| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

টিপ বিতর্ক ও বাঙালির টিপ পরার ইতিহাস : সাইফুর রহমান

Reporter
সাইফুর রহমান / ১৬২৬ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৮ জুন, ২০২২

আমার লেখালেখিতে প্রায়ই আমি বলি, ইতিহাসের বহু ঘটনা ঘুরেফিরে আবার ফিরে আসে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। কিছু দিন আগে এক পুলিশ সদস্য যখন একজন ভদ্র মহিলার টিপ পরার বিরুদ্ধে বললেন এবং দেশজুড়ে মানুষ এর পক্ষে এবং বিপক্ষে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনায় মুখরিত, সেসময় আমার মনে পড়ে গেল ২০১৩ সালের কথা। ২০১৩ সালে বোধকরি মার্চের দিকে বিশ্ববিখ্যাত গায়িকা সেলিনা গোমেজ কপালে টিপ পরে যখন তাঁর সেই বিশ্ব কাঁপানো ‘কাম অ্যান্ড গেট ইট’ গানটি গেয়েছিলেন, সেটা দেখে ভারতের মৌলবাদী নেতা রাজন জেড তো রেগে আগুন। এর তুমুল সমালোচনা করে বলেছিলেন, গায়িকা সেলিনা গোমেজ কপালে টিপ পরে গান গেয়ে ভীষণ গর্হিত কাজ করেছেন। কারণ কপালে টিপ পরা হিন্দু ধর্মে একটি ধর্মীয় রীতি এবং ফ্যাশনের অঙ্গসজ্জা হিসেবে টিপ ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়। সেসময় রাজন জেডের সেই সমালোচনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন বলিউডের নায়িকা প্রিয়াংকা চোপড়া। তিনি বলেছিলেন, টিপ পরার জন্য সেলিনা গোমেজকে নিন্দামন্দ না করে বরং তার প্রশংসা করা উচিত। কারণ ভারতীয় সংস্কৃতি ভালোবেসে সেটাকে আলিঙ্গন করেছেন তিনি। ২০১৩ সালের সেই ঘটনার পর যেন এর পুনরাবৃত্তি ঘটল ২০২২ সালে। এবার এর বিরুদ্ধে সংসদে সোচ্চার হলেন একজন স্বনামধন্য অভিনেত্রী। বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন, তার এই সোচ্চার হওয়া কতটা জনসমর্থন পেয়েছে। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। তবে আমি একজন লেখক। গল্প-উপন্যাস লিখি। চরিত্রের মনস্তত্ত্ব নিয়েই আমার কাজ। লেখক হিসেবে মানুষের মনস্তত্ত্বটা আমি একটু বোঝার চেষ্টা করি। সেই আলোকে এই লেখাটা লেখার চেষ্টা করছি।

প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ ঋকবেদে তিলক বা টিপের উল্লেখ থাকলেও সেটা কখনো অঙ্গসজ্জার অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি বরং সেসময় তিলক ব্যবহার হতো ধর্মীয় কারণে। হিন্দু শাস্ত্র যারা ভালো করে পড়েছেন তারা সেটা সহজেই অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। সেখানে বিস্তারিত লেখা আছে। পাঠকবৃন্দের জ্ঞাতার্থে আমি শুধু অল্প একটু আলোচনা করছি- চন্দন গাছ থেকে চন্দন কাঠ পাওয়া যায়। এই চন্দন কাঠ, ঠান্ডা ধরনের এক জাতীয় কাঠ; আর এই কাঠ, পাথরের ওপর পানি দিয়ে ঘষলে এক ধরনের আধা তরল পদার্থ পাওয়া যায়, যার দ্বারা তিলক পরা হয়। হিন্দু শাস্ত্র মতে, ‘কপালে চন্দনের তিলক দিলে মস্তিষ্ক ঠান্ডা থাকে, ধৈর্যশক্তি বৃদ্ধি হয়, মন শান্ত থাকে এবং মনের একাগ্রতা বাড়ে।’ বৈজ্ঞানিক গবেষণার হাজার হাজার বছর আগে মুনি ঋষিরা চন্দনের এই গুণাগুণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করেন এবং তারা কপালে চন্দনের তিলক দেওয়ার বিধি প্রবর্তন করেন।

