কয়েক মাস আগে বাম দলগুলির মধ্যে বিতর্ক বেধেছিল এ রাজ্যে তৃণমূল না বিজেপি কে তাদের মূল শত্রু তাই নিয়ে। দলের অন্দরে এমন দাবিও উঠছিল যে বাংলায় তৃণমূল নয়, বামদলগুলির মূল প্রতিপক্ষ হওয়া উচিত বিজেপি। আসলে তখন অভিযোগ উঠছিল, বঙ্গ বামেরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে মূল লড়াই করছে, যার অন্যদিকে বিজেপি ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। তাই তখন অনেকের প্রশ্ন ছিল; কার বিরুদ্ধে মূল লড়াই, বঙ্গ বামেদের ঠিক করতে হবে। পরবর্তীতে এই প্রশ্নের মীমাংসা ঘটাতে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, বাংলায় তৃণমূল নয়, বামদলগুলির মূল প্রতিপক্ষ বিজেপি।
এখানেই শেষ নয়, পরবর্তীতে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান এও বলেছিলেন, বিরোধী যে কোনও দলের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বামেরা। তিনি মুখ দিয়ে তৃণমূলের নাম উল্লেখ না করলেও তিনি জানান, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এটা বহুবার ঘটেছে, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কচ্ছ থেকে কোহিমা পর্যন্ত কোনও আন্দোলন সংগ্রামের প্রশ্ন দেখা দিলে বিজেপি বিরোধী যে কারও সঙ্গে বামেরা একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। স্পষ্ট করে তৃণমূল কংগ্রেসের কথা বলা হলেও বিমান বসু বলেন, তিনি তো বলছেনই, যে বিজেপি বিরোধী যে কোনও দলের সঙ্গে তারা কাজ করতে প্রস্তুত।
একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস, আইএসএফ-এর সঙ্গে জোট করেও সংযুক্ত মোর্চা ভোটবাক্সে মুখ থুবড়ে পড়ে। পাঁচ মাস পরে বিধানসভা নির্বাচনের ভবানীপুরে উপনির্বাচন। এছাড়া নির্বাচন হবে সামসেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুর আসনে। ভবানীপুরে কেন্দ্রে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায়ের বিপক্ষে সিপিএমের প্রার্থী শ্রীজিব বিশ্বাসের হয়েও প্রচার শুরু হয়েছে। অথচ ভবানীপুরে বামেদের প্রচারে দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। যেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের প্রার্থীদের নামের আগে লেখা ছিল ‘সংযুক্ত মোর্চা সমর্থিত’, এবার কিন্তু তা নেই। অথচ সিপিএম বলছে সবার সঙ্গে জোট অক্ষত রেখেই নাকি তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আইএসএফ-এর একমাত্রা জয়ী নওশাদ সিদ্দিকি বামপ্রার্থীদের সমর্থনে প্রচারে নামার কথা জানালেও এখনও পর্যন্ত তাঁকে দেখা যায়নি। তার ওপর বামেরা জানিয়েছে জোট ভাঙলে তার দায় তারা নেবে না।
দুদিন আগেই একটি সভায় এমনটা জানিয়েছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। এর আগেই অবশ্য কংগ্রেস ভবানীপুর উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিতে রাজি হয়নি৷ এরপর বিধান ভবন থেকে জানানো হয়েছে, সিপিএমের প্রার্থী শ্রীজিব বিশ্বাসের হয়েও প্রচারে নামবে না তারা। তবে বিমানবাবুর কথা অনুযায়ী সমশেরগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে বিধান ভবনের সঙ্গে কোনও কথা হয়নি তাদের। তবে জোটসঙ্গীদের আচরণে যে বামেরা বেজায় ক্ষুব্ধ তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ২০১৬ সালে ভোটবাক্সের ফলাফলে নিঃস্ব হয়ে কংগ্রেস দায় চাপিয়েছিল বামেদের ওপর। এবার আগে থেকেই সতর্ক বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমরা জোট ভাঙার কথা একবারও বলছি না। কিন্তু তিনটি কেন্দ্রের উপনির্বাচনে কংগ্রেস কী করছে, তা মানুষ দেখছে৷’
