শীতকাল। পৌষমেলা। নলেন গুড়। পিঠে পার্বণ। বাড়ি ভর্তি মানুষের মেলা। তবু সেই সত্তরের দশকে গ্রাম বাংলা শীতে যেন জবুথবু। বাড়ির কতকগুলি অলিখিত নিয়ম থাকত। সেগুলো ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বলতে হত না। শৈশব থেকেই সেই অলিখিত নিয়ম সকলে পড়ে ফেলত এবং জটায়ুর মত ‘কোনো প্রশ্ন নয়’ বলে দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে যেত। যেমন ভোরে ওঠা। উঠেই বাসি অর্থাৎ আগের রাতের পোশাক ত্যাগ করে কাচা কাপড় জামা পরে ফেলা। এর কোনো অন্যথা কচি থেকে পাকা চুলের কারোর ক্ষেত্রে ঘটত না। আর শীতের ভোর মানে চারদিক কুয়াশায় ঘোমটা টেনে কনে বৌয়ের মত লাজুক পায়ে পুকুরঘাটে যাওয়া। সেই কুয়াশার মধ্যে থেকেই আচমকা আবছা একটা গোটা মানুষ আস্তে আস্তে প্রকাশমান। কাঁধে বাঁক, বাঁকে দুখানি মাটির কলসি। আর সেই কলসিতে আছে অমৃত। টাটকা ভোরের খেজুর রস।
কারো গায়ে এই হি হি শীতে স্রেফ একটা চাদর, পেছনে গিঁট বেঁধে দেওয়া, যাতে খুলে না যায়। কারো বা ফুলহাতা সোয়েটার। চটি জুতোর গল্পই নেই। কারণ ঘাসের শিশিরে পা ফেলে হাঁটার আনন্দই অন্যরকম। এক আধটা শিশুর পায়ে চটি। সুবোধ কাকার বাঁক নামানোর অপেক্ষা শুধু। অমৃতের কলসি কয়েক মিনিটের মধ্যে ফাঁকা হতে সময় লাগে না। শুধু ছোটরা নয়, বাড়ির বয়স্ক সদস্যরাও অমৃত রসে সমান মজে থাকতেন। কারোর হাঁটু বা কোমরে ব্যথা টনটন, মাথা ঝনঝন শোনা যেত না একদমই সেটা নয়, তবে এতই কম যে স্মৃতিতে ধরা পড়ে না। আর এখন চল্লিশ পেরোলেই কোমর আর হাঁটু নিয়ে প্রায় সকলেই নিত্যদিন হায় হায় করছে আর পঞ্চাশ পেরোলেই কোথায় দুটো হাঁটু একসঙ্গে অপারেশন করেন কোন ডাক্তার সেই খোঁজে জেরবার।
অন্ধকার থাকতে বাড়ির মহিলামহল বাসি কাপড় ছেড়ে পাকশালে দোর দিলেন। দোর দেওয়ার একটিই কারণ – ভয়ানক শীতের দাপট সেই সত্তর আর আশির দশকে। অথচ বর্তমানের মত তখন এক একজনের এতগুলো করে শীতের পোশাক ছিল না। গরিব মানুষের যেমন ‘দোলাই’-এ কাজ চলে যেত, তেমনি অবস্থাপন্ন ঘরেও একটি চাদর আর বাইরের একখানি শালে বেশ কেটে যেত জীবন। দোরবন্ধ পাকশালে গুলতানি হাসির সঙ্গে চলত হাতে হাতে সেদ্ধপিঠে, ভাজাপিঠে, সরুচাকলি, আস্কেপিঠে, বাড়ির গরুর দুধের দুধপুলি, রাঙাআলুর রসপিঠে আর পাটিসাপটা তৈরি। ছেলেপিলের দল সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠেই জলখাবার সারতো এতরকম গরম গরম পিঠে দিয়ে। পাঁউরুটি বাটারের সাহেবি ব্রেকফাস্ট কারোর মুখে রুচত না।
