ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
বাংলার কোম্পানির বিনিয়োগের সমস্যা
মাদ্রাজ টাকা ওজন আর আকারে বাংলার সিক্কা টাকার সমান কোম্পানির এই দাবি ভুয়া প্রমান হল। বাংলার স্রফেদের পরীক্ষায় দেখা গেল বাংলার সিক্কা টাকার তুলনায় মাদ্রাজ টাকা ওজন আর আকারে ২ শতাংশ ঘাটতি বর্তমান। কোম্পানির ধারনা হল স্রফেরা তারা স্রেফ হাত ঘুরিয়ে তাদের ঠকাচ্ছে এবং স্রফেরা নিজেদের লাভের জন্যে মাদ্রাজ টাকার কম মুদ্রা মূল্যের দাবি জানাচ্ছে। ১৭০৮ সালে দেখা গেল মাদ্রাজ রুপি বে অঞ্চলে এই বছরের মুদ্রার থেকে ৯ শতাংশ এবং সিক্কা টাকার তুলনায় সাড়ে ৯ শতাংশ কম। ডায়রেক্টরদের ধারণা ছিল তাদের মাদ্রাজের নতুন মুদ্রার তুলনায় বাংলার বর্তমান সিক্কার পার্থক্য কম হবে। যদিও এই পার্থক্যটা কমল না, কিন্তু তাও তাদের মনে হল মাদ্রাজে মুদ্রা তৈরি করা শস্তা, সময় বাঁচানো, এবং নিরাপত্তার দিক থেকে সাশ্রয়ী কারণ রাজমহলে দামি ধাতু পাঠানোর ঝামেলা অনেক বেশি (ডি বি, ৭ এপ্রিল, ১৭০৮, ৯৬ খণ্ড, ২২২-২৩, ২৬০)। কিন্তু ১৭০৯ সালে সরকার মাদ্রাজ টাকা খাজাঞ্চিখানায় নিতে অস্বীকার করলে, তার বাটা কমে গেল ৯ থেকে ৭ শতাংশে (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ১, ৫২৮, ডি বি ৫ জানু, ১৭১১, খণ্ড, ৯৭, ১২৫)।
কোম্পানির বিপুল ক্ষতি বুঝে কলকাতার কুঠিয়ালেরা মাদ্রাজ কুঠিয়ালদের লিখল তাদের কাছে যত মুদ্রা না হওয়া রূপো আছে অব কলকাতায় পাঠিয়ে দিক, ইতোমধ্যে তারা মুর্শিদাবাদে টাকা তৈরি করার জন্যে নবাব মুর্শিদকুলির থেকে পরওয়ানা পেয়ে গিয়েছে (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ১, ৫২৮, মনে হয় ১৭০৮ সালে মুর্শিদকুলি মুর্শিদাবাদে আরেকটি টাঁকশাল তৈরি করেছিলেন, দেখুন, ডি বি, ৭ এপ্রিল, ১৭০৮, খণ্ড ৯৬, ২৬২-৬৩)। কিন্তু কর্তারা মাদ্রাজে মুদ্রা তৈরির সুবিধা ছাড়তে রাজি হল না, তারা দেখছিল এই মুদ্রা তৈরির ব্যবস্থায় তাদের টাঁকশালে বাটা দেওয়ার ঝামেলা নেই, দামি ধাতু দখল বা লুঠ হবার মত নিরাপত্তার হুমকি নেই। তারা কলকাতা কুঠিয়ালদের এই প্রস্তাব উপেক্ষা করল। তাদের ভাবনা ছিল সব মাদ্রাজের মত বাংলায় টাঁকশাল চালানোর অধিকার পাওয়া গেলে; নিদেন পক্ষে টাঁকশাল ব্যবহার করার স্বাধীনতা পাওয়া গেলে। ১৬৮৭ সালেই ব্রিটিশ আর বাংলা সুবাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুয়ায়ী তারা হুগলীতে টাঁকশাল করার অনুমতি চেয়েছিল (ও ই, ১৮ জুন, ১৬৮৭, ৫৬১৮, ৪৭ খণ্ড, হোম মিসলেনি, ৬৮ খণ্ড, ৩৫)। তখন থেকেই কর্তারা বাংলার কুঠিয়ালদের নির্দেশ দিচ্ছিল কলকাতায় টাঁকশাল তৈরির করার অধিকার অর্জনের জন্যে দরবার করতে। ১৭১৭ সালের ফারুখশায়ারের ফরমানে বাংলায় টাঁকশাল করার অধিকার পাওয়া গেলেও, কোম্পানিকে তার বিনিময়ে যে সুযোগ দেওয়া হল তা দিয়ে মুদ্রা তৈরির কাজ চালানো মুশকিল। মুর্শিদকুলি, বাংলার ব্যাঙ্কার জগতশেঠের সঙ্গে জোট বেঁধে মুর্শিদাবাদের বিনামূল্যে টাকা তৈরির কোম্পানির অধিকার মেনে নিল না (এস ভট্টাচার্য, প্রাগুক্ত, ৩১-৩৩)।
