ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ী এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
কোম্পানি বাংলা ব্যবসা সূত্রে ব্যবসায়ী মথুরাদাসের সঙ্গ ছাড়তে পারছিল না, এবং বাংলা কাউন্সিল তার সঙ্গে যতটা পারা যায় একতরফা বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রেখে চলছিল। এইভাবেই ১৬৯৪ সালের প্রথম দিকে তাকে ১৭,০০০ টাকা অগ্রিম দেওয়া হল কোম্পানির পক্ষ থেকে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসেলেনিয়াস, খণ্ড ৩এ, ২৬৮; ও সি, ১৪ ডিসে ১৬৯৪, ৫৯৪৯, ৫০ খণ্ড)। কোর্ট অব ডিরেক্টর্স বাংলা কাউন্সিলকে জানাল মথুরাদাসের বিরুদ্ধে প্রমানযোগ্য সত্যকারের বিপুল অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, তাকে লাগিয়ে রাখতে হবে, কারণ তার কাছে প্রচুর পণ্য পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং ক্ষমতাকেন্দ্রে বহু শক্তিশালী বন্ধুও আছে। তারা লিখল, তোমরা তাকে অনুরোধ কর যে মথুরাদাস তার পণ্য পাঠাচ্ছে, সে সবগুলোয় নির্দিষ্ট চিহ্ন দেয়, যাতে অন্য পণ্যের সঙ্গে তার পণ্য গুলিয়ে না যায় এবং গুণমানের ওপর নজরদারি করা যায়। একই চিঠিতে তারা জানাল মথুরাদাস ক্যাপ্টেন ড্রোলের ডেসপ্যাচে যে পণ্য পাঠিয়েছিল সে সব কটাই গুণমানে সর্বোচ্চ ছিল এবং সেই পণ্যের মধ্যে এমন কিছু পণ্য ছিল যেগুলি অতীতে আমাদের কুঠিয়ালেরা পাঠাতে পারে নি (ডি বি, ১৪ মে, ১৯৯৬, ৯৩ খণ্ড, ৪৯৪)।
এখানে আমরা একটা প্রশ্ন তুলছি, মাত্র কয়েক বছর আগে তার বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগ আনা ব্রিটিশ কোম্পানি, কেন বাংলা ব্যবসায় হঠাৎ তাকে এত অপরিহার্য হিসেবে গণ্য করতে লাগল! উত্তর খুবই সহজ সাধারণ, কোম্পানি জানত মথুরাদাস প্রতিপত্তিওয়ালা প্রভাবশালী ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী। মথুরাদাস শুধু যে ইওরোপে পণ্য পাঠাবার জন্যে বিনিয়োগ জোগাড় করে দেওয়ার কাজে দক্ষই ছিলেন না, তিনি কম সুদেও টাকা ধার দিতেন। ১৬৯৬ সালে বাংলা কাউন্সিলে কোর্ট লিখল, তোমাদের ভাঁড়ারে যদি কম পণ্য থাকে, তাহলে আমরা যুক্তিসঙ্গতভাবে আশাকরতে পারি, মথুরাদাস … তোমাদের কম সুদে টাকা ধার দিতে পারে, ঢাকা থেকে আমাদের বলা হয়েছে এই মহান মানুষটি বাৎসরিক ৪ শতাংশ সুদে টাকা ধার দেন (ডি বি, ১৪ মে, ১৬৯৬, ৯২ খণ্ড, ৪৯৫)। হয়ত এই কারনেই কোম্পানির মথুরাদাসের ব্যবসায়ী কবল থেকে বেরিয়ে আসার কোনও ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না। মথুরাদাস এক সময় ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি বাংলায় যে সব পণ্য আনত, সেগুলির সে একচেটিয়া ব্যবসা করেছে। বহুবার সে কোম্পানির সম্বৎসর আমদানি করা ব্রিটিশ ব্রডক্লথের সব কটা গাঁটরি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। ১৬৯৮ সালে মথুরাদাস কোম্পানির আমদানি করা ২ লক্ষ টাকার রূপো এক লপ্তে কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও নবাবের ভয়ে সেই প্রস্তাব নিয়ে আর কোম্পানি এগোয় নি (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৩ খণ্ড, অংশ ১, ১২১)।