শুধু হিন্দুত্বের প্রতীক বলেই নয়, চন্দনের এই গুণের জন্য ঈশ্বরের প্রতি যারা সর্বদা মন নিবিষ্ট রাখতে চান, সেই সব সাধু-সন্ন্যাসী ও বৈষ্ণবরা সব সময় চন্দনের তিলক পরিধান করে থাকেন এবং এ কারণেই যে কোনো মন্দির বা কোথাও হিন্দু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলে- সেই অনুষ্ঠানের প্রতি এবং অনুষ্ঠানের বিষয়- ঈশ্বরের প্রতি সবার একাগ্রতা যাতে বজায় থাকে, সে জন্য মন্দির বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া মাত্র ভক্তদের কপালে চন্দনের তিলক পরিয়ে দেওয়া হয়। দাড়ি রাখা, টুপি পরা যেমন মুসলমানিত্বের প্রতীক, তেমনি চন্দনের তিলক পরাও হিন্দুত্বের প্রতীক। টিপ বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা যখন তুঙ্গে তখন দেখলাম একজন লেখক একটি পত্রিকায় লিখেছেন- বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি হচ্ছে টিপ। এটি সত্য নয়। বাঙালি হাজার বছর ধরে মাথায় তিলক পরতে পারে কিন্তু টিপ নয়। আর আমার বক্তব্য হচ্ছে একজন মানুষ চাইলে হাজার বছরের সংস্কৃতি না হলেও কি সেটা পরতে পারবে না। কোট প্যান্ট শার্ট টাই এগুলো কত বছরের সংস্কৃতি? বড়জোড় দু-তিন শ বছরের সংস্কৃতি। ইংরেজরা এদেশে আসার আগে নিশ্চয়ই কেউ কোট প্যান্ট টাই পরত না। আমার বক্তব্য হচ্ছে, যার যা ইচ্ছে পরুক তাতে অন্যের কী।

আমাদের এই উপমহাদেশে কবে থেকে টিপ পরা হয় এর সুলুক সন্ধানে আমি বহু প্রাচীন পুঁথিপত্র ও সাহিত্য ঘেঁটেছি। কিন্তু নারীদের রূপসজ্জার অনুসঙ্গ হিসেবে টিপ পরার টিকিটিও কোথাও খুঁজে পেলাম না। ব্যতিক্রম শুধু একটি, সে প্রসঙ্গে পরে আসব। কারণ সেটাও অনেকটা অস্পষ্ট। আমি শুধু ধর্মীয় শাস্ত্রই নয়, সেই প্রাচীনকাল থেকে যুগে যুগে এই উপমহাদেশে এসেছিলেন বহু পর্যটক আলবেরুনি, মার্কোপোলো, ইবনে বতুতাসহ আরও অনেকে। তারা ভারতবর্ষে মানুষের চালচলন, আহারবিহার, পোশাক-পরিচ্ছদের বিস্তারিত বর্ণনা লিখে গেছেন। আমি পইপই করে খুঁজেছি কোথাও তারা নারীদের টিপ পরার কথা লিখেছেন কিনা। আমার সামান্য পড়াশোনায় দেখলাম সেখানে মেয়েদের টিপ পরার বিষয়টি কোথাও উল্লেখ নেই। প্রথমেই পর্যটক আলবেরুনি তার ভারততত্ত্ব বইতে কী লিখেছেন সেটা বলি। ১০১৭ সালে আলবেরুনি ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেন। তিনি পদার্থবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন এবং একজন ইতিহাসবিদ, কালানুক্রমিক এবং ভাষাবিদ হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি তার সময়ের প্রায় সমস্ত বিজ্ঞান অধ্যয়ন করেছিলেন এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার অক্লান্ত গবেষণার জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন।

তিনি লিখেছেন, ভারতীয়রা তাদের শরীরের কোনো চুল কাটে না। আসলে, গরমের প্রভাব থেকে বাঁচতে তারা প্রায় নগ্নভাবে চলাফেরা করে। আর মাথার চুল না কাটার মূল কারণ হলো সর্দি-গর্মির কবল থেকে আত্মরক্ষা করা। এক গুচ্ছের আকারে তারা তাদের গোঁফ রাখে। সুপারি, পানের পাতা ও খড়ি (চুন) চিবানোর ফলে তাদের দাঁতগুলো সব লাল। তারা আহারের আগে মদ্যপান করে ও পরে আহার করে। তারা গোমূত্র পান করে কিন্তু তার মাংস খায় না। হাত-মুখ ধোয়ার বেলা তারা পা থেকে শুরু করে ও পরে মুখ ধোয়। স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসের আগে তারা স্নান করে নেয়। উৎসবের দিনে তারা তাদের দেহে সুগন্ধির বদলে গোময় লেপে। মেয়েদের সাজ-পোশাকের জিনিস পুরুষ পরে। তারা প্রসাধন দ্রব্য ব্যবহার করে। কানে দুল, বাহুতে অঙ্গদ, হাতের আঙুলে নাম-মোহর করা আংটি ও পায়ের আঙুলেও ওই রকম আংটি পরে। মহাদেবের প্রতীকরূপে তারা তার জননেন্দ্রিয়ের পূজা করে।

