ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ীদের বৈদেশিক বাণিজ্য
এর আগের কিস্তির শেষার্ধে উল্লিখিত দুটি তালিকা বিশেষ করে দ্বিতীয়টা অর্থাৎ আমদানি পণ্যের জাহাজের হিসেব তালিকায় দুই বাংলা ব্যবসায়ীর বৈদেশিক বাণিজ্যের আমদানি রপ্তানি আর পণ্য চলাচলের বিন্যাস এবং দিক নির্দেশ চিহ্নিত করে। এই তালিকা থেকে এটাও পরিষ্কার হয়ে যায় যে ভূতল বাণিজ্যের মতই, সমুদ্রভিত্তিক রপ্তানি বাণিজ্যে খেমচাঁদ আর তার অংশিদারেরা, ব্যবসা সহকর্মী চিন্তামনের থেকে অনেকটা এগিয়েছিল। খেমচাঁদের মূল ব্যবসা ছিল শ্রীলঙ্কার গ্যালের সঙ্গে। একই সঙ্গে আচিন এবং টেনাসেরিমের সঙ্গেও সমান্তরালভাবে ব্যবসা চালিয়েছেন। চিন্তামনের বড় ব্যবসা ছিল মালদ্বীপের সঙ্গে, যদিও তার জাহাজ গ্যালে এবং জাফনাপত্তমও যেত। পূর্বের দ্বীপরাষ্ট্রগুলির সঙ্গে এই ব্যবসায়িরা সাধারণত চাল, ঘি, মাখন, তেল, চিনি, থান কাপড়ের ব্যবসা করত। এছাড়াও তারা লংপিপার (লঙ্কা), আফিম, রেশম, জাফরান, মটর ইত্যাদি রপ্তানি করত। তবে গুরুত্বপূর্ণতম আমদানি ছিল হাতি। এই বণিকদের কোনও জাহাজই হাতি ছাড়া বালেশ্বরের বন্দরে ভিড়ত না। সুবার নবাব জমিদার এবং অন্যান্য অভিজাতদের উচ্চলাভে হাতি বেচা ছিল। এছাড়াও তারা আমদানি করত টিন কড়ি দারুচিনি, জায়ফল, সোরা, আরক, চিনামাটির বাসন, এমন কি সোনাও।
দুই ব্যবসায়ীই তাদের ব্যবসা সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন পূর্ব দিকের সমুদ্রের কোলে জন্মানো দ্বীপরাষ্ট্রগুলির সঙ্গে। এরা কেউই পশ্চিমের সমুদ্রের রাষ্ট্র বা উপকূলেও ব্যবসা করতে যান নি। হয়ত তারা জানতেন, এই ব্যবসায় অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ অংশিদার সুরাটের ব্যবাসায়ীদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবেন না। মনে হয় যে বাংলা-সুরাট ব্যবসার একচেটিয়া দখল ছিল সুরাট ব্যবসায়ীদের। এই বাণিজ্যপথে যে ১০টি দেশিয় জাহাজ চলাচল করত তার মধ্যে একটি ছাড়া (সেটি ছিল শ্যাম দেশের রাজার গোমস্তা জুলফিকার খানের) সব কটির মালিকানা ছিল সুরাট ব্যবসায়ীদের, একটাও বাংলার ব্যবসয়ীদের ছিল না (কে এ, ১২৬৭, ১৩৩৭ভিও-১৩৪০; খণ্ড ১২৭৬, ১১৭৬ভিও; ১২৯২, ৪৯৮ভিও, ৪৯৯, ৫৩৩-৫৩৪ভিও)। এমন কি সুরাটের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আবদুল গফফুরের বহু জাহাজ বাংলার সঙ্গে ব্যবসা করেছে এবং বাংলা সুরাট পথ বাণিজ্যে বিপুল পরিমান লাভ থাকত বলে সাধারণত সুরাট ব্যবসায়ীরা, তাদের যে কোন প্রতিযোগীকে বাংলা সুরাট ব্যবসা থেকে বার করে দেওয়ার চেষ্টা করত (কে এ, খণ্ড ১২৭৬, ১২৬৪ভিও; খণ্ড ১২৯২, ৪৯৮ভিও)।