কোম্পানির বাংলা ব্যবসা চালাতে যে পরিমান দামি ধাতু বা ধাতু মুদ্রা দরকার, তা তার হাতে ছিল না বলেই, তারা বিনিয়োগের ঘাটতি মেটাতে বাংলার বাড়তে থাকা রপ্তানি বাণিজ্য চালাবার জন্যে বে অঞ্চলের বেশ কিছু ব্রিটিশ পণ্য বাংলায় বিক্রির জন্যে আমদানি করতে হচ্ছিল। কিন্তু এতেও সমস্যার সমাধান হল না। বাংলার গ্রীষ্মকালীন বাজারে শীতের দেশের এই সব পণ্যের চাহিদা ছিল না বললেই চলে। তবুও এই ধরণের পণ্য তাদের বাধ্য হয়ে আমদানি করতে হত কারন দক্ষিণ এশিয়ার পণ্য কিনতে টন টন সোনা রপ্তানি করায় ক্ষুব্ধ দেশের মানুষের চোখে ধুলো দিতে তাকে বাধ্য হয়ে দেশের কিছু পণ্য আইনগতভাবেই বিদেশের বাজারে বিক্রির জন্যে পাঠাতে হচ্ছিল (১৬৯৪ সালে আইন করে তাকে বাধ্য করা হয় বছরে অন্তত ১০,০০০ পাউণ্ডের পণ্য বিদেশে নিয়ে যেতে)।
ব্যবসা ঘাটতি মেটাতে তাকে এই পণ্যগুলি তাড়াতাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য হতে হত এমন কি অনেক সময় অনেক কম দামেও ছেড়ে দিতে হয়েছে। লন্ডনের কর্তাদের নীতিই ছিল ইংলন্ডের উতপাদনের বৈদেশিক বাজার খোঁজা এবং এই সব পণ্য বিক্রি থেকে বড় পরিমানে লাভ আহরণ করা। ১৬৭৫ সালে বাংলার কুঠিয়ালেরা ব্রডক্লথ এবং অন্যান্য পশম দ্রব্যের বাজার না থাকার কথা বললে কর্তারা মন্তব্য করলেন, এগুলি আমাদের জাতির মৌল উতপাদন, আপনার, আমার প্রত্যেকের এই পণ্যের বাজার খোঁজা দরকার, আর যদি এই পণ্যগুলো যদি শস্তায়ও বিক্রি করতে হয়, সেটাই করুন – আমরা আপনাদের এই ছাড়পত্র দিলাম (ডি বি, ২৪ ডিএ, ১৬৭৫, ৮৮ খণ্ড, ২৩২)। ১৭১১ সালেও কোম্পানির মৌল উদ্দেশ্য ছিল বাংলায় ব্রিটিশ পণ্য বিক্রি করা। এই বছরেই কর্তারা বাংলার কাউন্সিলকে নির্দেশ দিল, যদি আপনাদের ব্যবস্থাপনায় আমাদের পশম আর অন্যান্য পণ্য বাৎসরিকভাবে বিপুল পরিমানে বিক্রি করতে চেষ্টা করেন, তাতে আমাদের দেশের দুটো উদ্দেশ্য সাধন হয়, দেশের রোজগার বাড়ে আর দামি ধাতু রপ্তানি কম করতে পারি, এবং এই দ্রব্যগুলি বিক্রি করে ক্রেতাদের চাহিদা বাড়াতে পারি, তাহলে তার থেকে বেশি বেশি করে লাভ অর্জন করা যায় এবং আমরা আরও বেশি করে এই পণ্য আপনাদের কাছে বছরে বছরে পাঠাতে পরি। (ডি বি, ৫ জান ১৭১১, ৯৭ খণ্ড, ১৩০)।
কিন্তু তাদের আকাশচুম্বি আশা সত্ত্বেও বাংলার বাজারে ব্রিটিশ পণ্য দ্রব্যের চাহিদা বিন্দুমাত্রও বাড়ে নি। ১৬৬৯ সালে বাংলার কুঠিয়ালেরা লিখল, আমরা অর্থ পাঠানো ছাড়া অন্য কোনও অনুরোধ পেশ করছি না, বাংলা বাজারে কিছু দ্রব্য হয়ত বিক্রি হবে, কিন্তু তার অঙ্ক খুবই ছোট, যতক্ষণনা পোন্য বিক্রির পরিমান বাড়াতে পারছি ততক্ষণ লাভ বাড়াবার আশা নেই (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ড, মিসলে, ৩ খণ্ড, ১০০, এ এফ আই, ১৬৬৮-৬৯)।
