ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
তৃতীয় অধ্যায়
কোম্পানির ব্যবসায় বিকাশ এবং উন্নয়ন
কুঠির (ফ্যাক্টরি) ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ
কোম্পানির ব্যবসা কাঠামো আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি আমরা তাদের কুঠি বা ফ্যাক্টরি ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা না করি। পঞ্চাশের দশকের প্রথম পাদ পর্যন্ত কোম্পানি বাংলায় দুটো কুঠি চালাত একটা হুগলী এবং অন্যটা বালেশ্বরে। দুটোই বন্দর শহর। ব্যবসা মোট মূল্যে এবং বৈচিত্রে বাড়তে থাকল কোম্পানির মনে হল বাংলায় আরও কয়েকটা কুঠি তৈরি করা যাক। ১৬৫৮ সালে কাশিমবাজারে রেশম, এবং রেশম বস্ত্র কেনার জন্যে কুঠি তৈরি করল কোম্পানি (ও সি, ২৬৭৩, ২৬৮৫, ২৬৯১, খণ্ড ২৫; ১৬৫৩ এবং ১৬৫৪ সূত্রে পাচ্ছি কুঠি তৈরি করার জন্যে মধ্যস্থ নিয়োগ করা হয়, দেখুন ও সি, ২৪৩৫, ২৪ খণ্ড)। পরের বছর পাটনায় কুঠি তৈরি করা হয় সোরা কেনার উদ্দেশ্যে (ও সি, ২৬৯০, ২৫ খণ্ড)। ১৬৬৮ সালে ঢাকায় কুঠি তৈরি হয়।
সপ্তদশ শতকের ষাটের দশক থেকে কোম্পানি বাংলায় নতুন কুঠি তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। খরচ কমাতে হুগলী ছাড়া সমুদ্র তীরবর্তী যত কুঠি ছিল সব বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬৬৩ সালে কর্তারা লিখলেন, বালেশ্বর কুঠি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে কেননা এর প্রয়োজনীয়তা নেই; আর কাশিমবাজার কুঠিও বন্ধ করা দরকার কারণ কাশিমবাজার থেকে তাফেতা কিনে লন্ডনে বিক্রি করে লাভ করা যাচ্ছে না। এছাড়াও পাটনায় কোম্পানির স্থায়ী প্রতিনিধি, রেসিডেন্ট নিয়োগ করা হয়েছে, তাকে তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করার কথা ভাবা হল কারণ সোরা উতপাদন মূলত মরশুমী প্রক্রিয়া। সোরা তৈরির মরশুমে যে কোন কুঠি থেকে কুঠিয়াল পাঠিয়ে সোরা জোগাড় করা সম্ভব — তাই পাটনায় বছরভর স্থায়ী প্রতিনিধি রাখার প্রয়োজন নেই (ডি বি ১৬ ডিসে, ১৬৬৩ম ৮৬ খণ্ড, ৩৪৪)। পরের বছর লন্ডনের কর্তারা জানাল বাংলার কুঠিয়ালেরা যে ধরণের গুণমানের তাফেতা, সানোস, গিগঘ্যাম পাঠাচ্ছে সে সব লন্ডনের বাজারে বিক্রি করে যা লাভ হচ্ছে, সেই অর্থ বিনিয়োগ করে বিপুল খরুচে সমুদ্র বাণিজ্য চালানো সম্ভব নয় (ডি বি, ২১ ডিসেম্বর, ৮৬ খণ্ড, ৪৫৮)।
বাংলার কুঠির সংখ্যা কমানোর প্রস্তাবের উত্তরে বাংলার কুঠিয়ালেরা লিখল পাটনা আর কাশিমবাজারের কুঠি বন্ধ করে দিলে এই দুই ধরণের দ্রব্য সোরা আর রেশম বস্ত্রের বাণিজ্য মার খাবে। প্রত্যেক বছরে পণ্য কেনার জন্যে শর্তা সাপেক্ষে অগ্রিম অর্থ বিনিয়োগ করা হয় এবং সারা বছরভর সে সব পণ্য কুঠির গুদামে কিস্তিতে কিস্তিতে আসতে থাকে বিভিন্ন আড়ং থেকে। বেঙ্গল কাউন্সিল লন্ডনের কর্তাদের লিখল, প্রত্যেক