ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
তৃতীয় অধ্যায়
কোম্পানির ব্যবসায় বিকাশ এবং উন্নয়ন
ব্যবসা করার অধিকার অর্জনে সমস্যা এবং স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলায় ব্রিটিশেরা ব্যবসায়িক কুঠি এবং তাদের বসস্থানকে সুরক্ষিত করার যে ভাবনা সে ভেবে চলেছিল বেশ কিছু কাল ধরে, সে ভাবনা সফল হল সপ্তদশ শতাব্দের এক্কেবারে শেষের দিকে এসে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুর্ণাবর্তে। মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণার জমিদার শোভা সিংহ বিদ্রোহ করলেন ১৬৯৬ সালে, ওডিসা প্রধান আফগান রহিম খানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে। কিছু সময়ের জন্যে বাংলায় মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি নড়ে ওঠে (এই বিদ্রোহ এবং বাংলার ওপর তার সামগ্রিক প্রভাব বিষয়ে জানতে পড়ুন ও সি ৬২৩১, ৬২৭৯, ৬৩১১, ৫২ খণ্ড; ও সি ৬৪০৮, ৬৪২৫, ৬৪৮৫, ৫৩ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৬ খণ্ড, অংশ ১, ২০-২১, ৩৮-৪২, ৫৩-৫৪, ৫৯-৫৯, ৮১, ৮৩, ৮৬-৮৮; অংশ ২, ৩-৪, ৬, ১০, ১৭, ২৩-২৪, ৩২, ৩৫-৩৬, ৩৯, ৫৫, ৮৫)। শোভা সিংহের হ্যাঙ্গামের সুযোগে ব্রিটিশদের সামনে সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে দরবার করার সুযোগ খুলে গেল। প্রথম থেকেই কোম্পানি বুদ্ধি খাটিয়ে দুই যুযুধান পক্ষ থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখছিল, দুজনকেই বোঝাচ্ছিল সে তাদের দুজনেরই বন্ধু – যাতে রাজা তাদের সন্দেহ না করে আর নবাব তাদের বন্ধুত্বের জন্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে (ও সি, ৩০ সেপ্ট, ১৬৯৬, ৬২৭৯, ৫২ খণ্ড)। বিদ্রোহীদের বিপুল অগ্রগতি রোধ করল ডাচেরা। তারা ফরাসিদের মত সরাসরি মুঘল শাসকদের পাশে দাঁড়িয়ে বিদ্রোহীদের হুগলী ছাড়া করে। এর ফলে ডাচেরা, ফরাসীদের মত চুঁচুড়ায় নিজেদের দুর্গ বানিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নবাবের দরবার থেকে সহজেই সম্মতি জোগাড় করে ওম প্রকাশ বলেছেন (দ্য ইন্ডিয়ান ইকনমিক এন্ড সোসাল হিস্ট্রি রিভিউ, ৪ খণ্ড, ৩ নং, ১৯৬৭ সেপ্ট, ২৮৬) ডাচেদের সুরক্ষা কবচ তৈরি করার কোন সূত্র ডাচ মহাফেজখানায় পাওয়া যায় না। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বহু নথিতেই এই বিষয়ের উল্লেখ আছে, দেখুন ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৬, অংশ ১, ৪২; ওসি, ৫ ডিসে ১৬৯৬, ৬৩১১, ৫২ খণ্ড)। একইভাবে ডাচেদের দেখাদেখি এই গোলমালের সুযোগে ব্রিটিশ কোম্পানিও কলকাতার নিরাপত্তা সুদৃঢ় করে। ১৬৯৬ সালে কলকাতা কাউন্সিল লিখল, ‘দ্য নবাব হ্যাভিং গিভন লার্জ লিবার্টি ফর সিকিওরিং আওয়ারসেলভস এন্ড এফেকটস এগেনস্ট রাজা, উই থিঙ্ক উই নেভার হ্যাড সো ফেয়ার এন অপারচুনিটি এন্ড প্লি ফর বিল্ডিং আ ফর্টিফিকেশন এজ দিস এক্সিডেন্ট অকেসনড, আ ম্যাটার অব গ্রেট কন্সিকুয়েন্স এন্ড এগ্রিয়েবল ফর আওয়ার রাইট অনারেবল মাস্টার্স ইনক্লিনেশনস দ্য হুইচ মে বি ম্যানেজড উইদাউট এনি গ্রেট নয়েজ এন্ড বিল্ট ইন দ্য নেচার অব আ ফ্যাক্টরি বাট ইকুইভ্যালেন্ট টু আ স্টং ফোর্ট…’ (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৬, অংশ ১, ৪২)।
