ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চিন্তামন এবং খেমচাঁদের কাজে অতীব ক্ষুব্ধ হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানিকে এই দুই প্রধান ব্যবসায়ী এবং তাদের সঙ্গী ছোট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তিতোমুখে কাজ করতে হয়েছে, কারণ কোম্পানির ব্যবসা তুলতে এই দুই ব্যবসায়ী এবং তার দলবল অপরিহার্য ছিল। কোম্পানির শুধু বিনিয়োগের নিরাপত্তার জন্যেই বালেশ্বর কুঠিয়ালদের এই দুই ব্যবসায়ি দলের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হচ্ছিল তাই নয়, স্থানীয় ক্ষমতার সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্যেও এই ব্যবসায়িদের সঙ্গ করা কোম্পানির বাধ্য ছিল কারণ স্থানীয় ক্ষমতাধরদের সঙ্গে এই ব্যবসায়ী জোটের সুমধুর সম্পর্ক প্রায় সকলেই জানত। ১৬৮৫-তে হুগলী কাউন্সিল বালেশ্বরের কুঠিয়ালদের নির্দেশ দেয় তারা যেন হুগলীর ফৌজদার মামুদ বরখুরদারকে শান্ত করার জন্যে ওডিসা প্রধান মাহমুদ শাহকে প্রভাবিত করে। সে সময় বরখুরদারের রোষের শিকার হয় হুগলি কাউন্সিল। আবারও সেই বছর চিন্তামন এবং খেমচাঁদকে কোম্পানির সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তির দরকষাকষি চালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নতুন করে কোম্পানির ব্যবসায়ি হিসেবে নিয়োগপত্র দিতে বাধ্য হয় (ও সি, ২ এপ্রিল, ১৬৮৫, ৫৩৫৫, ৪৫ খণ্ড; ৯ মে ১৬৮৫, ৫৩৭৮, ৪৫ খণ্ড)।
শতাব্দের আটের দশকের শেষের দিকে আস্তে আস্তে দুই ব্যবসায়ীরই ক্ষমতা এবং প্রভাব কমছিল। ১৬৮৭র নভেম্বরে খেমচাঁদের মৃত্যু হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ১১ খণ্ড, ১৮৭) এবং চিন্তামন শাহের অস্বচ্ছলতার অভিযোগে কোম্পানি তার ব্যবসায়িক অংশিদার এবং দলবলের বিরুদ্ধে সামারি প্রসিডিংস শুরু করে। অভিযোগ চিন্তামন কোম্পানির থেকে প্রচুর ধার করেছিল, এবং যেহেতু তার সম্পত্তি ক্রোক করে সম্পদ উদ্ধারের কোনও আশা কোম্পানির ছিল না, তাই তারা চিন্তামনের জাহাজ দখল নেয়। ১৬৮৬ সালে যখন খেমচাঁদের আংশিক অংশিদারত্বে চিন্তামনের জাহাজ বালেশ্বরে পৌঁছয়, ক্যাপ্টেন নেলসন সেই জাহাজ দখল নেয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, কনসাল্টেসন, ১৬ নভে, ১৬৮৬)। ১৬৮৭ সালে বালেশ্বর কুঠিয়ালেরা লিখল, চিন্তামন কানাকড়ির যোগ্য নয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১১, ১৮৯)। কিন্তু পরের দিকের কোম্পানির কাগজপত্রে আমরা প্রমান পাচ্ছি যে চিন্তামন তার নিজের উদ্যমে বেশ ভাল পরিমানে ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছে। ১৬৯১ সালে চিন্তামন, কোম্পানির বেঙ্গল মার্চেন্ট নামক ব্রিটিশ জাহাজ ১৭,০০০ টাকায় কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ১, অংশ ২, ৯৫, ১২৭, অংশ ২, ১৩২, ১৪২)। সেই বছর চিন্তামনের দুটো জাহাজ টেনাসরিম এবং মালদ্বীপে ব্যবসা করতে যায়(ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ১, অংশ ২, ৩১, ৩৬, তার একটা জাহাজের নাম পাচ্ছি জগন্নাথপ্রসাদ)। ১৬৯৫ সালেও তার ১০ হাজার মনের ফতেচাঁদ নামে জাহজ মালদ্বীপে ব্যবসা করতে গিয়েছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৯, অংশ ২, ১৯, ৪৫)। ১৬৯৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর কোম্পানি মালদ্বীপ থেকে ১৬,০০০ টাকা মূল্যের কড়ি এবং অন্যান্য পণ্য আমদানি করা জাহাজে একজন পিয়ন নিযুক্ত করে (এই উদ্দেশ্যে, কোম্পানির ১০,১৩৮ টাকা ধার যাতে সহজে আদায় করা যায়) যাতে এই জাহাজের বিক্রি বা জাহাজের পণ্য বিক্রি বন্ধ করা যায়। ব্যবসায়ীর জামাই রাম