ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
বাংলার কোম্পানির বিনিয়োগের সমস্যা
কাশিমবাজারের ব্যাঙ্কার ব্যবসায়ীরা বছরে কত পরিমান অর্থ ব্রিটিশ কুঠিগুলোকে সরবরাহ করতেন, এই অঙ্কটা জানা গেলে মোটামুটি তাদের মোট বিনিয়োগের ধারণা পাওয়া যেত। কিন্তু এই তথ্যেও ঘাটতি রয়েছে। তবে সুখবর হল মার্চ ১৬৮৩ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৬৮৪ অবদি ধারের তথ্য আমরা পাচ্ছি। এই বারো মাসে কাশিমবাজার ব্যবসায়ীরা কোম্পা্নিকে ২,০০,০০০ টাকা ধার দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারী ১৬৮২ থেকে জানুয়ারী ১৬৮৪ এই সময়ক্রমে ১,৬৮,০০০ টাকা কুঠি ব্যবসায়ীদের শোধ করে, কিন্তু বাকি ৭৮,০০০ টাকা ধার বকেয়া থেকে যায়। এই বারো মাসে কুঠি ২০,০০০ টাকা ধারের সুদ হিসেবে সওদাগরদের শোধ করেছে (অঙ্কটা করা হয়েছে কাশিমবাজার কুঠির ক্যাশ একাউন্টস, খণ্ড ৩ থেকে)।
অন্যান্য কুঠি কত অঙ্কের ধার করেছে, তার একটা ধারনা এই রকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্য জোগাড় করেই হিসেব করা যায়। ১৬৮৪-তে হুগলী কাউন্সিল বালেশ্বর কুঠিকে মাসে ১ শতাংশের কম সুদে ১,০০,০০০ টাক ধার করতে নির্দেশ দেয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১০, ৮৬, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২২ এপ্রিল ১৬৮৪)। ১৬৯৯-তে কোম্পানির খাজাঞ্চি মিটারসেনের (মথুরা সেন) থেকে ৪০,০০০ টাকা ধার করে। একই বছরে কলকাতা কাউন্সিল তার থেকে আরও ৫০,০০০ টাকা ধার করার সিদ্ধান্ত নেয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ড, কলকাতা, ৩ খণ্ড, অংশ ২, ৫১-৫২, ৬১)। ১৬৮২তে কোম্পানি ঢাকায় ৫০০০০ টাকা ধার করে একই ব্যবায়ীর থেকে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, ঢাকা, খণ্ড ১, অংশ ২, ৫৭)। একমাত্র দেখা যাচ্ছে শুধু পাটনার স্থানীয় বাজার থেকে তারা বেশি ধার করে নি, এবং স্বাভাবিকভাবে এর কোন কারণ খুঁজে আর পাওয়া যায় না। এই কুঠিকে সাধারণত অন্য কুঠি টাকা ধার দিত। ১৬৭৯-তে কাশিমবাজার কুঠিয়ালেরা ১.২৫ শতাংশে সুখানন্দ শাহের থেকে ৩০,০০০ টাকা ধার নিয়ে পাটনা পাঠিয়েছিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২৫ মার্চ, ১৬৭৯) ।