যদ্দিন পঞ্চাশের আগের বছরগুলো কাটছিল, তখন দিনগুলো বেশ যেন থাকছি, থাকব, যাচ্ছে, যাক না- বলে এপাশ ফিরে, ওপাশ মুড়ে, হাতে যেন অনেক সময়, এরকম একটা মূর্খের স্বর্গে কাটাচ্ছিলাম। যেই বয়স গড়িয়ে পঞ্চাশ পেরিয়ে আরও গড়িয়ে চলতে লাগল হঠাৎ করেই পেছন ফিরে দেখলাম সাংঘাতিক জোরে ছুটছি। আশপাশের গাছপালা, বাড়িঘর, মানুষজন সব দ্রুত সরে যাচ্ছে। পাল্টেও যাচ্ছে। কাল যেখানে একটা বাগান ঘেরা সুন্দর চেনা বাড়ি ছিল আজ দেখছি ঠংঠং ঢংঢং শব্দে ছেনি হাতুড়ির ঘা পড়ে সেই বাড়ি নিশ্চিহ্ন। তার দুদিন পরেই দেখলাম প্রকান্ড এক ইমারত সেখানে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। আর সেই ইমারতের প্রতিটি খোপ আমার চেনা বৃত্তের বাইরে। অগণিত অচেনা মুখ পেরিয়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই গতিতে। কাউকে চিনি মনে হতে হতে দেখি মুখ পাল্টে গেছে।

সত্তর আশির দশকের গ্রামবাংলার মত মফস্বলেও শীতের কামড় কিছু কম ছিল কি? সেখানেও বাগানের প্রতিটি ঘাসের ডগায় তখন শিশিরের ফোঁটা চিকচিক করত। ছোট্ট বিণি, মণি, কাঁকন কান বা নাক ফুটিয়ে সেই শিশির দিত সদ্য ফোটানো কানের, নাকের লতিতে। ব্যথা মরত। তারপর ব্যথা মরলে সুতো কেটে নিমগাছের খুব সরু কাঠি কানের ফুটোতে বেশ কিছুদিন শোভা পেত, যতদিন না সোনার ছোট্ট মাকড়ি প্রাপ্তি ঘটছে। পঞ্চাশ পেরিয়ে দিন রাতগুলো যেমন দ্রুত সরে যাচ্ছে, তেমনি ওই ছেলেবেলার শিশিরের ফোঁটা, নিমের কাঠি সব হুড়মুড়িয়ে কোথায় যে উধাও হয়ে যাচ্ছে কোনো খোঁজ নেই।
ইংরেজি বছর শেষ হব হব সময়ে বাবার হাত ধরে বাড়িতে আসত অঢেল ক্যালেন্ডার। তখন শিপিং কর্পোরেশনের ক্যালেন্ডারের ভীষণ চাহিদা ছিল। হট কেকের মতো ক্যালেন্ডার আসত আর উধাও হয়ে যেত। আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, এমনকি অচেনা অনেকেও শিপিং কর্পোরেশন নাম শুনে ক্যালেন্ডার ডায়েরি চেয়েছেন এবং পেয়েছেন দেখেছি। তারপর দৌড়তে দৌড়তে বর্তমানে এসে দেখি দেওয়ালে আর ক্যালেন্ডার রাখতে নেই। ক্যালেন্ডার দ্রুত সরে গেল, সেই সঙ্গে সরে গেল অনেকগুলো চেনা মুখের সারি।
ইংরেজি বছর আসা মানেই নাহুম, নিউমার্কেটে একটু ঘোরাঘুরি বাবার হাত ধরে। গ্রেট ইস্টার্নের ক্রিম রোলের কি অসাধারণ টেস্ট। একটা ক্রিম রোলের জন্য গোটা একটা বছর প্রতীক্ষায় থাকা যেত অনায়াসে। পঞ্চাশ পেরিয়ে দৌড়তে গিয়ে পেছনে ফিরে দেখলাম প্রতীক্ষা কেউ করে না। ‘আমার যা-কিছু চাই, এই মুহূর্তে চাই। যেটা প্রাপ্য এক্ষুনি তা পাব’ প্রতীক্ষাকে দৌড়ে হারিয়ে দিয়েছে। আর সেজন্য কোনো কিছু পাওয়ার সেই আনন্দটা কোত্থাও নেই। সবই যে অনায়াসে হাতের মুঠোয়।
