কর্ণাটক নির্বাচনে বিজেপির ধস নামতেই কংগ্রেস, তৃণমূল, এনসিপি, ডিএমকে, উদ্ধব ঠাকরের মতো দল মোদীর পতন দেখা শুরু করেছে। তাঁরা মনে করছেন, মোদীর অপশাসন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও উগ্র হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে। অতএব চব্বিশের ভোটে মোদীর দিল্লি থেকে উৎখাত এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। যদিও একটি রাজ্যের নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক বিষয় নয়। আবার এও দেখা গিয়েছে গত দশ বছরে নরেন্দ্র মোদীর মুখ সামনে রেখেও বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, হিমাচল, পাঞ্জাব, তেলঙ্গনা, অন্ধ্রপ্রদেশ ভোটে জেতা যায় নি। কিন্তু এই সব রাজ্যের ভোটে মোদী ম্যাজিক কাজ না করলেও সর্বভারতীয় স্তরে মোদীর ক্যারিশ্মা দুর্বল হয় নি। কারণ, ওই সব রাজ্যের ভোটে পরাজয়ের পরেও উনিশের লোকসভা ভোটে মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ড্যাং ড্যাং করে জিতেছে।
উল্লেখ্য, উনিশের লোকসভা ভোটের আগে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেস হিন্দি বলয়ের তিনটে রাজ্য রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগড় বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লোকসভা ভোটে আমরা দেখলাম এই তিন রাজ্যেই বিজেপি স্যুইপ করে ফলাফল একেবারে উল্টে দিল। তাহলে কর্নাটকের ভোটের ফলাফল দিয়ে অন্তত এখুনি চব্বিশের লোকসভার পরিস্থিতি কি অনুমান করা ঠিক হবে? তবে এ কথা বলতেই হবে, বিজেপি একটা ধাক্কা খেয়েছে আর কংগ্রেস খরা কাটিয়ে উৎসাহ পেয়েছে। কিন্তু দলের এই উৎসাহকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড়ে জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে? চব্বিশের লোকসভার আগে ২০২৩ সালে আরও কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোট হয়ে গিয়েছে, যার মধ্যে ত্রিপুরা, মেঘালয়, নাগাল্যান্ডে ভোট হয়ে গিয়েছে। দেখা যাচ্ছে দেশের উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলি বিজেপিকে হতাশ করেনি। গুজরাতেও বিজেপি বিপুল ভোটে জিতেছে। কিন্তু হিমাচল প্রদেশ ও কর্নাটকে বিজেপি কংগ্রেসের কাছে পরাজিত হয়েছে। বাকি রয়েছে রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ ও তেলঙ্গানার ভোট। দেখা যাচ্ছে এই তিন রাজ্যের মধ্যে একমাত্র মধ্যপ্রদেশে বিজেপির সরকার রয়েছে। অন্য দুই রাজ্য ছত্তীসগড় ও রাজস্থান কংগ্রেসের দখলে। অন্যদিকে তেলঙ্গনা শাসন করছে টিআরএস, তারা এখনও পর্যন্ত বিজেপি জোটের বাইরে। ভোট বাকি রয়েছে মিজোরামেও। উল্লেখিত রাজ্যগুলির বিধানসভা ভোটে কী ফলাফল হয় তার উপর আগামী লোকসভার ফলাফল নির্ভর করবে।
তবে শুধুমাত্র কর্ণাটক ভোটের ফলাফলই নয়, চব্বিশের লোকসভায় বিজেপির চাপ রয়েছে আরও কিছু ক্ষেত্রে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ ভারতে এতদিন একমাত্র কর্নাটকেই বিজেপি তার শাসন টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। কেবল শাসন ক্ষমতা ছাড়াও দক্ষিণের এই রাজ্যে বিজেপির সংগঠনও যথেষ্ট মজবুত ছিল। কিন্তু এই ধসের পর দক্ষিণে যে বিজেপি সর্বশান্ত হল তা বলেই যায়। তাছাড়া দক্ষিণে আর কোথাও প্রধান বিরোধী হিসেবেও বিজেপির অস্তিত্ব উল্লেখ করার যোগ্য নয়। কর্ণাটকের আশপাশে তাকালেও দেখবো, তামিলনাড়ু,র এমকে স্ট্যালিন, কেরলের পিনারাই বিজয়ন, তেলঙ্গানার কে চন্দ্রশেখর রাও, অন্ধ্রপ্রদেশের জগনমোহন রেড্ডির সঙ্গেও গেরুয়া শিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতানুসারে, দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে বিজেপির হিন্দুত্ব তাস আর কাজ করছে না সেটা কর্ণাটক বিধানসভা ভোটের ফলাফল থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তার ওপর এই বছরের শেষ দিকে তেলঙ্গানায় বিধানসভা নির্বাচনেও যদি আর একটি কর্নাটক ঘটে যায়, সে ক্ষেত্রে চব্বিশের লোকসভায় অন্তত দক্ষিণ ভারত থেকে বিজেপির আশাহত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তার বদলে আঞ্চলিক দলগুলির আধিপত্যই সেখানে বজায় থাকবেবলে মনে করা যায়।
কংগ্রেসের পক্ষে তেলঙ্গানায় কর্নাটকের মতো বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। কিন্তু কংগ্রেস যদি সেখানে মাথা সামান্য হলেও ভাল ফল করতে পারে, তাহলে চব্বিশের যুদ্ধের আগে তারা সাংগঠনিক ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। কর্নাটকে ভোটে হেরে বিজেপি যে ধাক্কা খেলো তার বিরাট মাশুল দিতে হবে। কারণ আইটি হাব বলে পরিচিত বেঙ্গালুরুতে যেমন একাধিক শিল্প সংস্থার সদর দফতর, তেমনি এই শহর স্টার্টআপ সংস্থাগুলির ভরকেন্দ্র। শাসন ক্ষমতা হারানো মানে এই সব বড় বড় সংস্থার উপর বিজেপির আর আগের মতো আধিপত্য খাটাতে পারবে না। ফলে চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপি কর্পোরেট সহযোগিতাও হারাবে। এই সব হতাশা কাটিয়ে উঠতে বিজেপির অনেক সময় লাগবে। তবে মনে রাখা দরকার ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, পাঞ্জাবের মতো রাজ্যে ভোটে হেরে, ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের আগে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড়ে কংগ্রেসের কাছে হারের পরও ২০১৯-এ মোদি ঝড়ে উড়ে গিয়েছিল বিরোধীরা।