কুঠিগুলিতে নির্দিষ্ট সময়ে/মরশুমে বিনিয়োগে ঘাটতি দেখা দিলে স্থানীয় ব্যবসাদারেরা খোলা হাতে টাকা ধার করার সুযোগ করে দিলেও, বলা দরকার, বাংলায় টাকা ধার করার বেশ কিছু সমস্যাও ছিল। সব থেকে অসুবিধের ছিল সুদের উচ্চ হার বাৎসরিকভাবে ১২-১৮ শতাংশ (ফ্যাক্ট্রি রেকডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ১, কনসালটেশন, ১৫ অক্টোবর, ১৬৭৯, খণ্ড ৩, কনসালটেশন, ৮ ফেব, ১৬৮৩, খণ্ড ৪, অং ১, ১৫৪, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, বালেশ্বর, খণ্ড, ১, ডায়েরি, ২২ এপ্রিল, ১৬৮৪; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ২, অংশ ১, ১৬, ৪১, খণ্ড ৩, অংশ ২, , ৪৯, খণ্ড ৬, অংশ ৩, ১৪, খণ্ড ৮, অংশ ২, ৭১-৭২, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, ঢাকা, খণ্ড ১, অংশ ২, ৫৭, রাওয়াল, এ, ৩০২, ২৫০, ও সি, নভেম্বর ১৬৮৪, ৫২৬৪, ৪৪ খণ্ড, ডি বি, ১৩ ফেব, ১৬৮৫, ৯০ খণ্ড, ৪৩৬)। মাদ্রাজে সুদের বাৎসরিক হার ছিল ৮ শতাংশ এবং সুরাটে ৯ শতাংশ (ডি বি, ৫ জুলাই, ১৬৮২, খণ্ড ৯০, ৮, ১২ জান, ১৭০৫, ৯৫ খণ্ড, ৩৮১), তাই এই হারটি কোম্পানির কাছে বেশ বেশি ছিল। কর্তারা কুঠিয়ালদের সতর্ক করে বলেছিল জরুরি না হলে বাজার থেকে বেশি অর্থ ধার না করতে। ১৬৭৭ সালের শুরুতে কুঠিয়ালদের কর্তারা লিখল, আমরা মনে করি বেশি হারে সুদ দেওয়া এড়ানো উচিৎ, কিন্তু যদি তোমরা মনে কর, আর ধার না করে কোনও উপায় নেই, তাহলে ধার কোরো, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার তোমাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া গেল (প্রাগুক্ত, ১২ ডিএ, ১৬৭৭, ৮৮ খণ্ড, ৫২০)।
কর্তারা মনে করতেন, বাংলায় উচ্চহারে সুদ তাদের ব্যবসার ক্ষেত্রে হুমকি বিশেষ, ফলে তারা কুঠিয়ালদের সতর্ক করে বললেন, ধারে ডুবে আওয়ার আগে ভাববে, উচ্চ সুদ আমাদের ব্যবসাকে কুরে কুরে খাচ্ছে (প্রাগুক্ত, ৫ জুলাই, ১৬৮২, খণ্ড ৯০, ৮, প্রাগুক্ত, ১৮ জানুয়ারী, ১৭০৫, ৯৫, ৫১৯)। কিন্তু বাংলার কুঠিয়ালদের ধার করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকত না। তারা মনে করতেন এটি প্রয়োজনীয় ঝামেলা এবং চেষ্টা করত নানানভাবে যাতে সুদের হার কমানো যায়।
আটের দশকের শুরুর দিকে লন্ডনের কর্তারা দাবি করছিল তারা সুরাটে এত পরিমান অর্থ পাঠিয়েছেন যে সেখানকার সুদের হার ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তারা লিখল, এখানে অর্থের এতই প্রাচুর্য যে যে কেউই সেখানে ৪ শতাংশ সুদে স্বচ্ছন্দে টাকা ধার নিতে পারে। এই হার কোম্পানির কাছে খুবই সুবিধের ছিল তাই তারা সুরাট কুঠিকে সারা বছরই দ্রব্য কিনতে অনুমতি দিয়েছিল, যার জন্যে তাদের পণ্যের দামে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত লাভ থাকত আর তারা যদি ছ মাসের জন্যে টাকা নিত তাহলে তার হার দাঁড়াত মাত্র ৩ শতাংশ। সুরাটের অনুসরণে কর্তারা বাংলার কুঠিয়ালদের সুদের হার কমাবার জন্যে চেষ্টা করতে নির্দেশ দিল। অন্তত সুদের হার যাতে ৭, ৮ বা ৯ শতাংশে নেমে আসে