| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল : সুশীল চৌধুরী (২ নং কিস্তি), অনুবাদ : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৫২০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৩

ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

প্রথম অধ্যায়

পৃষ্ঠভূমি

যাই হোক বাংলায় মুঘল রাজত্ব, শান্তি আর স্বচ্ছলতা বৃদ্ধির সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বাংলায় মুঘল রাজত্ব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ভারতের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ বেড়েছিল দ্রুতগতিতে। কয়েকশ বছর আগে বাংলার মুসলমান শাসন, দিল্লির অধীনতা ত্যাগ করার ফলে উত্তরভারতের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ বিছিন্ন হয় এবং মুঘল আমলের সুবাদে উত্তরভারত মার্ফত মধ্য এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ায় সঙ্গে ভূমি পথে বাংলার ব্যবসা যোগাযোগ সুদৃঢ় হতে থাকে। একই সঙ্গে বাংলার সমুদ্র বাণিজ্যও বাড়তে শুরু করে। ষোড়শ শতকে হার্মাদ এবং মগেদের হ্যাঙ্গামে দেশিয় বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ১৬৩২ সালে হারমাদদের বাংলা থেকে বিতাড়ন এবং ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম দখলের ফলে বাংলার সমুদ্র বাণিজ্যে অংশগ্রহণ বাড়ল।

উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত বাংলা মূলত কৃষি উৎপাদন অঞ্চল এবং তার অর্থনীতি কৃষির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল ছিল। বাংলার স্বাভাবিক উৎপাদন প্রচুর এবং অপরিসীম। কোরা রেশম এং সুতি বস্ত্র উৎপাদন বাংলার মূল সংগঠিত হস্তশিল্প ছিল। ষোড়শ শতকে পাইরার্ড দ্য লাভাল জানাচ্ছেন বাংলা শুধু উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেই চাল সরবরাহ করে না, সে গোয়া বা মালাবারের মত দূর এলাকাতেও চাএর মত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য পাঠায় নিয়মিত, এমন কি সুমাত্রা, মলুক্কাস এবং সুন্দার মত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্বীপগুলোতেও সে মায়ের মমতায় তাদের মুখে খাদ্য তুলে দেয় (পাইরার্ড দ্য লাভাল দ্য ভয়েজেস অব… খণ্ড ১, ৩২৭; এম এ পি মেইলিঙ্ক রোয়েলোফজ, এশিয়ান ট্রেড এন্ড ইওরোপিয়ান ইনফ্লুয়েন্স, ৬৮)। বার্নিয়ে বিশ্বাস করতেন, বিশ্বে মিশরকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে (সমগ্র মধ্যযুগে বিশ্বে শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে মিশরের পরিচিতি ছিল), সেই গুরুত্ব বাংলাকে দেওয়া উচিৎ (বার্নিয়ে, উল্লিখিত, ৪৩৭)। তিনি বলছেন বাংলার চাল পাটনা, মসলিপত্তনম, এবং করমন্ডল উপকূলের নানান অঞ্চলে সঙ্গে সঙ্গে শ্রীলঙ্কা এবং মলদ্বীপে রপ্তানি হয়। বাংলার চিনি শুধু গোলকুণ্ডা বা কর্ণাটকেই রপ্তানি হত তাই নয়, আরব এবং মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে বন্দর আব্বাসি মার্ফত মোকা এবং বসরার মত শহরেও রপ্তানি হত (ঐ, ৪৩৭)। বার্নিয়ে বাংলার শিল্প আলোচনায় মুক্তকচ্ছ ছিলেন। তিনি বলছেন বাংলার পণ্য বৈচিত্রের সমাহার সারা বিশ্বের ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ করে, এবং বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই যারা বাংলার এই বৈচিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে… বাংলায় সুতো আর রেশম এত রয়েছে এবং এইগুলি দিয়ে সে যে পণ্য উৎপাদন করে, সেই সুবাদে যে সে শুধু মুঘল সাম্রাজ্যেরই সরতাজ নয়, তাকে তার প্রতিবেশী দেশ এবং ইওরোপের গুদামঘর বলতে পারি (ঐ, ৪৩৯)। বাংলার কারিগরেরাও সারা বিশ্বে সমাদৃত হতেন।

পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে (বাংলার) অধিবাসীরা সুতিবস্ত্র উতপাদনে অপরূপ দক্ষ ছিলেন, কাপড়ের ওপর সূক্ষ্মতম ফোঁড় থেকে নানান ধরণের সুচিকর্ম আমাদের মুগ্ধ করে, এবং এই ধরণের কাজ বিশ্বের কোন প্রান্তেই হয় না (পাইরার্ড দ্য লাভাল, প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, ৩২৯)

ষোড়শ শতাব্দের সাতের দশক অবধি সাতগাঁ ছিল বাংলার এমন এক বন্দর যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা উপমহাদেশের পশ্চিম অংশের সঙ্গে বিপুল পরিমানে ব্যবসা করেছে। গঙ্গার মুখের কাছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সরস্বতী নদীর গিঁটের আকারের মুখে সাতগাঁ বন্দরের অবস্থান এমনভাবে ছিল যে এই জলস্রোত বাহিত হয়ে সমগ্র মধ্যযুগে বিপুলাকৃতির জাহাজগুলি সমুদ্রবাহী গঙ্গায় গিয়ে পড়ত। সম্পতগ্রাম বন্দরের সম্পদ মধ্যযুগের কাব্য এবং বৈদেশিক মুসাফিরদের বর্ণনায় বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মুকুন্দরামের কাব্যে পাছি এখানে এতই বিদেশি বণিকের আগমন হত যে স্থানীয় বণিকদের আর বিদেশেই যেতে হত না (আর কে মুখার্জী, ইকনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, ১২২)। ষোড়শ শতের শেষে হুগলী বন্দর চালু হওবার আগে এটিই ছিল বাংলার মুল বন্দর, এবং সপ্তদশ শতের শুরুতে এর উল্কাসম উত্থানে সাতগাঁর পতন ঘটে এবং এর সমস্ত আলো নিজের দিকে টেনে নেয় সে (রিয়াজুসসালাতিন, পূর্বোক্ত, ৩৩; ক্রফোর্ড আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব হুগলী ডিস্ট্রিক্ট, ২; হান্টার, স্ট্যাটিস্টিক্যাল একাউন্টস অব বেঙ্গল ৩ খণ্ড, ২৯৯; জি টয়েনবি, আ স্কেচ অব দ্য এডমিনিস্ট্রেশন অব দ্য হুগলী ডিস্ট্রিক্ট, ২)। বাংলার পণ্যের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে শুধু যে সে উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বণিক ও সওদাগরদের ছাতছানি দিয়েই ডাকত না, সে বিভিন্ন দেশের বণিকদেরও সমভাবে আকর্ষণ করত (ক্যাম্ফোজ, হিস্ট্রি অব পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল, ১১৩; এস দে, হুগিলী পাস্ট এন্ড প্রেজেন্ট, ১৫০)। ১৫৩৭ থেকে এই বন্দর পর্তুগিজ ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র ছিল, এটি পোর্তো পিকেনো নামে বিশ্বে প্রখ্যাত ছিল। এমন কি ১৫৩৭ সালে সিজার ফেলিনি সাতগাঁওকে অসাধারণ উজ্জ্বল শহর নামে অভিহিত করেছিলেন যেখানে প্রত্যেক বছর ছোট বড় মাঝারি নানান আকারের ৩০ থেকে ৩৫টা জাহাজ বিভিন্ন ধরণের বোম্বাস্ট কাপড়, লাক্ষা, চিনি, শুকনো এবং প্রক্রিয়া করা মিরাবোলান্স, লম্বা লঙ্কা, ওলে অব লারজিলাইন এবং নানান ধরণের পণ্য বোঝাই হয় (সিজার দ্য ফেড্রিসি, এক্সট্রাক্টস অব…হিজ এইটিনথ ইয়ার্স ইন্ডিয়ান অব্জারভেশন, ১১৪)।

ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি থেকেই প্রবাদপ্রতীম সাতগাঁও বন্দরের জ্যোতি ম্লান হতে থাকে মূলত প্রাকৃতিক কারণেই। এটি সরস্বতী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল, যেটি মূলত হুগলী নদীর জলেই পুষ্ট হত, সেটিতে পলি জমে বড় জাহাজ চলার অনুপযোগী হয়ে গেল। বছরে বর্ষার কিছু মরশুম বাদ দিলে ছোট নদী যানও এই নদী দিয়ে চলাচল করতে পারত না। সরস্বতী আর গঙ্গার মোহনা পলিপড়ে জলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল। এর ফলে সাতগাঁর খ্যাতি কমতে শুরু করল (সালিমুল্লাহ প্রাগুক্ত, ৮৭, ক্যাম্পোজ, প্রাগুক্ত, ২২, ৫৭; এস দে, প্রাগুক্ত, ৯, ১৫০; হান্টার)। ষোড়শ শতকের প্রথম থেকেই সরস্বতীতে পলি পড়ছিল। ১৫৩২ সালে ডি ব্যারোজ বলছেন, জাহাজ ঢোকা এবং বেরোনোর জন্যে নদী একেবারেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে (এস দে’র বইতে উদ্ধৃত, প্রাগুক্ত, ১১৩)। ১৭৫৪ সালে সাতগাঁওতে আর বড় জাহাজ ঢোকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যদিও ১৫৬৭ সালে সাতগাঁও শহরের ঔজ্জ্বল্য তখনও ম্লান হয় নি, কিন্তু বন্দরের গুরুত্ব তখন থেকেই কমতে শুরু করেছে (সিজার দ্য ফ্রেডরিকি প্রাগুক্ত, ১১৫; সি আর উইলসন, আর্লি এনালস অব দ্য ইংলিশ ইন বেঙ্গল, খণ্ড ১, ১৩৪-৩৬; ক্রফোর্ড, প্রাগুক্ত, ২)।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি পর্তুগিজদের কাজকর্মও বাংলার প্রধান বন্দর হিসেবে সাতগাঁ বন্দরের পতন আর হুগলীর উত্থানের জন্যে দায়ি। ষোড়শ শতকে ভারত মহাসাগরে সব থেকে বড় জাহাজের মালিকানা ছিল পর্তুগিজদের দখলে এবং বাংলার একটা বড় অংশের সমুদ্র বাণিজ্যের রাশ ছিল তাদের কবলে। ১৫৩০ সাল থেকে তারা বাংলা থেকে বাণিজ্যকর্ম শুরু করে এবং সাতগাঁওতে গুরুত্বপূর্ণ কুঠি তৈরি করে। সেই শতাব্দের ছয়ের দশকে তাদের মনে হল, নদীর নিম্নধারায় নতুন কিছু অস্থায়ী বাসস্থান তৈরি করা দরকার। তারা স্পষ্ট দেখছিল বড় বড় জাহাজগুলো শেষ পর্যন্ত সাতগাঁও পর্যন্ত পৌঁছতে পারছিল না। নতুন নতুন এলাকায় অস্থায়ী বাসস্থান নির্ভর এলাকায় ব্যবসা কাজ শেষ হলে সেই সব অস্থায়ী বাসস্থানগুলি পুড়িয়ে দিত (সিজার ফ্রেডরিচি পূর্বোক্ত, ১১৫)। তারা দেখল যে অস্থায়ী ছোট ছোট গ্রামগুলো বসাছিল, পোড়াচ্ছিল, সেগুলি দিয়ে তাদের স্বাছন্দ্যও আসছিল না আর অর্থনৈতিকভাবে তারা লাভবানও হচ্ছিল না। ফলে তারা তাদের তৈরি পোর্তো পেকুইনোকে এখন একটা নতুন জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছিল, যেখানে নদী বেশ নাব্য এবং জাহাজ দাঁড়াবার যথেষ্ট যায়গা রয়েছে। তাদের দৃষ্টি পড়ল হুগলীতে এবং তারা তাদের তৈরি সাতগাঁও বন্দর তুলে নিয়ে চলে এল নতুন বন্দরে। শুধু পর্তুগিজেরাই নয়, সেখানকার এশিয় বড় বণিকেরা হুগলী বন্দরে উঠে এল। সাতগাঁও গড়ে ওঠায় তাদের অবদান অস্বীকার করা যায় না। যারা সেই এলাকায় বসত বাড়ি বানিয়ে সম্পদশালী হয়েছেন, তারাও সাতগাঁওর পতনের আশংকায় নতুন জায়গায় উঠে এসে সেখানেই জীবিকা নির্বাহ করতে শুরু করলেন। কিছু দিনের মধ্যেই হুগলী হয়ে উঠল বাংলার শ্রেষ্ঠ বন্দর এবং তার এই শ্রেষ্ঠতা সে সপ্তদশ শতাব্দজুড়ে এবং অষ্টাদশ শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত থেকে যাবে (সি আর উইলসন, প্রাগুক্ত, ১ খণ্ড, ১৩৫; জে এন সরকার, প্রাগুক্ত, ২ খণ্ড, ৩৬৪-৬৫)।

বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্য, বাংলার ব্যবসায়ী, উত্তর ভারত সাতগাঁওএর ম্যা ছেড়ে হুগলী বন্দরে এসে জড়ো হল। এবার হুগলী থেকে পর্তুগিজেরা বৈদেশিক বাণিজ্যের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত, এদের সঙ্গে ছিল কিছু মালয়, আরব এবং দেশিয় বণিকও। শুধু সমুদ্র বাণিজ্যই নয়, স্থলপথ বাণিজ্যের একটা বড় অংশও হুগলীতে সমাধা হতে শুরু করল। যদিও সাতগাঁওতেই ১৬৩২ সাল পর্যন্ত সুবাদার এবং তার সঙ্গে সরকারি শুল্ক এবং অন্যান্য দপ্তর ছিল। এরপরে যখন সরকারিভাবে হুগলী সরকারি বন্দরের অভিধা পাবে তখন এখানে সরকারি দপ্তরগুলি উঠে আসবে (ক্রফোর্ড, প্রাগুক্ত, ১৮৮-৮৯; জি টয়েনবি, প্রাগুক্ত, ২; এস দে, প্রাগুক্ত, ১৮)। যে ধরণের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটছিল ব্যবসা কেন্দ্র হুগলীতে নতুন করে স্থাপন করার ফলে, সেই নতুন শহর বসাবার কাজে সঙ্গী হতে পারছিলনা সাতগাঁওএর মুঘল আমলাদের একাংশ। সে সময় অধিকাংশ মুঘল দরবারি ঐতিহাসিকের হুগলী বিষয়ে বর্ণনা ছিল, যে ফিরঙ্গিরা বিশ্বাসঘাতকতা করে সরকারি সম্পদ চুরি করে পালিয়ে যাচ্ছে। শাহজাহানের দরবারি ঐতিহাসিক আবদুল হামিদ লাহোরি লিখছেন, বাঙ্গালিদের শাসনের সময় সন্দ্বীপের ফিরঙ্গি বণিকেরা সাতগাঁওতে মাঝেমধ্যে যাতায়াত করতে করতে তারা সেখানে সাতগাঁর এক ক্রোশ দূরে একটি খাঁড়িতে উপনিবেশ গড়ে তোলে… সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাসকদের (সুবাদারের?) নির্বুদ্ধিতা এবং অসতর্কতার দরুণ আরও প্রচুর ফিরঙ্গি সেখানে জড়ো হয়… সময়ের প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় শহর গড়ে ওঠে এবং এটার নাম হয় হুগলী বন্দর। ফিরঙ্গিরা এটাকে বন্দর হিসেবে গণ্য করতে থাকে এবং সেখান থেকে জাহাজ ছাড়তে থাকে; ফলে সাতগাঁওর বাজার নষ্ট হতে থাকে এবং তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যায় (আবদুল হামিদ লাহোরি, পাদশানামা, ১ খণ্ড; এলিয়ট এন্ড ডসন, হিস্টোরি অব ইন্ডিয়া এজ টোল্ড বাই ইটস ওউন হিস্টোরিয়ান্স, খণ্ড ৭, ৩১; জে এন সরকার, প্রাগুক্ত, ৩১৮-১৯)।

