ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
রপ্তানি বাণিজ্যের কাঠামো এবং সংগঠন
কোম্পানির ব্যবসার সাফল্যের মাত্রা নির্ভর করছিল ইংলন্ড এবং ইওরোপের বাজারে বিক্রিযোগ্য পণ্য জোগাড় করার জন্যে ঠিকঠাক বরাত দেওয়া এবং সেই পণ্যকে সময় মত ইওরোপের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার ওপর। সাধারণত কোম্পানি যেহেতু সরাসরি কারিগর উৎপাদকেদের সরাসরি দরকষাকষি করে পণ্য কিনত না, তাই তারা তাদের প্রত্যেক কুঠিতে কয়েকজন ব্যবসায়ী-মধ্যস্থকে রাখত, যারা দেশিয় উৎপাদন ব্যবস্থাজাত পণ্য কোম্পানিকে জোগাড় করে দিত। এই পণ্য ইওরোপের উদ্দেশ্যে যাওয়া জাহাজে ভর্তি হয়ে চলে যেত ইওরোপের বাজারে বিক্রি হওয়ার জন্যে। এই সময়ে বরাত দিয়ে বাজার থেকে পণ্য জোগাড়ে অনেকগুলি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে কোম্পানির আমলাদের। বহু ব্যবসায়ী পণ্য সরবরাহ চুক্তি সম্পাদনের সময় অগ্রিম নিয়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে সেইসব বিনিয়োগ স্থায়ী ধার সম্পদে রূপান্তরিত হত। এই ধারের আর পুঁজি হয়ে ফেরত আসার সুযোগ ছিল না। বহু সময় যে নমুনা পণ্য বরাতের জন্যে কোম্পানি, ব্যবসায়ী সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে, দেখা যেত নমুনার তুলনায় খারাপ পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। অনেক সময় চাহিদা মত নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য না আসায় জাহাজ ছাড়তে দেরি হত। এছাড়াও কোম্পানির ব্যবসায় বেশ বড় প্রভাব ফেলত প্রতিযোগীদের সঙ্গে তীব্র লড়াই, পণ্যের দাম বাড়াবার জন্যে দেশিয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অলিখিত জোট, অথবা মধ্যস্থদের দাদন দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব ইত্যাদি।
বাংলায় কোম্পানির সাফল্যের আরও একটা কারণ ছিল শিল্পকাঠামোর ব্যবস্থাপনা। কোম্পানি ইংলন্ড এবং ইওরোপে বাংলাজাত পণ্যের ক্রেতা তৈরি করার জন্যে সেই পণ্যগুলির রং, আকার এবং তারওপরে আঁকা ছবি ইত্যাদিকে তার পণ্য বিক্রির বাজার সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের মনের মত করে ঢেলে সাজিয়েছে, উতপাদক কারিগরদের বাজারের চাহিদার তথ্য সরবরাহ করেছে, সেই পণ্যগুলি নতুন করে তৈরি করিয়েছে। বহু সময়ে তারা বাংলায় রঙের কারিগর, রেশম পাকাইকর (থ্রোস্টার্স), ছাপাই কারিগর ইত্যাদিকে নিয়ে কারিগরদের পণ্যের বাজারের কি ধরণের জিনিস তৈরি করতে হবে সে সব বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করিয়েছে। এছাড়াও কোম্পা্নি সোরা শিল্পকেও নতুন করে ব্যবস্থাপনা করেছে, বিশেষ করে পরিস্রবনের কাজটিতে। এখানে আমরা কোম্পানির বিনিয়োগ, বরাত দেওয়া এবং সেগুলি ঠিকঠাক সময়ে হাতে পেয়ে, শ্রেণী বিন্যাস করে, গুণমান নির্ধারণ করে ফিরতি জাহাজে ঠিকঠাক সময়ে তোলা এবং শিল্প ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোর কিছু সমস্যা এবং সেই সমস্যার তারা কিভাবে সমাধান করল, সে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।
