ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলার ব্যবসায়ীদের বৈদেশিক বাণিজ্য
এছাড়াও বাংলার শাসক দলের অভিজাতরা বিভিন্ন ব্যক্তি ব্যবসায়ী এবং ইওরোপিয় কোম্পানির বাণিজ্য জাহাজ ভাড়ায় নিতেন। ১৬৫৩ সালের প্রথম দিকে হুগলীর ফৌজদার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে ১১ বেল পণ্য সমুদ্রপথে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন (এ এফ আই, নতুন সিরিজ, খণ্ড ২, ৩৪৫)। হুগলীর ফৌজদার মালিক কাশেম একটি ব্রিটিশ জাহাজে গমব্রুনে পণ্য পাঠিয়েছিলেন ১৬৭২ সালে। অভিজাতরা তাদের গোমস্তা, না অন্য নামের মধ্যস্থ মার্ফত ব্যবসার কাজ চালাতেন। মালিক কাশেমের মধ্যস্থ ছিলেন হাজি মহম্মদ চিনি। তিনি মালিক কাশেম এবং অন্যদের বিক্রিযোগ্য পণ্য নিয়ে গম্ব্রুনে পাড়ি দিয়েছিলেন। ফেরত আসার জাহাজে তিনি আনেন ৭ বেল হিং, তামাক ৭ বেল, গোলাপ জল ১ চেস্ট, আতর ১০চেস্ট, ফল ১০ জার, কাঠবাদাম (almond) ১৫ মণ, আরক ২ চেস্ট, ৮টি ভেড়া এবং সব থেকে দামি ৪টি ঘোড়া। শুল্কহীন এই জাহাজে ঘোড়া ব্যতীত কোম্পানি সব পণ্য কিনে নেয়। তারা মালিক কাশেমের মধ্যস্থকে গম্ব্রুণে পণ্য কিনতে অর্থ দিয়েও সাহায্য করেছিল এই আশায় যে তাদের এই চেষ্টার ফল ফলবে হুগলীর শাসকদের দরবারে আধিপত্য বিস্তারে সহায়ক হবে (রেকর্ডস অব ফোর্ট সেন্ট জর্জ, ডায়েরি এন্ড কন্সালটেশন বুক, ১৬৭২-৭৮, ৪৩-৪৪)। ১৬৮৭ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি একটি স্পেনিয় জাহাজ দখল করে। এটি টেনাসেরিম থেকে কটকের নবাবের পণ্য নিয়ে আসছিল (ও সি, ১২ ডিসে, ১৬৮৭, ৫৫৭৬, ৪৭ খণ্ড)। মনে হয় সপ্তদশ শতকের নয়ের দশক থেকে ব্রিটিশ জাহাজে করে বাংলার ব্যবসায়ীদের মাল সুরাট বা পারস্যের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশ সাধারণ ব্যবসায়িক রূপ পায়। বেনারসী, জনার্দন শেঠ অথবা খাজা সরহদ ইস্রায়েল কোম্পানির জাহাজে পণ্য পাঠানোর উদ্যম নিয়েছিলেন।
বাংলার ব্যবসায়ীদের সম্পদ
বাংলার ব্যসায়ীদের ধন সম্পদের পরিমান নিয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা বেশ কঠিন। কারণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু তথ্য যেমন কোম্পানির সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমান পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের চুক্তি অথবা নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীর নির্দিষ্ট জাহাজ কত পরিমান পণ্য বিদেশ থেকে নিয়ে আসছে এই রকম খুব হাল্কা উদাহরণ ছাড়া সেই সময়ের ব্যবাসায়ীদের কি পরিমান স্বচ্ছলতা ছিল এ সম্বন্ধে সরাসরি ধারণা করা আজ অসম্ভব। এই ধরণের তথ্যের ওপর নির্ভর করে ব্যবসায়ীদের সম্পদ ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও বটে। তবুও এই সব তথ্য নির্ভর করে আমরা সেই সময়ের অন্তত একজন ব্যবসায়ী খেমচাঁদের সম্পদ নির্ধারণ করার চেষ্টা করব। তিনি যে ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন এ নিয়ে কোনও সন্দেহই নেই। হয়ত সেই শতাব্দের সাত এবং আটের দশকজুড়ে বালেশ্বরের মত বন্দর শহরে ধনীতম ব্যবসায়ী ছিলেন তো বটেই। এই জন্যেই হয়ত মাঝেমধ্যে বালেশ্বরের ফৌজদার বা ওডিসার নবাবা তার থেকে বিপুল অর্থ জরিমানা আদায় করেছেন।
১৬৭ সালের প্রথম দিকের সময়ে, ওডিসার নবাব সফি খাঁ, ব্রিটিশদের জন্যে Boremull (সুশীলবাবু আন্দাজ করছেন নামটা পুরণমল, আমার মনে হয় ভুরে মল)-এর সঙ্গে দুই ব্যবসায়ী হরিচাঁদ এবং জয়রাজ শাহকে নিয়ে পরওয়ানার জন্যে দরবার করতে গেলে খেমচাঁদকে গ্রেফতার করেন। কোন গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছাড়াই নবাব তাকে কারারুদ্ধ করেন, এবং হয়ত তার থেকে অর্থ আদায় করার জন্যেই তার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। সাত দিনের জন্যে ১০,০০০ টাকা এবং তিন মাসের জন্যে ২০,০০০ টাকার জামিনে খেমচাঁদকে নিজের মুক্তিপণ কিনতে হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৭, অংশ ১, ৩৯, ৪৩এ এ এফ আই, নতুন সিরিজ, খণ্ড ৪, ৩৩৯)। এর ফলে তার সম্পদের পরিমানে দৃষ্টিকটু প্রভাব পড়েছিল এমন কোনও প্রমান পওয়া যায় না। ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা লিখল, খেমচাঁদ… এই ঘটনায় বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না, কারণ তার অগাধ সম্পদের প্রভাবে সে জরিমানা দিয়েও, সেই দিনই আমাদের দেয় ২৫,০০০ টাকার মধ্যে তার অংশ ৭,৫০০ টাকা দিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৭, অংশ ১, ৪৫এ)।
