একুশের বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে বাংলার দিকে তেড়ে আসছিল যে গেরুয়া ঝড় তা কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। তারপরই গেরুয়া শিবিরে লেগে যায় অন্তর্কলহ, আদি বনাম নব্যের কোন্দল। তার প্রভাব টের পাওয়া যায় গত উপ নির্বাচনের ফলাফলে। এবার পুরভোটের ফলেও দেখা যাচ্ছে জেলায় জেলায় পর্যুদস্ত গেরুয়া শিবির৷ সামগ্রিক ভাবে বাংলার উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ বাংলার বিভিন্ন পুরসভায় ঘাসফুল আধিপত্য বিস্তার করেছে। এক সময়ে বিরোধীদের হাতে ছিল যে পুরসভা, সেটিও তৃণমূলের দখলে চলে এসেছে। এছাড়াও অনেক পুরসভাতে তৃণমূল আগের তুলনায় জয়ের ব্যবধান বাড়িয়েছে। এমনকি যেখানে বিজেপির বিধায়ক রয়েছে সেখানকার পুর এলাকা দখল করেছে তৃণমূল।
পাহাড় থেকে সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত বঙ্গের মোট ১০৮টি পুরসভায় ঘাসফুল ঝড়ে বিরোধীরা খড়কুটোর মতো উড়ে গেলেও বাংলার মাটিতে এক চিলতে হলেও লাল আবির দেখা গিয়েছে তাহেরপুরে। কিন্তু বাংলার তিন প্রান্তের তিনটি ওয়ার্ড- কাঁথির ১৫ নম্বর, বালুরঘাটের ২২ নম্বর ও ভাটপাড়ার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে রাজ্য বিজেপি-র তিন শীর্ষনেতা যথাক্রমে শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার এবং অর্জুন সিংহ তৃণমূলের বিক্রমের কাছে একেবারে ধরাশায়ী হলেন।
কাঁথি পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে থাকেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ওই এলাকাকে ‘অধিকারীগড়’ হিসাবেই ধরা হয়। সেখানে তৃণমূলের তনুশ্রী চক্রবর্তী ২২৮ ভোটে হারিয়ে দিয়েছেন বিজেপি প্রার্থীকে। এই পরাজয় তো আসলে শুভেন্দু ও তাঁর দলেরই।
রাজ্য বিজেপি-র সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের ওয়ার্ড বালুরঘাট পুরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ড, সেখানেও একই অবস্থা। সুকান্ত বালুরঘাটের সাংসদ। এই পুরভোট ছিল তাঁর কাছে কার্যত ‘সম্মানের লড়াই’। রবিবার পুরভোটে শাসকদলের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাস’-এর অভিযোগ তুলে সুকান্ত সোমবার রাজ্যে ১২ ঘন্টার বন্ধ ডেকেছিলেন। ঠিক দুদিন পর ফলপ্রকাশ হলে দেখা গেল, সুকান্তর নিজের পাড়া বালুরঘাটের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে পদ্মপ্রার্থী হাজার খানেক ভোটে হেরেছেন।

শুভেন্দু-সুকান্তের থেকেও খারাপ অবস্থা ব্যারাকপুরের বিজেপি সাংসদ অর্জুন সিংহের। অর্জুন দুর্গ বলে পরিচিত ভাটপাড়ায় বিজেপি শোচনীয় ভাবে হেরেছে। ভাটপাড়া পুরসভার ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে অর্জুনের বাড়ি, সেই ওয়ার্ডের বিজেপি প্রার্থী অর্জুনের ভাইপো সৌরভ সিংহ পুরভোটের ঠিক আগে তৃণমূলে যোগ দিয়ে বিজেপি-র মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। ফলে অর্জুনের ওয়ার্ডে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোটের আগেই জিতে গিয়েছিল তৃণমূল। এছাড়া বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষও নিজেদের খাসতালুক ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন৷ মেদিনীপুরের বিজেপি সাংসদ দিলীপ ঘোষের এলাকার দু-টি পুরসভা মেদিনীপুর ও খড়্গপুর দখল নিয়েছে তৃণমূল।
