ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
বাংলার কোম্পানির বিনিয়োগের সমস্যা
এই পদ্ধতিতে যখন দামি ধাতু বদল করা সম্ভব হত না, অধিকাংশ সময়ে সময়ের অভাবে (কারণ হুগলী থেকে রাজমহলে ধাতু পাঠানো তারপর সেটি মুদ্রা হয়ে ফিরে আসা দীর্ঘ সময় লাগত — অন্তত দু থেকে তিন মাসের ধাক্কা ছিল), তাছাড়া ব্যবসায়ীরা দামি ধাতুতে তাদের বকেয়া অর্থ নিত না। এই জন্যে ১৬৭৮ সালে কোম্পানি ব্যবসায়ীদের রূপো রিয়াল মার্ফত একটা অংশ বিনিয়োগ নেওয়ার জন্যে রাজি করাতে উদ্যমী হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৬ সেটে, ১৬৭৮)। পরের বছর বছর থেকে কাশিমবাজারের রেশম তাঁতিদের রূপোয় আর ব্যবসায়ীদের সোনায় বিদায় দেওয়ার নীতি নেয় (প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১৫ ফেব, ১৬৭৯, খণ্ড ২, ১৭)। এমন কী বহু বিখ্যাত ব্যবসায়ীকেও এইকভাবে বিদায় দেওয়া হতে থাকে। ১৬৭৯ সালে মথুরাদাসের পণ্য সরবরাহের সাপেক্ষে তাকে ১৫,০০০ তোলা সোনা দেওয়া হয় (প্রাগুক্ত, খণ্ড ২, ডায়েরি, ৯৫-৯৬, মাস্টার্স ডায়েরি, খণ্ড ২, ২৫৮-৫৯)। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সাধারণত নগদে বিদায় চাইত। ফলে কোম্পানির কাছে বিনিয়োগের সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। ১৬৭৮ সালে হুগলী এবং ঢাকায় বরাত দেওয়া পণ্য সরবরাহের ৮-১০ দিনে মধ্যে ব্যবসায়ীদের অর্ধেক রিয়াল মুদ্রায় আর বাকি অর্ধেক নগদ অর্থে বিদায় দিতে হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৫ সেপ্ট, ১৬৭৮; খণ্ড ৭, অংশ ২, ১১৫)।
বাংলায় সোনা রূপো দু-ধরণের দামি ধাতু পাঠানো হত। সমস্যা হল বাংলার কুঠিয়ালেরা চাইত কোম্পানি কর্তারা বাংলায় সোনা না রূপোই পাঠাক, কারণ বাংলায় রূপার বাজার ভাল ছিল। রূপার রিয়াল গোটা এশিয়ায় জনপ্রিয় করে পর্তুগিজ বণিকেরা। রূপার রিয়ালের ভাল চাহিদা ছিল। অন্য মুদ্রার তুলনায় রিয়ালকে স্থানীয় মুদ্রায় বদলে নেওয়া সহজ ছিল, ফলে চুক্তির সময় ব্যবসায়ীরা বেশি অংশে রিয়ালে বিদায় দাবি করত। ১৬৭৭ সালে এক হুগলী ব্যবসায়ী অভিযোগ করল তারা খুজাডোজ মুদ্রা সময় মত বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না, ফলে তাদের পক্ষে নির্দিষ্ট সময়ে বাজার থেকে বিনিয়োগ জোগাড় করা দুঃসহ হয়ে পড়ছে। ফলে তাদের দাবি রিয়াল চাই (প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, ডায়েরি ১৮ সেপ্ট, ১৬৭৭)। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা খুবই অনড় অবস্থান গ্রহণ করে। ১৬৭৯ সালে কাশিমবাজার ফ্যাক্টরেরা জানাচ্ছেন, ব্যবসায়িদের দোনার বাট দিয়ে বিদায় দেওয়া যেত না, তারা চাইত চেনা আকারের সোনা আর রূপোর মুদ্রায় বিদেয় (প্রাগুক্ত, ৭ খণ্ড, অংশ ২, ৩৩)। বাংলায় সোনার বাজার খুব লাভজনক ছিল না এবং সোনা এনে তাকে পরিবর্তন করে কোম্পানির বহু ক্ষতি হয়েছে, তাই বাংলার এজেন্সি চাইতনা বিনিয়োগের জন্যে ইওরোপ থেকে তাদের জন্যে সোনা রপ্তানি করা হোক।
