ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
বালেশ্বরের ব্যবসায়ীরা কোম্পানির পণ্য সরবরাহের জন্যে অর্ধেক নগদে এবং অর্ধেক ইওরোপিয় পণ্যে দাদনি বিনিয়োগ নিতেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনি, ১৪ খণ্ড, ৩২৪; মাস্টার্স ডায়েরি, ২ খণ্ড, ৮৬)। সাধারণত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা অগ্রিম ছাড়া কোম্পানিকে পণ্য সরবরাহের কাজে চুক্তিবদ্ধ হতেন না। ১৬৭৩ সালে এই রকম এক অবস্থা তৈরি হল। গোটা বছর ধরেই বালেশ্বর কুঠিতে কোম্পানির খুব টাকার টানাটানি চলছিল। এক দিকে আগের বছরেই (১৬৭২ সালে বাংলায় ছটা জাহাজ আসে এবং ৫,৪৭,৭১৮ টাকার পণ্য নিয়ে রওনা হয়, দেখুন ইএফআই, নতুন সিরিজ, খণ্ড ২, ৩৪৩) অস্বাভাবিকভাবে কয়েকটা বড় জাহাজ এসে নিপুল পরিমান পণ্য নিয়ে চলে গিয়েছে যার জন্যে কোম্পানির বালেশ্বর কুঠির অর্থ আর ভাণ্ডার প্রায় খালি হয়ে যায়। অন্য দিকে ডাচ যুদ্ধের জন্যে ডাচেদের থেকে হুণ্ডি কাটা যাচ্ছিল না, অথচ ডাচেরা সাধারণভাবে ব্রিটিশদের ব্যবসায়ে এই রাস্তায় প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করত। কোম্পানির এই হাত বাঁধা অবস্থা খেমচাঁদ খুব ভালভাবে জানত, সে অগ্রিম ছাড়া কোম্পানিকে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে না জানাল। মনঃক্ষুণ্ণ কুঠিয়াল লিখল, আমাদের দুর্দিনে খেমচাঁদ দূরে দূরে থাকছে, এবং যেহেতু আমাদের হাতে কোন অর্থ নেই, আমরা তাকে কোন অগ্রিম দিতে পারছি না, সে আমাদের সঙ্গে পণ্যচুক্তি করছে না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৪, অংশ ১, ৫৪)। তারপরে কোম্পানি তাদের হাতে থাকা কিছু দস্তা আর কিছু লন্ডন থেকে আমদানি করা ব্রডক্লথের বিনিময়ে বালেশ্বরের কুঠি খেমচাঁদের থেকে পিসগুডস জোগাড় করতে সক্ষম হয়। এতে কোম্পানির ২০% আর্থিক ক্ষতি হল(ঐ, খণ্ড ৪, অংশ ১, ৪)।
খেমচাঁদ কোম্পানির ভৃত্য ছিলেন না, তিনি কোম্পানির ব্যবসা নিরপেক্ষভাবে নিজের ব্যবসায়ী চরিত্র বজায় রেখে চলেছেন। ১৬৭৬-৮০ সালের দিকে বাংলায় এসে কোম্পানির ব্যবসা নতুন করে গুছিয়ে তোলার অনুঘটক, স্ট্রেনশ্যাম মাস্টার বলছেন, বালেশ্বরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে খেমচাঁদ এবং চিন্তামন এই দুজনই একমাত্র আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যবসায়ী ছিলেন, এবং বালেশ্বরে এরা ছাড়া অন্য একজনও কোন ব্যবসায়ী ছিল না, যারা কোম্পানির চাহিদামত শস্তায় পণ্য যোগ্যভাবে এবং ঠিকভাবে জোগাড় করে দিতে পারে (ও সি, ১ সেপ্ট, ১৬৭৬, ৪৬৪৭, ৪০ খণ্ড; মাস্টারের ডায়েরি, খণ্ড ১, ১০১; খণ্ড ২, ২১৭, ২১৯)। ৩০ আগস্ট ১৬৭৬ সালে স্ট্রেনশ্যাম মাস্টার বলছেন খেমচাঁদ কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করুক আর নাই করুক, তিনি সেইরকম প্রখ্যাত এবং অপ্রতিরোধ্য ব্যবসায়ী হিসেবেই গণ্য হবেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনি, ১৪ খণ্ড, ৪৮; মাস্টারের ডায়েরি, খণ্ড ১, ৩০৩)। তবে