ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
বাংলার কোম্পানির বিনিয়োগের সমস্যা
১৬৭৮ সালে কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা লিখছে আগ্রায় ১০০-র বদলে ৯৯ থেকে ৯৬ টাকা পাওয়া যাচ্ছে, আমাদের মনে হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি আমরা রূপো বিক্রি করতে পারব না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৬৭৯)। পরের বছরে তারা লিখল, বদলের হার বাড়ছে, রূপোর দাম বাড়ছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৯ সেপ্টেম্বর ১৬৭৯)। আগ্রা নির্ভর মুদ্রা বিনিময় হারের পাশাপাশি রূপোর দাম বাড়া কমার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলত ইন্টারলোপার এবং ব্যবায়ীদের নিয়ে আসা রূপোর প্রভাব আর টাঁকশালে মুদ্রা করানোর জন্যে ট্রেজার কয়েনের ওপর প্রযুক্ত ৫% শুল্ক। ১৬৮২ সালে কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা লিখলেন, ইন্টারলোপারদের নিয়ে আসা সম্পদ এখানে খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে, এবং সাম্প্রতিককালে টাঁকশালে সব ধরণের দামি ধাতুর ওপর রাজার ৫% শুল্ক চাপানোর ফলে রূপোর দাম কমছে (প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, ডায়েরি, ৭ সেপ্টেম্বর, ১৬৮২)। রূপো বিক্রির সমস্যা আরও বাড়তে থাকে নগদ হিসেবে স্রফেরা রুপো না নেওয়ার সিদ্ধান্তে, এমন কি কোম্পানি ক্ষতির দামে রূপো দিলেও। এটা হুগলী আর মালদা কুঠিতে ঘটত। ১৬৭৮, ১৬৮৪ এবং ১৬৮৫ সালে হুগলী কুঠিয়ালেরা লিখছে তারা সোনা বা রূপো কোনটাই বিক্রি করতে পারছে না (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৩ অক্টোবর ১৬৭৮; খণ্ড ৬, অংশ ২, ১৬৫; হোম মিসলেনি, ৮০৩ খণ্ড, ৪৫৮)। ১৬৮২ সালে মালদা কুঠিয়ালেরাও কোনও ধরণের দামি ধাতু বিক্রি করতে পারছেনা জানিয়েছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মালদা, খণ্ড ১, ডায়েরি, ১৭ অক্টোবর ১৬৮০(??))।
এর ফলে বাংলায় আসা কোম্পানির সম্পদকে কাশিমবাজার কুঠিতে পাঠিয়ে দেওয়া হত, যেটা আমাদের আলোচ্য সময়ে দামি ধাতুর একমাত্র চাঙ্গা বাজার ছিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৩ অক্টোবর ১৬৭৮)। কাশিমবাজারের জোরটা হল, সে সেই সময় দেশিয় বড় ব্যবসায়ীদের ঘাঁটি ছিল এবং এই শহরের কাছাকাছি টাঁকশালও ছিল। যদি খোলা বাজারে সম্পদ বিক্রি নাও করা যেত, তাহলে সেই সম্পদ অর্থাৎ দামি ধাতু, মূলত রূপো, রাজমহলের টাঁকশালে মুদ্রা তৈরি করার জন্যে পাঠিয়ে দেওয়া সহজ ছিল। এমন কী সম্পদের চাঙ্গা বাজার কাশিমবাজারেও কুঠীয়ালেরা ১৬৮২ সালে লিখছেন, দামি ধাতুকে নগদ হিসেবে বহু সময় বিক্রি করায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ২, কনসালটেশন, ৭ সেপ্টেম্বর ১৬৮২)। অধিকাংশ স্রফ, যারা এই সম্পদগুলি কিনত, তারা অর্ধেক নগদে এবং বাকি অর্ধেক অর্থ এক মাস পরে চোকাত। সুকানন্দ, চতুরমল, হরিদাস নাগর, গোকুলচাঁদের মত স্রফেদের সঙ্গে কোম্পানির চুক্তি সূত্রে আমরা এই ধরণের তথ্য জানতে পারছি (প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৮ আগস্ট, ৩০ আগস্ট, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২ অক্টোবর, ১৬৭৯)।
রূপো বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই সব সমস্যা দূর করতে ১৬৭৯ সালে স্ট্রেশ্যাম মাস্টার দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে প্রখ্যাত স্রফ, সওদাগর চতুরমল শাহের সঙ্গে কোম্পানির আমদানি করা সব ধরণের সম্পদ একটি নির্দিষ্ট হারে নিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন (মাস্টার্স ডায়েরি, প্রাগুক্ত, খণ্ড ২, ৩০৬-৮)। এই চুক্তি অনুসারে অন্যান্য আমদানি করা স্বাভাবিক ধাতু মুদ্রা এবং সম্পদের নানান পরিবর্তিত হারের বিনিময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতি ১০০ রিয়ালের বিনিময়ে চতুরমল ২১০ সিক্কা রূপি এবং প্রতি সোনার মোহরের বদলে ১৩ সিক্কা রূপি দিতে স্বীকৃত হয়। দামি ধাতু ওজন করে স্রফেদের দেওয়া হত। টাঁকশালে এই ধরণের দামি ধাতু দিয়ে মুদ্রা তৈরি করানোর যে ঝুঁকি, চতুরামলকে সেই সম্পদ বা