ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
বালেশ্বরের দুই ব্যবসায়ী খেমচাঁদ এবং চিন্তামন, খুবই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিল তার প্রমান আমরা নানান উদাহরণে পাই। এখানে একটা মাত্র উল্লেখ করা গেল ক্রেতারা যদি সরকারের প্রভাবশালী অভিজাত আমলা হলে এই দুই ব্যবসায়ী কোম্পানির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দিতেন। ১৬৭৩ সালে আর্থিক লেনদেনের সমস্যা থাকায় হুগলী কাউন্সিল বালেশ্বরের জনৈক হলকে নির্দেশ দিচ্ছে, বালেশ্বরের ফৌজদার মালিক কাশিম যদি কোম্পানির আমদানি করা বন্দুক (গান) কিনতে চান, তাহলে সেই মুঘইল আমলাকে সেই পণ্য অর্থ নগদে কিনে নিতে হবে। তাদের প্রস্তাব ছিল প্রাথমিকভাবে খেমচাঁদ বন্দুকগুলো ফৌজদারের পক্ষে নগদ অর্থে কোম্পানির থেকে কিনে নিক। কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেয় ৮টাকা প্রতি মন দরে, খেমচাঁদ যতগুলো সম্ভব ব্রিটিশদের আমদানি করা বন্দুক কিনে নি আরেক সম্ভাব্য ক্রেতা রাজা মানসিংহ, তাঁরও মধ্যস্থ ছিলেন ব্যবসায়ী খেমচাঁদ, প্রতিমন ৯টাকায় ব্রিটিশ বন্দুক কেনার খদ্দের ছিলেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৪, অংশ ১, ৯৮; ইএফআই, নতুন সিরিজ, খণ্ড ২, ৩৬৫)। ১৬৭৯ সালে চিন্তামন মালিক কাশেমের চিঠি নিয়ে বালেশ্বরের কুঠিয়ালের কাছে যান বেশ কিছু লোহার আগ্নেয়াস্ত্রের চাহিদা জানিয়ে। কুঠিয়াল মধ্যস্থর মার্ফত সুবাদারের সঙ্গে ব্যবসা করতে অস্বীকার করলেন, যদিও এই মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত খেমচাঁদ এবং চিন্তামনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৭, অংশ ৩, ৪৩)। সেই বছরেই বালেশ্বরে ডাচেদের সঙ্গে একটি খাঁড়ি এবং একটি জমির মালিকানা নিয়ে বিবাদ হলে ফ্যাক্টরদের বলা হল তারা quanungo chup ব্যবহার করতে। এই ছাপটা আদতে খেমচাঁদ এবং কল্যাণ রায় নিয়ন্ত্রণ করতেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ৫ খণ্ড, অংশ ১, ৪১-৪২)।
খেমচাঁদের নেতৃত্বে তার অনুগামী ব্যবসায়িরা নিজেদের মধ্যে জোট তৈরি করে কোম্পানির সঙ্গে দক্ষ হাতে দরকষাকষি করতেন। শেষ পর্যন্ত কোম্পানিকে খেমচাঁদের শর্ত অনিচ্ছুকভাবে মেনে নিতে বাধ্য হতে হত। ১৬৮০ সালে কোম্পানির সমস্ত চাপ এবং শেষ পর্যন্ত নরম মনোভাব নেওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়িরা এককাট্টা হয়ে ১০০ রিয়াল মুদ্রার বিনিময় মূল্য হিসেবে ২০৮ টাকার বেশি অর্থ দিতে রাজি হল না… তারা নিজেদের মধ্যে জোট তৈরি করে … একবাক্যে কোম্পানির সঙ্গে প্রতি পাই পর্যন্ত দরকষাকষি চালিয়েগেল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ২, অংশ ২, ৯৫)। বালেশ্বর ব্যবসায়িরা দরকষাকষিতে এতটাই দক্ষ ছিল যে তারা বুঝতে পেরেছিল, সে বছর কোম্পানিকে তাদের ওপর নির্ভর করতেই হবে, দরকষাকষির রাশ তাদের হাতে এবং কোম্পানিকে তাদের মতে মত দিয়েই চলতে হবে। কোম্পানি যদি তাদের শর্ত মেনে না নেয়, তা হলে সে বছর কোম্পানি সমস্ত বিনিয়োগের