বালেশ্বরে কোম্পানিকে পুরোনো শোধ না হওয়া ধার (বেড ডেটস) থেকে বাঁচাতে মাস্টার বালেশ্বরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি করে বলেন, যে অর্থ ব্যবসায়ীদের অগ্রিম হিসেবে (এডভান্সড অন একাউন্ট) দেওয়া হয়েছে, তার জানিমদার থাকবেন খেমচাঁদ এবং চিন্তামন যৌথভাবে জামিনদার থাকবেন, কেননা তাদের নিজেদের যেমন বিপুল ব্যবসার ভিত্তি আছে, তেমনি তাদের থেকে অস্বচ্ছল ব্যবসায়ীরাও এই চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন। এই চুক্তি হিসেবে কোম্পানির বিনিয়োগ দশ ভাগে ভাগ করা হল, চার অংশ খেমচাঁদের দিকে যাবে দুই অংশ চিন্তামন পাবে বাকি অংশ চার অংশ কুঠির প্রধান, খেমচাঁদ এবং চিন্তামনের যৌথ নির্দেশে অন্যান্য ছোট ব্যবসায়ীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে ‘দিজ মার্চেন্টস অব্লাইয়েজড দেমসেলভস ইন রিটার্ন ফর আ ফুল এডভান্স অন দু হোল ইনভেস্টমেন্ট, টু রিপে এনি এরিয়ারস উইদিন আ মন্থ অব দ্য ডিপারচার অব দ্য শিপস, ফর ইওরোপ, এন্ড ইন ডিফল্ট টু পে দেড় পার্সেন্ট ইন্টারেস্ট আন্টিক দ্য এরিয়ার্স অয়ার সেটলড। দেইলিওর টু সাপলাই গুডস কন্ট্রাক্টেড ফর এন্টেইলড ফরফিচুওর অব দ্য মারচেন্টস শেয়ার অর শেয়ার্স, এজ দ্য কেস মাইট বি, ইন দ্য ইনভেস্টমেন্ট। কোম্পানির ইচ্ছেমত সময়ে এই চুক্তিটি বলবত থাকবে জানান হল, আনলেস দ্য মার্চেন্টস থ্রু দেয়ার ডিফলটস শ্যাল কজ আ ব্রিচ দেয়ারঅফ (বি এম এডি ম্যানু, ৩৪১২৩, ৪৩এ-৪৪এ; ও সি, ৩ সেপ্ট, ১৬৭৯, ৪৬৪৮, খণ্ড ৪০, মাস্তারের ডায়েরি, খণ্ড ২, ২২২-২৪)।
বালেশ্বরের ব্যবসায়ী এবং কোম্পানির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটা অত্যাশ্চর্য ভাবনাবিন্দু পেতে পারি। কোন সন্দেহই নেই যে সেই সময় খেমচাঁদ ছিলেন বালেশ্বরের কোম্পানির পক্ষে প্রধান মধ্যস্থ। কোম্পানির বিনিয়োগের ৪০ শতাংশ তিনিই সরবরাহ করতেন। প্রভাবের দিক থেকে খেমচাঁদের পরের স্তরে ছিলেন চিন্তামন, যিনি কোম্পানির বিনিয়োগের ২০% সরবরাহ করতেন। অন্য কারা বিনিয়োগ করবেন, এই প্রশ্নটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্পষ্টতই ছিল বালেশ্বরের প্রধান কুঠিয়ালের সঙ্গে চিন্তামন আর খেমচাঁদের একসঙ্গে। একই সঙ্গে বলা হয়, এই ব্যবসায়ীদের কোন অধিকার থাকবেনা কোম্পানির চুক্তি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার, বা চুক্তি রদ করার। ফলে মাস্টার কোম্পানিকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবার ব্যবস্থা করলেন এই চুক্তির মাধ্যমে খেমচাঁদ আর চিন্তামনকে জামিন রেখে।