মার্কোপোলো ভারতবর্ষে আসেন আলবেরুনির প্রায় দুই শ বছর পরে। তিনি ভারতবর্ষে ছিলেন ১২৮৮ থেকে ১২৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ভারত ও চীন ভ্রমণ করে তিনি যে বইটি লিখেছেন সেটা ‘দ্য ট্রাভেলস অব মার্কোপোলো’ নামে পরিচিত। তার বইতে ভারতবর্ষ সম্পর্কে বহু কিছু লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘পুরো মাবর দেশ খুঁজে ফিরলেও তুমি কোট কাটবার বা সেলাই করবার কোনো দর্জি পাবে না।’ কী করে পাবে। সেখানে যে সবাই উদোম থাকে। নেহাৎ শালীনতার খাতিরে কোমরে তারা একখন্ড কাপড় জড়িয়ে রাখে শুধু। কী মেয়ে কী পুরুষ সবাই। এ ব্যাপারে ধনী আর গরিবের মধ্যেও কোনো প্রভেদ নেই। প্রভেদ নেই প্রজা আর রাজার মধ্যেও-অবশ্য যে জিনিসগুলোর কথা এখনই বলতে চলেছি তা বাদ দিলে, সত্যি কথা বলতে কী, রাজা নিজেও ঠিক অন্য সবার মতো আদুড় গায়ে থাকেন। শুধু এক টুকরা মিহি কাপড় তার কোমরের নিচে জড়ানো। তবে গলায় ঝুলছে একটি হার যার পুরোটাই মাণিক্য, নীলা, পান্না ইত্যাদি নানা রকম সব দামি রত্ন দিয়ে তৈরি। মেয়ে পুরুষ প্রত্যেকে তারা দিনে দুবার করে পুরো শরীর জল দিয়ে ধোয়। খাবার বেলা তারা শুধু ডান হাতখানিকে ব্যবহার করে। বাঁ-হাত দিয়ে কখনো খাবার জিনিস ছোঁবে না। যা কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ব্যবহারের জন্য দরকারী, সে সব কাজ সব সময়ই তারা ডান হাত দিয়ে করে। যে সব কাজ নোঙরা ও অপছন্দকর অথচ না করলে নয় তা সব সময় বাঁ হাত দিয়ে করে, যেমন— শরীরের গোপন অঙ্গসমূহ ধোয়া বা পরিষ্কার করা ইত্যাদি। তারা সব সময় যে যার নিজের ঘটিতে জল খায়। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ঘটি রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কাব্য মনসামঙ্গলেও মেয়েদের টিপ পরা বিষয়ে তেমন কিছু পেলাম না। সেখানে নর-নারীর রূপসজ্জার নানাবিধ বিবরণ থাকলেও নারীদের টিপ পরার বিষয়টি চোখে পড়ে না।

‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের কাহিনিতে আমরা বাংলার প্রায় পাঁচ শ বছরের বৃহত্তর জীবনচিত্র পেয়ে থাকি। এই জীবন বৃহত্তর মানব জীবন। মনসামঙ্গল কাব্যকে তাই ‘জনসাহিত্য’ বলা চলে। এই সাহিত্যে সাধারণ মানুষের জীবনবৃত্তান্ত অতি সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