মথুরাদাস ছাড়া আমরা অন্য কোনও বাংলা ব্যবসায়ীর উদাহরণ পাচ্ছি না যারা বৈদেশিক ব্যবসা করেছে, এবং যতদূর সম্ভব বাংলার কোনও ব্যবসায়ীই এই ব্যবসায় যুক্ত ছিল না। কিন্তু একই সঙ্গে বলা দরকার মথুরাদাস বৈদেশিক ব্যবসায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন সীমিতভাবেই। ১৬৮৩ সালের প্রথম দিকে মথুরাদাসের পাটনার গোমস্তা রামদাসের সুরাট অঞ্চলের দিকে যাত্রা করার জন্যে পণ্য সংগ্রহ করার খবর পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু বাকি তার এই উদ্যমের বাকি খবর পাওয়া যায় না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৯, ১৫১)। ১৭০০ সালে মথুরাদাসের একটি কার্তেজ ছাড়া জাহাজ পর্তুগিজেরা দখল নেয় এবং গোয়ায় নিয়ে যায় (বি এম, এডিশনাম ম্যানাস্ক্রিপটস, ২২৮৪২, খণ্ড ১, ৭৪)। যতদূর সম্ভব সে সময়ে ভবিষয়তের ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রীর ঠাকুর্দা ফোর্ট সেন্ট জর্জের গভর্নর টমাস পিট মথুরাদাসের বৈদেশিক বাণিজ্যে সাহায্য করেছিলেন। তিনি বেশ কিছু ব্রিটিশ জাহাজ ধার/ভাড়া দিতেন। এমন এক উদাহরণ পাওয়া যায় ১৭০২ সালে এক আরমেনিয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে পিট সুরাটে জাহাজ নিয়ে গিয়েছিলেন (ও সি, ২৩ ডিসে, ১৭০১, ৭৮০৭, খণ্ড ৬৩; ২৭ জানু ১৭০২, ৭৮৩৭, ৬৩ খণ্ড)। তবে পিটের ব্যবসা, বন্ধু ব্যবসায়ী মথুরাদাস বা চিন্তামনের মত অত ছড়ানো ছিল না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সপ্তদশ শতকে বাংলার বৈদেশিক ব্যবসায় সরাসরি জড়িয়ে ছিলেন বাংলার ফৌজদার, সুবাদার এবং শাসক শ্রেণীর, প্রশাসনের নানান থাকবন্দীর বহু অভিজাত। সেই শতাব্দের চতুর্থ শতকে বাংলার সুবাদার শাহ সুজা নিজের জাহাজে বৈদেশিক ব্যবসা করতেন। এমন কি তিনি বাংলার বৈদেশিক ব্যবসার কিছু কিছু ক্ষেত্রে একচেটিয়া দখল নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং বাংলায় যত হাতি আসত, বিশেষ করে ডাচেরা বাংলায় যত হাতি আমদানি করত, সে সব হাতি তিনি একাই কিনে নিতেন (টি রায়চৌধুরী, প্রাগুক্ত, ৭৬)। ১৬৫১ সালে হুগলির ফৌজদারের একজটি বড় জাহাজ, জাঙ্ক, গম্ব্রুনে যায় বাংলার নানান পণ্য নিয়ে, ফিরে আসে জাহাজ ভর্তি ঘোড়া নিয়ে (ও সি, ৮ মে ১৬৫১, ২২১৯, ২২ খণ্ড; ইএফআই ১৬৫১-৫৪, ৬৩)। ১৬৫৪ সালে খেড্ডা, কলম্বো এবং কোচিনের দিকে যাওয়া গভর্নর জাফরের