রায়, তার শ্বশুরের কাগজপত্র নির্ভর করে জাহাজ দখল দেওয়ার বিরুদ্ধে এবং ১৬৮৬ সালের যুদ্ধের সময় কোম্পানির কাছে তার শ্বশুরের যে ধার ছিল সেই ধার উদ্ধার করতে কোম্পানি যেভাবে অনেক বেশি দামের জাহাজ দখল নেয়, তার বিরুদ্ধে মামলা করে। হাউএভার দ্য কোম্পানি ফাউন্ড আদার ক্রেডিটর্স অব চিন্তামন ক্ল্যামারিং ফর সাটিসফ্যাকশন আউট অব দ্য শিপস এবং শেষে কোম্পানির যতদিন না ধার শোধ না হয়, ততদিন তারা রাম রায়ের সঙ্গে বাৎসরিক ৭০০ টাকা শোধের চুক্তি করতে বাধ্য হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ২ খণ্ড, অংশ ১, ১৬২, ১৯৫; খণ্ড ৯, অংশ ২, ৮৯-৯০, ১০৫, ১২৪; খণ্ড ১০, অংশ ১, ৩)।
আমরা হুগলীতে মথুরাদাসকে দেখি কোম্পানির প্রধান ব্যবসায়ি হিসেবে; কোম্পানির সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু সেই শতকের সাতের দশক থেকেই, তবে প্রধান ব্যবসায়ী হিসেবে তার নাম পাই আটের দশক থেকে শুরু করে। তার নিজের বক্তব্যের সূত্র ধরে বলতে পারি, সে কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করেই প্রখ্যাতি অর্জন করেছে (ও সি, ১৪ ডিসে, ১৬৯৪, ৫৯৪৯, ৫০ খণ্ড)। বালেশ্বরের ব্যবসায়ী খেমচাঁদ এবং চিন্তামনের মতই, মথুরাদাস শুধু কোম্পানির বণিক হিসেবেই নয়, হুগলীর অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ ব্যবসায়ি হিসেবে গণ্য হতেন। তার সময়ের অন্যান্য বাংলার ব্যবসায়ীর মতই, বিভিন্ন কোম্পানির আমদানি কেনার সঙ্গে সঙ্গেই, নানান ধরণের পণ্যের ব্যবসা করতেন আর ইওরোপিয় কোম্পানিদের ইওরোপিয় ব্যবসার জন্যে বেশ ভাল পরিমান অর্থ ধার দিতেন। ১৬৭৯ সালে ৬০০০টি রুমালের জন্যে কোম্পানির সঙ্গে মথুরাদাস চুক্তিবদ্ধ হন, যার মূল্য ছিল ৩০,০০০ টাকা। এই পরিমান কোম্পানি শোধ করত অর্ধেক নগদে এবং অর্ধেক কোম্পানির আমদানি করা পণ্যে। সেই বছরেই তিনি কোম্পানির থেকে ২০,০০০ টাকার বিনিময়ে ১৫০০ তোলা সোনা কেনেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ২, অংশ ১, ৬৮, ৯৫-৯৬)। পরের বছর কোম্পানি তাকে ১৩টা ধনসম্পত্তিওয়ালা সিন্দুক বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয় (১১টাই উচ্চমানের (ফাইন) রূপোর বাট (বার) এবং অন্যদুটিতে ভর্তি রিয়াল, যার মূল্য ছিল ১ লক্ষ টাকা), কাশিমবাজারের শুকানন্দ শাহের চুক্তির শর্তে এবং একই হারে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলি, ২ খণ্ড, অংশ ২, ৯৮; এই ধনসম্পত্তিওয়ালা সিন্দুকের মূল্যমান নির্ধারণ করেছি হুগলীর কুঠির তথ্যানুসারে, খণ্ড ২, অংশ ২, ১০১ এবং এজিডি, ১১ রেঞ্জ, ৪১ খণ্ড, ২১, ২৬)।
খেমচাঁদ এবং চিন্তামন শাহের মত, মথুরাদাস কিন্তু কোম্পানির মধ্যস্থ হিসেবে বিখ্যাত হন নি, বরং তার পরিচিতি ছিল প্রভাবশালী এবং স্বচ্ছল, স্বনির্ভর, কোম্পানি নিরপেক্ষ ব্যবসায়ী হিসেবে। তিনি নিজেও ব্যবসা করেছেন অন্যান্য ইওরোপিয়, বিশেষ করে ফরাসী এবং ইন্টারলোপারদের সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবে একচেটিয়া ব্যবসায়ের তত্ত্বে ডুবে থাকা ব্রিটিশ কোম্পানির বিরক্তি উৎপাদন করেই তিনি সমান্তরালভাবে ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছেন। কাশিমবাজার কুঠিয়ালদের অভিযোগ ছিল তিনি কাশিমবাজারে একমাস অবস্থান করে কোরা রেশমের জন্যে তিনি বিপুল অর্থ অগ্রিম দেন এবং বেশ কিছু কোম্পানি নির্ধারিত পাইকারকে ফুসলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ২, ডায়েরি, ২ জুন ১৬৮২)। একই বছরে কোম্পানি আরও অভিযোগ করে পাইকারেরা অস্বাভাবিক দাম চাইছে এবং তাদের দুই নেতা চতুরমল এবং গোবিন্দজী, মথুরাদাসের সঙ্গে মিলে পাইকারদের একটা বড় অংশকে