আমাদের দেশে মানুষের গুণপনার নিরপেক্ষ বিচার হয় না। ডিগ্রি-ডিপ্লোমা দেখে, পেছনের মুরুব্বিকে দেখে, প্রচার দেখে আমরা গুণপনার বিচার করি। ‘ভারত ইতিহাসের ছেঁড়া পাতা’ বইটির পাণ্ডুলিপি দেখতে গিয়ে সে কথাই মনে এল। ‘দুর্বার কলম’ নামক এক লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক অমর নস্কর তাঁর পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছেপে যাচ্ছিলেন তপনকুমার ঘোষের লেখাটি। তারপরে সহায়সম্বলহীন অথচ দুঃসাহসী নস্করবাবু তপনবাবুর সেই লেখা বই আকারে প্রকাশ করবেন বলে ঠিক করলেন। এর মধ্যে অকালমৃত্যু হয়েছে তপনবাবুর। তপনবাবুর ছেলে-মেয়ে ও বড়দাদা স্বপন ঘোষ উৎসাহ দেখালেন, কিছু টাকাকড়িও জোগাড় করে দিলেন।
তপনবাবু আমাদের পাড়ার লোক। জানতাম তিনি বড় এক চা কোম্পানিতে নিষুক্ত ছিলেন টি টেস্টার হিসেবে। কিন্তু সেই তিনি যে ইতিহাসপ্রেমিক ছিলেন, ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু ছিলেন এ কথা আমার মতো তাঁর পরিবারের লোক বা বন্ধুরাও সম্ভবত জানতেন না। জীবিকা অর্জনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ভারতের নানাস্থানে ঘুরে বেড়াতেন। মনে হত ভ্রমণের টানেই ঘুরতেন তিনি। ঘুরছেন তিনি, কিন্তু সেটা ইতিহাস অনুসন্ধানের তাগিদে। তাঁকে টানছে ভারত ইতিহাসের মধ্যযুগ, মন্দির-মসজিদ-সৌধ-গম্বুজ-সমাধি-শিলালিপি। আর ঘোরার ফাঁকে ফাঁকে নিবিড়ভাবে পড়ছেন দলিল-দস্তাবেজ, বিভিন্ন ভ্রমণকারীর বিবরণ, নবীন-প্রবীণ ঐতিহাসিকের লেখা। চোখে পড়ছে প্রচলিত ইতিহাসের ভুল-ভ্রান্তি, পেয়ে যাচ্ছেন নতুন নতুন তথ্য।
কোন দায় কি ছিল তাঁর? না তো। ছাত্রদের পড়ানোর দায় ছিল না, সেমিনারের বক্তৃতা দেওয়ার দায় ছিল না, প্রকাশের তাগিদে উদ্বুদ্ধ হওয়ারও দায় ছিল না। তাহলে? এ দায় একেবারেই ভালোবাসার দায়। দেশকে জানার, দেশের প্রকৃত ইতিহাস জানার দায়। একেবারে অহৈতুকী। তাই অধ্যাপক বা ঐতিহাসিক না হয়েও তিনি ইতিহাসচর্চায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। নির্মোহ দৃষ্টিতে। মোট আটটি অধ্যায়ে সমাপ্ত এই অসমাপ্ত বই। অসমাপ্ত, কেননা গিয়াসুদ্দিন বলবনের মৃত্যু ও দাস রাজত্বের পতনের পর থেমে গেল তাঁর কলম। ততক্ষণে মরণের অমোঘ আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছেন নিজেকে।
মুসলমান আক্রমণকারীদের ধ্বংসলীলার বর্ণনা তিনি করেছেন, কিন্তু হিন্দুত্বের ধ্বজা ওড়ানোর চেষ্টা নেই। বলেছেন মুসলমান নবাবদের রাজ্য শাসনপ্রণালীর ইতিবাচক দিকের কথা। তাঁর মতে ভিনদেশি আক্রমণের জন্য ভারতের পটভূমি যেন তৈরি ছিল। আলাউদ্দিন খলজির দাক্ষিণাত্য বিজয়ের কথা ভাবা যাক। মালিক কাফুরের নেতৃত্বে আলাউদ্দিনের সৈন্যবাহিনী যখন দাক্ষিণাত্যের দিকে এগিয়ে চলেছে তখন পাণ্ড্য, হয়সালা, মাদুরার রাজারা ঐক্যবদ্ধ না হয়ে বিবাদ-বিসংবাদে মত্ত, এমন কি নিজেদের প্রতিপক্ষকে জব্দ করার জন্য বিদেশি শক্তির কাছে আত্মসমর্পণেও দ্বিধাহীন। একই কথা বলা চলে রাজপুতদের সম্বন্ধে। তপনবাবু লিখেছেন : —
“এরা সকলেই সাহসী। দুর্দান্ত বীর। এরা রাজপুত। এরা কেউ কারোর অনুগত নয়। অধীনতা শব্দ এদের অভিধানে নেই। কেউ কারো পরামর্শ নেন না। নিজের নিজের বুদ্ধিতে চলেন। অকুতো সাহস আর সীমাহীন দেমাক। সাহস দেখাতে গিয়ে যদি সবংশে খতম হয়ে যেতে হয় তাতেও আপত্তি নেই। ….দেমাক দেখাতে গিয়ে শ্বশুরের সামনে জামাই শত্রুর হাতে খুন হয়ে যায়, তাতেও শ্বশুরের মনে কোন রেখাপাত হয় না। পৃথ্বীরাজ চৌহান যখন মহম্মদ ঘোরির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে মারা পড়েন, তখন শ্বশুর জয়চাঁদের কিছু কি আসে যায় ?”
তুর্কি আগ্রাসনের ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের চালচিত্র, কুতুবউদ্দিন আইবক ভারতের প্রথম স্বাধীন সুলতান কি না, লক্ষণসেনের পরাজয়ের সত্যাসত্য, বিচারের মানদণ্ডে সুলতান মামুদ ও মহম্মদ ঘোরি, রাজপুতদের ব্যর্থতা ও মুসলমানদের সাফল্যের কারণ, রাজ্যশাসনে চাহলগনিদের ভূমিকা, কেন জয়দেব ও পদ্মাবতী লক্ষণসেনের রাজসভা পরিত্যাগ করেছিলেন, বল্লালসেনের পিতৃপিণ্ড যজ্ঞ, রাজস্থানের পদ্মিনী কাহিনি কতদূর ইতিহাস সম্মত, ভারতবর্ষে সুফি চিন্তাধারা ও চিস্তি সম্প্রদায় .ধর্মের গতি-প্রকৃতি ও দেব-দেবী ইত্যাদি বিষয়ে তপনবাবুর আলোচনা আমাদের নড়ে-চড়ে বসতে প্রেরণা দেয়।
তপন বাবুর এই রকম একটি মূল্যবান কাজকে (অসমাপ্ত) দুই মলাটে প্রকাশ করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করি এই বইটি ভারতের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অনেক নতুন বিষয় পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে সাহায্য করবে।