অবশ্যই ‘সাধারণভাবে সুরক্ষা’ দুর্গ বলতে যা বোঝায়, কোম্পানি সেটা যথাযথভাবে তৈরি করতে পারে নি। এর কারণ কুঠিয়াল ব্যখ্যা করে বলেছেন সরকার যে তাদের খুব বড় দুর্ভেদ্য দুর্গ বানাতে দেবে না সেটা তারা মনে করছিল। কিন্তু তারা ‘উইল এন্সার দ্য অনারেবল কোম্পানিজ এক্সপেক্টেশনস টু কিপ আস ফ্রম দ্য ফরমার এবিউজেস অব নবাব এন্ড ফৌজদারস অব বেঙ্গল, দেয়ার ব্লকিং আপ আওয়ার ফ্যাক্টোরিজ এন্ড ডিমান্ডিং আনরিজনেবল এন্ড আনলফুল সামস অব মানি ফ্রম আস’ (ঐ, অংশ ২, ৫৫)। সুরক্ষার যে কবচ তৈরি হল, তার পরে পরেই ১৬৯৮ সালে কোম্পানি সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং কলকাতা মিলিয়ে জমিদারির মালিক হয়ে বসল। যে জমিদারি কোম্পানিকে যথেষ্ট পরিমান রাজস্ব দিল এবং যশুয়া চাইল্ড যাকে ‘ফাউন্ডেশন অব পাওয়ার’ বলছেন, সেই ক্ষমতায় যাওয়ার ভিত্তিভূমি তৈরি করার সুযোগ করে দিল (ডিবি, ১২ ডিসে, ১৬৮৭, ৯১ খণ্ড, ৪৭২)।
কুঠিতে কিছুটা নিরাপত্তার বেড়া তৈরি করা গেলেও অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে কোম্পানি তাদের বাণিজ্যের ওপর স্থানীয় শাসকদের শ্যেন দৃষ্টি এড়াতে পারছিল না। আওরঙ্গজেব বহুকাল ধরেই পূর্ব পশ্চিম সাগরে ব্যবসায়ী জাহাজের ওপর আক্রমণ, এবং একই সঙ্গে সুরাট এবং মক্কাগামী তীর্থ যাত্রীদের ওপর জলদস্যুদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর দরবারে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ জানাচ্ছিলেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী আর প্রশাসকেরা এই দস্যুতার জন্যে সামগ্রিকভাবে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলিকেই দায়ি করছিল এবং বাড়তে থাকা তীর্থ যাত্রী বহরের সুরক্ষার জন্যে পাদসাহের কাছে নিরন্তর দরবার করছিলেন, আর পাদশাহও সমুপথে তীর্থ যাত্রীদের ওপর নামিয়ে আনা অত্যাচারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৭০১ সালে তিনি নির্দিষ্ট ফরমান জারি করে দেশের মাটিতে সব প্রকারের ইওরোপিয় ব্যবসা বন্ধ করে তাদের গ্রেফতার করার নির্দেশ জারি করলেন। এই ফরমান পেয়ে বাংলার প্রশাসন সব ধরণের হাতমেনদের (hatmen) ব্যবসা বন্ধ করে দেয় (ও সি, ২৪ ডিসে, ১৭০২, ৮০৯৭, ৬৫ খণ্ড)। ১৭০২ সালে কাশিমবাজার পাটনা এবং রাজমহলে পুরোনো কোম্পানির আমলাদের সব কিছু দখল করে নেয়। সব থেকে ঝামেলা হয় নতুন কোম্পানির, তাদের ৬২,০০০ টাকার বেশি ক্ষতি হল (ও সি, ৭৯৯৬, ৬৪ খণ্ড; হেজেসেস ডায়েরি, খণ্ড ২, ১০৫-৬; ব্রুস, প্রাগুক্ত, ৩ খণ্ড, ৫০৬)। পুরোনো কোম্পানি ৯ দিন ধরে সুরাট এবং পারস্যগামী মুসলমানদের জাহাজ আটকে রাখায় ‘হুগলীর ব্যবসায়ীরা এতই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে যে তারা ছুটে যায় সরকারের কাছে’। এই প্রতিনিধিত্বের প্রভাব পড়ল। সরকার তার ফরমান তুলে নিল (ও সি, ২৪ ডিসে, ১৭০২, ৮০৯৭, ৬৫)।
