সম্প্রতি কবি ধর্মেন্দ্র বিশ্বাসের ‘তবু প্রেম আছে একবুক’ কাব্যগ্রন্থটি পড়লাম। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আর কতটুকু ছুঁলে প্রেম হয়’। তাঁর দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘তবু প্রেম আছে একবুক’। দুই ফর্মার এই কাব্যগ্রন্থের ভিতরে স্থান পেয়েছে ২৭টি ছোটো বড়ো কবিতা। এই কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব কবিতাই প্রেমের কবিতা। কবি বলছেন —
“আসলে আমি প্রেমের কবিতা লিখতেই ভালোবাসি। দৈনিক কাগজ, বাণিজ্যিক মাসিক পত্রিকাসহ নানা পত্র-পত্রিকায় প্রত্যেকটা কবিতাই প্রকাশ পেয়েছে। সেইসব কবিতা নিয়েই এই কাব্যগ্রন্থ।” —
কাব্যগ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী রাজদীপ পুরী। প্রকাশক-‘অচিন পাখি’ প্রকাশন।
প্রথমেই কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা ‘তবু প্রেম আছে একবুক’।এই কবিতায় কবি লিখছেন —
“দু’চোখ জুড়ে অতৃপ্ত একরাশ বেদনা/
অবজ্ঞা, অবহেলা, ছিঁড়ে গেছে সম্পর্কের টান/
আশা নেই। তবু প্রেম আছে একবুক।”
‘বোধ’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন —
“আমারে সে ভালোবাসিয়াছে, আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা করে চ’লে গেছে —
যখন ডেকেছি বারে -বারে
ভালোবেসে তারে ;
তবুও সাধনা ছিলো একদিন — এই ভালোবাসা;”
তেমনই ভালোবাসা, উপেক্ষা, ঘৃণা, সম্পর্কের টান ছিঁড়ে গেলেও প্রেম আছে একবুক। ভালোবাসা একটা সাধনা। কাঁটা বিছানো রাস্তায় অনন্ত এক অভিসার। বাধা বিপত্তির পাহাড় ডিঙিয়ে ভালোবাসার নারী ‘বরুণা’র জন্য ১০৮টা নীলপদ্ম খুঁজে আনা যায়, দুরন্ত ষাঁড়ের চোখেও বাঁধা যায় লাল কাপড় — কিন্তু ‘বরুণা’রা সবসময় কথা রাখে না। ‘বরুণা’রা শুধু বদলেই যায়। হতাশা দানা বাঁধে মনে —
“নিভু নিভু দীপ,
চারপাশ ঘিরে আছে গভীর কালো। শিকড়ের সন্ধানে উঁকি মারে চুপিসারে,
নিয়মের বেড়া ভাঙে আশ্চর্য অধিকার। সে আশ্রয়ের ছায়াতলে
নিজেকে হারায়, মৃত্যুর গন্ধে অমলিন
তবু প্রেম আছে একবুক।”
আসলে ভালোবাসা, প্রেম শাশ্বত, অমলিন। যুদ্ধ, ধ্বংস, অবক্ষয়ের মাঝেও ভালোবাসার বীজ নীহিত থাকে। তবুও কিছু অতৃপ্তি, না পাওয়ার বেদনা মনকে বিষাদ ভারাক্রান্ত করে তোলে–
“প্রেম হলে নাকি যন্ত্রণা হয়
নোনাজলে ভেজা দু’চোখ
তবু ক্লান্ত করতে পারেনি।”
বিষাদ না আসনে প্রেমে যেমন মিলন আসে না, তেমনি প্রেম কখনো যন্ত্রণাহীন নয়। ভালোবাসার আগুনে পুড়ে পুড়ে হতে হয় ইস্পাত। যেমনটা হয়েছিলেন চন্ডীদাস-রজকিনী রামীর প্রেমে।তাই ‘রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম’, এ প্রেম নিতান্তই শাশ্বত, অলৌকিক প্রেম যা কামগন্ধহীন। তাই কবিকে বলতে শুনি –
“ফুলের মতো ঝরে যায়
কামনা-বাসনা
কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম টানে
প্রেমিক আনত হয়
অরণ্যের কাছে।
স্বপ্ন জুড়ে সহবাস গড়ে ওঠে —
গোপন অভিমানে