গরমের ছুটির সময় দুপুরে বেশ ভাতঘুম দিয়ে উঠে অঙ্ক বই খাতা নিয়ে খানিক বসা। মাঝেমাঝেই উদাস হয়ে যাওয়া। আর শীতের ছুটির কটা দিন ছিল চিড়িয়াখানা, কমলালেবু, কেক আর পিঠের গন্ধ মাখা মায়ের আঁচলের ওমের মতো। দুপুরের শীতরোদ্দুরে ছাদ অথবা বারান্দায় রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে মহিলামহল নানা রঙের উল কাঁটা আর নকশায় বিভোর। তারই মাঝে এবাড়ির মেয়ে সেবাড়ির ছেলের দিকে আড়চোখে চেয়ে সদ্য কলেজে যাচ্ছে বা ও বাড়ির সোনার টুকরো ছেলে ঢিল বেঁধে গোলাপি চিঠি ছুঁড়ে দিচ্ছে সেবাড়ির ছাদে, ছাদে তখন এক কন্যা গোধূলি আলোয় রাঙা হয়ে উঠছে — এসব কথাও ফিসফিসিয়ে চালাচালি হত। উল কাঁটায় নিজেদের টুকরো ভালোবাসার স্মৃতিও বোনা হত এই ‘পি এন পি সি’র মধ্যেই। রেডিওতে বাজছে ‘হারানো সুরের’ সুচিত্রা সেনের লিপে কোনও গান।
সত্তরের একেবারে শেষ দিকে বাড়িতে প্রথম ঢুকল সাদা কালো টেলিভিশন। সেই সঙ্গে টেলিভিশন রাখার একটি শাটার দেওয়া কাঠের ঘর। সেই দরজার আবার চাবিও থাকত কোনো কোনো বাড়িতে। হিন্দি সিনেমার দিন টেলিভিশনের শাটার অবভিয়াসলি বন্ধ থাকত। বাড়ির যে ছেলেটিই কিনে থাকুক, সেটির স্থান হত বাড়ির সবথেকে প্রাচীন সদস্য বা সদস্যার ঘরে। অথবা বৈঠকখানায়। তখন ড্রইংরুমের চল হয় নি। সন্ধ্যায় গোটা একটা পাড়া সেই বৈঠকখানায়। শনি রবিবার সিনেমার দিন বা ফুটবল-ক্রিকেট খেলা থাকলে বাড়িতেই একটা উৎসব। পরে ধীরে ধীরে এর জন্য অসুবিধাগুলো টেলিভিশন থাকা বাড়িতে সবাই অনুভব করতে লাগল, কিন্তু ধীরে ধীরে। তখনও সময় এত দ্রুত দৌড়ানো শুরু করেনি। গাভাস্কার, কপিলদেব, ভিভ রিচার্ডস, ইয়ান বোথাম একদিকে, অন্যদিকে আবার মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের তরজা আর লড়াই। তারই ফাঁকে কখন যেন মোহনবাগানের মেয়ে ইস্টবেঙ্গলের বাড়িতে টুক করে হেঁসেলে ঢুকে পড়ত অনেক ঝড় ঝাপ্টা সামলে। প্রথম প্রথম দু বাড়িতে মুখ দেখাদেখি নেই, তারপর দু-এক বছর পরে একটি অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠান দিব্যি মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলকে মিলিয়ে দিত। আবার তার মধ্যে খবরের কাগজ থেকে গাভাস্কার, কপিলদেব, ওদিকে বিদেশ বসু, সুব্রত ভট্টাচার্য, সুরজিৎ সেনগুপ্তের’র ছবি কেটে খাতায় সাঁটছে পড়াশোনায় অমনোযোগীর দল। তাদের জন্য রোজের কানমলা বরাদ্দ থাকতই কোনো এক কাকার হাতে।
