ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
তৃতীয় অধ্যায়
কোম্পানির ব্যবসায় বিকাশ এবং উন্নয়ন
কুঠির (ফ্যাক্টরি) ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণ
হুগলী বন্দরে আসা প্রথম ব্রিটিশ জাহাজের নাম লায়োনেস। ১৬৫০ সালে এটিকে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। কিন্তু মাদ্রাজের এজেন্টরা হুগলী অবদি সমস্যাসঙ্কুল জলপথে জাহাজ এবং যাত্রী নিরাপত্তা বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন বলে লায়োনেসকে হুগলীতে না পাঠিয়ে বালেশ্বর রোডেই যাত্রা শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয় (ও সি, ১৮ জানু, ১৬৫১, ২২০০, ২২ খণ্ড)। লন্ডনের কর্তারা বাংলার কুঠিয়ালদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, জাহাজের পণ্য বালেশ্বরে খালাস না করিয়ে হুগলী অবদি যেন নিয়ে আসা যায়, তাতে ব্যবসায় কিছুটা হলেও শালীনতা আসে। উৎসাহ ভাড়া হিসেবে ১৬৬৩-তে টন পিছু ১০ শিলিং অতিরিক্ত মাশুল পণ্য বহনের খরচ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হলেও, জাহাজ মালিক আর জাহাজের ক্যাপ্টেন এই প্রস্তাব মানেন নি (ডি বি ৩১ ডিসে, ১৬৬, ৮৬ খণ্ড, ১৮১ জানু ১৬৬৩, ৮৬ খণ্ড, ২০৩; ২১ ডিসে, ১৬৬৪, ৮৬ খণ্ড, ৪৫৮; ইএফআই, ১৬৬১-৬৪, ২৯০-৯১; স্টিভেন, দ্য পোর্ট অব ক্যালটুকরো, জার্নাল অব সোসাইটি অব আর্টস, ৪৭ নম্বর, ৬৩৫; এ কে রায়, আ শর্ট হিস্ট্রি অব ক্যালটুকরো, এনাস অব ইন্ডিয়া, ১৯০১, খণ্ড ৭, অংশ ১, ১১৩)। ৬০০ টনের ডাচ জাহাজকে নদীতে নিয়মিত চলাচল করতে দেখে, জনৈক ক্যাটেন এলিয়ট জানায় সে জাহাজগুলিকে আপন দায়িত্বে হুগলীতে নিয়ে আসতে ইচ্ছুক ছিল, কিন্তু এজেন্ট ত্রেভিষা তার উতসাহে জল ঢেলে দেয়। কর্তাদের দুঃখ দিয়ে ত্রেভিষার বলল হুগলী পর্যন্ত আসার পথ এবং হুগলীতে পণ্য খালাস করার কাজ উভই সমস্যা সঙ্কুল। অথচ ক্যপ্টেন লিখিতভাবে আবেদন করে নদীপথ দিয়ে যাওয়া আসা করা খুব কিছু কঠিন নয়, তাই ভবিষ্যতের জাহাজগুলিকে বালেশ্বর না রেখে, সরাসরি হুগলীতে নিয়ে আসা যেতে পারে।
এই পরিকল্পনা লন্ডনের কর্তারা বহুকাল ধরে কুঠিয়ালদের বলে আসছে, এবং এটাই তাদের কাউন্সিলের বহুকালের ইচ্ছে, এবং এবার থেকে বাংলা কাউন্সিল এই পরিকল্পনা নীতিগতভাবে পালনীয় বলে স্বীকার করল (ডি বি ২ জানু, ১৬৬২ ৮৬ খণ্ড, ২০২-৩; ও সি, ১১ সেপ্ট, ১৬৬৯, ৩৩৪৪, ৯-১০, ৩০ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, ফোর্ট সেন্ট জর্জ, ১৪ খণ্ড, ১৭৭)। ডায়রেক্টরেরা নতুনভাবে প্রস্তাব করলেও তখনও বিষয়টার সমাধান সূত্র বেরোল না। স্থানীয় এজেন্ট জানত বালেশ্বরে পণ্য খালাস হলে তার সুবিধেগুলো, সে হুগলীতে আসা জাহাজকে পথ দেখিয়ে আনতে মাঝি পাঠাল না তার যুক্তি হাতে যথাযোগ্য নাবিক ছিল না। মধ্যস্থরা বলল স্থানীয় পথ দেখানো মাঝি ভাড়া করা খুবই খরচ সাপেক্ষ বিষয়; জাহাজের মালিকেরা যথাযোগ্য মাঝির দিক নির্দেশ ছাড়া বা নদীর ‘ডেপথস এন্ড সাউন্ডিং’ মানচিত্র ছাড়া হুগলী পর্যন্ত জাহাজ ঢুকিয়ে বিপদে পড়তে