সুযোগ হারাবে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানি এই তাদের শর্ত মেনে আত্মসমর্পন করেরার সময় মন্তব্য করল …ডিলে ইন আ বিজনেস অব সাচ ইমপোর্ট বিইং অব কনসিকুয়েন্স, উই হ্যাভিং ওয়েল ওয়েটেড দ্য থিং … এজ দ্য ইনভেস্টমেন্ট অব দিস ইয়ার এন্ডোর্ড অন বালাসোর মে বি মাচ রিট্রেঞ্চড, ইফ নট হোললি লস্ট, দোজ পিপল এপিয়ারিং রেসলিউট এট দিস পিঞ্চ অব টাইম এজ ওয়েল নোয়িং আওয়ার নেসেসিটি অব টেকিং দেয়ার গুডস, উই জাজড বেস্ট টু গিভ অর্ডার… (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ২, অংশ ২, ৯৫-৯৬)।
১৬৮১ সালে বালেশ্বরে কোম্পানির বিনিয়োগ মূলত ছিল নিলা, গিগহ্যাম এবং সানোসে মোট ১,৩৮,০০০ টাকা (১৬৭৭ সালে কোম্পানির বালেশ্বরে বিনিয়োগ ছিল ১,৮৭,০০০ টাকা, ১৬৮২ সালে ১,৯৮,৭০০ টাকা, দেখুন ফ্যাক্ট্রই রেকর্ডস, হুগলী, ৭ খণ্ড, অংশ ২, ২১; ও সি, ১৭ জুন, ১৬৮২, ৪৮২৩, ৪২)। এর মধ্যে ২৫০০০ টাকা অগ্রম ব্যবসায়িদের দেওয়া হয়েছিল, যার অংশিদারি দেওয়া গেল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, ডায়েরি এন্ড কনসালটেশন, ২১ জুন ১৬৮১) (সব অঙ্ক টাকায়)
খেমচাঁদ ১২,০০০
নিমদাস ১,২৫৫
হীরা শাহ ৮২৮
গোকুলচাঁদ ১,৮৭৫
রাজারাম ২,১৭৫
সৈয়দ নায়ামতুল্লা ৮৭৫
এনায়েত খান ৮৭৫
ইউসুফ খান ৭২৫
গঙ্গারাম ১,৬৫৬
শিবরাম ৫৭৫
বিহারী ৫৮৫
নীলু শাহ ৫৭৫
ভিখারী শাহ ১,০১১
মোট ২৫,০০০
এই অগ্রিম দেওয়ার তালিকা থেকে স্পষ্ট যে খেমচাঁদ বালেশ্বরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সব থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তিনি একাই মোট দেয় অগ্রিমের ৪৮% দখল করেন। সেই বছরে কোম্পানি বিনিয়োগ আরও বাড়িয়ে ৩৫,০০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সবার আগে কিন্তু ভাবল আগের তালিকা থেকে বাদ পড়া আরেক বড় ব্যবসায়ী চিন্তামন শাহের কথা। যদিও অগ্রিমটার পরিমান তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। তবে অন্য ব্যবসায়ীর তুলনায় যথেষ্ট বেশি, খেমচাঁদের পাওয়া অগ্রিমের তুলনায় যথেষ্ট কম (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, ডায়েরি এন্ড কনসালটেশন, ২১ জুন ১৬৮১)।
১৬৭৯ সালে কোম্পানি চিন্তামন শাহকে কোম্পানির সঙ্গে জুড়ে থাকা প্রধানতম ব্যবসায়ী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও (মাস্টার্স ডায়েরি, খণ্ড ২, ২৩৬), হঠাৎ ১৬৮০ সালের জুলাই মাসে হুগলী কাউন্সিলের পক্ষে তাকে জানানো হল তার কাছে কোম্পানির প্রচুর বকেয়া টাকা পড়ে আছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ১, ২১-২২)। ১৬৮১ সালে তাকে বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশিদারির বাইরে রাখা হল তিনটে কারণে, ইন্টারলোপারদের সঙ্গে তাঁর ব্যবসা, তার বেশ কিছু সমস্যাজনক ধার (স্যর জেমস ফসেট বর্ণিত) এবং নবাব রশিদ খানের সঙ্গে সখ্য (ইএফআই নতুন সিরিজ, ৪ খণ্ড, ২৭১, কোম্পানির মধ্যস্থ হিসেবে চিন্তামনকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ নবাবের সঙ্গে চিন্তামনের অন্তরঙ্গতা, এই তথ্যটি স্যর জেমস ফসেট অগ্রাহ্য করেছেন, দেখুন ইএফআই নতুন সিরিজ, ৪ খণ্ড, ২৭২। চিন্তামন মাঝেমধ্যে ওডিসার নবাব রশিদ খানের গোমস্তা হিসেবে কাজ করতেন, দেখুন, ও সি, ২৫ মার্চ, ১৬৮১, ৪৭২৬, ৪১ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ৩ খণ্ড, অংশ ১, ২০-২১)। ১৬৮১ সালের ২১ জুন বালেশ্বরের কনসাল্টেশনে বলা হচ্ছে হুগলী কাউন্সিল তাদের জরুরি নির্দেশ (এক্সপ্রেস অর্ডার) পাঠিয়ে চিন্তামনের সঙ্গে সব ধরণের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছেদ করতে নির্দেশ দিয়েছে, কারণ সে নবাবের পক্ষে কাজ করে। মধ্যস্থ হিসেবে চিন্তামনকে বাদ দেবার এটা একটা আকর্ষণীয় অজুহাত হলেও মুঘপ্ল আমলার সঙ্গে কাজ করা ছিল অজুহাত মাত্র। আসল কারন ছিল অন্য। কোম্পানি চাইত তার সঙ্গে জুড়ে থাকা দেশিয় ব্যবসায়ীরা যেন প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টারলোপার্সদের সঙ্গে ব্যবসা না করে। এছাড়াও ধারের পাঁকে ডুবে যাওয়াকেও সব থেকে ক্ষতিকর বিষয় বলে মনে করত। এই সব কারণ দেখিয়ে তারা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ বিশেষ ব্যবসায়িক মধ্যস্থকে ছাঁটাই করেছে। চিন্তামনের কাছে কোম্পানির যে পরিমান অর্থ ফেরত পাওয়ার অঙ্ক দেখানো হয়েছে, সেই পরিমানটাও আমার কাছে খুব একটা বড় অঙ্ক বলে মনে হয় নি। কোম্পানির খাতায় ধারের পরিমান ছিল ৫,৭২৯ টাকা ৩ আনা ৪ পাই ছিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণদ ১, ডায়েরি এবং কনসালটেশনস, ২১ জুন ১৬৮১)। অন্যদিকে খেমচাঁদ এগিয়ে এসে কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টি করে বলে চিন্তামনের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া তার পক্ষে কোম্পানির এত বড় কাজ তোলা সম্ভব নয় এবং জানালেন তিনি চিন্তামনের হয়ে জামিন দিতেও রাজি(ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৩, অংশ ১, ৪৪; ও সি, ৮ জুলাই, ১৬৮১, ৪৭৪২, ১৪ খণ্ড; ফ্যাক্ট্ররি রেকর্ডস বালেশ্বর, খণ্ড ১, ডায়েরি এন্ড কন্সালটেশন্স, ২১ জুন ১৬৮১)। তার ঋণের জামিন হিসেবে চিন্তামন ৫০০০ টাকা কুঠিকে দিল। এই টাকাটা সায়ামের (শ্যামদেশ) রাজার কুঠিয়াল পেত(সায়ামের রাজার সঙ্গে এই সময় বাংলার নিয়মিত ব্যবসা চলছিল। ১৬৮২ সালে তার চারটে জাহাজ বাংলায় আসে শ্যাম দেশের নানান পণ্য নিয়ে। তাঁর দেশ থেকে রপ্তানি করা পণ্যগুলোর মধ্যে হাতি ছিল সব থেকে বেশি, দেখুন কে এ, ১২৬৭ খণ্ড, ১৩৯৮) এবং এর সুদ হয় ৬০০ টাকা। হুগলী কাউন্সিল এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওরার দায় চাপিয়ে দিল বালেশ্বর কুঠির কুঠিয়ালের ওপরে। কারণ তিনি জানিয়েছিলেন, তারা আরেকবার চিন্তামনকে সুযোগ দিয়ে দেখতে চান (ও সি, ৮ জুলাই ১৬৮১, ৪৭৪২, খণ্ড ৪১; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ১, ২৯; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, ডায়েরি এন্ড কনসালটেশন, ২১ জুন, ১৬৮১)। (চলবে)