বাংলার দামি ধাতুর সঙ্গে রেশম আসত, কর্তাদের একটাই লক্ষ থাকত যে কোনও দামে এই পণ্যগুলো বিক্রি করা। তারা কুঠিয়ালদের নির্দেশ দিত যে কোনওভাবে ব্রডক্লথ বিক্রির পরিমান বাড়ানোর। আমরা আগেই দেখেছি ১৬৮০তে মালদায় কুঠিয়ালের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল যতদূর সম্ভব বেশি পরিমানে ব্রডক্লথের বিক্রি এবং তার বাজার বাড়ানো (সুপ্রা, ৩ অধ্যায়)। ১৬৮৪ সালে বাংলার প্রেসিডেন্ট, জনৈক বালেশ্বর ব্যবসায়ীর সঙ্গে কাপড় কেনার এক চুক্তিতে উপনীত হলেন। ঠিক হল তিনি বাতসরিকভাবে তার বিদায়ের একতৃতীয়াংশ ইওরোপিয় দ্রব্যে গ্রহণ করবেন (ও সি, ২২ ডিসে, ১৬৬৪, ৫২৮৮, ৪৪ খণ্ড)। ব্রডক্লথের দাম আর বিক্রি বাড়াতে পরের দিকে তারা একজন ব্যবাসায়ীকেই সব ব্রডক্লথ বিক্রি করতে শুরু করে (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ৯৯, ৭৪-৭৫)।
১৭১৭ ব্রডক্লথ বিক্রির জন্যে কেন্দ্রিয় কর্তারা একটা নিদারুণ ভাবনা ঠাউরালেন। লন্ডনের কর্তারা বাংলা কাউন্সিলকে লিখলেন, আপনাদের কাজকর্মের সঙ্গে সঙ্গে যে সব ব্যবসায়ী জুড়ে থাকেন, তারা যখন আপনাদের কাছে শীতকালে কোন দ্রব্য বিক্রি বা কিনতে আসবেন, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্রিটিশ শীতের কাপড় পরে আসতে বলুন। কর্তাদের আশা এইভাবেই আস্তে আস্তে করে এই পণ্যগুলোর বাজার বেড়ে উঠবে কারণ তাদের দেখে অন্যরা এসব পণ্য ব্যবহার করতে উতসাহিত হবে, ফলে বাজার বাড়বে (ডি বি, ১৮ জুন, ১৭১৭, ৯৯ খণ্ড, ৭৪-৭৫)। কিন্তু এই চেষ্টার ফল ফলল না। কুঠীর সঙ্গে জুড়ে থাকা ব্যবায়ীদের ব্রিটিশ পশমের কাপড় পরতে রাজি করানো গেল না কারণ তাদের বক্তব্য, তাদের পূর্বজরা কেউই এই ধরণের বস্ত্র পরত না। এমন কি ব্রডক্লথের দাম কমিয়ে দিলেও বাজারে চাহিদা বাড়ল না (সি এন্ড বি, এবট্র্যাক্ট, খণ্ড ২, ১২৬)। একজনকে পণ্য বিক্রি করার সিদ্ধান্তও সফল হল না। ১৭১৪ কোম্পানির আমদানি পণ্যের গুদাম থেকে সব বস্ত্র কিনে নেওয়ার চুক্তি করা বনারসী শেঠ পরের বছর সে সব কাপড় কিনতে অস্বীকার করলেন কারণ, হুগলী ও কলকাতায় ৪৬০ বেল আর পাটনায় ১০০ বেল কাপড় পড়ে রয়েছে, তখনও তিনি সে সব পণ্য বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়েছেন (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ৩, ১৮)। একই সঙ্গে এই তথ্যটাও সত্য যে বাংলায় ব্যবসা করার দিন থেকেই কুঠিয়ালের অনুভব করেছিলেন, ব্রিটিশ পণ্যের বাংলায় বাজার শূণ্য। ১৬৬৯ তারা কর্তাদের অনুরোধ করে লেখেন কোনওভাবেই যেন ব্রিটিশ পণ্য মোট বিনিয়োগের এক-চতুর্থাংশ না ছাড়িয়ে যায় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিওলেনি, খণ্ড ৩, ১০০, ই এফ আই, ১৬৬৮-৬৯, ৩১১)। বাংলার বাজারে এত কম অঙ্কের ইওরোপিয় দ্রব্যেরও ক্রেতা মিলছিল না। কুঠিয়ালেরা হতাশ — এই দ্রব্যগুলির চাহিদা খুব কম, বলা ভাল বিন্দু মাত্রও চাহিদা নেই, ফলে ব্রিটিশ পণ্য দ্রব্যের দাম কম। সত্য হল এই ধরণের পণ্য নিয়ে ব্যবসা করার মানুষ বাংলায় অন্তত নেই। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনারেবল কোম্পানির সম্পর্ক শুধু অর্থের আদান প্রদানের আর তাদের কাজ সেই অর্থ নিয়ে তাঁতি বাড়ি থেকে বস্ত্র কেনা (হোম মিসলেনি, খণ্ড ৮০৩, ৪৫৬)। (চলবে)