ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
মজার ব্যাপার হল কোম্পানি এই সময়েই বালেশ্বরে কোম্পানির বিনিয়োগ নিশ্চিত করা নিয়ে খেমচাঁদ, চিন্তামন ইত্যাদি জোটের ওপর অত্যধিক নির্ভরতার অসুবিধের মত সমস্যা মোকাবিলা করার চিন্তাভাবনা করছিল। ১৬৭৯ সালে হুগলীর এজেন্ট ম্যাথিয়াস ভিন্সেন্ট বালেশ্বর কুঠিয়ালকে লিখল যতক্ষণনা খেমচাঁদ ইত্যাদি এবং তাদের ওপর নির্ভর করে থাকা ব্যবসায়ীদের ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে, ততদিন যেন বালেশ্বর পণ্যগুলো তাদের কাছে না পাঠায় (ও সি, ৯ ফেব, ১৬৭৯, ৪৫৭৬, ৩৯ খণ্ড)। ১৬৮১ সালে হুগলী কাউন্সিল সিদ্ধন্ত নেয় যে, বালেশ্বরে বিনিয়োগ পাঠানোর সব থেকে শ্রেষ্ঠ উপায় হল এই সব প্রখ্যাত ব্যবসায়িকে এড়িয়ে ব্যবসা করা (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৩, অংশ ১, ৪৪)। এই সিদ্ধান্তের ফলে এবং লন্ডনের কর্তাদের ইচ্ছা মত নতুন বনিকদের সঙ্গে কাজ করার উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে যারা খেমচাঁদের (ব্যবসা এবং ব্যবস্থাপনা) শৃঙ্খলের সঙ্গে জড়িয়ে নেই (ডি বি, ৫ জুন, ১৬৮১, ৮৯ খণ্ড, ২৫৬-৫৭; ফ্যাকক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ১, ২৯), সেই সব বণিককে চিহ্নিত করে বালেশ্বরের কুঠিয়ালেরা ১৬৮১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সেই বছরের জন্যে চাহিদার পণ্য সরবরাহের জন্যে মোট বিনিয়গের ২০,০০০ টাকা অগ্রিম দিয়ে রেওয়াদাস এন্ড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় এই বয়ানে —
রেওয়াদাস ৫,৫০০
বুলচাঁদ ৩,৫০০
শ্যামদাস ৫,৭৫০
অভিরাম ৫,২৫০
মোট ২০,০০০
চুক্তি করে হুগলী কাউন্সিল খুশি যে, খেমচাঁদ আর তার সঙ্গী ব্যবসাদারদের তুলনায় রেওয়াদাস এন্ড কোম্পানি অনেক প্রতিযোগিতামূলক দামে কোম্পানিকে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে। বালেশ্বর কুঠিয়ালেরা যে মিথ্যা আরোপ লাগিয়ে বলেছিল, ব্যবসায়ীরা খেমচাঁদের ভয়ে ভীত হয়ে কোম্পানির সঙ্গে আলাদা চুক্তি করতে চাইছে না, সেটা মিথ্যা প্রমান হল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, ডায়েরি এন্ড কনসালটেশন, ২৯ আগস্ট, ১৭ অক্টো ১৬৮১)। এই কাণ্ড থেকে অবশ্যই বালেশ্বরের প্রধানতম ব্যবসায়ী হিসেবে, ব্যবসায়ী মহলে খেমচাঁদ অথবা চিন্তামনের প্রভাব কম হওয়ার অবস্থা বোঝায় না। এমন কি ১৬৮২ সালেও খেমচাঁদ কোম্পানির সঙ্গে প্রধানতম দরকষাকষির ব্যবসায়ী ছিল, যদিও তখন তার কোম্পানির প্রধানতম ব্যবসায়ী তকমা ছিল না। সে বছরে বিনিয়োগের পরিমান ছিল ১,৯৮,৭০০ টাকা এবং হুগলি কাউন্সিলের অংশিদারিত্ব নির্ধারণ করার হিসেবটা হল, খেমচাঁদ এবং চিন্তামন ৫৫,০০০ টাকা (চিন্তামন ২০,০০০ টাকা), রেওয়াদাস মাহাত এবং মহম্মদ হুসেন ৩৭,৫০০, রাজারাম দাস ২১,০০০, হীরা শাহ ২০,০০০, এবং বাকি অংশ ১৩ জন ব্যবসায়ীকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল (ও সি, ১৭ জুন, ১৬৮২, ৪৮২৩, ৪২ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ১, ৫৭)। এই বার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খেমচাঁদ জানিয়ে দিলেন, যতক্ষণনা তার প্রধান ব্যবসায়ী খেতাব ফিরিয়ে না দেওয়া হচ্ছে সে বিনিয়োগের কোনও অঙ্কই স্বীকার করছে না করবেন না এবং তিনি কোম্পানির দেওয়া কোন অগ্রিম (imprest) অর্থ গ্রহণ করছে না আর কোম্পানির হয়ে পণ্যের বরাতও জারি করবে না (ও সি, ১৭ জুন ১৬৮২, ৪৮২৩, ৪২; ২৭ জুন, ১৬৮২, ৪৮২৪, ৪২ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ১, ৫৮)। বালেশ্বরের কুঠিয়ালদের হুগলি কাউন্সিল নির্দেশ দিল, খেমচাঁদ যদি তার অংশ নিতে অস্বীকার করে, তাহলে তারা যেন খেমচাঁদের অংশটা নতুন চুক্তিবদ্ধ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভাগ করে দেয় এবং এই বছর থেকে বালেশ্বরের কুঠিতে প্রধান ব্যবসায়ী বলে কোনও পদ থাকবে না। দেখতে ঝবে কোনও বড় ব্যবসায়ীর ওপর অন্য ছোট ব্যবসায়ী যাতে নির্ভর না করে (ও সি, ১৭ জুন, ১৬৮২, ৪৮২৩, খণ্ড ৪২; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ১, ৫৮)। হুগলি কাউন্সিলের নির্দেশে বালেশ্বরের কুঠিয়ালরা খুব যে খুশি হল বলা যাবে না। তারা লিখল, এই সিদ্ধান্তে কোম্পানির কাজকর্মে বিরূপ প্রভাব পড়বে। তারা জানাল ব্যক্তিগত উদ্যমের একটি জাহাজ বালেশ্বরে এসে পৌঁছেছে, এবং আগামী দিনে আরও অনেকগুলি এসে পৌঁছবে, এবং খেমচাঁদ যদি তার বিরোধিতায় অটল থাকে, তাহলে সে সেই (জাহাজগুলির) পণ্যের জন্যে অন্য ক্রেতা (যেমন ইন্টারলোপার্স) খুঁজে নেবে। বাস্তবিকভাবে সে ততদিনে দেশজুড়ে তার গোমস্তাদের এক লক্ষ টাকা অগ্রিম দিয়ে বিভিন্ন দেশিয় বাজারে তাঁতিদের সঙ্গে দেখা হলেই তাকে অগ্রিম বরাত দেওয়ার জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বালেশ্বর কুঠিয়ালেরা লিখল, তাকে আমাদের সঙ্গে জুড়ে রাখা বাস্তবজনোচিত এবং অত্যাবশ্যকিয় কাজ হবে, বিশেষ করে এই বছরের ব্যবসা তোলার জন্যে; আমরা সেটা যদি করতে না পারি, তাহলে আমরা যে ছোট অংশ বরাত দিয়েছি, সেই পরিমান ব্যবসা তোলা সম্ভব হবে না (ও সি, ১৪ জুলাই, ১৬৮২, ৪৮২৯, ৪২ খণ্ড)।
তবে ১৬৮৪ সাল নাগাদ খেমচাঁদের ভাগ্য পড়তে শুরু করে, অন্তত কোম্পানির প্রধান কুঠিলের চোখে খেমচাঁদের বিশেষণগুলো হল, ‘ইন্টারলোপারদের উৎসাহদাতা’, ‘অস্বচ্ছল ব্যক্তি’, ‘আমাদের কোম্পানির জন্যে একটি কড়ি বিনিয়োগ পাওয়ারও অযোগ্য’, এবং ‘বড় বিনিয়োগ পাওয়ার জন্যে অনুপযুক্ত ব্যক্তি’ (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ১০ খণ্ড, ১১-১২)। আমাদের মনে হয় এই সময় থেকেই কোম্পানির প্রধান ব্যবসায়ীর মুকুটটি খেমচাঁদের থেকে চিন্তামন শাহের মাথায় উঠল (ইএফআই, নতুন সিরিজ, খণ্ড ৪, ৩৪৪; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১৩ মার্চ ১৬৮৪; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ২, ৯)। ১৬৮২ সাল থেকেই কোম্পানির বিশ্বস্ততা অর্জন করে চিন্তামন। সেই বছরে তার গোমস্তা মালদার কুঠিকে মাসে ১ শতাংশ সুদে ১০ হাজার টাকা ধার দেয় (সাধারণ ধারের হার ছিল ১.২৫, ১.৫ শতাংশ প্রতি মাস)। ১৬৮৪ সালে খেমচাঁদ এবং চিন্তামনের থেকে ৮৫০০ টাকায় বিল অব এক্সচেঞ্জ নেয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ১০ খণ্ড, ৪৭; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, ক্যাশ একাউন্ট অব মার্চ, ১৬৮৪)।