১৬৭৮ সালে কোম্পানির পক্ষে ১০ হাজার পাউন্ডের কুইকস্টকের বড় অংশ সোনায় দেওয়া হল আর খুবই ছোট অংশ রূপোয় — কুঠিয়ালেরা লিখলো এর ফলে কোম্পানির প্রভূত ক্ষতি হবে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১ আগস্ট, ১৬৭৮)। আবার ১৬৮০ সালে হুগলী কুঠিয়ালেরা লিখল, আমরা মনে করি বাংলায় সোনা বিক্রি যোগ্য নয় মোহরের ফর্মে মানুষ জমায়, কিন্তু রূপো হল নগদের মত, একে যে কোনও সময়ে বাজারে নিয়ে বদলে ফেলা যায় (প্রাগুক্ত, ৫ খণ্ড, অংশ ২, ১১২)। এই সময়ে ঢাকা ছিল সোনার বড় বাজার। ঢাকার বাজারে সোনা বিক্রি করলে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্য পাওয়া যেত (ডি বি, ১২ ডিসে, ১৬৭৭, খণ্ড ৮৮, ৫২২; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১ আগস্ট, ১৬৭৮)। সোনাকে মুদ্রায় রূপান্তরিত করার জন্যে কোম্পানির ক্ষতি হয় ২০%। কোর্ট অব ডিরেক্টর সূত্রে জানা যাচ্ছে যে এমনি কী ১৬৮৫ সালে ঢাকায় প্রচুর সোনার বাট পাঠালেও ক্ষতি হয় ৩০%, একইভাবে পাটনায় ক্ষতি হয় ১২-১৪% (ডি বি, ১৪ জানু, ১৭৮৬, ৯১ খণ্ড, ৪৮)। এই ক্ষতির দায় স্বাভাবিকভাবে কোম্পানির কর্তারা চাপিয়ে দিয়েছিল বাংলার কুঠির কর্মচারীদের ওপরে। বাংলায় সোনার মোহরের দাম বেশ কম ছিল, কুঠিয়াল ১৬৭৯ সালে লিখছে যে এগুলোর চাহিদা প্রায় নেই বললেই চলে দ্য গভর্নমেন্ট বিইং এজ পুয়োর এন্ড নট এরাইভড টু দ্য হোর্ডিং এজ (হয়ত শাহজাদা আজমের সাময়িক নবাবীর কাল বলা হচ্ছে। সাধারণত তারা এসে থিতু হবার পরে বিপুল পরিমান সম্পদ একত্র করত)। সোনার মোহরের বাজার দর সময়ে সময়ে খুব ওঠাপড়া করত। সেই হার তালিকা সূত্রে দেখা যেতে পারে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ২, ১৪; ফতাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১৫ ফেব, ২৪ এপ্রিল, ২৫ জুন, ২৭ জুলাই, ১৬৭৭; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, দায়েরি, ১ আগস্ট, ১৬৭৮; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১০, ১৮৫; বি এম এডি ম্যানুস্ক্রিপটস, ২৪,১২৩, ২য়া, ৩য়া। সোনা আর সোনার মোহরের দামের জন্যে দেখুন ইরফান হাবিব, দ্য এগ্রারিয়ান সিস্টেম অব মুঘল ইন্ডিয়া, ৩৮৪-৮৭; কে এন চৌধুরী, ট্রেজার এন্ড ট্রেড ব্যালেন্সেস, দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিজ এচপোর্ট ট্রেড, ১৬০০-১৭২০, ইকনমিক হিস্ট্রি রিভিউ, ২১ খণ্ড, ১৯৬৮, ৪৮৬-৯০)
তারিখ স্থান দাম (টাকা আনা)
১৬৭০-এর শুরু হুগলী ১৫-২ থেকে ১৫-৪
১৬৭৭ ফেব্রুয়ারি কাশিমবাজার ১৩-১৪
১৬৭৭ জুলাই কাশিমবাজার ১৩-১৪
১৬৭৮ আগস্ট ঢাকা ১৩-১০
১৬৭৮ ডিসেম্বর কাশিমবাজার ১৩-০০
১৬৮৪ সেপ্টেম্বর মালদা ১২-৬ থেকে ১২-৮
১৭১১ সেপ্টেম্বর হুগলী ১৫-০০ থেকে ১৫-৮
১৭১১ সেপ্টেম্বর কলকাতা ১৪-৮ থেকে ১৫-৮
১৬৭৯ সালে বাংলার কুঠিয়ালেরা লিখল, সোনা বিক্রি করলে কোম্পানির কম করে ২২ শতাংশ ক্ষতি হয়, এবং বিপুল ক্ষতি এড়াতে তারা কোম্পানির কর্তাদের বিপুল পরিমান রূপো পাঠানোর আবেদন করল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ২ খণ্ড, অংশ ১, ১৪, ১৭)। সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে বাংলা বাজারে সোনার কম দামের ধাক্কা কোম্পানিকে সইতে হচ্ছিল। লন্ডনের কর্তারা ১৬৮৬ সালের পর থেকে