জাহাজের জন্যে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকার করে ডাচেরা, শেষ পর্যন্ত টেনাসেরিম এবং আচিনের দিকে যাত্রা করা নবাবের মাত্র দুটি জাহাজ এবং মালদ্বীপের দিকে যাত্রা করা ফৌজদারের একটি জাহাজের জন্যে ছাড়পত্র দেয় তারা। রাজমহলের ফৌজদার নবাব নওয়াজিস খান আর হুগলীর প্রাক্তন ফৌজদার আহমদ বেগের জাহাজের জন্যে তিনটিমাত্র ছাড়পত্র জারি করে তারা (ডাচ লেখাপত্রের অনুবাদ, খণ্ড ১৮টি, ৫৫০। কোনও কোম্পানির থেকে কোনও ব্যবসায়ীর জাহাজের ছাড়পত্র পাওয়ার অর্থ হল, সেই জাহাজ কোম্পানিটি দখল বা লুঠ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া)। ১৬৫৬ সালে হুগলীর ফৌজদার কলম্বোর দিকে যাত্রা করা একটি জাহাজের জন্যে এবং শাহ সুজা তিনটি ছাড়পত্র ছাড়পত্র যাচ্ঞা করে কলম্বো কোচিন এবং জাফনা পত্তনমের দিকে যাত্রা করার জন্যে। কিন্তুইওরোপিয় কোম্পানি বিনীতভাবে সব কটি দাবিই মানতে অস্বীকার করে কারণ তাদের অভিযোগ বাংলার শাসক শাহ সুজা বাংলার নানান বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষেত্র একচেটিয়া করণ করছেন। একইভাবে ডাচেরা পারস্যের দিকে যাত্রা করা আরেকটি জাহাজের ছাড়পত্র দিতেও অস্বীকার করে (প্রাগুক্ত, খণ্ড ১৮টি, ৫৫০। এই ছাড়পত্র দেওয়ার প্রথা বাংলার বণিকদের বৈদেশিক বাণিজ্যের বিন্যাস, বিস্তার এবং দিকনির্দেশের ওপর স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি যে সব শর্ত চাপিয়ে দিত সেব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন ওম প্রকাশ তার দ্য ইওরোপিয়ান ট্রেডিং কোম্পানিজ এন্ড দ্য মার্চেন্টস অব বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২৫, ইন্ডিয়ান ইকনমিক এন্ড সোসাল হিস্ট্রি রিভিউ, খণ্ড ১, ৩ ক্রম, ১৯৬৪ প্রবন্ধে)।
১৬৮২ এবং ১৬৮৪ সালে যে সব জাহাজ বাংলা থেকে বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্যে বিভিন্ন পথে গিয়েছে, তাদের দিকে নজর দিলে দেখতে পাব যে আগে আলোচ্য বালেশ্বরের দুই বণিকের জাহাজ ছাড়া সব কটা জাহাজই ছিল বাংলার শাসক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে। পাটনার নবাব বুজুর্গ খান ডিসেম্বর ১৬৮১ থেকে ডিসেম্বর ১৬৮৩র মধ্যে টেনাসেরিম, গ্যালে এবং শ্যামদেশে বিভিন্ন পণ্য নিয়ে চারখানি জাহাজ পাঠিয়েছিলেন। হুগলীর ফৌজদার মালেক কাশেম, কিছুদিনের জন্যে বালেশ্বরেও ছিলেন, জানুয়ারি ১৬৮২ থেকে জানুয়ারি ১৬৮৩ পর্যন্ত চারটি জাহাজ টেনাসেরিম, গ্যালে এবং মালদ্বীপে