এই চুক্তি বাদ দিলেও খেমচাঁদ এবং চিন্তামন তাদের স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে পারতেন। এবং কোম্পানির কুঠিয়ালদের বিস্মিত করে তারা তিনজন ব্যবসায়ীর জামিন হতে অস্বীকার করলেন। দুজনের বক্তব্য, এদের ডেসপারেট কাজকর্ম পছন্দ নয় (ও সি, ১ সেপ্ট, ১৬৭৮, ৪৬৪৭, খণ্ড ৪০; মাস্টার্স ডায়েরি, খণ্ড ১, ১০১; খণ্ড ২, ২১৯)। এছাড়াও তাঁরা বললেন এই দলের মধ্যে কয়েকজন যেহেতু সরবরাহ করা পণ্যের গুণমান বজায় বজায় রাখার ইতিহাস নেই, তাই তারা তাদের হয়ে জামিন থাকতে ইচ্ছুক নন। হুগলী কাউন্সিল খেমচাঁদ এবং চিন্তামনের এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে সাধুবাদ জানিয়েছে সেটা পরিষ্কার তাদের চিঠির বক্তব্য থেকে …উই এডমায়ার খেমচাঁদ এন্ড চিন্তামন শুড রিফিউজ টু বি সিকিউরিটি ফর দোজ পার্সনস হু প্রোভাইড এনি গুডস অব দ্য ইনভেস্টমেন্ট এনঅডার্ডড উইথ ইউ … দ্য সিকিউরিটি ডিসায়ার্ড ইয়ু মে টেল দেম, ওয়াজ ফর পার্সনস নট ফর অল সর্টস অব গুডস দে অয়ার টু প্রভাইড, হুইচ, হোয়েন দে হ্যাভ বেটার কন্সিডার্ড, উই অপোজ, দে উইল নট বি সো স্ক্রুপুলাস এজ ইউ নাউ রিপ্রেজেন্ট (ও সি, ১ অক্টো, ১৬৭৬, ৪৬৫৯, ৪০ খণ্ড)।
১৬৭৮ সালে বিনিয়োগের বিনিময়ে জোগাড় করা বিভিন্ন পণ্যের মূল্যমান যতক্ষণ না নিশ্চিত করা যাচ্ছে, ততদিন সেগুলি পণ্যগুলো গুদামজাত করে রাখার জন্যে হুগলি কাউন্সিল খেমচাঁদ এবং অন্য ব্যবসায়ী দলকে তাদের নিজেদের ব্যয়ে বালেশ্বরে গুদাম তৈরি করার অনুমতি দেয়। গুদাম তৈরির জন্যে কাউন্সিলের শর্ত ছিল এইগুদামটি কোম্পানির নামে তৈরি হবে, কিন্তু সেখানে খুব জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে না দিলে আর হুগলী কুঠি কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং প্রস্তাবনা ছাড়া কোম্পানি কোনো পণ্য রাখতে পারবেন না (ও সি, ১৫ নভে, ১৬৭৮, ৪৫২২, ৩৯ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, কনসাল্টেশন, ১৪ নভে, ১৬৭৮)।
খেমচাঁদ যেমন কোম্পানিকে পণ্য জোগাড় করে দিতেন তেমনি তিনি কোম্পানির আমদানি করা পণ্যও কিনতেন। কোম্পানি প্রত্যেক বছর যে পরিমান ব্রডক্লথ বাংলায় আনে, সেই সমগ্র পরিমান তিনিই কিনে নিতে নিতে পারেন কী না, সেই আলোচনা দুতরতফেই চলছিল। মাথায় রাখতে হবে লন্ডন থেকে আনা পণ্য কোম্পানির বাংলা বিনিয়োগের একটা বড় অংশ ছিল। ১৬৭৭ সালের প্রথম দিকে তিনি কোম্পানিকে এই প্রস্তাব দিলেও কোম্পানির তরফে কিছুই জানানো হয় নি। ১৬৭৭ সালে কোম্পানি তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, কাশিমবাজারের প্রভাবশালী স্রফ, শুকানন্দ শাহ-এর সঙ্গে পণ্য কেনার চুক্তি করে। শুকানন্দ, বাংলায় আমদানি করা কোম্পানির সব ব্রডক্লথ কিনে নিতেন। আগেই বলেছি, কোম্পানির সঙ্গে পণ্য সরবরাহের চুক্তিতে খেমচাঁদ তার আর্থিক বিদায় হিসেবে প্রতিবছর অংশত ইওরোপিয় পণ্য নিতেন এবং সেগুলি তিনি দেশিয় বাজারে বিক্রি করতেন (১৬৭৭ সালে কাশিমবাজারের [কুঠি] ডায়েরি সূত্রে জানতে পারছি খেমচাঁদ তার গোমস্তা মার্ফত এই ইওরোপিয় পণ্যগুলি কাশিমবাজারে পাঠাতেন, দেখুন ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১৮ সেপ্ট, ১৬৭৭), কিছু সময় সেগুলো ব্যবসায়িদের হাতেও জমে যেত (কারণ তখন বাংলায় এই সব পণ্যের বিন্দুমাত্র বাজার ছিল না)। এবং এই জন্যে কোম্পানির আমদানি করা পণ্য সহজে বাংলার বণিকেরা কিনত না। (চলবে)