কোম্পানির সঙ্গে কাজ না করার জন্যে মন্ত্র দিচ্ছেন এবং তাদের কথার বিরুদ্ধাচরণ করলে তারা ১০০০ টাকা জরিমানা নিচ্ছে। ফ্যাক্টরি সূত্র জানতে পাচ্ছি, মথুরাদাস পাইকারদের মনভোলানো দামের প্রস্তাব দিচ্ছেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ২, ডায়েরি, ১৭ জুন ১৬৮২; খণ্ড ৪, অংশ ১, ২৯)। লন্ডনের কর্তারা বাংলা কাউন্সিলকে জানালেন তারা যেন মথুরাদাসের একচেটিয়া ব্যবসার আওতা থেকে বের হয়ে এসে মথুরাদাসকে বাদ দিয়ে অন্য ১০০ ব্যবসায়ীকে নিয়ে একটি অংশিদারি (জয়েন্ট স্টক) কোম্পানি তৈরি করে, কিন্তু কুঠিয়ালেরা এই কাজ করতে চরম ব্যর্থ হয় (ডি বি, ৫ সেপ্ট, ১৬৮৩, খণ্ড ৯০, ২১৯)। ১৬৮৪ সালে যখন মথুরাদাস কোম্পানির প্রধান ব্যবসায়ী, তখনও তিনি কোম্পানিকে রুষ্ট এবং স্বার্থ হানি করে ঢাকা থেকে বিপুল পরিমান কাপড় কিনছেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ২, ১৫২; খণ্ড ১০, ২০৭)। তিনি কোম্পানির ১৪০০০ টাকা পুঁজি সুদ সহ ফেরত দিতে গড়িমসি করায় কোম্পানির সঙ্গে তার তিক্ততা বাড়ে।
১৬৮৬-৮৮ পর্যন্ত চলা যুদ্ধের পরে কোম্পানি নতুন করে বাংলায় থানা গেড়ে বসার পর প্রাণপন চেষ্টা করল মথুরাদাস নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে। বাংলায় কোম্পানির এজেন্ট জোব চার্নক, হুগলীর কুঠিয়াল স্ট্যানলিকে লিখছেন চতুরমল, সদানন্দ এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে, বিশেষ করে যে সব ব্যবসায়ী দুর্বৃত্ত খলনায়ক মথুরাদাসের সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নয়। তার নির্দেশ মথুরাদাসের সঙ্গ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা হোক (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৫ খণ্ড, অংশ ১, ৭)। তিনি ঢাকার চার্লস আয়ারকে নির্দেশ দেন, নবাবের থেকে এত বেশি পণ্য কিনুন যাতে সে (মথুরাদাস) অপ্রতিভ হয়ে মথুরাদাস বাংলা ছাড়তে বাধ্য হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৫ খণ্ড, অংশ ১, ১৫। জোব চার্নক একই নির্দেশ নিয়মিত বিভিন্ন কুঠিতে পাঠিয়েছিলেন, তথ্য দেখুন, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ১, অংশ ১, ২১, ৩০, ৪১; খণ্ড ৯, অংশ ১, ৪০)। মনে হয় নবাবের থেকে, কোম্পানি, মথুরাদাসকে নিয়ে হুগলীর ফৌজদার আলি আকবরকে পাঠানো একটা পরওয়ানা পায় যেখানে স্পষ্ট করে লেখা ছিল মথুরাদাস যদি কোনও দিন ব্রিটিশদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ী হিসেবে মথুরাদাস যে প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করেছিলেন এই নির্দেশে সেই প্রভাব প্রতিপত্তিতে দাগ পড়ল না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৯ খণ্ড, অংশ ১, ৭৬)। কুঠিয়ালদের লেখা নথিপত্র থেকে পাচ্ছি, ফৌজদার এই পরওয়ানায় প্রবল ক্ষুব্ধ হন, এবং নবাবকে লেখেন, যে ব্যক্তি বছরে শাহী খাজানায় ১৮,০০০ টাকা রাজস্ব দেন, তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা সোজা হবে না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খন্ড ৯, অংশ ১, ১৫০। সেই যুগে হিন্দুরা সাধারণত ৫ শতাংশ বহিঃশুল্ক দিত, তাহলে তার বাৎসরিক ব্যবসা ছিল [কোম্পানির বিনিয়োগ বাদ দিয়ে, কারণ কোম্পানির কেনা পণ্য, তার পাওয়া দস্তক অনুসারে এই শুল্কের আওতায় আসত না] খুব কম করে ৪ লক্ষ টাকা)। কোম্পানিও শীঘ্র বুঝতে পারল, মথুরাদাস ১৬৯১তে হুগলীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ি হয়ে উঠেছেন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ছাড়া বাংলায় কোম্পানির পূর্ণ বিনিয়োগ উদ্ধার করা সম্ভব নয়। (চলবে)