ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়িক সংগঠন
এই অধ্যায়ে আমরা বাংলা ভিত্তিক ব্যবসায়ীদের ব্যবসা আলোচনা আর তার চরিত্র এবং প্রকৃতি এবং এর পাশাপাশি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা ব্যবসা বিষয়ে বিশদে আলোচনা করব। বাংলার ব্যবসা জগতে ইওরোপিয় সওদাগরি কোম্পানিগুলির আবির্ভাবে বাংলার ব্যবসায়ীরা নতুন অবস্থার মুখোমুখি হল। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলো বাংলা বাজারে এক সঙ্গে পণ্যের ক্রেতা অন্য দিকে পণ্যের বিক্রেতা, উভয় চরিত্র নিয়েই প্রবেশ ক’রে পণ্য সরবরাহ আর বিলিবন্টনে সমস্যা তৈরি করে। আমরা প্রমান হিসেবে দেখছি ব্যবসা প্রবাহে যে পণ্য প্রবেশ করছে তার পরিমান আগের থেকে অনেক বেশি, এবং একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ ফেলেছে। যদিও বাংলার ব্যবসায়ীরা এর আগে বিভিন্ন এশিয় বন্দরে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পণ্য আদান প্রদান করেছেন ঠিকই, কিন্তু এই প্রথম আমাদের আলোচ্য সময়ে তারা বিদেশি একচেটিয়া পুঁজি নির্ভর কোম্পানির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। আমাদের এই পর্বের গবেষণার উদ্দেশ্য হবে বাংলায়, আমাদের আলোচ্য সময়ে যে নতুন বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি হল, সেই পরিবেশে দেশিয় ব্যবসায়ীরা কোন পদ্ধতিতে খাপ খাওয়াতে পারল এবং নতুন অবস্থায় তারা কিভাবে সংগঠিতও হয়েছিল সেই বিষয়টা বিশদে বোঝার চেষ্টা করা।
বাংলার ব্যবসায়ীদের চরিত্রে বেশ কিছু স্বাতন্ত্র্য ছিল। তারা ইওরোপিয় কোম্পানি আর বাংলার বাজারের মধ্যস্থ হিসেবে কাজ শুরু করে। মাথায় রাখতে হবে ইওরোপে রপ্তানি করা পণ্য, ইওরোপিয় কোম্পানিগুলো সরাসরি বাংলার বাজার থেকে কিনতে পারত না। বাংলার ব্যবসায়ীরা শুধুই মধ্যস্থ বা দালাল ছিল না, তারা নিজেদের পুঁজি বিনিয়োগ করেও আলাদা করে ব্যবসা করত। বাংলার ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর মধ্যস্থরা প্রত্যেকেই নিজেদের জোরেই ব্যবসায়ী হিসেবে গণ্য হতেন — তারা বিভিন্ন পণ্য বেচা কেনা করতেন — লাভ হয় এমন কোনও পণ্য নিয়ে বাণিজ্য করতে দ্বিধা বোধ করতেন না। নিজেদের নানান ধরণের ব্যবসা চালানো আর সেবা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের কেউ স্রফ বা সওদাগর-ব্যাঙ্কার হিসেবেও কাজ করেছেন, কেউ মুদ্রা বিনিময় করেছেন, কেউ জনগণের অর্থ জমা রাখতেন, কেউ বিল অব এক্সচেঞ্জ বা হুন্ডি কাটতেন আবার কেউ বাংলার ব্যবসা কেন্দ্রগুলোর কুঠির বিভিন্ন মধ্যস্থকে লেটার অব ক্রেডিটও জারি করতেন। এরই ফাঁকে তারা ইওরোপিয় কোম্পানির সঙ্গে অথবা বাংলার শাসক শ্রেণীর মানুষদের বাণিজ্য উদ্যমের মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করেছেন। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলো ব্যবসায়ীদের সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে, অভিজাতদের সঙ্গে দরকষাকষি করত, তাদের থেকে সুবিধা নিত। বহুমুখী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকা সত্ত্বো কোম্পানিগুলো বাংলার ব্যবসায়ীদের শুধুই মধ্যস্থ হিসেবে গণ্য করত এবং সেই জন্যে তারা অসফলভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিতর্কে তাদের মাথা নোয়ানোর চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন সময়ে তারা তাদের একচেটিয়াভাবে ব্যবসা করার ভাবনা থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী-মধ্যস্থদের জোট ভাঙ্গার এবং ব্যবসায়ীদের দরকষাকষির অবস্থানকে দুর্বল করার চেষ্টা করলেও তারা বার বার ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময় জুড়ে বাংলার ব্যবসায়ীরা ইওরোপিয় কোম্পানিদের সাহায্য ছাড়াই তাদের সম্মান, প্রভাব এবং নিরপেক্ষতা বজায় রেখে চলেছে।
আমরা এই পর্বে বাংলার ব্যবসায়ী শব্দবন্ধ ব্যবহার করছি ইওরোপজাত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে সব ধরণের দেশিয়, বাংলা নির্ভর ব্যবসা করা ব্যবসায়ী বোঝাতে। আমরা এই বিষয়টা আলোচনা করব এই কটি শীর্ষকে — ১) বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি; ২) বাংলার ব্যবসায়ীদের বৈদেশিক বাণিজ্য; ৩) তাদের সম্পদ এবং ৪) শেষে আমাদের মন্তব্য।
বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
এই শীর্ষকে আমরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন ব্যবসা কেন্দ্রের বেশ কিছু প্রখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী এবং তাদের লেনদেন আর অন্যান্য কাজকর্ম বিষয়ে আলোচনা করব। এই মানুষগুলোর কাজকর্ম দেখে আমাদের মনে হয়েছে, তারা এক ঝাঁক গোমস্তা ব্যবস্থা নির্ভর করে কোনও একটি ব্যবসায়িক এলাকায় থানা গেড়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কেন্দ্র লক্ষ্য করে ব্যবসাকর্ম পরিচালনা করতেন।
সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দুই গুরুত্বপূর্ণ বালেশ্বরভিত্তিক ব্যবসায়ী খেমচাঁদ এবং চিন্তামন শাহ, বাংলার ব্যবসা জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খাতা পত্রে এই দুই ব্যবসায়ীর নাম Chimcham এবং Chintamund Saw হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। তারা নিজেদের বালেশ্বরের সব থেকে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন। তারা বিপুল পরিমান আন্তর্দেশিয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্য করেছেন। কখোনো তার এক জোট হয়ে ব্যবসা করেছেন, কখন বা আলাদা আলাদভাবে ব্যক্তিগতস্তরে ব্যবসা করেছেন। তারা বালেশ্বরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুল মধ্যস্থ হিসেবে বিভিন্ন রপ্তানিযোগ্য পণ্য এবং বিনিয়োগের পুঁজি জোগাড় করে দিত। কোম্পানি ব্যবসা নিরপেক্ষ ব্যবসায়ী এবং সওদাগর হিসেবে তাদের গুরুত্ব কোম্পানির মধ্যস্থ হিসেবে সম্মানের তুলনায় কম ছিল না। এবং হয়ত নিজেদের তৈরি ব্যবসা সাম্রাজ্য তৈরি করার যোগ্যতায়, কোম্পানি থেকে তাদের প্রধান মধ্যস্থ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও তারা কোম্পানির সঙ্গে মুখোমুখি দরকষাকষি করতে পারতেন।
এই দুজন ব্যবসায়ীর মধ্যে যতদূর সম্ভব খেমচাঁদ, তার অংশিদার এবং সহব্যবসায়ী চিন্তামনের তুলনায় বালেশ্বরে একটু বেশি সম্মানীয় ব্যবসায়ি ছিলেন। ১৬৬৯ সালে খেমচাঁদ কোম্পানির সঙ্গে তাদের বিনিয়োগের বিনিময়ে পণ্য সরবরাহের চুক্তি করেন (ও সি, ২৮ মে ১৬৬৯, ৩২৮২, ৩০ খণ্ড; ১২ অক্টো ১৬৬৯, ৩৩৫২, ৩০ খণ্ড)। এই সময় বালেশ্বরে কোম্পানির সাধারণ বিনিয়োগ ছিল সানোস, নিলা এবং গিগহ্যামের মত পিস গুডসে এবং মাঝেমধ্যে যদি শস্তাদরের ভাল গুণমানের ডুরিয়া এবং খাসার জন্যে চুক্তিবদ্ধ হত (২ অক্টো ১৬৮০ সালে কোম্পানি বালেশ্বর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ১০,০০০ গিগহ্যাম, ১৪,০০০ নিলা, ১৫,০০০ সানোস সরবরাহের জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, দেখুন ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, কনসালটেশন, ২ অক্টো, ১৬৮০)। জুন মাসের খাতায় খেমচাঁদের বর্ননা আছে বালেশ্বরের প্রধান ব্যবসায়ী হিসেবে। কিন্তু তিনি যেভাবে বেশি দাম নিচ্ছিলেন তা কোম্পানির নজরে আসে। ১৬৭০ সালে হুগলী কুঠিয়াল লেখে, তারা চেষ্টা করছে ব্যবসায় খেমচাঁদের হাত যাতে আলগা করা যায় সেটা তারা চেশঘটা চালাচ্ছেন। আমরা দেখব এই ব্যক্তি ইওরোপিয় কুঠিতে মধ্যস্থ হিসেবে বেশি দিন কাজ করছে না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস মিসলেনি, ৩ খণ্ড, ১৪০)। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমরা ১৬৭২ সালে তাকে কোম্পানির কাগজপত্রে কোম্পানির প্রধান মধ্যস্থ হিসেবে উল্লিখিত হতে দেখি। সেই বছর ওডিসার সুবাদার হিসেবে সাফসি খান, সাফি খানের স্থলাভিষিক্ত হলেন, সে সময় খেমচাঁদ, এবং তার সঙ্গে আরও দুই বণিক হরিচরণ এবং জয়রাজ সাহ, বোরেমল (পূরণমল?)-এর সাহায্যে কটকে গিয়ে সুবাদারের থেকে ব্রিটিশ কোম্পানির ওডিসা ব্যবসার পরওয়ানা আদায় করেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ৭ খণ্ড, অংশ ১, ইএফআই, নতুন সিরিজ, ২ খণ্ড, ৩৩৯)। (চলবে)