ইন্টারলোপারা সম্মানিত কোম্পানিকে ব্যবসা ক্ষেত্রে নিয়মিত ধাক্কা দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ব্যবসায়ীদের চাকরি খাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হল ইন্টারলোপারদের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনওরকম সম্পর্ক রাখা যাবে না — কোম্পানির এই হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ইন্টারলোপারদের সঙ্গে উভয় ব্যবসায়ীই নিয়মিত ব্যবসা করেছে(ফ্যাক্টরি ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, দায়েরি এন্ড কন্সালটেশনস, ২ অক্টো, ১৬৮০)। এর আগে আমরা দেখেছি কোম্পানির খাতায় বলা হয়েছে খেমচাঁদ ইন্টারলোপারদের উৎসাহদাতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, যতদূর সম্ভব এই জন্যেই তিনি কোম্পানির বালেশ্বর কুঠির প্রধান ব্যবসায়ী খেতাবটি খোয়ান। বহুবার কোম্পানি বাংলার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইন্টারলোপারদের সম্পর্ক ছিন্ন করতে চেয়েছে, কিন্তু তাদের সাফল্য আসে নি। ১৬৮৩ সালে হুগলি কাউন্সিল বালেশ্বর কুঠিয়ালদের নির্দেশ দেয়, খেমচাঁদ এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীকে তারা সেই বছরের জন্যে যে পরিমান বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার থেকে বালেশ্বরের কুঠিয়ালেরা যেন বিচ্যুত না হয় কারণ ব্যবসায়ীরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে জুড়ে থেকেই বড়লোক হয়েছে, সেই কোম্পানির সঙ্গ ছাড়া সেই ব্যবসায়দের পক্ষে অসম্মানজনক হবে (ও সি, ২ মে, ১৬৮৩, ৪৯৪১, ৪৩ খণ্ড)। সেই বছরের আরও একটি নির্দেশে তাদের জানানো হয়, খেমচাঁদ এবং চিন্তামনকে যেন বার বার ইন্টারলোপারদের সঙ্গে ব্যবসা না করার প্রতিশ্রুতি আর দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়, এই আশায় যে এই মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটি অবশেষে হয়ত কাজ করতেও পারে, এবং তারা তাদের সম্মান বজায় রেখে কোম্পানির স্বার্থের বিরুদ্ধে যারা কাজ করছে, তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা থেকে বিরত থাকবে (ও সি, ৩০ মে, ১৬৮৩, ৪৯৪৭, ৪৩ খণ্ড)। কিন্তু কোম্পানির সব চেষ্টাই ব্যর্থ হল। বালেশ্বরের ব্যবসায়ীরা কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করার খোয়াইশে ইন্টারলোপারদের সঙ্গ ছাড়ে নি। এমনকি ১৬৮৪ সালে কোম্পানির স্বার্থের বিপরীতে কাজ করে, কোম্পানির হুঁশিয়ারি শুনেও, ঢাকায় চিন্তামনের গোমস্তাকে ঢাকার তাঁতের বাজার থেকে যতদূরসম্ভব ইন্টারলোপারদের দেওয়া বরাত অনুযায়ী বেশ ভাল পরিমানে পিস-গুডস কাপড় কিনতে দেখা যায়। যদিও হুগলী কাউন্সিল বলে দিয়েছিল ব্যবসায়ীরা যেন ইন্টারলোপারদের মত দুর্বৃত্তদের সুবিধার জন্যে কাজ না করে, কিন্তু বাস্তবে তারা বাংলার ব্যবসায়ীদের ইন্টারলোপারদের সঙ্গে কাজ করা থেকে নিবৃত্ত করতে পারে নি (ও সি, ৫২৬৪, ৪৪ খণ্ড; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ২, ১৯৫)। (চলবে)