পর্তুগিজদের হাতে অসম্ভব দ্রুততায় হুগলী বন্দর তৈরি হয় মোটামুটি ১৫৭৯ সালে (এস চৌধুরী, দ্য রাইজ এন্ড ডিমাইজ অব হুগলী, বেঙ্গল পাস্ট এন্ড প্রেজেন্ট, জানু-জুন, ১৯৬৭, ৩৭-৪০)। খুব অল্পকালের মধ্যেই হুগলী বাংলার বণ্ডেল গুলির অর্থাৎ ছোট ছোট ব্যবসায়িক ক্ষেত্রগুলির মধ্যে সর্বতকৃষ্ট, সর্বস্বচ্ছল, সব থেকে বিকাশশীল, সব থেকে বড় বাসস্থানযোগ্য বন্দর হয়ে ওঠে। ১৬৩৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্তুগিজ জাহাজের ধর্মযাজক জন কাব্রাল লিখলেন, এই বন্দরে চিন, মালাক্কা, ম্যানিলায় ব্যবসা করা পর্তুগিজদের বিপুল সংখ্যক জাহাজ অতি দক্ষতায় সারাই করা হয়। কাব্রাল আরও লিখলেন, এখানে শুধু এই অঞ্চলের মানুষই বসবাস করে না, এখানে বিপুল সংখ্যক পারসি, হিন্দুস্তানী, মোঘল, আর্মেনিয় বাস করে পণ্য জোগাড়ের জন্যে (মানরিকে, প্রাগুক্ত, ২ খণ্ড, ৩৯২)। ১৫৮৩ এবং ১৫৮৯এর মধ্যে ভারত ভ্রমনে আসা ভ্যান লিন্সকোটেন লিখলেন (জাহাজকে) পথ দেখানো জাহাজ আর নাবিকদের সারা বছরের কাজ থাকে। তারা এইখানে আসার জন্যে সারা বছরে ভিড় লেগে থাকা বিভিন্ন প্রাচ্যের বন্দর থেকে আসা জাহাজগুলিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে (লিন্সকোটেন, প্রাগুক্ত, ১ খণ্ড, ৩৯২)। ১৫৮৮ সালে এই বন্দরে আসা ব্রিটিশ মুসাফির র‍্যালফ অনুসারে ফিচ হুগলী ছিল পর্তুগিজদের চিফ কিপ (ক্যাম্পোসে উদ্ধৃত, প্রাগুক্ত, ৫৫)। আইনিআকবরি লেখা শেষ হয় ১৫৯৬-৯৭ সালে, সেও জানাচ্ছে সাতগাঁও থেকে হুগলী অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ণ বন্দর। সব সূত্র থেকে একটা বিষয় প্রতীয়মান হয় যে ষোড়শ শতাব্দের শেষের দিকে বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দরের নাম হয় হুগুলী এবং এটা এখন আর পোরতো পিকুইনো নামে আর চিহ্নিত হল না এর নাম হল পোর্তো গ্রান্ডে বা অসাধারণ স্বর্গ, এর আগে এই অভিধাটাই পর্তুগিজেরা দিয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরকে। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev