“টক্কা টরে, টক্কা টরে/খবর এসেছে ঘর ভেঙেছে দারুণ ঝড়ে/তারের বার্তায় সংকেতে টরে টক্কা টরে”… অপরেশ লাহিড়ীর এই জনপ্রিয় গানটির টরেটক্কা শব্দটা বয়ে নিয়ে আসতো দ্রুত দূর-দুরান্ত হতে জরুরি তার বার্তা– যাকে বলা হয় টেলিগ্রাম।
তখন শহরের বিভিন্ন পোষ্ট অফিসে পোষ্ট মাস্টারের টেবিলে টেলিগ্রাফ যন্ত্রটি থেকে অনবরত টক টক টরেটক্কা টরেটক্কা আওয়াজ হতো। প্রবীণ যারা তারা অনেকেই জানেন তাঁদের পরিবারে, বাংলার বহু গল্প উপন্যাসে কাহিনীর নাটকীয় মোড় নিয়েছে একটি দুই বাক্যের টেলিগ্রামে। মনে পড়ে, সুচিত্রা-উত্তম অভিনীত সপ্তপদী চলচ্চিত্রের কথা! মায়ের মৃত্যু সংবাদ উত্তম কুমারের কাছে বহন করে আনে একটি নির্দোষ টেলিগ্রাম। বিভূতিভূষণ রচিত পথের পাঁচালীতে অপু যখন নিশ্চিন্তপুর ছেড়ে আসছিল প্রথম গ্রামের বাইরে, তখন রেললাইনের ধারে বাবা হরিহরকে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিল — ওগুলোকে তার বলে? ওর মধ্যে কিসের শব্দ?…. ‘একটা ছোট্ট খড়মের বউলের মত জিনিস টিপিয়া স্টেশনের বাবু খটখট শব্দ করিতেছে?’

সেই খড়মের বউল থেকে টরেটক্কা মেশিন হারিয়ে গেছে ২০১৩ সালের ১৫ই জুলাই।
সেই আমলে টেলিগ্রাম অমোঘভাবে জড়িয়ে ছিল প্রতিটি পরিবারের সুখ-দুঃখের গল্পের সঙ্গে। পোস্ট অফিসের উর্দিপরা পিয়ন যখন সাইকেলের ঘন্টা বাজিয়ে ‘টেলিগ্রাম টেলিগ্রাম’ বলে চেঁচাতো বা বাড়ির সদর দরজায় টোকা দিতো, অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠতো। হলুদ রঙের ছোট্ট একটা কাগজের উপর ছোট ছোট করে লেখা থাকতো জরুরি খবর — নয় বিষাদের, নয়তো আনন্দের।
বার্তা বহন নিয়ে মানুষের চিন্তা ভাবনা শুরু হয়েছিল যীশুখ্রীষ্টের জন্মেরও হাজার বছর আগে। গ্রিক সৈন্য বাহিনী ট্রয় দখল করে নিলে সম্রাট আগামেনন রানী ক্লাইটেমনেমস্টারের কাছে অগ্নি সংকেত মারফত ট্রয় বিজয়ের সংবাদ প্রেরণ করেন। এই বার্তাই সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম কমিউনিকেশন।
এরপর ১৭৭২ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় ক্লড চ্যাপ নামে এক ব্যক্তি আধুনিক এক সংকেত ব্যবস্থার ব্যবহার শুরু করেন — সেই যন্ত্রের নাম ছিল সেমাফোর টেলিগ্রাফ।

ভারতে সাংকেতিক বার্তা বহন প্রথম দেখা গেছে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে। সাম্রাজ্ঞী নুরজাহান ও জাহাঙ্গীর দিল্লি থেকে প্রায় কাশ্মীরের শালিমারে আসতেন প্রমোদ বিহারে। তাদের সাড়া পথ জুড়ে ছড়িয়েছিল স্তম্ভ। সেই স্তম্ভের মাথায় দামামা নিয়ে বসে থাকতো সংবাদপ্রেরকরা। রাজ দম্পতির আগমন বার্তা দামামা বাজিয়ে জানান দেওয়া হতো।
ভারতের টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা সূচনা হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্মচারী ২৪ বছর বয়সী এক আইরিশ ডাক্তার উইলিয়াম ব্রুক ও’শগনেসির (William Brooke O’Shaughn) হাত ধরে। তখন ভারতের গভর্নর ছিলেন লর্ড ডালহৌসি। ১৮৪৯ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে ও’শগনেসির লেখা প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, কলকাতার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে বাঁশের খুঁটির সাহায্যে ২১ মাইল লম্বা করে টেলিগ্রাফের তার পুঁতে প্রথম বার্তা প্রেরণে সফল হয়েছিলেন তিনি।
আর তার এই কাজকে সহযোগিতা করেছিলেন সামান্য লেখাপড়া জানা কলকাতারই এক বাইশ বছরের সুবর্ণবণিক যুবক—নাম শিবচন্দ্র নন্দী। ১৮৪৬-এ যুবক শিবচন্দ্র কলকাতার টাঁকশালের রিফাইনারি ডিপার্টমেন্টে যোগ দেন। তাঁর কারিগরি দক্ষতা তখনই ও’শনেসির নজরে পড়ে এবং শিবচন্দ্র হয়ে ওঠেন তাঁর দক্ষিণ হস্ত। ১৮৫১-য় কলকাতাতেই প্রথম ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত প্রায় ২৬ মাইল লাইন বসানো হয়েছিল এবং প্রথম ঐতিহাসিক বৈদ্যুতিক সমাচারটি শিবচন্দ্রই পাঠিয়েছিলেন। শিবচন্দ্রকে ভারতের প্রথম বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ লাইনের বার্তা প্রেরকের সম্মান জানানো হয়।
ইস্ট ব্যারাকপুর থেকে এলাহাবাদ, বেনারস থেকে মীর্জাপুর, মীর্জাপুর থেকে শিওনি এবং কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যস্ত ৯০০ মাইলটেলিগ্রাফ লাইন পাতার কাজ তদারকি করেছিলেন শিবচন্দ্র।

ডাক্তার উইলিয়াম ব্রুক ও’শগনেসি
কলকাতা থেকে ঢাকা অবধি লাইন স্থাপনের কাজের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি ছিল ভয়াবহ পদ্মার সঙ্গে পাঞ্জা কষা। মাটির উপর দিয়ে তার টানা নয়, পদ্মার জলের তলা দিয়ে ‘সাবমেরিন কেবল’ পাততে হবে। কোনো স্টিমার কোম্পানিই দশ হাজার টাকার কমে কাজে হাত দিতে রাজি নয়। শিবচন্দ্র শেষ পর্যস্ত জেলে ডিঙি ভাড়া করে ব্যক্তিগত তত্বাবধানে কৃতকার্য হলেন।
১৮৫৭ সালের ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় সিপাহী বিদ্রোহ। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার আগে ৪২৫০ মাইল টেলিগ্রাফ লাইন বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছিল। সংবাদ গ্রহণ ও প্রেরণের কেন্দ্র ছিল ৪৬টি। বিদ্রোহীরা ইংরেজদের সংযোগ ব্যবস্থা ছিন্ন করতে ৯১৮ মাইল টেলিগ্রাফের লাইন ধ্বংস করে।
লর্ড ক্যানিং তখন ভারতের গভর্নর। ১৮৫৭ সালের ১০ই মে সকাল আটটার সময় টেলিগ্রাফ এর মাধ্যমে মীরাট থেকে দিল্লিতে খবর আসে সেখানে ভারতীয় সিপাহীদের মধ্যে বিশেষ চঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। এমনকি উম্মত্ত সিপাহীদের হাতে দুজন ইংরেজ কর্মচারীও মারা গেছেন।