রাজি ছিল না। কর্তারা স্পষ্ট বুঝলেন যতদিন বালেশ্বর থেকে আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা রমরম করে চলবে, যত দিন জাহাজ ব্যবসার সঙ্গে জুড়ে থাকা কমান্ডারেরা সেই ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থের সঙ্গে জুড়ে থাকবেন, ততদিন জাহাজকে হুগলীতে নিয়ে যাওয়া যাবে না (ডি বি, ১২ ডিসে, ১৬৭৭, ৮৮ খণ্ড, ৫১৬)। ১৬৬৭ সালে কোর্ট উদ্যোগী হয়ে ছোট ৬০ টনের জাহাজ তৈরি করায়। এর নাম দেয় ডিলিজেন্স। উদ্দেশ্য হগলী পর্যন্ত নদী সমীক্ষা। ছজন শিক্ষা নবিশীকে হুগলী নদী ধরে বড় জাহাজকে পথ দেখিয়ে আনার পাইলট শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হুগলীতে পাঠানো হল (ডি বি, ২৪ জানু ১৬৬৮, খণ্ড ৮৭, ১২০-২১; ২০ নভে, ১৬৬৮, ৮৭ খণ্ড, ২০২-৩)। একই সঙ্গে জাহাজের মালিকদের উৎসাহ দিতে ১৬৭১ সালে হুগলীতে পণ্য বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রতি টন পরিবহন শুল্ক ২০ শিলিং করে বাড়ানো হয় (ডি বি, ১৮ ডিএ, ১৬৭১, ৮৭ খণ্ড, ৫০৮)।
নতুন নীতিতে নদীপথ পরিবহনে জোয়ার এল। ১৬৭২ সালে জাহাজ হুগলী পর্যন্ত নদীপথ ধরে যাবে, লন্ডনের কর্তাদের নীতি কার্যকরে হল। প্রধান পাইলট স্যামুয়েল হ্যাকনের নেতৃত্বে ২০০টনের পণ্যবাহী জাহাজ রেবেকাকে ৬০ টনের স্লুপ ডিলিজেন্স সফলভাবে হগলী নদী বেয়ে হুগলী বন্দর পর্যন্ত রাস্তা দেখানোয় সফলভাবে হুগলী বন্দরে এসে পৌঁছয় এবং পণ্য নিয়ে ফিরেও যায় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ৭ খণ্ড, অংশ ১, ৫২; ইএফআই, নতুন সিরিজ, ২ খণ্ড, ৩৪২)। তবুও বিষয়টা নিয়ে সড়গড় হতে, জাহাজে হুগলী বন্দর থেকে নিয়মিতভাবে বড় জাহাজে পণ্য বোঝাই করার কাজ করতে আরও কয়েক বছর লেগে যায়। ১৬৭৬ সালে ওয়াল্টার ক্লাভেল হুগলী সংক্রান্ত ব্যবসা সমীক্ষায় বললেন শিক্ষিত পথ দেখানে নদী পথ কর্মী তৈরি করা প্রয়োজন যাতে কোম্পানি জাহাজ হুগলী অবদি আনা যায়, তার ফলে বালেশ্বরে ট্রান্সশিপমেন্ট করা দরকার হবে না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস মিসলেনি, ১৪ খণ্ড, ৩২০-২১, ইএফআই, নিউ ইরিজ, ২ খণ্ড, ৮২-৮৩)। ১৬৭৮ সালে ফ্যালকন নামক জাহাজ এরাইভ্যাল নামক স্লুপের পথ দেখানো অনুসরণ করে ৪০,০০০ পাউণ্ডের দামি ধাতু এবং পণ্য নিয়ে হুগলীতে ঢোকে।
অথচ উইলিয়ামসন, ন্যাথানিয়েল এবং সোসাইটি নামক তিনটে জাহাজ ঐ বছরই জানায় তাদের কাছে মালিক পক্ষের নির্দেশনা না থাকায় তারা বালেশ্বরে দাঁড়িয়ে মাল খালাস করবে। কোম্পানির নীতি অনুসরণ করে বাংলা কাউন্সিল এই জাহজগুলোকে হুগলী পর্যন্ত আসার অনুরোধ জানায়। তিন জাহাজের কমান্ডার স্লুপ বাহিত হয়ে হুগলী বন্দর পর্যন্ত আসে এবং নদীর নাব্যতা দেখে খুশি হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ৭ খণ্ড, অং ১, ১১১-১৫; ইএফআই, নতুন সিরিজ, ৪ খণ্ড, ১৬৬-৬৭; ডি বি, ১ ডিসে, ১৬৭৭, ৮৮ খণ্ড, ৫২২)। আটের দশক পর থেকে কোম্পানি জাহাজগুলি বালেশ্বরে না দাঁড়িয়ে সরাসরি হুগলীতে এসে তাদের নিত্যকর্ম সমাধা করত। জাহাজ নিয়ে হুগলী পর্যন্ত উজিয়ে আসা ব্রিটিশদের শেষ অবদি বেশ সুবিধেই করে দিয়েছিল কারণ ‘এর পর থেকে তারা ব্রিটিশ নানান পণ্য সরাসরি হুগলী অবধি নিয়ে এসে দেশের নগর ও শহরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ত এবং উল্টোদিকে অন্য অঞ্চলের কেনা মালামাল খুব সহজেই জাহাজে করে এখানে চলে আসতে পারত’ (বাউরি, প্রাগুক্ত, ১৬৬-৬৭)।