দামি ধাতু দিলে কোম্পানির সে ধরণের ঝুঁকি ছিল না এবং চতুরামল তার খরচে এবং ঝুঁকিতে রাজমহল দামি ধাতু পাঠিয়ে সেগুলি টাকায় পরিবর্তিত করে নিত। কোম্পানির পক্ষে এটা আত্মসন্তুষ্টির চুক্তি ছিল। কারণ এতদিন কোম্পানির হাতে সম্পদ থাকলেও সেগুলিকে সে বাজারে বিক্রি করে উপযুক্ত সময়ে নগদে পরিণত করতে পারছিল না এবং রূপোর দামের বিপুল ওঠাপড়ার জন্যে তার তুলনামূলকভাবে বেশি খরচও হয়ে যেত। কিন্তু কোম্পানিকে হতাশ করে এই চুক্তি বেশি দিন স্থায়ী হল না, চতুরমল ক্ষতি সামলাতে না পেরে এই চুক্তি ছেড়ে সে বেরিয়ে গেল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৪ ডিসেম্বর, ১৬৭৯, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৬৮০, ২ মার্চ ৮ মার্চ ১৬৮০, নভেম্বর ২৭ আগস্ট ১৬৮০)।
রাজমহলের টাঁকশালে দামি ধাতুকে মুদ্রায় রূপান্তরিত করলে খোলা বাজারের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ পাওয়া যেত। কিন্তু দামি ধাতু থেকে মুদ্রা তৈরি করার প্রক্রিয়াটি খুব সহজ বা সাধারণ ছিল না। কিন্তু বাংলার দামি ধাতুর বাজারে বারবার ধাক্কা খেয়ে কোম্পানিকে এই অপ্রীতিকর সিদ্ধান্তটি নিতে হয়। ১৬৮৫ সালে মাদ্রাজের কুঠিয়ালদের উদ্দেশ্যে লেখা হুগলী জেনারেল লেটারে বলা হয়েছে বাংলা কাউন্সিল সুবায় রূপো বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। মুঘল টাঁকশালে দামি ধাতু পাঠানোর কাজ ঝুঁকির ছিল। হুগলী থেকে কাশিমবাজার হয়ে যে রাস্তাটি রাজমহলে গিয়েছে, আবওহাওয়া খারাপ থাকলে রাস্তার অবস্থা প্রায় অগম্য হয়ে উঠত এবং পথে ডাকাতির আশঙ্কাও ছিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৭, অংশ ১, ১১, ডি বি, ১৪ জানুয়ারি, ১৬৮৬, খণ্ড ৯১, ৪৮, ১২ জানুয়ারি, ১৭০৫, ৯৫ খণ্ড, ৩৮৯)। এছাড়াও টাঁকশালে মুদ্রা ছাপানোর জন্যে বহু সময় লাগত — এক মাস থেকে ছয় মাস পর্যন্ত (হোম মিসলেনি, ৮০৩ খণ্ড, ৪৫৮, ডি বি, ৭ এপ্রিল, ৯৬ খণ্ড, ২৬২-৬৩)। আরেকটা সমস্যা ছিল ১৬৭৭ সালে যে কোন দামি ধাতুর জন্যে ৫% শুল্ক চাপানো হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস কাশিমবাজার খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৬৭৭, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি ১, আগস্ট ১৬৭৮, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস কাশিমবাজার, খণ্ড ২, ডায়েরি, ৭ সেপ্টেম্বর ১৬৮২। ১৬৮৩ সালে কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা লিখছেন রাজমহল থেকে সেই বছর তাদের কাছে একটি বার্তা আসে যে ঢাকা থেকে একটি সাধারণ পরওয়ানা জারি হয়েছে, তা নিম্নরূপ (দেখুন, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ৩, ডায়েরি, ৩১ জানুয়ারি, ১৬৮৩) ব্রিটিশদের সাড়ে ৩ শতাংশ, ডাচেদের ৪ শতাংশ, মুসলমানেদের ২.৫ শতাংশ, হিন্দুদের ৫ শতাংশ, আর্মেনিয়দের সাড়ে সাত শতাংশ)। এবং বলা হয় এই সময় ব্রিটিশেরা ৪ লক্ষ মুদ্রা ছাপিয়ে নিতে পারত (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৯, ৭৬)। পরের বছর মালদা এবং রাজমহলের ফৌজদার রফিউজ্জামান কোম্পানিকে হুঁয়ারি দিয়ে বলল তারই শর্তে টাঁকশালে পাঠাতে হবে আর দামি ধাতু একমাত্র তাকেই বিক্রি করতে হবে (ঐ, খণ্ড ১০, ১৮৫)।
বাংলায় দামি ধাতু থেকে মুদ্রা বানাবার এইসব বাধা বিপত্তির সামনে দাঁড়িয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে মাদ্রাজের তাদের নিয়ন্ত্রিত টাঁকশালে আমদানি করা দামি ধাতুকে মুদ্রা বানিয়ে বাংলায় পাঠানো হবে। ১৭০৫ সালে কোর্ট অব ডিরেক্টর বাংলাকে লিখল, তারা মাদ্রাজে রূপো পাঠিয়েছে, সেখানে সেটি মুদ্রা হয়ে বাংলায় যাবে এবং এর ফলে রাজমহলে দামি ধাতু পাঠিয়ে মুদ্রা বানাবার ঝামেলা এবং সময় উভয়ই বাঁচবে (ডি বি, ১২ জানু, ১৭০৫, খণ্ড ৯৫, ৩৮৯)। মনে হয় এর পর থেকেই মাদ্রাজে দামি ধাতু মুদ্রায় পরিণত করে বাংলায় পাঠানো হতে থাকে। ১৭০৭ সালে ডায়রেক্টরেরা জানাল তারা খুশি যে, বাংলার কুঠিয়ালদের রাজমহলে মুদ্রা তৈরি করার দরকার হয় নি, আগামী দিনে জরুরি কোন প্রয়োজন না হলে এই কাজটা করার দরকার হবে না (ডি বি, ৭ ফেব, ১৭০৭, ৯৬ খণ্ড, ৯৮এ)। (চলবে)