বছর বিভিন্ন অঞ্চলে কুঠিয়াল পাঠিয়ে যে সব মরশুমি পণ্য কেনার কর্তাদের প্রস্তাব বাংলায় ব্যবসা চালাবার জন্যে যথেষ্ট নয়; এবং একটামাত্র হুগলী কুঠির পক্ষে বাংলা জুড়ে বিপুল পরিমান পণ্য কেনা বাস্তবসম্মতও নয়, কারণ সারা বছর পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না, এবং অগ্রিম না দিলে পণ্যের দামও বেড়ে যায় (ও সি, ১ সেপ্ট, ১৬৬৯, ৩০৬৯, ২৯ খণ্ড)।
বাংলার কোম্পানির ব্যবসা কাঠামোয় বিভিন্ন কুঠির প্রতিবছর বিনিয়োগ এবং তাদের তুলনামূলক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা জরুরি। ১৬৬৪ সালে বেঙ্গল জেনারেল লেটারে নানান পণ্য তালিকা পাচ্ছি যা বাংলা অঞ্চল থেকে জোগাড় করা হয়েছিল, সেগুলি ইওরোপগামী জাহাজে তোলার পরেও অন্তত দুয়ের তিন অংশ এদেশেই থেকে গেল — হ্যাভিং আ হোল স্টক, এট লিস্ট টুথার্ড লেফট ইন দ্য কান্ট্রি (Having a whole stock, at least two-thirds left in the country)।
বালেশ্বর
গিগহ্যাম ৬০০০টি @ ৮০টাকা প্রতি কর্জ (corge) ২৪,০০০টাকা
সুতো ৫০০ মন @ ১৬ টাকা প্রতি মন ৮,০০০টাকা
স্টিকল্যাক ঐ @ ৪ টাকা প্রতি মন ২,০০০ টাকা
সানোস ৬,০০০টি @ ৮০ টাকা প্রতি কর্জ (corge) ২৪,০০০টাকা
কড়ি ৯০০ মন @১০ টাকা প্রতি মন ৯,০০০ টাকা
হুগলী
খাসা ৫,০০০টি @ ৪-৮টাকা/পিস ৩০,০০০টাকা
সালাম্পোর বা সানোস ৪০০০ @ ৩-৪ টাকা ১৬,০০০ টাকা
সানোস ৫,০০০ @ ৩-৪ টাকা ২০,০০০ টাকা
ঢাকা
খাসা ৮,০০০ পিস @ ৪-১০ টাকা ৫৬,০০০টাকা
সানোস ৫,০০০ পিস @ ৪-৮ টাকা ৩০,০০০ টাকা
হামহাম ২,০০০ পিস @ ৬-১২ টাকা ১৮,০০০টাকা
কাশিমবাজার
তাফেতা ১০০০ পিস, @১২ টাকা ১২০০০ টাকা
ঐ মিহি ৫০০০ পিস @ ৯টাকা ৪৫০০০ টাকা
ঐ সাধারণ রেশম ১৫০০০ @৪-৪.৫ টাকা ৬৭৫০০ টাকা
রেশম কি ধরণের মিহিত্ব এবং পরিমান দরকার জানান
পাটনা
সোরা দুবার ফোটানো, ২০,০০০ মন ২.৫ টাকা প্রতি মন ধরে ৫০,০০০ টাকা
বাফতা আম্বারতি প্রচুর পরিমানে (এই চিঠির শেষে লেখা ছিল এই দামগুলি বছরের মরশুম শুরুর দাম। জাহাজ আসার পরে যদি এই পণ্যগুলি কেনা হয় তাহলে এর দাম ৩০-৪০ শতাংশ বাড়বে, দেখুন ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস মিসলেনি, ৩ খণ্ড, ৪৫-৪৬; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১; কনসালাটেন্সি, ২০ জুন ১৬৬৩)।
কর্তাদের ঢাকা থেকে ইওরোপের বাজারের জন্যে কাপড় কেনার উদ্দেশ্যে, সেখানে কুঠি তৈরির পরিকল্পনা ছিল না। ১৬৬৪ সালে বাংলায় এজেন্ট লন্ডনে প্রশ্ন করেন, ঢাকায় কোম্পানি কোন বিনিয়োগ করতে পারেন কি না। লন্ডনের কর্তারা জানায় সেটা সম্ভব যদি তারা একটা নির্দিষ্ট পরিমানে ব্রড ক্লথ এবং অন্যান্য ব্রিটিশ উতপাদন সেখানে বিক্রি করতে পারে, সেটা যদি সম্ভব হয় তাহলে সেখানে কুঠি তৈরি করতে ‘আমরা উতসাহিতও হব, তোমাদের কুঠি তৈরি করার নির্দেশ দেব’। আমাদের আলোচ্য সময় জুড়ে কোম্পানির বড় সমস্যা