ঠাসা কর্মসূচি নিয়ে গোয়া উড়ে গিয়েছেন ডেরেক-প্রসূন। তৃণমূল সমস্ত বিজেপি শাসিত রাজ্যে ঘাসফুল ফোটাতে চায়। বাংলা জয়ের পর প্রতিবেশী রাজ্য ত্রিপুরা দখল করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই মাটিতে। অন্যদিকে গত কয়েকদিন আগে বিজেপি রাজ্যেও ঘাসফুল ফুটবে বলে হুঁশিয়ারি ছুঁড়ে দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, গোটা টিম সেই লক্ষ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। সেই লক্ষে গোয়ায় পৌঁছেছেন ডেরেক ও ব্রায়েন এবং প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। যা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, সাতদিনের ঠাসা কর্মসূচী নিয়ে তাঁরা বিজেপি শাসিত রাজ্যে গিয়েছেন। সব কিছু ঠিক থাকলে দুর্গাপুজোর আগে গোয়া যাচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে ত্রিপুরা জয় ফিক্সড হয়ে আছে। তৃণমূলের দাবি, ত্রিপুরা দখল এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। ইতিমধ্যে প্রতিবেশী সে রাজ্যে সংগঠনকে মজবুত করেছে তৃণমূল। ত্রিপুরায় ভোট ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু গোয়ায় ভোট ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতে। আর সেই কারনে ডেরেক ও ব্রায়েন এবং প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানোর সিদ্ধান্ত বলে জানা গিয়েছে। তৃণমূল সেই সমস্ত রাজ্যই টার্গেট করছে, যে সমস্ত রাজ্যে কংগ্রেস বিজেপির কাছে আন্তসমর্পণ করেছে। প্রশান্ত কিশোরের ছকে দেওয়া পরিকল্পনা মতোই মমতা-অভিষেক ভিনরাজ্যে তাদের পদার্পণ শুরু করেছে। সম্প্রতি নবান্নে গিয়ে প্রশান্ত কিশোর বৈঠক করেন মমতা-অভিষেকের সঙ্গে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা তিনজনের মধ্যে ত্রিপুরা-মণিপুর-অসমের পাশাপাশি গোয়া নিয়েও কথা হয়।
তৃণমূল ত্রিপুরায় পা রাখার আগে প্রথমে তাঁরা প্রশান্ত কিশোরের টিমকে পাঠিয়েছিলেন গোপন সমীক্ষার জন্য। তারপর তৃণমূল নেতারা পদার্পণ করেছিল সেই রাজ্যে। ত্রিপুরা ছিল বাংলার বাইরের রাজ্য হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম টার্গেট। সেই টার্গেট ছুঁতে তাঁরা কোমর বেঁধে নেমেছেন। কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া সুস্মিতা দেবকে দায়িত্ব দিয়েছেন ত্রিপুরা দখলের। আর মাথার উপরে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
আগামী লোকসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। ইতিমধ্যে দেশের একাধিক রাজ্যে তৃণমূল তাঁদের সংগঠনকে মজবুত করতে মাঠে নেমে পড়েছে। উত্তরপ্রদেশে একদিকে যেমন অফিস খুলে বিজেপিকে বার্তা দিয়েছেন মমতা অন্যদিকে দক্ষিনের একাধিক রাজ্যেও কাজ করছে শাসকদল। ইতিমধ্যে কর্নাটকেও সংগঠনকে মজবুত করতে কাজ করছে শাসকদল।
২০২৩-এ ত্রিপুরায় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসতে বদ্ধপরিকর তৃণমূল কংগ্রেস। ২০২৩-এর নির্বাচন জিততে এখন থেকে ঘূঁটি সাজাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। ইতিমধ্যে ত্রিপুরা রাজ্যে তৃণমূলের সংগঠন অনেকটাই বাড়াতে পেরেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। এ রাজ্যে বিজেপিতে আড়াআড়ি ফাটলের সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে ত্রিপুরায় তৃণমূল ক্রমেই অ্যাডভান্টেজ পজিশনে আসতে শুরু করেছে। তৃণমূলের সফট টার্গেট, জল্পনার তালিকায় যুক্ত হয়েছে গোয়া। ত্রিপুরার পাশাপাশি তৃণমূল অসম, মণিপুরের মতো উত্তর-পূর্বের ছোট রাজ্যগুলিকেও টার্গেট করেছে। এমনকী মেঘালয়ও তাঁদের নজরে রয়েছে। মেঘালয়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা মুকুল সাংমা সম্প্রতি কলকাতায় এসে বৈঠক করে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সেই থেকেই মেঘালয় নিয়ে জল্পনা চলছে। আর সেই জল্পনার তালিকায় যুক্ত হয়ে গেল আরও একটি নাম- গোয়া।
ইতিমধ্যে গোয়াতে কাজ শুরু করে দিয়েছে প্রশান্ত কিশোরের টিম। সে রাজ্যে ভোটের আগে সমীক্ষার কাজ শুরু করে দিয়েছে অ্যাইপ্যাক। এমনকি গোয়াতে বেশ কয়েকজন নেতৃত্বের সঙ্গেও গত কয়েকদিন ধরে কথাবার্তা চালাচ্ছিলেন তৃণমূল নেতারা। গোয়া সফরে সেই সমস্ত নেতাদের সঙ্গে সংগঠনের বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন ডেরেক। এছাড়াও গোয়ার মানুষের সঙ্গে কথা বলে পালস বোঝার চেষ্টা করতে পারেন তৃণমূল নেতারা। এই টিমের রিপোর্ট পাওয়ার পরে সেখানে যেতে পারেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে তিনি সেখানে প্রচার শুরু করবেন বলে সূত্রের খবর। উল্লেখ্য, গোয়া বিধানসভার আসন সংখ্যা ৪০। যা কিনা ত্রিপুরার থেকেও কম। ২০১৭-র নির্বাচনে এই রাজ্যে কংগ্রেস ১৭টি আসন দখল করেছিল। বিজেপি পেয়েছিল ১৩টি আসন। যা সত্ত্বেও বিজেপিই সেখানে সরকার গঠন করে। গোয়ায় কংগ্রেসের দুর্বলতার সুযোগ তারা নিতে চায় বলেই খবর।
ত্রিপুরা থেকে শুরু করে গোয়া- প্রতিটি রাজ্যেই বিজেপির কাছে আন্তসমর্পণ করেছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের সেই ব্যর্থতা ঢাকার উদ্দেশ্য নিয়ে আর এক কংগ্রেস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল এবার পাড়ি দিচ্ছে বিজেপিশাসিত দেশের ছোট ছোট রাজ্যগুলিতে। ত্রিপুরায় পুরো কংগ্রেস টিম ভেঙে বিজেপি হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা ক্ষমতায়। এখন সেই কংগ্রেসিরাই ব্রাত্য। বিজেপির বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ লড়াই দিতে পারেনি কংগ্রেস, মণিপুর বা গোয়ারও তেমনই অবস্থা। এই দুটি রাজ্যে একক বৃহত্তম দল হয়েও কংগ্রেস সরকার গড়তে পারেনি। বিজেপি প্রায় পূর্ণ মেয়াদ এখানে ক্ষমতায় অন্য দল ভাঙিয়ে। কংগ্রেসের এই দুর্বলতাকে কাটিয়ে তাঁরা এবার নেতৃত্ব দিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ লড়াই করতে চায়।
২০২২ থেকে শুরু করে ২০২৩-এর মধ্যে সমস্ত রাজ্যে নির্বাচন হবে। গোয়ায় নির্বাচন ২০২২-এর ফেব্রুয়ারিতে। আর ত্রিপুরায় নির্বাচন ১ বছর ৫ মাসের মধ্যে। মণিপুরেও নির্বাচন ২০২২-এ। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তৃণমূলকে সংগঠন বিস্তার করে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তৃণমূল বাংলায় ক্ষমতায় আসার পরই গোয়া অভিযানে নেমেছিল। ২০১২ সালের নির্বাচনে তাঁরা প্রার্থীও দিয়েছিল। তবে সেবার তাদের শূন্য হাতে ফিরতে হয়। আর ত্রিপুরাতেও তৃণমূল সংগঠন বিস্তার শুরু করেছিল ২০১৬-র পর। সেখানে বিরোধী দলের তকমা আদায় করে নিলেও ২০১৮-য় তারা মুখ থুবড়ে পড়ে। বরং মনিপুরে তারা নির্বাচনে লড়ে একজন বিধায়ক পেয়েছিল। অসমেও তৃণমূল সংগঠন বিস্তারের টার্গেট নেয় আগে। টার্গেট ছিল পঞ্জাবেও। কিন্তু সে অর্থে কোথাও হালে পানি পায়নি তৃণমূল। এখনও পর্যন্ত তারা বাংলাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবে এবার ভিন রাজ্যে সংগঠন বিস্তারে একেবারে কোমর বেঁধে নেমেছে তৃণমূল।