আর ছিল ফিস্ট। না পিকনিক নয়। ফিস্ট। ভাত, পাঁঠার মাংস, চাটনি, রসোগোল্লা। জলখাবারে মুড়ি আর গোপাল ময়রার দোকানের ‘বোমা’। বোমা চপেরই নামকরণ, বোধহয় সাইজের জন্য। যাদের পাঁঠার মাংসের চাঁদা চেয়ে চিন্তেও উঠল না, তাদের বরাদ্দ হাঁসের ডিমের ঝোল। বেশির ভাগ বাড়িতে তখন মুরগি নট অ্যালাউড। মুরগির ডিমও নয়। তবু নিয়মভঙ্গকারী এক আধজন বাইরে খেয়ে মুখ মুছে ভালো ছেলে হয়ে বাড়ি ঢুকত। শীতের আর একটা আকর্ষণ তখন এখন সমানভাবে রয়েছে — মটরশুঁটির কচুরি, সঙ্গে নতুন আলুর দম। সময় যতই দৌড়োক, কচুরি পিছনে পড়ে থাকে নি।
কেক, পিঠে, কচুরির সঙ্গে ছুটতে ছুটতে সিনেমার মতো অনেক কিছু মুছে যাচ্ছে জীবন থেকে। সেই ছোট দুটি বোন ‘সিস্টার’ সিনেমা দেখে ক্রস দেওয়া হার কিনতে একা একা রাস্তা পেরিয়ে চার্চের ধারের দোকানে গেছিল সেদিন। আজ একটি বোন মেঘের দেশের ডাক পেয়ে উড়ে গিয়েছে কোথায়, ঠিকানা রেখে যায় নি। হাতের মুঠো খুললে মুঠোর মধ্যে সেই ক্রস এখনও অনুভব করতে পারি। দিব্যি ঝকমকে আছে সেটি। সেদিন একা দুটি ছোট মেয়ের সেই ভয় তত ছিল না, আজ যে ভয় আছে। এক রত্তি মেয়েও রাস্তায় বেরোলে আজ আর নাও ফিরতে পারে। বা ফিরবে শুধু মাংসের তাল হয়ে। দৌড়তে দৌড়তে এগুলো চোখে পড়ে, চোখে পড়ে বিনা কারণে অসংখ্য মৃত্যু। চোখে পড়ে হিংসা। চোখে পড়ে রবি ঠাকুরের ভাঙা টুকরো। চোখ ভেজে। আবার হাসিও আসে। এ কোথায় চলেছি ছুটতে ছুটতে? জীবনের ‘তিপ্পান্ন কাহন সমস্যার’ জট কী সত্যিই খুলতে পারলাম? নাকি আরও জট পাকিয়ে তুললাম!
পঁচিশে ডিসেম্বর আর ‘একলা’ জানুয়ারি এলে যীশু ঠাকুরের সঙ্গে আসে কেক পেস্ট্রী আর পিঠে পায়েস। পঁচিশে বৈশাখ এলে আমাদের জীবনদেবতার জন্মদিনে আসে সাদা ফুলের সুবাস আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। একজন শীতে, একজন ঠা ঠা গরমে। ছুটতে ছুটতে এদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে পেরিয়ে যাচ্ছি অনেকটা সময়। ‘পঞ্চাশ পেরুলে দেখা যায়, মাথার কলকব্জা গেছে খুলে, কাঠ খেয়েছে ঘূনে আর ইঁট খেয়েছে নোনা। তোমরা থাকো, আমি আর অপেক্ষা করব না।’
পাগলা ঘন্টি বাজছে। আমি ছুটছি, আমরা ছুটছি, হাঁপাচ্ছি, দম নিচ্ছি, আবার ছুটছি। অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক রাস্তা আর চেনা যায় না। অনেক মুখ অচেনা। তবু ‘জানলার পর্দাটা সরালে দেখা যায় জামরুলের ডালে খেলা করছে তিনটে-চারটে-পাঁচটা- ছটা পাখি।’
ঋণ: কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
দারুন ভালো হয়েছে।
অনেক ধন্যবাদ ????????
খুব ভালো লাগলো। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকালে বেশ ভালোই লাগে। ভালো থাকুন।