বিধানসভা নির্বাচনের পাঁচ মাসের মধ্যেই বামেদের প্রচারে এই পরিবর্তনের মধ্যে ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ জানিয়েছেন, তাঁকে প্রচারে ডাকা না হলে তিনি যাবেন না। অন্যদিকে সিপিএম-এর তরফে জানানো হয়েছে, আইএসএফ-এর সঙ্গে জোটকে সাধারণ মানুষ ভালভাবে নেয়নি। কিন্তু তাদের সঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনও জোট হবে কিনা এখন পর্যন্ত সেটাও স্পষ্ট করেনি বামেরা। কিন্তু তারা বলেছেন, সংযুক্ত মোর্চা ছিল সাময়িক নির্বাচনী সমঝোতা। তার মানে কি সংযুক্ত মোর্চার প্রাণবায়ু ফুরিয়েছে? বিধানসভা ভোটের পরে সংযুক্ত মোর্চাকে কোনও কর্মসূচিতেও দেখা যায়নি। এদিকে আব্দুল মান্নান সোনিয়া গান্ধীকে চিঠি লিখে রাজ্যে জোট বজায় রাখার কথা বললেও, হাইকমান্ডের তরফে কোনও সাড়া মেলেনি বলেই জানা গিয়েছে।
ভবানীপুর কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী না দিয়ে কংগ্রেস ভবিষ্যতের জন্য পথ খুলে রাখলেও সামশেরগঞ্জ এবং জঙ্গিপুরে নির্বাচন নিয়ে জোটসঙ্গীর আচরণে যে বামেরা ক্ষুব্ধ সেটা স্পষ্ট। যে কারণে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, এবার বামেরা তিনটি আসনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট অক্ষত রেখে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের পরে জোট ভাঙলে তার দায় নেমে না বামেরা। অন্যদিকে সংযুক্ত মোর্চা নিয়ে আগেই আপত্তি ছিল অধীরের। একুশের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেসেরও পকেট খালি। দলের অন্দরে আইএসএফ–কে নিয়ে গোল বাঁধায় সংযুক্ত মোর্চার ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা বেড়েছে। সাংবাদিক বৈঠকে আইএসএফ নিয়ে নিজের আপত্তির কথা গোপন করেননি অধীর চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট বলেন, জোটে আইএসএফ থাকায় প্রশ্নের মুখে পড়ে সংযুক্ত মোর্চার ভাবমূর্তি। এটা থেকে আরও স্পষ্ট হয়, সিপিএমকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। তিনি এও বলেছিলেন, ‘কংগ্রেসের সব নেতা–কর্মীদের মতামত নিয়ে জোট হয়েছিল। মাঝখানে আইএসএফ ঢুকে জোটের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি মুখে ফেলে দেয়। তাই নতুন করে জোট করতে গেলে সেই সব প্রশ্নের সমাধান দরকার।’
এদিকে বিজেপি শাসিত রাজ্যে বিরোধীদের ওপরে আক্রমণ হলে তৃণমূল সরব হলেও, ত্রিপুরায় দিন কয়েক আগে সিপিএম তথা বাম কার্যালয়ের ওপর হামলা নিয়ে তৃণমূল হয়েছে, তার প্রতিবাদ না করায় প্রশ্ন তুলেছে রাজ্যের বামেরা। রাজ্যের শাসকদল এবং সরকার বাধা দিলেও রাস্তায় নেমে ২৭ সেপ্টেম্বর কৃষকদের সমর্থনে বামেরা বনধ পালন করবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে। তৃণমূলকে একটা সময়ে আন্দোলনরত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেলেও, কেন তারা বনধ নিয়ে কোনও কথা বলছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বামেদের তরফে। অন্যদিকে ত্রিপুরায় সিপিএমের সঙ্গে তৃণমূলের জোট সম্ভবনাও যে হচ্ছে না সেটা স্পষ্ট করেছেন মানিক সরকার। পাশাপাশি ‘বিজেপি বিরোধী যে কোনও দলের সঙ্গে যে সিপিএম কাজ করতে প্রস্তুত’ তারও কোনও সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না।