বিকাল বেলায় খবর আসার কথা ছিল দিল্লির টেলিগ্রাফ অফিসে। সকলে অপেক্ষা করতে থাকেন সেখানে কিন্তু তখনই টেলিগ্রাফের টরেটক্কা একবারেই নিঃশ্চুপ। লাইন পরীক্ষা করার জন্য টেলিগ্রাফ অফিসের টড সাহেব যমুনা নদীর ওপার পর্যন্ত চলে যান। সেখানে লুকিয়ে থাকা সিপাহী বিদ্রোহীদের হাতে নিষ্ঠুর ভাবে প্রাণ হারান টড সাহেব। তার খন্ড-বিখণ্ড রক্তাক্ত দেহ যমুনার জলে ভেসে যায়।

শিবচন্দ্র নন্দী
তাঁর মৃত্যুর সংবাদ যখন দিল্লির টেলিগ্রাম অফিসে এসে পৌঁছায় তখন সেখানকার ইংরেজ কর্মচারীরা টড পত্নী ও তার শিশু পুত্রকে নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে ফ্ল্যাগ স্টাফ টাওয়ারে গিয়ে আশ্রয় নেন। পালাবার আগে কিন্তু তারা বুদ্ধি করে আম্বালায় টেলিগ্রাফ এর মাধ্যমে সিপাহীদের বিদ্রোহের খবরটি পাঠিয়ে দিতে ভোলে না।
একটি মাত্র টেলিগ্রাম সবকিছু বদলে দিল। আম্বালা থেকে লাহোর রাওয়াল পেশোয়ারে এই খবর পৌঁছে গেল টেলিগ্রামের মাধ্যমে। ব্রিটিশশক্তি ভারতীয় সেনা ছাউনি থেকে বিদ্রোহীদের আতর্কিত আক্রমণ হওয়া থেকে আগে থেকেই সজাগ হতে পেরেছিল। সেদিন মূলত টেলিগ্রাফ এর সাহায্যে ইংরেজদের ধন, প্রাণ, সাম্রাজ্য রক্ষা পেয়েছিল।
আশির দশকেও দিল্লির কেন্দ্রীয় অফিস থেকে দিনে প্রায় লাখখানেক টেলিগ্রাম আসতো কলকাতায়। ইন্টারনেট আর মোবাইল পরিসেবা চালু হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করলো। ফ্যাক্স-ডেটা-কমিউনিকেশন-ভিডিও টেক্সট– এর কল্যাণে টেলিফোন বিভাগের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে লাগলো টেলিগ্রাফ বিভাগ। সূত্রের খবর শেষের দিকে পরিষেবা চালু রাখাতে বিএসএনএল-এর বাৎসরিক ৭৫ লক্ষ টাকা আয়ের জন্য খরচ হতো প্রায় ১০০ কোটি টাকা। পরিণামস্বরূপ টেলিগ্রাম তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। ক্রমশঃ হারিয়ে যায় সবুজ আদিগন্ত প্রসারিত ধানক্ষেতের বুকে সংবাদবহনকারী টেলিগ্রাফের লম্বা পোস্ট থেকে ঝুঁকে থাকা কোন ধাতব তার।
তথ্যসূত্র : “কলের শহর কলকাতা”— সিদ্ধার্থ ঘোষ এবং উইকিপিডিয়া।
আমরা হয়তো সেই শেষ প্রজন্ম যারা টেলিগ্রাফ দেখেছি, দেখেছি নম্বর বিহিন হাতে ঘুড়ানো টেলিফোন,, কলের গান শুনেছি, ক্যাসেট বাজিয়ে গান শুনেছি, দেখেছি ভিসিয়ার এ সিনেমা, কয়লার ইঞ্জিন চালিতো ট্রেনে উঠেছি, উঠেছি সুপার ফাস্ট ট্রেনে, বিমান হেলিকপ্টারে, ব্যাবহার করছি এন্ড্রুয়েট মোবাইল ফোন, জানিনা আরও কত কি দেখতে পাবো, আপনার সুন্দর লেখা মুগ্ধ করেছে হারিয়ে যাওয়া অতিতে ফিরিয়ে গেলাম কিছু সময়ের জন্য, ধন্যবাদ আপনাকে।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে❤️????।
আমার দাদুর মৃত্যু সংবাদ নিয়ে এক বিভ্রাট ঘটে গেছিলো আমাদের ঘরে। কত ঘটনা মনে পড়ে। কতগুলি ক্যাসেট আর টেপ রেকর্ডার এখনো স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য রেখেছি। পুরনো কথার জাবর কাটতে আমার তো খুব ভালো লাগে ????