কিভাবে ১৬৭৪ সালে নবাব রশিদ খান খেমচাঁদের থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়েছিলেন, তার বিশদ বর্ণনা টমান বাউরি দিয়ে গিয়েছেন। বাউরির ভাষায় ‘ক্ষুধার্ত’ নবাব ‘গ্রেট বানজারা ব্যবসায়ী’ এবং ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গ্রেট ব্রোকার’-এর কাছে ১ লক্ষ টাকা দাবি করলেন। নবাবের সামনে যাওয়ার আগে খেঁমচাঁদ তার সোনার শিরস্ত্রান, গয়নাপত্র এবং আংটি খুলে ফেলে খুব সাধারণ পরিধেয় পরে যেন দারিদ্রে ডুবে থাকা মানুষের মত বেশ পরিধান করলেন। উপস্থিত হয়ে তিনি নবাবের সামনে বলতে শুরু করেন কিভাবে তার মেয়ের বিয়েতে যাওয়ার পথে তার থেকে পনের লক্ষ টাকা ডাকাতি হয় (যে ঘটনার সত্যতা নিয়ে বাউরি বিন্দুমাত্র সন্দেহ প্রকাশ করেন নি, প্রমানও দিয়েছেন)। কিন্তু নবাব তার তার এই কান্নাকাটিকে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। তিনি বললেন তার কাছে খেমচাঁদের সম্পদের পরিমান নিয়ে পাকা খবর আছে এবং খেমচাঁদ যা বলছেন তা বিন্দুমাত্রও সত্য নয়। নবাবের কাছে বহু রকমের ক্ষমা চেয়ে দরবারের অভিজাতদের সঙ্গে দহরম মহরম করেও তাকে ৫০,০০০টাকা নবাবকে দিতে হয় (বাউরি, প্রাগুক্ত, ১৫২-৫৬)।
বাউরির ভাষ্যকে বিশ্বাস করলে আমরা আন্দাজ করতে পারি যে খেমচাঁদ কতটা ধনী ছিলেন। মেয়ের বিয়েতে ১৫ লক্ষ টাকা খরচ করার উত্তর সময়ে তাঁর নবাবকে ৫হাজার টাকা উতকোচ দিতে কষ্ট হয় না। এটাও মনে রাখা দরকার এই পরিমান খরচ করার পরেও তার অন্তর্দেশিয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি পড়ে নি। তবে আগেই আমরা দেখেছি সেই শতকের আটের দশকের শেষের দিকে তার সম্পদ ভাগ্য বদলাতে থাকে। তার মৃত্যর সময় পর্যন্ত তিনি তার সব ধার শোধ করে ৯০,০০০ টাকা রেখে গিয়েছেন পরিবারের জন্যে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ১১ খণ্ড, ১৮৭)।
অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলার ব্যবসায়ীরা বিপুল বিনিয়োগ হাতে নিয়ে বৈদেশিক ব্যবসা চালাতেন, যদিও তাদের ভাগ্যে কখোনো সুরাটের বীরজী ভোরা বা আবদুর গফফুরের মত সম্পদশালী হওয়ার মত উপকথা তৈরি হয় নি। তবে আমাদের হাতে বাংলার কয়েকজন ব্যবসায়ীর ব্যবসার কয়েকটি লেনদেনের পরিমানের অঙ্কের প্রমান আছে। ঢাকার স্রফ গোলা রায়, যিনি কোম্পানির শুল্ক অনাদায়ে নবাবের সামনে জামিন দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি কোচবিহারের রাজার পক্ষে নবাবকে ৩ লক্ষ ৫ হাজার টাকার জামিন হিসেবে নিজেকে উপস্থিত করান (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ১০ খণ্ড, ১১৯)। ১৬৯৯ সালে কোম্পানির যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করে তাতে মথুরাদাসের অংশিদারি ছিল আড়াই লক্ষ টাকা (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৩ খণ্ড, অংশ ২, ১৪০-৪১)। এই প্রসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার তিনি শুধু নতুন এবং পুরোনো, দুটো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতেই বিনিয়োগ করেন নি, তার পাশাপাশি ফরাসী এবং ইন্টারলোপারদের ব্যবসাতেও বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। আর্মেনিয় ব্যবসায়ী খাজা সরহদ, কোম্পানির সঙ্গে আড়াই লক্ষ টাকা পরিমানে পণ্য সরবরাহের জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন একবার (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৩ খণ্ড, অংশ ২, ২২৮-২৯) যদিও তার মুল ব্যবসা ছিল কোম্পানি নিরপেক্ষ বিনিয়োগ। কলকাতার কোম্পানির মধ্যস্থ, জনশ্রুতি ছিল জনার্দন শেঠের সম্পদের পরিমান ছিল কয়েক লক্ষ টাকা (ডি বি, ১৩ জানু, ১৭১৪, ৯৮ খণ্ড, ১৯৬)। (চলবে)