মধ্যরাতের নারী-পুরুষের।
তবু ভালোবাসা পোড়ে
নিজেরই আগুনে
অলিন্দের অনাবিল স্পন্দনে।”

এই প্রেম চিরন্তন। কিন্তু প্রেমে বিচ্ছেদ আসে অনেক সময়, তা হয়তো অনভিপ্রেত। লাবন্যময় হৃদয়েও সৃষ্টি হয় ক্ষতচিহ্ন। নীরবতার ভাষা খুঁজে নেয় অভিমানী মন। ‘শুধু শুধু অভিমান করে কেন বিচ্ছেদ আনো…’ — কবি হৃদয়ের এই আকুতি যেন আকাশে বাতাসে মুখরিত হয়ে ওঠে। তাই কবি শুনিয়েছেন এক পজেটিভ জীবনের গল্প। একটু একটু করে কীভাবে ভালোবাসার জন্ম হয় — আমরা দেখি তাঁর ‘ভালোবাসা’ কবিতায় –
“মেঘ জমে হৃদয়ের অন্তপুরে
হয়তো বা ক্রমশ এভাবেই জমে প্রেম, সন্ধ্যাতারা চেয়ে দেখে যৌবনের রোদ্দুর এখানে বৃষ্টি বারোমাস
ভিজে যায় দেহ-মন্দির
নিষ্পাপ আগুনে জ্বলতে থাকে
ষড়রিপু। জন্ম হয় ভালোবাসার।”
কিন্তু ভালোবাসা প্রেমে একদিকে যেমন থাকে মিলনের আনন্দ তেমনি অন্যদিকে থাকে হয় বিপ্রলম্ভ নায়িকার মতো বিচ্ছেদের হতাশা —
“দু’ চোখে ব্যর্থতার চিত্রকল্প জড়িয়েছে তোমার শূন্যতা বিষাদ এঁকে দেয়। পরাজয় বারবার নীরব করে রাখে চেতনায় জেগে ওঠে উচ্ছ্বসিত প্রাণের সজীবতা।”
‘অভিমানী চোখ’ কবিতাতে দেখি —
হতাশাহ
“শিকড় ছড়িয়েছে
ব্যর্থ জীবনের অক্সিজেনে
সোঁদা অনুভব প্রহরীর বুকে
না-বলা কথার নির্যাস
গাঢ় হয়েছে শ্যাওলার মতো।
তবু অভিমানী চোখ জোড়া
খুঁজেছে নির্বাসিত সুর
যেভাবে নদী খোঁজে সমুদ্রের ছায়াতল।”
সব কিছু ব্যর্থ হয়ে গেলেও, প্রেম ব্যর্থ হলেও সবসময় হতাশাই পড়ে থাকে না,
অনেক সময় থাকে বেঁচে থাকার প্রেরণা। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে শ্রীকান্তকে তাই বলতে শুনি — ”বড়ো প্রেম শুধু কাছেই টটানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয় —”।
তাই যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের মতো কবি বলেননি —
“প্রেম বলে কিছু নাই
চেতনা আমার জড়ে মিশাইলে
সব সমাধান পাই।”
প্রেম আছে এবং তা শাশ্বত ভালোবাসার কথাই বলে। প্রিয়া কাছে না থাকলে কি ভালোবাসার জন্ম হয় না। হয় বই কি।
“মুখোমুখি কোনদিন দেখা হবে না জানি
হাতে হাত রেখে বলবে না — ‘ভালোবাসি’।
তবু প্রেম আছে একবুক…”
কবির কবিতায় আছে প্রেম, আছে হতাশা, বেদনার গাঢ় অমানিশা, আছে দুঃখ, বিরহ-দহন, আছে ব্যথা যাপনের চিত্র। তবুও আশ্বাস আছে এক বুক প্রেমের। শব্দচয়ন কৌশল, মাঝে মাঝে রূপকের সূচারু প্রয়োগ, ছন্দের চোরা গতি,নিরেট ভাষার বুননে কবিতাগুলি হয়ে উঠেছে ‘প্রেম-বিরহের এক অনন্য রূপকথা’।
কাব্যের নাম : ‘তবু প্রেম আছে একবুক’, কবি : ধর্মেন্দ্র বিশ্বাস, প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর, ২০২৩, প্রচ্ছদ: রাজদীপ পুরী, প্রকাশক: ‘অচিনপাখি প্রকাশন’, কাঁদোয়া, নাকাশিপাড়া, কৃষ্ণনগর, নদিয়া, পিন-৭৪১১৩৮, ফোন- 9609513423 / 9734645123 , বিনিময়: ৪০.০০ টাকা (ভারত), ৫০.০০ টাকা (বাংলাদেশ), উৎসর্গ : কবি ও গীতিকার প্রিয়তমা মণিকা বিশ্বাসকে ভালোবাসার পরশে।