বাংলার কোম্পানির বিনিয়োগের সমস্যা
বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসার ইতিহাস হল মূলত বাড়তে থাকা বিনিয়োগ নিশ্চিত করে ইওরোপ এবং ইংলন্ডের বাজারের জন্য পণ্য কেনার ব্যবস্থ্যাপনাকে নিশ্ছিদ্র করা। এই ব্যবসাটিতে বিনিয়োগ নির্দিষ্ট করা, কোম্পানির অক্ষে খুবই জটিল এবং দুর্গম কাজ ছিল। সপ্তদশ শতকের প্রথমের দিকে যখন জাহাজগুলি পূবের পানে আসছে, কোম্পানির লক্ষ্য ছিল পূবের দেশগুলির সোনা রূপোর বিনিময়ে মশলা কিনে ইওরোপিয় বাজারে বিক্রি করা। কিন্তু সওদাগরীয় তত্ত্বে (মার্কেন্টালিস্ট থিওরি) দামি ধাতুর সরবরাহ কম থাকায় পূবের দেশগুলোর পণ্য খুব বেশি কিনতে পারছিল না তারা। ফালে পরের দিকে তারা দামি ধাতুর বদলে ব্রিটিশ উতপাদনও পাঠাতে শুরু করল এশিয় বাজারগুলির জন্যে। কিন্তু দেখাগেল ইংলন্ডের উৎপাদনগুলির এশিয় বাজারে খুব বেশি চাহিদা ছিল না। কোম্পানির আমলাদের অভিজ্ঞতা হল এই সব বাজারে চাহিদা ছিল মূলত ভারতীয় কাপড়ের, যা দিয়ে তারা খুব সহজেই মশলা বিনিময় করতে পারত। ভারতীয় কাপড় যদি বিপুল পরিমানে কিনতে পারে, তাহলে তাদের মশলা কেনার বিনিয়োগের সমস্যা কিছু হলেও মিটতে পারে। তারা তাই ইস্ট ইন্ডিজে শস্তার ভারতীয় কাপড় দিয়ে মশলা কিনতে থাকল। ফলে এর ফলে যে ব্যবসার কাঠামোটা তৈরি হল, তার চরিত্র হল দ্বিপাক্ষিক — ইংলন্ডের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিজের — যা পরে ত্রিপাক্ষিক থেকে বহু পাক্ষিক ব্যবসায় পরিণত হবে।
পূবের ব্যবসার এটাই ছিল সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকের মোটামুটি পরিচিত চরিত্র। কিন্তু ডাচেরা মশলা বাণিজ্যের একচেটিয়াকরণ করে ফেলায়, ব্রিটিশ কোম্পানির পক্ষে ভারতীয় বস্ত্র দিয়ে মশলা কেনার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হল। তাদের মশলার চাহিদা মেটাত দক্ষিণ ভারত আর সুমাত্রার পশ্চিম উপকূলের কিছু ছোট সংখ্যার কুঠি। ব্রিটিশ কোম্পানির ইওরোপবাণিজ্যের মুল আয় হল ভারতের সুতি বস্ত্র, রেশম থান এবং সোরা। ইংলন্ডে দামি ধাতু রপ্তানির বিরুদ্ধে বিপুল বিক্ষোভ আয়োজিত হলেও, ব্যবসার পরিমান বাড়তে থাকায় ইংলন্ড থেকে দামি ধাতুর রপ্তানির পরিমান দিনের পর দিন বাড়তে থাকে সঙ্গে দেশিয় উতপাদনও বিদেশে যেতে থাকে। কিন্তু ইংলন্ডে ভারতীয় পণ্যের বিশেষ করে বস্ত্রের চাহিদা বাড়তে থাকায় ইংলন্ডের দেশিয় উৎপাদকেরা ভারতবর্ষীয় পণ্যের বিরুদ্ধে সংরক্ষণ দাবি করল। শিল্প সরক্ষণের দাবির সঙ্গে দামি ধাতু রপ্তানির বিরুদ্ধে দেশ গর্জে ওঠায় কোম্পানিকে ভারতীয় বাজারে বিনিয়োগের নতুন পথ দেখতে হল।