ছিল বাংলায় তাদের আমদানি করা পণ্যের খুব কম এবং ছোট বাজার, অর্থাৎ লন্ডনে তৈরি করা পণ্যের বাংলায় ক্রেতা ছিল না বললেই চলে। ফলে কোম্পানি যত বাংলা থেকে রপ্তানির বাড়াতে থাকে, তার বাংলার পণ্য কিনতে বিপুল পরিমানে দামি ধাতু এবং ধাতব মুদ্রা বাজারে বিনিময় দ্রব্য হিসেবে আনতে হয়েছে। ইতিমধ্যে লন্ডনের কর্তাদের জানাল হল, আআসা করা যাচ্ছে ঢাকার কুঠি বেশ ভাল পরিমানে ব্রিটিশ পণ্য বিক্রি করতে পারবে এবং মিহি কষা আর মলমল বিপুল পরিমানে ঢাকা কিনতে পারবে, লন্ডনের কর্তারা ঢাকায় কুঠি খোলার জন্যে সবুজ সংকেত দিলেন। লন্ডনের কর্তাদের আশা ছিল, ঢাকায় যদি বেশ ভাল অঙ্কের লন্ডনের উৎপন্ন বিক্রি করা যায়, তাহলে ঢাকাই নিজের খরচ নিজেই তুলে নিতে পারবে (ডি বি, ৪ জানু, ১৬৬৮, ৮৭ খণ্ড, ১২৩)।
১৬৬০ সালে কোর্ট অব ডিরেক্টরেরা সিদ্ধান্ত নিল এত দিন যে সব জাহাজ শুধু বালেশ্বর পর্যন্ত যাচ্ছিল, সে সব জাহাজ এবার হুগলী বন্দর পর্যন্ত উজিয়ে যাবে। ডাচ কোম্পানি তাদের জাহাজ হুগলী পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে পণ্য নামানো বা ইওরোপে পাঠানোর জন্যে জাহাজ ভর্তির কাজ করলেও ব্রিটিশ জাহাজগুলি হুগলিতে যেত না, থেকে যেত বালেশ্বর বন্দরেই। ব্রিটিশেরা সব কটা কুঠির জোগাড় করা পণ্য হুগলী পর্যন্ত নিয়ে আসত, তারপরে এগুলি তারা স্লুপ [ছোট নৌকো] করে বালেশ্বরে এনে সমুদ্রে নোঙর করা ইওরোপগামী জাহাজে তুলত। এইভাবেই কোম্পানি যে সব পণ্য আমদানি করত, সেগুলি তারা বালেশ্বর অবদি নিয়ে এসে, সেখানে নামিয়ে, ছোট ছোট স্লুপ নৌকো করে হুগলী পর্যন্ত নিয়ে এসে বিভিন্ন কুঠিতে ভাগ করে দিত। মোটামুটি সাতের দশক পর্যন্ত হুগলীকে ব্রিটিশেরা শুধু গুদাম হিসেবে ব্যবহার করত। ফলে বাংলার পণ্য বালেশ্বরে নিয়ে গিয়ে ইওরোপের দিকে ফিরতি জাহাজে চাড়ানোর কাজ করতে অনাবশ্যক দেরি হত। আর এ সব ছোট নৌকো বা জাহাজ পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেসব নৌকো ভর্তি পণ্য অনেক সময় হারিয়েও যেত (ডি বি, ২১ ডিসে, ১৬৬৪, ৮৬ খণ্ড, ৪৫৮)। এছাড়া কোম্পানির নিজস্ব বা ভাড়া করা নৌকো কিছু সময়ের জন্যে দখল নিত ফৌজদারেরা তাদের নিজেদের ব্যবসার পণ্য সরবরাহের জন্যে। ফলে নৌকোর বহর থাকলেই যে খুব তাড়তাড়ি মাল আদান-প্রদান সবসময়েই সম্ভব হয়ে উঠত না। ১৬৬৫ সালে মাদ্রাজ কাউন্সিলকে পাঠানো চিঠিতে হুগলীর কুঠিয়ালেরা লিখলেন, সুবাদার তার নুনের ব্যবসার জন্যে কোম্পানি নৌকা হুকুম দখল করায় পণ্য পরিবহনে বিপুল সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তাদের যুক্তি ছিল বাংলার উদ্দেশ্যে আসা জাহাজগুলি যদি বালেশ্বর থেকে আরেকটু দূরে হুগলী চলে আসে তাহলে এই সব সমস্যা আপসেই উপে যাবে (ও সি, ১ সেপ্টম্বর, ১৬৬৫, ৩০৬৯, ২৯ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৬৫-৬৭, ১৩৮-৩৯)। (চলবে)