরকে (পড়ুন মুসলিম) শাসক হিসেবে মানতেন না। এই নেতা যে কথাটি গোপন করেছেন তা হলো ভক্তি আন্দোলনের মূল স্পিরিট। ভক্তি আন্দোলনের কবিরা কোনও শাসককেই মানতেন না। তাঁদের বক্তব্য ছিল, যাঁর প্রেরণায় কাব্যশক্তির স্ফুরণ হয়, তাঁকেই শুধু মান্য করবো। এর সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। মীরাবাঈ তাঁর শ্বশুরকুলের মেবারের রানাদের শাসক হিসেবে মানতেন না। তিনি কেবল মানতেন, গিরিধারী গোপালকে। কথিত আছে, সংগীত রসগ্রাহী আকবর ছুটে গিয়ে ফকিরের ছদ্মবেশে মীরার গান শুনত। সংগীতসম্রাট তানসেনের গুরু স্বামী হরিদাসের গান শুনতেও আকবর পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর সময় মোগল চিত্রকলায়ও রামায়ণ কাহিনি, মহাভারত কাহিনি অপূর্ব রূপ পেয়েছে। এইসব নানা আখ্যান-উপাখ্যান সংগ্রহ করেছেন অধ্যাপক এ কে রামানুজন। আর এই সব লোকবৃত্ত, লোককথা, লোকপুরাণ এসবের মধ্যে তিনি সন্ধান করেছেন প্রকৃত রামকথার। যে রামকথা গরিব শ্রমজীবী মানুষের প্রাণের সম্পদ। তিনি হিন্দু হন বা মুসলমান হন তাতে কিছু যায়-আসে না। গল্পগাথার আনন্দ মানুষ হাজার বছর ধরে উপভোগ করেছেন। তেমনই রামকথা এক বিশেষ গল্পের ধরন। এটাকে ব্যাহত করে হিন্দুত্ববাদীরা ভারতকথাকেই খাটো করছেন না তো?