কোম্পানিকে মালদায় কুঠি খুলতেই হল বাড়তে থাকা ক্যালিকো চাহিদা মেটানোর জন্যে। ১৬৭৬ সালে মালদায় কুঠি তৈরি হয় স্ট্রেশ্যাম মাস্টারের ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টির ফলে। স্ট্রেশ্যাম মাস্টারকে বাংলায় পাঠানো হয়েছিল এই অঞ্চলের কুঠিগুলর ব্যবস্থাপনা করার জন্যে। কয়েকজন কোম্পানির আমলাকে তাদের অবসর সময়ে রাজমহলে পাঠানো হয়েছিল সরকার টাঁকশালে কিভাবে কোম্পানির আনা রূপো, মুদ্রায় রূপান্তরিত হচ্ছে সেই কাজ দেখার জন্যে। তারা সেখানে অবসর সময়ে রাজমহলের আশেপাশের এলাকায় ঘোরাঘুরি করতেন। তাদের সমীক্ষায় জানাগেল ‘গঙ্গার অন্যপাড়ে মালদা শহরে ডাচ কোময়ানি কুঠি তৈরির উদ্যম নিয়েছে’। এখানে বিপুল পরিমানে মোটা সুতির কাপড় পাওয়া যায় যে কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে ইওরোপের বাজারে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনি, খণ্ড ১৪, ১৩৫-৩৬, মাস্টার্স ডায়েরি, খণ্ড ১, ৩৯৮; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, কনসাল্ট্যান, ১৪ অক্টো ১৬৭৬)। স্ট্রেশ্যাম মাস্টার কর্মচারীদের পাঠানো সমীক্ষার তথ্য মন দিয়ে পড়ে বুঝলেন, তাকে এখানে যে সব শর্ত দিয়ে পাঠানো হয়েছিল তার মধ্যে একটা ছিল যে সব পণ্য তখনও ইংলন্ডের বাজারে যেত না, সেই সব পণ্যের নমুনা কিনে নিয়ে যাওয়ার জন্যে (মাস্তার্স ডায়েরি, খণ্ড ১, ২০৪-১৬, ডি বি, ৮৮ খণ্ড, ২৮৭, ৩৯৮-৯৯)।
তিনি প্রস্তাব দিলেন বেশ কিছু হাজার টাকা বিনিয়োগ করে এখান থেকে নানান ধরণের কাপড়ের নমুনা কিনে সেগুলি কোম্পানির সদর দপ্তরে পাঠিয়ে তাদের মন্তব্যের জন্যে অপেক্ষা করতে। কোম্পানির দামি ধাতুর বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত রিচার্ড এডওয়ার্ডস রাজমহলেই যাচ্ছিলেন, মাস্টার তাকে বললেন মালদা অঞ্চলের কাপড়ের ব্যবসা নিয়ে খোঁজ খবর করে সেই তথ্য কাউন্সিলকে জানিয়ে দিতে। তার মনে হল এই প্রস্তাব কাউন্সিল বিচার করে মালদা অঞ্চলে কুঠি খোলারও সিদ্ধান্ত নিতে পারে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনি, ১৪ খণ্ড, ৩৩৪-৩৭; মাস্টার্স ডায়েরি, খণ্ড ১, ৩৯৮-৯৯)। মালদা থেকে টাঁকশালের দূরত্ব খুব কম এবং এই স্থান নির্বাচন কাউন্সিলের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়াল। এর সঙ্গে জায়গাটা যদি ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হয়, তাহলে এখন যত রূপোর বাট সরাসরি রাজমহলে পাঠানো হচ্ছে, তখন সেগুলি মালদার কুঠিতে প্রাথমিকভাবে পাঠিয়ে যথোচিত সুরক্ষা দিয়ে রাখা যাবে, যতক্ষণনা এগুলি মুদ্রা তৈরির জন্যে পাঠানো হচ্ছে। (চলবে)