অসাধারণ ! তথ্য সমৃদ্ধ চমৎকার প্রতিবেদন।
থ্যাঙ্ক ইউ ????❤️
লেখাটা খুব ভাল লাগল। আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুব সহজে এই লেখার সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে পারলাম। কারণ আমার স্বর্গত পিতৃদেব পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ বিভাগে কর্মসূত্রে টেলিগ্রাফের ব্যবহার জানতেন। ওই বিভাগে টরে, টক্কা শব্দের সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রেরিত হত। বাবাকে রাত বিরেতে বিভিন্ন সংস্থা ঘুম থেকে ডেকে তুলে তাঁদের জরুরী টেলিগ্রাফ পাঠাতে অনুরোধ করতেন। বাবা সাথে সাথে অফিস খুলে এই কাজটি করতেন। মজাটা হল অনেক বছর পরে তাঁর ছেলে অর্থাৎ আমিও এই যন্ত্রের সাহায্যে অনেক মেসেজ পাঠিয়েছি, রিসিভ করেছি। প ব পুলিশের বেতার বিভাগে কাজের সূত্রে আমিও ট্রেনিং নিয়েছিলাম আমাদের হেড কোয়ার্টারে। তবে বাবাদের সাথে আমাদের তফাত ছিল কোডে। আমাদের বিভাগে, জাহাজে এবং আর্মিতে ডিড আর ডা শব্দ দিয়ে মেসেজ পাঠানো হত মোর্স কোডে। এখন সব বিভাগেই এটা অবলুপ্ত হয়ে গেছে।
এত সুন্দর একটা মন্তব্য পেয়ে ভীষণ খুশি হলাম। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ????????
এতো তো জানতাম না। ধন্যবাদ আপনাকে এত সুন্দর তথ্য সমৃদ্ধ লেখনীর জন্য
খুব খুশি হলাম ????
অপরেশ লাহিড়ী*র অসাধারণ গান”র প্রথম অংশ “তারের ভাষায় সংকেতে টরে
টক্কা টরে” গানটি নস্টালজিক করলো,এই গানটি অনেক জলসায় গাইতে হয়েছে
শ্রোতাদের অনুরোধে* বাবা ঘরে আসার আগে টেলিগ্রাম করে জানাতেন কবে
আসছেন।ঘরের কাছেই পোস্ট অফিস ছিল মাঝে মাঝেই ছুটে যেতাম ঐ আশ্চর্য
টরেটক্কা মেশিনটিকে দেখতে আর শুনতে তার তার মধুর ধ্বনি সংকৃত।পরবর্তী
কালে খবরের কাগজে থাকাকালীন অনেক টেলিগ্রাম করেছি প্রায় প্রতিদিন খবর
পাঠাতে নির্ধারিত দরের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ কম দরে খবর পৌছে যেতো খবরের
কাগজের অফিসে ওখানেও এই বিশেষ মেশিনটি টরেটক্কা করে যেতো সর্বক্ষণ।
আপনি ইতিহাস লিখলেন টরেটক্কার পাঠক যারা দেখেননি শোনেননি এই মধুর
শব্দ ধ্বনি তারা অনুমান করবেন,যারা দেখেছেন তারা আমার মত নস্টালজিক
হবেন। পোস্টকার্ড,ইনল্যান্ড,মাখন রঙা খাম আর পোস্ট অফিস,ডাকবাক্স সব
হারিয়ে গেছে হারিয়ে গিয়ে ইতিহাস হচ্ছে। এখন আর কেউ কোনো নীল খামের
আশায় পোস্টম্যান”র পথ চেয়ে থাকেনা টেলিগ্রাম তো দুর* আপনি জানালেন
ভাবালেন আনমনা করলেন টরেটক্কা*র অনুপস্থিতির নিদারুণ সময়ে,করুন স্বরের
সুর ডাক দিলো বারান্দায়, লোহার গেটে ঝোলানো ডাকবাক্স অব্যবহারে ধ্বংস
প্রাপ্ত নিঃশ্চিহ্ন।কানে বাজছে “খবর এসেছে ঘর ভেঙ্গেছে দারুন ঝড়ে”!য়
ভালোলাগা ভালোবাসা।
Pradeep Biswas আপনার একটা সুন্দর মতামত আমাকে ঋদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করলো। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে শ্রদ্ধেয় ❤️????