কিন্তু কোম্পানি মথুরাদাসের একচেটিয়া ব্যবসায়িক মনোভাবে এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে জোট বাঁধার উদ্যমের দিকে শঙ্কিত হয়ে নজরদারি করছিল। কোম্পানির বাংলা কাউন্সিলের সঙ্গে মথুরাদাসের তিক্ততা চরমে পৌঁছয় ১৬৯৯ সালে। সে বছর তিনি দুই ব্যবসায়ী উদয়চরণ এবং গোকুলচাঁদকে পাশে নিয়ে কোম্পানির দাদনি অগ্রিম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তাঁর শর্ত ছিল বহিষ্কৃত দুই ব্যবসায়ী নয়নসুখ এবং প্রাণনাথের (যারা কোম্পানির অধমর্ণ ছিল) সঙ্গে কোম্পানি নতুন করে ব্যবসা শুরু করুক, এবং মথুরাদাসের শত্রু গোলাপ রায়ের বাবার সঙ্গে কোম্পানি চুক্তি করতে অস্বীকার করুক। কলকাতার কুঠিয়াল লিখল মথুরাদাসের এই ঔদ্ধত্য কোম্পানির পক্ষে অসম্মানজনক, ইজ গ্রেটলি ওয়িং টু দ্য কাউন্টিনেন্স হি হ্যাথ হ্যাড ফ্রম থিস এজেন্সি, ফর আপন ক্যাপ্টেন ডোরিলস এরাইভ্যাল হি ওয়াজ এট দ্য ব্রিঙ্ক অব ডেস্ট্রাকশন, হিজ ক্রেডিট রুইনড, এন্ড কুড নট হ্যাভ সাবসিস্টেড আবাভ আ ইয়ার লঙ্গার, বাট দ্য এরোনিয়াস একাউন্ট দ্যাট ওয়াজ গিভন অব হিম টু দ্য রাইট অনারেবল কোম্পানি গেইনড দেয়ার এস্টিমড এন্ড গট হিম ক্রেডিট এগেইন আফটার হি রিসিভড দেয়ার ইম্প্রেস্ট মানি (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৩, অংশ ২, ১২৮-২৯)।
কোম্পানি মথুরাদাসের দাবি মেনে নিল না। যখন দেখাগেল তিনি কোম্পানির কাছে দাদনি অগ্রিম পাওয়ার জন্যে আবেদন করেন নি, তখন তার জন্যে রাখা বরাদ্দ ২,৫০,০০০ টাকা অন্য ব্যবসায়িদের মধ্যে বেঁটে দেওয়া হল(ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৩, অংশ ২, ১৪০-৪১)। কোম্পানির এই পদক্ষেপে, স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে মথুরাদাস কোম্পানির সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে কোম্পানির থেকে ১ লক্ষ টাকা অগ্রিম নিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৩, অংশ ২, ১৫৫)। ১৭০০ সালে নতুন কোম্পানির সঙ্গে মথুরাদাস আরও বেশি যোগাযোগ রেখে চলতে থাকে এবং কোম্পানির ব্যবসার সমস্ত দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়। তিনি ঠিক করলেন, নতুন কোম্পানির হাতে বাদশার ফরমান না থাকার দরুন তার যদি শুল্ক বাকি পড়ে তাহলে সেই বাকি শুল্কও তিনি মিটিয়ে দেবেন(রেকর্ডস অব ফোর্ট সেন্ট জর্জ, লেটার্স টু ফোর্ট সেন্ট জর্জ ১৬৯৯-১৭০০, ৪২ পাতা)। বছরের শুরুতে শাহজাদার থেকে নিশান না পাওয়ার ঘটনায় পুরনো কোম্পানির কুঠিয়ালেরা লিখল মথুরাদাস সুবার রাজনীতিতে হাস্যকর হয়ে উঠেছে, তার সম্মান ধুলোয় মিশেছে, তিনি নতুন কোম্পানির ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন (পূর্বোল্লিখিত, ৪১ পাতা, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৭, অংশ ৩, ১৪)। ১৭০২ সাল নাগাদ ফোর্ট উইলিয়াম জেনারেল লেটার্স থেকে পাচ্ছি মথুরাদাস থুত্থুড়ে বৃদ্ধ হয়েছেন গ্রোউন ভেরি ওল্ড এন্ড গোয়িং অফ দ্য স্টেজ হু হ্যাথ বিন আ বার্ড রেইজড আপ টু পিক এট ইয়োর ওউন আইজ। অলদো হি ইজ গ্রোন ভেরি রিচ, সিনস দ্য নিউ কোম্পানিজ সেটিং ইন হুগলি, ইয়েট উইদাউট দ্য ইন্টারেস্ট অব দ্য ইংলিশ উইদিন ফাইভ ইয়ার্স উড বি ব্রট টু এজ লো এন এব এজ হি ওয়াজ অন ক্যাপ্টেন ড্রোলস এরাইভাল (ও সি, ২৪ ডিসে, ১৭০২, ৮০ ৯৭, ৬৫ খণ্ড)। যে বছরে এই চিঠিটি লেখা হচ্ছে, মথুরাদাস নতুন কোম্পানির হয়ে বাংলার কাজ করছেন এবং জয়কৃষ্ণকে সরিয়ে তাঁকে আর তাঁর ভাই বল্লভদাসকে নতুন কোম্পানির মধ্যস্থ হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে (ও সি, ২৪ ডিসেম্বর, ১৭০২, ৮০৯৭, ৬৫ খণ্ড)। এতেও মথুরাদাসের ব্যবসার ক্ষতি হল না। তার ভাই, দুই পুত্র — বিঠলদাস এবং দ্বারকাদাস আর দুই বন্ধু পরাণ এবং গোঁসাইরামকে নিয়ে এবং বিভিন্ন ব্যবসাকেন্দ্রে গোমস্তা রেখে তিনি আগের মত বিপুল পরিমানে ব্যবসা করতে লাগলেন। এমন কি ১৭০৩ সালে দুই কোম্পানির মিলনের পরের বছরেও কোর্ট অব ডিরেক্টর্স তার প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে এতই শঙ্কিত ছিলেন যে তারা লিখল, হিজ মনোপলাইজিং টেম্পার হ্যাথ বিন সাচ এজ টু মেক আস লুক আপন হিম [এজ] ডেঞ্জারাস (ডি বি, ২৬ ফেব, ১৭০৩, ৯৫ খণ্ড, ৫৮)।
ব্রিটিশ কোম্পানির কাজ ছেড়ে দেওয়ায় মথুরাদাসের পতন ঘটে নি, বরং তার পতন হয়েছে রাজস্ব আদায়ের কাজে ব্যর্থ হওয়ায়। ১৭০৫ সালে ব্রিটিশ কুঠিয়াল লিখছেন, …মথুরাদাসের কাজকর্মে তার পরিবারের ক্ষতি হয়েছে। সরকারের হয়ে রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে প্রচুর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এই ঝামেলা থেকে তিনি মুক্তি পান নি। রাজস্ব আদায়ের ব্যর্থতা তার জীবনে অর্থের অপচয়ের কারণ হয়।
১৭০৬ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় পরিবারের হাতে খুব বেশি অর্থ ছিল না এবং সরকারের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে তার মৃত্যুর আগেই পরিবার পথে বসতে বাধ্য হয় (ও সি, ২৮ ডিসে, ১৭০৫, ৮৪১৬, ৬৮ খণ্ড; ২৯ ডিসে ১৭০৬, ৮৪০৮, ২৭, ৫৬-৫৭, ৬৮ খণ্ড। ১৭০৩ সালে ফরাসী কুঠিয়াল লিখলেন, মথুরাদাস এবং বল্লভদাস, এই অঞ্চলের দুই গুরুত্বপূর্ণতম ব্যবসায়ী… তাদের ওপর এসে পড়া দুর্যোগের সময়ও আমরা তাদের ওপর নির্ভর করেছি… রাজার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বহু অর্থ নষ্ট করেছেন … দুই ভায়ের মধ্যে বড় ভাই প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ হওয়ায় দেওয়ান তাঁকে অন্তরীণ করেন, ইন্দ্রানী রায়ের প্রাগুক্ত প্রবন্ধ, ৫৩-৫৪)। (চলবে)