মনসামঙ্গল কাব্য থেকে নারী-পুরুষ উভয়েরই প্রসাধন ও বিভিন্ন অলংকার ব্যবহারের কথা জানা যায়। তখন নারী পুরুষ নির্বিশেষে গায়ের রং ফর্সা করার জন্য তিলের তেলের সঙ্গে আমলকী ও হলুদ বাটা গায়ে মাখতেন, মাথায় মাখতেন নারকেল তেল। ছেলেরা চুল ও দাড়ির নিয়মিত পরিচর্যার জন্য নিয়মিত ক্ষৌরকর্ম করতেন। মেয়েরা চুল ছাঁটতেন কিনা জানা না গেলেও ছেলেদের মতো তারাও চুলের নিয়মিত পরিচর্যা করতেন। মেয়েরা চন্দন, চুয়া ও কস্তুরিকে ভালোভাবে বেটে সেই মিশ্রণ চুলে মেখে কাপড় দিয়ে দীর্ঘক্ষণ বেঁধে রাখতেন। তারপর শুকিয়ে গেলে ভালো করে স্নান করতেন। স্নান শেষে ভেজা চুলকে ধূপের ধোয়ায় শুকিয়ে সুবাসিত করে তুলতেন- মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যতম কবি বিজয় গুপ্ত (জন্ম আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ) লিখেছেন- আগর চন্দন চুয়া কস্তুরি বিশেষ/ধূপের ধুয়া দিয়া শুখায়ে মাথার কেশ। দেহকে সুবাসিত করার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আগর-চন্দন ও কস্তুরি ব্যবহার করতেন। তবে মৃগমদ কস্তুরির ব্যবহার ছিল উচ্চবিত্ত সমাজের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিজয় গুপ্ত আরও লিখেছেন, কস্তুরি কুমকুম ছন্দে সর্বাঙ্গ ভরিল গন্ধে/অঞ্জনে রঞ্জিত-ই আঁখি।

মনসামঙ্গল কাব্যের আরেক উল্লেখযোগ্য কবি জগজ্জীবন ঘোষাল লিখেছেন, দর্পণ ধরিয়া বালী করে নানা বেশ।/বান্ধিল বিচিত্র খোঁপা আচুড়িঞা কেশ।।/চাকি কঢ়ি কুন্ডল মকর কর্ণমূলে।/নাসিকায়ে বেশর গজমুক্তা ফুল দোলে।।/কপালে সিন্দুর পহ্রে চন্দনের বিন্দু।/অরুণ বেড়িঞা যেন শত শত ইন্দু।।/হৃদয়ে কাচুলি কি উপমা দিতে তার।/গলায়ে প্রবাল মালা গজমুক্তা হার। ধনী বাড়ির মেয়েরা প্রসাধনের সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথার চুল আচড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের খোঁপা বাঁধতেন। তারপর চোখে কাজল, কানে কর্ণফুল, নাকে বেসর, কোমরে কিঙ্কিন, গলায় মুক্তখচিত সোনার চেন, পায়ে নূপুর পরে রমণীয় করে তুলতেন। অন্যদিকে মনসা-পাঁচালীর সবচেয়ে পুরনো কবি, মনসার সম্পূর্ণ কাহিনি একমাত্র তার কাব্যেই লভ্য সেই কবি বিপ্রদাস পিপিলাই লিখেছেন- সধবা মেয়েরা সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে লোহার খাড়ু ও শাখা পরতেন। শিশুদের হাতে সোনার তাড় বালা, পায়ে মগর খাড়ু ও গলায় সোনার চেন পরানো হতো। কবি বিজয় গুপ্ত লিখেছেন- পারিজাত পুষ্পের মালা ভরিয়া সকল গলা।/সাক্ষাতে মদন হেন দেখি। সোনার অলংকার ব্যতীত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পুষ্পলংকার পরেও প্রসাধন করার রীতি ছিল।

এরপর আসা যাক বাঙালির ইতিহাসের এক অসামান্য প্রামাণ্য দলিল বলে বিবেচিত যে গ্রন্থটি সেটার দিকে। যার নাম ‘বাঙালির ইতিহাস’। লেখক নীহাররঞ্জন রায়। বইটিতে পৃথক একটি পরিচ্ছেদই আছে ‘প্রসাধন’ নামে। সেখানে প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত বাঙালি নর-নারীরা কী ধরনের প্রসাধনী ব্যবহার করতেন সেগুলো সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে শুধু জনৈক এক কবির একটি বর্ণনা ছাড়া মেয়েদের টিপ পরার বিষয়টি কোথাও উল্লিখিত হয়নি। নীহাররঞ্জন রায় তার বইটিতে লিখেছেন- নারীরা গলায় ফুলের মালা পরিতেন এবং মাথার খোঁপায় ফুল গুঁজিতেন, প্রাচীনকালে নারীরা, বিশেষভাবে বিবাহিতা নারীরা প্রতি সন্ধ্যায় নদী বা দীঘিতে ¯œানপর্ব শেষ করে অবগাহনান্তর প্রসাধনে-অলংকারে সজ্জিত ও শোভিত হইয়া আনন্দ ও ঔজ্জ্বল্যের প্রতিমা হইয়া বিরাজ করিতেন। দেহে সূক্ষ্মবসন, ভুজবন্ধে সুবর্ণ অঙ্গদ (তাগা); গন্ধতৈলসিক্ত মসৃণ কেশদাম মাথার উপরে চূড়ার মতো করিয়া বাঁধা, তাহাতে আবার ফুলের মালা জড়ানো; কানে শোভা পেত অর্ধচন্দ্র আকৃতির কানের দুল। পল্লী-সুন্দরীদের প্রসাধন-অলংকরণের কথা বলেছেন কবি চন্দ্রচন্দ্র। কপালে কাজলের টিপ, হাতে ইন্দুকিরণস্পর্ধী শাদা পদ্মমৃণালের বালা, কানে কচি রীঠাফুলের কর্ণাভরণ, স্নিগ্ধকেশ কবরীতে তিলপল্লব-অনাগর (অর্থাৎ, পল্লীবাসী) বধূদের এই বেশ স্বভাবতই পথিকদের গতি মন্থর করে আনে।