বাংলায় রূপোর রিয়াল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা সেটিকে বাংলা বাজারে সহজে রুপিতে রূপান্তরিত করা যায়, টাঁকশালে বাটা দিয়ে মুদ্রাও বানানো যায় অথবা খুব তাড়াতাড়ি বিনিয়োগযোগ্যও করা যায় (ডি বি, ১৪ জানু, ১৬৮৬, ৯১ খণ্ড, ৪৮)। সোনার দামের ওঠাপড়ার কারণ কী জানা যায় নি। তবে আন্দাজ করা যায় কোম্পানির প্রভূত পরিমান সোনা আমদানি, সোনাকে মুদ্রায় রূপান্তরিত করার ওপর ৫% শুল্ক লাগুকরা, এবং এই সময়ে সেনা বাহিনীর সদস্যদের সোনার মোহরে বিদায় দেওয়া, সাতের দশকের পরে বাংলায় ঘনঘন সুবাদার পরিবর্তন করা ইত্যাদি কারন হতে পারে (ডি বি, ১২ ডিসে, ১৬৭৭, ৮৮ খণ্ড, ৫২২; এই চিঠিতে কোম্পানি বাংলা কুঠিকে লিখল আগের তুলনায় অনেক বেশি সোনা তারা বাংলায় পাঠাল; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, আগস্ট ১৬৭৮; শায়েস্তা খান বাংলা ছাড়েন ১৬৭৭ সালে, আবার ফিরে আসেন ১৬৮০তে, ইতোমধ্যে দু-জন সুবাদার ফিদায়ি খান এবং শাহজাদা আজম বদল হয়েছেন। কুঠিয়ালেরা ১৬৭৭-এ লিখছেন, পাটনায় শাহজাদা তার সেনাকে সোনার মোহরে মাইনে দিয়েছেন, ফলে সোনার দাম এত পড়ে গিয়েছে যে মোহরের তুলনায় সোনার বাটের দাম বেশি হয়ে গিয়েছে, দেখুন ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৭ জুলাই, ১৬৭৭)।
রূপোর দাম বাংলা সুবায় অনেক বেশি হলেও, কোম্পানি বহুসময় রূপোকে চলতি মুদ্রায় পরিবর্তিত করতে অনেক বেশি মূল্য দিত। টাঁকশালে মুদ্রা তৈরি করা লাভজনক ছিল, কিন্তু এই কাজে এত সময় লাগত যে, তার তুলনায় কোম্পানি স্রফেদের কাছে রূপোর বাট বা রিয়াল মুদ্রায় রূপো বিক্রি করা লাভজনক ছিল। সাধারণত ১০০টি রূপোর রিয়ালের বিনিময়ে পাওয়া যেত ২০৬ থেকে ২০৯ সিক্কা টাকা, কখনো সেটা ২০৫-এ নেমে আসত আবার কখোনো উঠে যেত ২১০-এ। কিন্তু টাঁকশালে পাওয়া যেত শুল্ক আর বাটা না ধরে ২১৯ থেকে ২২১ সিক্কা টাকা যা দাঁড়াত ২১৩-২১৪ (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, দায়েরি, ১৬ নভে, ১৬৭৭; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১৮ আগস্ট ১৫৭৭; ১৬ সেপ্ট, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০ অক্টোবর, ১৬৭৯; ডি বি, ১৪ কজানু, ১৬৮৬, খণ্ড ৯১, ৪৮-৪৯; ডি বি, ৮ জানুয়ারি, ১৭১৮, খণ্ড ১৯, ৩৭২)। রূপোর দামের ওঠাপড়া নির্ভর করত আগ্রার বাজারের দামের ওঠা পড়ার ওপর। আগ্রার বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব বাংলার বাজারে অবশ্যম্ভাবীভাবে পড়ত এবং রূপোর দাম কমে যেত এবং রূপোর বাজারে রূপো অদৃশ্য হয়ে যেত। জন কেন ১৬৬১ সালে তিনি মুদ্রাবদলের পদ্ধতি নিয়ে একটি আকর্ষণীয় সমীক্ষা পেশ করে বলছেন, কাশিমবাজারে অর্থ জমা দিয়ে বিল অব এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাটনায় একমাস পরে অর্থ পাওয়া লাভের। আমার জানা মতে, এর হার ছিল ১ থেকে ৬ শতাংশ; যখন আগ্রায় রেশম ভাল বিক্রি হয়, তখন সেই টাকা ভূমিপথে কাশিমবাজারে পাঠানো হয়, সেই কারণে যখন সেই অর্থ পাটনায় এক্সচেঞ্জ হয়, তখন এক দিনে হার পড়ে যায় আড়াই থেকে ৩ শতাংশে (বি এম, এডি ম্যানু, ৩৪১২৩, ৪২এ)। (চলবে)