১৬৫০-১৭২০ সময় সারণিতে বাংলায় বিনিয়োগ করার জন্যে কোম্পানি কয়েকটা নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করে। দামি ধাতু আর মুদ্রার বিনিময়ে বাংলার ব্যবসা জগতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করল তারা। ব্যবসার প্রথম দিকে তাদের হাতে বিপুল পরিমান পুঁজি ছিল না। প্রথম দিকে বাংলার রপ্তানি ব্যবসার পরিমান কম থাকায়, সে সময়ের বিনিয়োগের অভাবটি কোম্পানিকে সমস্যায় ফেলে নি। ইওরোপের দিকে শেষ জাহাজটা বাংলার পণ্য ভর্তি করে ছেড়ে যাওয়ার পর, তার সমস্যার সময় শুরু হত। এই সময়ে কোম্পানির হাতে বাংলার ব্যবসা জগতে বিনিয়োগের মত অর্থ পড়ে থাকত না। বন্দরে জাহাজে পণ্য ভর্তি করার সময় যেহেতু পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেত (কখোনো ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ত) (ও সি, ১৮ জানু, ১৬৫১, সংখ্যা ২২০০, খণ্ড ২২, ই এফ আই, ১৬৫১-৫৪, ১৩-১৪), তাই কোম্পানির শেষ জাহাজটা ছেড়ে যাওয়ার পরে পরেই অর্থাৎ ফেব্রুইয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে পণ্য বরাতের জন্যে অগ্রিম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আগের বছরের মরশুমের পণ্য কেনার খাতে মধ্যস্থদের বকেয়া অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাকে অগ্রিম দেওয়ার জন্যেও কিছু অর্থ রেখে দিতে হত। ১৬৫১ শুরুর দিকে তারা কুঠিগুলিকে আ কম্পিট্যান্ট স্টক বিফোরহেড নামে কিছু অর্থ দেওয়া শুরু করল যার ফলে কুঠিয়ালেরা লিখল যে এর মাধ্যমে ব্যবসার পরিমান বাড়াবার সুযোগ তৈরি হবে (ও সি, ১৮ জানু, ১৬৫১, ২২, ২২ খণ্ড, ই এফ আই, ১৬৫১-৫৪, ১৩-১৪)।
কিন্তু জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার পরে কোম্পানির হাতে প্রায়োজনীয় অর্থ এবং গুদামে পণ্য পড়ে থাকত না। উদ্ভুত এই সমস্যা সমাধানের জন্যে কোম্পানি, প্রথমের দিকে অন্য কুঠির নামে বাংলার ব্যবসার জন্যে বিল অব এক্সচেঞ্জ কাটতে লাগল। ১৬৫১ সালে বে কুঠিগুলি পেগুর থেকে ৬,০০০ টাকার বিল অব এক্সচেঞ্জ পেল (ও সি, ১৮ জানু ১৬৫১, ২২০০, খণ্ড ২২ )। ১৬৫২ সালে সুরাট কুঠি, বাংলার কুঠিয়ালদের চিনি আর গামল্যাক পাঠাতে বলল এবং এ বাবদ আগরা কুঠি তাদের ১৫,০০০ টাকার বিল অব এক্সচেঞ্জ দেবে (ও সি, ২৭ জানু ১৬৫২, ২২৪২, খণ্ড ২২)। ১৬৫২ ডিসেম্বরে জাহাজ ছাড়ার সময় চিনির দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারিতেই তাদের ১০,০০০ টাকা চিনির বরাত দেওয়ার জন্যে বিনিয়োগ করতে হল (ও সি, ১০ ডিসে ১৬৫২, ২২৯৭, খণ্ড ২২)।
বাংলায় ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি পুঁজির দরকার হওয়ার ফলে দামি ধাতু আর ধাতু মুদ্রার আমদানি বাড়াতে হল। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ে বাংলা ব্যবসা নির্ভর করত ইংলন্ড থেকে দামি ধাতু আমদানির ওপরে, এবং যেহেতু এই সরবরাহের পরিমান যথেষ্ট ছিল না, বাংলার কুঠিয়ালদের স্থানীয় পুঁজির বাজার থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিতেই হত। দামি ধাতুর সরবরাহে ঘাটতি যেমন ছিল তেমনি বাংলায় তাদের আনা দামি ধাতুকে বাংলার প্রচলিত মুদ্রায় পরিবর্তন করারও বেশ কিছু নির্দিষ্ট সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই সময়ে কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ জোগাড় করত আমদানি করা সোনা বা রূপো হয় স্থানীয় স্রফেদের কাছে বিক্রি করে অথবা আমদানি করা ধাতুকে রাজমহলের টাঁকশালে মুদ্রা তৈরি করার পরিকল্পনায়। (চলবে)