তা দেখতে তারা বলত কোন বিখ্যাত ব্যবায়ীর সঙ্গে চুক্তি বদ্ধ হতে। কোর্ট কুঠিয়ালদের আরও লিখল, এই হারটি যদি বাংলায় মেনে আসে তাহলে আমরা সেখানে ১ লক্ষ টাকা বা তার কাছাকাছি কোন অঙ্ক ধার নিতে পারব (ডি বি, ৫ জুলাই, ১৬৮২, ৯০ খণ্ড, ৮। সুরাটে বিশাল মুদ্রা ভাণ্ডার পাঠানোয় সুদের হার কমে গিয়েছিল, এই বক্তব্যে অতিশয়াক্তি নেই। ১৬৮৩র সুরাট জেনারেল লেটার সূত্রে জানছি, এটা সত্য যে ইয়োর অনার্স যে বাৎসরিক পরিমানটি পাঠিয়েছেন তাতে সুদের হার কমে গিয়েছে এবং এটা স্বাভাবিক, কিন্তু যখন ইয়োর অনার বা ডাচেদের অর্থের প্রয়োজন থাকে না তখন সম্মানিত ব্যক্তিরা মাত্র ৪ শতাংশ হারে টাকা ধার করতে অসুবিধা হয় না, দেখুন ও সি, ৩০ নভে, ১৬৮৩, ৫০০১, ৪৩ খণ্ড)। ১৬৮২তে লন্ডনের ডায়রেক্টরেরা বাংলার কাউন্সিলকে নির্দেশ দিল দেশিয় ব্যবসায়ীদের থেকে ২০০০০০ পাউণ্ড পুঁজি নিয়ে কোন ব্যাঙ্ক খুলতে চায় কিনা ভেবে দেখুক (ডি বি, ২৮ আগট, ১৬৮২, ৯০ খণ্ড,২২)। কিন্তু এর জন্যে কর্তারা বাংলার কুঠিয়ালদের বড় অর্থ যেমন দেয় নি, সুরাটে যে কাজটা করেছিল সুদের হাত কমাতে, তেমনি এটা তাদের মাথায় আসে নি যে এই বিশাল সুদের হারের বোঝার ধার মাথায় নিয়ে কোন দেশিয় ব্যাঙ্ক চলতে পারে কি না। তবে কুঠিয়ালরা চেষ্টা করেছিল ব্যবসায়ীদের নিয়ে বিনিয়োগের সুবিধের জন্যে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি শুরু করার কিন্তু চরম ব্যর্থ হয়েছিল।
ব্যবসার জন্যে অর্থ জোগাড় করা কোম্পানির পক্ষে আরও ঝামেলাদার বিষয় ছিল কারণ বাংলার আর্থিক বাজারের সুদের হার আর বাজারে অর্থের যোগানের পরিমান নির্ভর করত আগরা বাজারের সুদের হারের ওঠাপড়ার ওপর নির্ভর করে। আগরার বাজারের সুদের হার যদি বাড়ত তাহলে বাংলা বাজারে টাকার পরিমান কমে যেত এবং স্বাভাবিকভাবে সুদের হার বেড়ে যেত। বহু সময়ে এই বিশাল সুদের হারেও কোম্পানির পক্ষে ধার পাওয়া সমস্যা হয়ে যেত। ১৬৮২-তে কাশিমবাজার কুঠিয়ালেরা লিখল আগরায় সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় এলাকায় টাকার যোগান কমে গিয়েছে (ফ্যাক্টরি রেকর্ডস, কাশিমবাজার, খণ্ড ২, কনয়াল্টেশন, ৭ সেপ্টম্বর, ১৬৮২)। আমাদের আলোচ্য সময়ে বাংলার ধারের বাজারের এই ছিল চরিত্র। এমন কি ১৭০০ আলেও কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা লিখছে, (বেশি) সুদেও অর্থ মিলছে না, দেশে নগদ অর্থর যোগান খুব কম, দিল্লি আর আগরায় ৬ শতাংশের পার্থক্য এবং স্রফেদের হাতে যতটুকু অর্থ আছে তাই দিয়ে তারা সেখানে বিনিয়োগ করছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ১০ খণ্ড, অংশ ২, ৯২)। (চলবে)