বাংলায় কোম্পানির ব্যবসা উন্নয়নের পঞ্জিকায় অষ্টাদশ শতকের প্রথম দুই দশক খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা ফারুখশিয়রের থেকে মাত্র ৩০০০ টাকার বাৎসরিক পেশকাশ দিয়ে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার অর্জন করে। বহুকাল ধরে ব্রিটিশেরা সারা দেশে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অধিকার লাভ করার উদ্দেশ্যে একটা সাধারণ ফরমান আদায় করার ব্যবস্থায় ছিল। ব্রিটিশদের মনোভাব আমরা শাহ আলমের খানইখানান জাউদি খানকে লেখা মাদ্রাজের গভর্নর পিটের চিঠি থেকে পাই। তিনি ব্রিটিশদের এই ধরণের অধিকার অর্জনের জন্যে তাদের পাশে দাঁড়ালেন। পিট লিখলেন বাংলায় তাদের কাছে সম্রাটের ফরমান আছে এবং নবাবের নিশান আছে এছাড়াও মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে শুল্কমুক্তির আদেশ হিসেবে বহু নবাবের পরওয়ানাও আছে। তবুও নানান জায়গায় তাদের কুঠির সামনে বাণিজ্য অবরোধ তৈরি করা হচ্ছে। তার আশা খুব তাড়াতাড়ি কোম্পানি এমন একটা ফরমান পাবে, যার বলে আগামী দিন সব ধরণের বাধাবিপত্তি উন্মুক্ত হবে যা ‘লেড গ্রেটলি টু দ্য অনার অব দ্য কিং এন্ড দ্য অগমেন্টেশন অব দ্য রিচেস অব দিস কান্ট্রি’ (হোম মিসলেনি, ৬৯ খণ্ড, ১৮৪)। শেষ পর্যন্ত ফারুখশিয়ারের দরবারে পাঠানো সুরমান দৌত্যের ফলে ১৭১৭ সালে ব্রিটিশরা চাহিদামত ফরমান পেতে সফল হয় (সুরমান দৈত্য সম্বন্ধে জানতে দেখুন হোম মিসলেনি, ৬৯-৭১ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস মিস্লেনিয়াস ১৯, ২০ খণ্ড। ফরমানের বিষয় জানতে দেখুন হোম মিসলেনিয়াস, ৬৯ খণ্ড, ১৩০-৩১; এস ভট্টাচার্য, দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এন্ড দ্য ইকনমি অব বেঙ্গল, ২৯; আবদুল করিম, মুর্শিদ কুলি খান এন্ড হিজ টাইমস, ১৬৬-৬৭)।
আমরা এস ভট্টাচার্যের গবেষণা করা মত মেনে নিচ্ছি না। উনি ১৭১৭র ফরমানকে অভিহিত করেছেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ব্যবসার ম্যাগনা কার্টা বা মুক্ত বাণিজ্যের সনদ হিসেবে (এস ভট্টাচার্য, প্রাগুক্ত, ২৯)। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ফরমানটা কাগজে কলমে ব্রিটিশ ব্যবসায় বেশ কয়েকটা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দিয়েছিল — বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসনিক আমলারা ফরমানের অভাবে ব্রিটিশ দাবির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছে। ব্রিটিশদের বড় লাভ হয়েছিল বাৎসরিক মাত্র ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে সারা ভারতবর্ষে ব্যবসা উপযোগী একটা ফরমানের মত অন্তত একটা কাগজ হাতে থাকা যা দেখিয়ে তারা শুল্ক ছাড়ে ব্যবসা করতে পারে। এর আগে কোনও শাহী ফরমান ব্রিটিশদের এ ধরণের ব্যবসার স্বাধীনতা দেয় নি, যদিও ঘুষ উপঢৌকনের বিনিময়ে বিভিন্ন সুবাদারের দেওয়া নিশান, পরওয়ানা ইত্যাদি নিয়ে তারা বিভিন্ন অঞ্চলে শুল্কমুক্ত ব্যবসা করছিল। তবে এই ফরমানেরও বয়ান খুবই অস্পষ্ট, তাদের কি ধরণের ব্যবসা শুল্কমুক্ত হবে তার কথা বলা নেই। কিন্তু মুল প্রেক্ষিত এবং ফরমানের উদ্দেশ্য বিচার করলে বোঝা যাবে এই শুল্কমুক্তি শুধু কোম্পানির আমদানি রপ্তানি ব্যবসার জন্যে সত্য, কোম্পানির দেশিয় ব্যবসার জন্যে আর কোম্পানির আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্যে প্রযুক্ত নয়।
এস ভট্টাচার্য যে লিখেছেন যে এটা স্থানীয় প্রশাসনের হাতে নিগৃহীত না হয়ে, কোম্পানি এবং কোম্পানি কর্মচারীদের জন্যে উন্মুক্ত ব্যবসার স্বাধীনতা তৈরি করেছিল, বা তল্লাসির বিরুদ্ধে এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে, এবং তারা এই ফরমানের মাধ্যমে অতিরাষ্ট্রীয় (এক্সট্রাটেরিটোরিয়াল) সুযোগ পেয়েছিল এই কথাটা বলা যথেষ্ট রকমের বাড়াবাড়ি (ঐ, ২৯)। কোম্পানির আমলারা অত্যাচার এবং উতপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়েছিল, যা আবদুল করিমেরও দাবি, সেটাকে অধিকার কিভাবে বলা যায় আর সেটাকে কিভাবে অতিরাষ্ট্রীয় অধিকারও বলা যায় জানি না (আবদুল করিম, প্রাগুক্ত, ১৬৯)। তল্লাসি থেকে মুক্তি পাওয়াকে যদি বলার কোনও সামান্য ইঙ্গিত, এইরকম কোন লব্জ ফরমানে বা হাসবুলহুকুমে (শাহী নির্দেশ) উল্লিখিত হয় নি। কোম্পানির হাত থেকে পালিয়ে যাওয়া ঋণীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এটা পরিষ্কার সেটা শুধু তার কর্মচারীদের ওপরেই প্রযোজ্য ছিল — কোম্পানিদের সঙ্গে কাজ করা ব্যবসায়ী বা তাঁতি, যারা কোম্পানির চাকুরে নয়, তাদের ওপরে কোম্পানি গ্রেফতারের অধিকারই প্রয়োগ করতে পারত না। আমরা যদি ফরমানের না বলা অংশটার দিকে নজর দিই, তাহলে দেখব সেখানে মার্চেন্ট-উইভার্স আর কোম্পানি সার্ভেন্টদের মধ্যে স্পষ্ট ভাগ করা হচ্ছে। মার্চেন্ট-উইভারসেরা যদি ঋণী হয় তাহলে ফরমান বলছে তারা খাতায়কলমে কুঠিয়ালদের যা প্রাপ্য তাই শুধু শোধ করবে। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারী যদি ঋণী হয় তাহলে তাকে কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হবে। ফরমানে কোথাও কোম্পানির দেশিয় আর ইওরোপিয় কর্মচারীর মধ্যে পার্থক্য করা হয় নি। দেশিয় চাকুরে যদি ঋণী হয় তাকে কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হবে। এটা খুবই সাধারণতম অধিকার, অতিরাষ্ট্রীয় অধিকার বলা অতিরঞ্জিত হবে, কারণ অন্য সব ঝামেলাতেই কোম্পানির দেশিয় কর্মচারীর মুঘল আইনে বিচার হবে। (চলবে)