সবুজ ঝড়ের পূর্বাভাস অনেক আগেই পেয়েছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা বহরমপুরের সাংসদ অধীর চৌধুরী। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন নিজের গড় যেন রক্ষা পায়। কিন্তু সেটাও টিকিয়ে রাখতে পারল না কংগ্রেস। এই প্রথমবার তৃণমূল মুর্শিদাবাদের প্রাণকেন্দ্র বহরমপুর পুরসভার দখল নিল তিন দশক পর। জয়ের বহরও বিরাট, পুরসভার ২৮টি আসনের মধ্যে ঘাসফুল দখল করল ২২টি। কেবল তাই নয়, অধীরের অস্বস্তি বাড়িয়ে অধীরের পাড়া ২ নম্বর ওয়ার্ডও জিতে নিয়েছে তৃণমূল।
অন্যদিকে অনুব্রত মণ্ডলের গড়ে সবুজ ঝড়ের মধ্যেও জেলে বসেই দাদাগিরি দেখিয়েছেন সিপিএম প্রার্থী সঞ্জীব মল্লিক। বীরভূমের ৫টি পুরসভা দখল করেছে তৃণমূল। দুবরাজপুর, সিউড়ি, বোলপুর, সাঁইথিয়া পুরসভা বিরোধীশূন্য। কিন্তু তারই মধ্যে রামপুরহাট পুরসভায় ১৭ নম্বর ওয়ার্ডটি জয় করেছে বামেরা। তাও আবার জেলে বসেই ১৫৩ টি ভোটে জয়ী হয়েছেন সঞ্জীব মল্লিক।
ঘাসফুল ঝড়ে যখন বিরোধীরা বাংলার মাটি থেকে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল তখন সেই মাটিতেই এক চিলতে হলেও লাল আবির দেখা গেল। বলা যেতে পারে বিধানসভায় শূন্যতে ঠেকে যাওয়া বামেরা যেন ফের ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ খুঁজে পেলেন৷ বামেরা নদীয়ার তাহেরপুর পুরসভার দখল অটুটু রাখল৷
তাহেরপুরে বামেদের সাফল্য অবশ্যই রাজ্য–রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে বলে মনে হয়। কারণ একুশের বিধানসভা নির্বাচনে যারা একটিও আসন না পেয়ে বাংলা থেকে ভ্যানিস হয়ে গিয়েছিল তাহেরপুর পুরসভার ১৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৮টির দখল পেয়ে সিপিএম কেবল এই পুরসভার ক্ষমতায় ফিরল না পাশাপাশি নিজেদের ভাঙাচোরা চেহাড়াটা নিয়েও ঘুরে দাঁড়াল। উল্লেখ্য, গত পুরসভা ভোটেও বামেদের দখলে ছিল তাহেরপুর পুরসভা। তখন ৭টি ওয়ার্ড পেয়েছিল বামেরা। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৬টি আসন। এবার একটি আসন বেড়েছে ৮।
ভোট লুট-ছাপ্পা-সাংবাদিক নিগ্রহ করে সন্ত্রাস সৃষ্টির কি খুব দরকার ছিল? মানুষ তো বিজেপিকে তাড়াতে জেনে বুঝেও সবুজে ভোট দিচ্ছে, নাকি
গুণ্ডাগিরি অন্ত্রে কৃমির মতো?
সবুজ ঝড়েও অনুব্রত মণ্ডলের গড়ে জেলে বসেই দাদাগিরি দেখালেন সিপিএম প্রার্থী সঞ্জীব মল্লিক। জেলে বসেই ১৫৩ টি ভোটে জয়ী
হয়েছেন তিনি।
বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করে শাসন কায়েম রাখার অন্যতম লক্ষ্য গণতন্ত্রকে নির্বাসনে রাখা। বিরোধীরা দিকে দিকে দুর্বল হলে উচ্ছাস আসে তখনই
যখন গণতন্ত্রের জায়গায় একনায়কতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা যায়। পুরভোট বা তার ফলেফলে সেই ছবিটাই স্পষ্ট হল।