পাঠান। ওডিসার শাসক নুরুল্লা খানের চারটি জাহাজ জানুয়ারি ১৬৮২ এবং মার্চ ১৬৮৪র মধ্যে চারটে জাহাজ পেগু এবং মালদ্বীপের গিয়েছিল। এমনকি বাংলার সুবাদার নবাব শায়েস্তা খান বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িয়েছিলেন। ১৬৮২ সালের জানুয়ারি মাসে তার একটি জাহাজ মালদ্বীপের দিকে যায় আরেকটি টেনাসেরিমের দিকে। বালেশ্বরের শাহবন্দর নসিব খানকে বাউরি প্রখ্যাত ব্যবসায়ি হিসেবে উল্লেখ করেছেন (বাউরি, প্রাগুক্ত, ৭৪), তিনি জানুয়ারি ১৬৮২ এবং জানুইয়ারি ১৬৮৩র মধ্যে একটা জাহাজ মালদ্বীপ অন্য জাহাজ টেনাসেরিমে পাঠান। তার পরের শাহবন্দর, সুজা খানও উত্তরসূরীর মত বৈদেশিক ব্যবসায় খুবই উৎসাহিত ছিলেন এবং জানুইয়ারি ১৬৮৩ এবং ফেব্রুয়ারি ১৬৮৪র মধ্যে দুটি মালদ্বীপ এবং একটি করে আচিন, গ্যালেতে জাহাজ পাঠান (কে এ, ১২৬৭ খণ্ড, ১৩৩৬-১৩৩৮ভিও, ১৩৪১; খণ্ড ১২৭৬, ১১৭৬ভিও-১১৭৯; খণ্ড ১২৯২, ৪৯৮ভিও, ৫৩৩ভিও, ৫৩৫)।
ওপরে উদাহরণগুলিকে বিচ্ছিন্ন মনে হতেই পারে, কিন্তু এই তথ্য থেকে আমরা আমাদের আলোচ্য সময়ের বাংলার অভিজাতদের বৈদেশিক বাণিজ্যের বিস্তৃতি, দিকপথ এবং বিন্যাস অনেকটাই আন্দাজ করতে পারি। যতদূর সম্ভব, বাংলার শাসককুলের অধিকাংশ জাহাজই পুর্বর দেশগুলোর বন্দরের সঙ্গে ব্যবসা করত। তারা যে সব গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রপ্তানি আমদানি করতেন, তার চরিত্র আমাদের পূর্বের দুই বালেশ্বরের ব্যবসায়িদের বৈদেশিক ব্যবসার অনুরূপ ছিল। বাংলায় মুঘল আর ব্রিটিশ কোম্পানির মধ্যে যে সময় যুদ্ধ চলছিল (১৬৮৬-৮৮) সেই সময় যে সব জাহাজ কোম্পানি দখল করেছিল, সেই হিসেবের মধ্যে জাহাজগুলির টনেজের হিসেব পাই। হুগলীর ফৌজদার মালিক বরখুরদারের বালেশ্বর নাম্নী যে জাহাজ ব্রিটিশ কোম্পানি দখল করে তার বহন ক্ষমতাছিল ৫০০ টন। এছাড়াও ব্রিটিশদের দখল করা এবং নিজেদের বহরে নিয়ে আসা জাহাজের টনেজ ছিল ৬০০ টনের হুগলী, ৩০০ টনের আচিন মার্চেন্ট, ৪০০ টনের ঢাকা মার্চেন্ট, ২৭০ টনের ক্যাথেরিনা, এছাড়া তারা শ্যামদেশের রাজার ডুরিয়া দৌলত নামক ৪০০ টনের জাহাজও দখলে নেয় (ও সি, ১৮ এপ্রিল, ২৪ মে, ১ নভে, ৬ ডিসে, ১২ ডিসে, ১৬৮৭, ৫৫৭৬, খণ্ড ৪৭)। বাউরি বলছেন, তিনি বালেশ্বরের শাহবন্দর নসিব খানের ৫০০ বা ৬০০ টনের জাহাজ দেখেছেন (বাউরি, প্রাগুক্ত, ৭৪)। এইসব উদাহরণ থেকে আমরা বলতে পারি যে ইওরোপিয় ব্যবসায়িদের জাহাজের মত বড় আকারের বাংলার ব্যবসায়িদের কয়েকটি জাহাজ ইন্দো-ইওরোপিয় বৈদেশিক ব্যবসায় জুড়ে ছিল। (চলবে)