যা হোক অতীতকালে কপালে টিপ পরা হতো কি হতো না এ জন্য একজন মানুষ কপালে টিপ পরতে পারবে না এটা ভীষণ রকম অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য। মেয়েদের কুচি দিয়ে শাড়ি পরার চলও বেশি দিন আগের নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদাননন্দিনী বাংলার নারীদের কুচি দিয়ে শাড়ি পরা শিখিয়েছেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাঙালিদের মধ্যে প্রথম আই সি এস অফিসার। তার পোস্টিং ছিল তখন বোম্বে। বোম্বের পারসি মেয়েরা কুচি দিয়ে শাড়ি পরত। সেটা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে জ্ঞানদাননন্দিনী বাংলাদেশেও এ রীতি প্রবর্তন করেছিলেন। এর আগে বাংলাদেশের নারীরা শাড়ি পরতেন আটপৌরে রীতিতে। কিন্তু বর্তমান সময়ে কুচি দিয়ে শাড়ি পরাটা-কি আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয়? কিন্তু সমস্যাটা সেখানে নয়। আমাদের দেশে প্রতিবাদগুলোও ভীষণভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। দেশের বেশির ভাগ মানুষেরই প্রশ্ন, প্রতিবাদগুলোতেও কেন এত বিভাজন? আপনি কপালে টিপ একটির জায়গায় ১০টি পরুন তাতে কার কী আসে যায়। এই তো গত মাসের কথা, ৭ এপ্রিল নওগাঁর মহাদেবপুরে হিজাব পরে স্কুলে আসায় ১৮ ছাত্রীকে মারধর করা হয়েছে। খবরটি ফলাও করে প্রায় সব পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কই কোনো সেলিব্রেটিকে তো দেখা গেল না এর প্রতিবাদ করতে। আপনি উলঙ্গ হয়ে চলাফেরা করুন; সেটা যেমন আপনার স্বাধীনতা, ঠিক তেমনি কেউ যদি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে হিজাব পরে কিংবা পর্দা করে সেটাও তার অধিকার।

আমার এসব কথা শুনে একজন বললেন— স্বল্প পোশাক পরিচ্ছেদ তো আধুনিকতা। আর হিজাব, আব্রু, পর্দা এগুলো গোঁড়ামি, সেকেলে ও পশ্চাৎপদ। আমি হেসে বললাম, ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে এ ধরনের চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক। প্রাচীনকালের কথা না হয় বাদই দিলাম, মধ্যযুগেও ইউরোপজুড়ে শুধু চার্চের সিস্টারই পর্দা করতেন সেটা নয় বরং সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত পরিবারের নারীরা হাতের কবজি থেকে শুরু করে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আবৃত্ত থাকে এমন পোশাক পরতেন তাঁরা। মাথা আবৃত্ত করার জন্য পরতেন সুদৃশ্য রুমাল জাতীয় হিজাব। প্রাচীনকাল থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত ইতালির রোম শহরে পতিতাদের সম্ভ্রান্ত ঘরের নারীদের মতো পোশাক পরার অনুমতি ছিল না। তারা স্বল্পবসনে পায়ে উঁচু জুতো পরে রোমের রাস্তায় খদ্দের খুঁজে বেড়াতেন। সময় অনেক পাল্টে গেছে। আজকের নারী যদি সে ধরনের পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, করতেই পারেন। এটা সম্পূর্ণই তাদের স্বাধীনতা। তাতে কারও তো কিছু বলার নেই। আর একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ফ্যাশন ও স্টাইল যুগে যুগে বদলায়। বদলায় শালীনতা, শোভন-অশোভনের মানদন্ড।

লেখক : গল্পকার ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev