ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
বাংলার কোম্পানির বিনিয়োগের সমস্যা
বিনিয়োগের ঘাটতি মেটাবার জন্যে প্রথমের দিকে ব্রিটিশ কোম্পানি ইওরোপিয় পণ্যের সঙ্গে দেশি জিনিস বদল করত। অধিকাংশ সওদাগর তাদের বিদায়ের অর্ধেক ইওরোপিয় বস্তুতে নিত এবং কিছু দেশি জিনিসের সঙ্গে বদল করত। কিন্তু দেশিয় ব্যবসায়ীরা স্থানীয় বাজারে এই সব পণ্য বিক্রি করতে পারতনা। ফলে অভিজ্ঞতা বলে তারা পরের দিকে এই সব জিনিস নিতে অস্বীকার করতে থাকে। এই ধরণের বদলের অর্থনীতিতে কোম্পানিরও ক্ষতি হত। কখোনো এই ক্ষতি ২০ শতাংশে পৌঁছত (১৬৭২-এ কোম্পানি বিনিয়োগ মেটাবার বদলে খেমচাঁদ এবং বালেশ্বরের ব্যবাসায়ীর ব্রডক্লথ, দস্তা ইত্যাদি দেয় দেশিয় জিনিসের বদলে, কিন্তু এতে ক্ষতি হয় ২০শতাংশ, দেখুন ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ৪ খণ্ড, অংশ ১, ৪)। ইওরোপীয় জিনিসের বদলে পাওয়া জিনিসের মান ঠিক থাকত না। এক সময় কর্তারা পণ্য বদল কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। ১৬৭৪-এ কর্তারা হুগলী কাউন্সিলকে জানাল ভারতীয় জিনিসের মান ঠিক রাখতে প্রয়োজনে এগুলো অর্থ দিয়ে কিনে নিন এবং দেখুন এগুলি বিক্রি করে কোম্পা্নির ঘরে অর্থ যাতে আসে (ডি বি, আগস্ট, ১৬৭৪, খণ্ড ৮৮, ১৫৩)।
কিন্তু তার পক্ষে বাংলার পণ্যের সঙ্গে আমদানি করা পণ্যের বদল করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। অনিচ্ছুক ব্যবাসায়ীদের বিনিয়োগের বদলে কিছু নগদ অর্থ তার সঙ্গে কিছু ইওরোপিয় দ্রব্য দেওয়া ছাড়া কোম্পানি অন্য কোনও রাস্তা তখনও খুঁজে পায় নি। ১৭০২তে বাংলা বাজারে ব্রিটিশ দ্রব্য বিক্রির সমস্যা চরমে ওঠে। সমস্যা হল সে সময় কোম্পানিকে অন্তত মোট রপ্তানির ১০ শতাংশ দ্রব্য ব্রিটিশজাত হতে হত (ডি বি, ২৬ ফেব, ১৭০৩, ৯৫, ৪৯)। লন্ডনের কর্তারা কুঠিয়ালদের নির্দেশ দিল দফেশিয় বিক্রির সুযোগ বাড়ান, বেশি লাভের কথা ভাবতে হবে না, বিক্রির পরিমান বাড়ান (ডি বি ১২ জানু ১৭০৫, ৯৫ খণ্ড, ৩৮৯)। এতদসত্ত্বেও ইওরোপিয় দ্রব্যের চাহিদা বাড়ল না, বাজারও বাড়ল না।
এর ফলে বিনিয়োগের অর্থ জোগাড় করা খুবই সমস্যা হয়ে দাঁড়াল কোম্পা্নির আমলাদের কাছে। কুঠিয়ালের বিনিয়োগের অর্থ জোগাড়ের জন্যে অন্য সূত্র পাওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করলেন। তবে প্রয়োজনীয় প্রমানিত তথ্যের অভাবে আজ আর বলা সম্ভব নয় তাদের বিনিয়োগের বাতসরিকভাবে কতটা ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। মনে হয় কোনও নির্দিষ্ট বছরে (অবশ্যই যুদ্ধের বছরগুলি বাদ দিয়ে, যখন সরাসরি জাহাজ পাঠানো যেত না) তারা যে দামি ধাতু এবং দ্রব্য পাঠাতেন তা মুল বিনিয়োগের পরিমান থেকে খুব কম ছিল। এর আগে আমরা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছি আমিদানি করা দামি ধাতুকে টাকায় বদলানো এমন কি স্রফদের গদিতে বিক্রি করতে সময়ও লাগত এবং ঝামেলাদার বিষয়ও ছিল। ক্রমশ দেখা গেল অধিকাংশ আমদানি করা জিনিস বিক্রি না হয়ে বহুকাল ধরে কোম্পানির গুদামে পড়েই থাকত। ফলে কোম্পানির পক্ষে বাংলা বাজারে কার্যকরী মুলধন জোগাড় করা সমস্যা হচ্ছিল।
কিন্তু কোম্পানির আমলাদের নির্দিষ্ট সময় বিনিয়োগ জোগাড় করতে হত। সব থেকে বড় কারণ ছিল জাহাজে ঠিক সময়ে ঠিক পরিমান পণ্য তুলতে ব্যবায়ীদের ঠিক সময়ে অগ্রিম দিতে হত। এই সময়টা ছিল ফেব্রু থেকে জুনের মধ্যেকার সময়ে। কিন্তু তখনও আরেকটা সমস্যা দেখা দিত। আগের বছরের বরাত দেওয়া পণ্যের পড়ে থাকা বকেয়া মেটাতে হত কুঠিয়ালদের। এই ধার শোধ করার পর তাদের হাতে আর উদ্বৃত অর্থ থাকত না বলা চলে, যা দিয়ে নতুন বছরের ব্যবসা শুরু করা যায়। এছাড়াও কোম্পানি অতীতের বিনিয়োগের কারণে বিভিন্ন ব্যবায়ীদের কাছে অধমর্ণ হয়ে থাকত, এমন কি ইওরোপ থেকে সম্পদ নিয়ে আসা জাহাজ যাদের নাম ট্রেজার শিপ ইওরোপের দিকে চলে যাওয়ার পরেও ধারধোর মেটাবার পরেও তাদের হাতে অগ্রিম দেওয়ার জন্যে অতিরিক্ত অর্থ পড়ে থাকত না। ১৭০০ সালে কাশিমবাজার কুঠিয়ালেরা লিখছে, বিগত বছরের ব্যবসায়ে বাজারে তখনও তাদের ১ লক্ষ টাকা ধার থেকে গিয়েছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ১০ খণ্ড, ৩ অংশ, ২)। বাংলার কুঠিয়ালেরা অনেক সময় লন্ডনের কর্তাদের লিখত ইওরোপগামী জাহাজ ছাড়ার পরেও যদি দ্বিগুণ স্টক পাঠানোর বিষয়টা দেখতে (ও সি, ১৮ জান, ১৬৫১, ২২০০, খণ্ড ২২, ই এফ আই, ১৬৫১-৫৪, ১৩-১৪। ও সি, ৮ জানু, ১৭০২, ৭৮২০, স্তবক ১১, খণ্ড ৬৩, ও সি, ২৪ ডিসে, ১৭০২, ৮০৯৭, তবক, ১৫, ৬৫ খণ্ড)। কর্তারা আগে থেকে জমিয়ে রাখা সম্পদের গুরুত্বটা বুঝতেন, কিন্তু এই কাজটা তারা করে উঠতে পারেন নি (ডি বি, ২৮ জান, ১৯৫৯, খণ্ড ৮৪, ৪১১, ডি বি, ১৮ জানু, ১৭০৬, ৯৫ খণ্ড, ৫১৮, রাওয়াল, এ ৩০২, ২৫০)। ফলে আমাদের আলোচ্য সময়ে কুঠিয়ালদের উপযুক্ত মরশুমে যথেষ্ট পরিমান বিনিয়োগ জোগাড় করার উদ্যম নিতে হত।
পুঁজি জোগাড়ের নানান উপায়ের মধ্যে সব থেকে সোজা কাজ ছিল স্থানীয় ধারের বাজারে গিয়ে ধার চাওয়া। কোম্পা্নি দেখল বাংলার ধারের বাজার বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ, দক্ষ, চাহিদা মত বিনিয়োগ তারা এই বাজার থেকেই তুলতে পারে। আমরা যে সময় নিয়ে আলোচনা করছি সেই সমগ্র সময়ে কুঠিয়ালেরা স্থানীয় বাজারের ব্যাঙ্কারদের থেকে টাকা ধার করত। তথ্যের অভাবে আজ আর আমরা বলতে পারব না, এ বাতসরিকভাবে কত পরিমান অর্থ ধার করত। তবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানান সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি কয়েকটি ধারের সূত্র। নিচের তালিকায় বলা আয় নির্দিষ্ট কিছু তারিখে কিছু কুঠি কত ধার ছিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী খণ্ড ৯, ৬৩১৫৫, খণ্ড ১০, ১০৯১৬৪, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ৪, অংশ ১, ৭১, ১৪৫, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনিয়াস, খণ্ড ৩এ, ৩৯২, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৬ খণ্ড, অংশ ১, ৬-৭, ২৬, খণ্ড, ১০, অংশ ৩, ৪৩, ও সি, ৪ ফেব্রু, ১৭০২, ৭৮৫২, স্তবক ৩, খণ্ড ৬৩, ও ই, ১৫ আগস্ট, ১৭০২, ৭৯৯৬, ৬৪)
তারিখ কুঠি কত ধার (টাকায়)
১৮ মে ১৬৮৩ কাশিমবাজার ২,৫০,০০০
২৯ অক্টোবর ১৬৮৩ কাশিমবাজার ৩,৫০,০০০
১১ জুন, ১৬৮৪ কাশিমবাজার ১,০০,০০০
১৫ সেপ্টেম্বর ১৬৮৫ ঢাকা ৮০,০০০
২৭ এপ্রিল ১৬৮৫ কাশিমবাজার ২,৭০,০০০
৬ অক্টোবর ১৬৮৫ কাশিমবাজার ২,৫০,০০০
২১ ডিসেম্বর ১৬৮৫ কলকাতা ১,৪৭,০০০
২৯ ফেব্রুয়ারি ১৬৯৬ কলকাতা ৩,০০,০০০
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৭০০ কলকাতা ৩,০০,০০০
২৬ মে ১৭০১ কাশিমবাজার ২,৫০,০০০
৪ ফেব্রুয়ারি ১৭০২ কাশিমবাজার ২,০০,০০০
১৫ আগস্ট ১৭০২ কলকাতা ৭,০০,০০০
সাধারণত তারা কাশিমবাজার থেকেই ধার করত, এবং সেখান থেকে বিল অব এক্সচেঞ্জ বা লেটার অব ক্রেডিটের মাধ্যমে বিভিন্ন কুঠিতে পাঠাত বিশেষ করে পাটনা আর ঢাকায় মার্চেন্ট এজেন্টের নামে। এছাড়াও নিয়মিতভাবে হুগলী বালেশ্বর আর ঢাকা থেকেও ধার নিত। অন্যভাষায় বলতে গেলে কুঠিয়ালেরা অর্থের প্রয়োজন হলেই এবং পাওয়া গেলেই ধারের রাস্তা ধরতেন। কিন্তু কাশিমবাজারে ধার করার কতগুলো সুবিধে ছিল এটি রাজমহলের টাঁকশালের কাছে অবস্থিত বলে, প্রয়োজনে জমা দামি ধাতু, মুদ্রায় রূপান্তর করে বেশি দিন অধিক সুদ দেওয়ার বদলে নগদে ধার মিটিয়ে দিতেন কুঠিয়ালেরা। এছাড়াও এখানে প্রচুর পরিমানে স্রফ আর ব্যাঙ্কারেরা থাকতেন। ফলে কোম্পা্নি তার দামি ধাতু কাশিমবাজারেই পাঠাত। কিন্তু অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে কলকাতার গুরুত্ব বাড়তে থাকায় ব্যবসায়ীরা কলকাতায় থাকতে শুরু করেন এবং ব্রিটিশরা কলকাতা থেকেই জরুরি অর্থ ধার করা শুরু করে। (চলবে)