ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
বাংলার কোম্পানির বিনিয়োগের সমস্যা
ডাচেরা ছাড়াও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে অর্থ যোগান দিত মুক্ত ব্যবসায়ী, ইন্টারলোপার এবং অন্যান্য ইওরোপিয়রা। শুরুর দিনগুলিতে কোম্পানির আমলারা খাজাঞ্চিতে অনেক সময়েই নিজেদের নাম লুকিয়ে দেশিয় ব্যবসায়ীদের নামে অর্থ জমা দিত। তাতে তাদের ব্যক্তিগত রোজগারের অঙ্কটা কর্তাদের কাছে লুকোনো যেত। ১৬৭৯-তে বাংলার কুঠিয়াল রিচার্ড মহুন, স্থানীয় ব্যবায়ীর নামে অর্থ জমা দিয়ে তার নামে বিল পেয়েছিলেন (ও ই, অক্টো ১৬৭৯, ৪৬৬০, খণ্ড ৪০)। অন্যদিকে এই আমলারা/কুঠিয়ালেরা ডাচ কুঠিয়ালদের উদ্বৃত্ত অর্থ ধার দিতে চাইতেন, কারণ তারা সুদ দিত মাএ ১.২৫ শতাংশ (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ৪ খণ্ড, অংশ ২, ২০)। এখানেও কুঠিয়ালের বিল অব এক্সচেঞ্জের বিনিময়ে অর্থ জমা দিতেন যা তারা ইওরোপে গিয়ে ভাঙাতেন। এই বিষয়ে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ফোর্ট উইলিয়ামের হিসেবরক্ষক, আব্রাহাম এডামস ১৭১৬ সালে লন্ডনে যাওয়ার সময় ২৭৭২৮.৬.৩ টাকা জমা করেন এবং ডলারে যে বিল অব এক্সচেঞ্জ পান তার মূল্য ছিল ৩৮১২.১৩.১ড (টাকায় ২সে ৯ড হিসেবে) কোর্ট অব ডিরেক্টরের নামে (বিপিসি, রেঞ্জ, ১, খণ্ড ৩, ১১৭)।
এমন কি বাংলায় কোম্পা্নির প্রেসিডেন্ট বিল অব এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে লন্ডনে অর্থ নিয়ে যেতেন। ১৭১৭-র ডিসেম্বরে রবার্ট হেজেস, বাংলার কোম্পানির প্রেসিডেন্ট ৪০০৪৫ টাকা, টাকায় ২স ৯ড হারে কোর্টের নামে বিল অব এক্সচেঞ্জ করে নিয়ে যান (বিপিসি, রেঞ্জ, ১, খণ্ড ৪, ১এ)। তার উত্তরাধিকারী ইয়ামুয়েল ফ্রেক ১০০০০ টাকা কোম্পা্নির খাজাঞ্চিতে জমাকরেন ১৭১৮-তে টাকায় ২ ৯ড দরে ১৩৭৫ টাকা পান (বিপিসি, রেঞ্জ, ১, খণ্ড ৪, ১এ)। ওই বছরে হেনরি ফ্যাঙ্কল্যান্ড ফোর্ট উইলিয়ামের গুদাম রক্ষক, বেঙ্গল কাউনিলের সদস্য ৮০০০০ টাকা জমা করে ১১০০০ পাউন্ড, টাকায় ২স ৬ড দরে পেলেন (বিপিসি, রেঞ্জ, ১, খণ্ড ৪, ৩)। কোম্পা্নির আমলা ছাড়াও অন্যান্য ইওরোপিয়ও অর্থ জমা দিত। ১৬৯৯তে ফরাসী নোয়েল আরগনস, মাসে ১শতাংশ সুদে ১৫০০০ টাকা জমা রাখতে চাইলেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৩ খণ্ড, অংশ ২, ৪৯)। ডেরিকসন, একজন ফ্রী মার্চেন্ট, কোম্পানি থেজে ১৭১৫তে সুদেমূলে সহ ৩০৭৩১.০.৬ টাকার বিল অব ডেট সংগ্রহ করে (বি পি সি, রেঞ্জ ১, ৩ খণ্ড, ১০৮)।
কম সময়ের শর্তে সরাসরি ধার করা ছাড়াও বাংলায় নগদের ঘাটতি মেটাতে কোম্পানি আরও কিছু বস্তবিক সূত্র নিয়ে নাড়াচড়া করতে থাকে, এর মধ্যে আরেকটি রোজগারের খাতা ছিল আন্তঃএশিয় ব্যবসা। এছাড়াও তারা নগদের খোঁজে কোম্পানির জাহাজ ভাড়া দিতে শুরু করে দেশিয় বণিকদের এবং বিভিন্ন এশিয় বন্দরে তাদের জাহাজ এই সব দেশিয় বণিকদের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যম নেয়। আন্তঃএশিয় বাণিজ্য এবং জাহাজ ভাড়া দেওয়ায় নগদ সমস্যা মেটানোর দিকে এক পা এগোনোর পাশাপাশি, জাহাজগুলি খারাপ হওয়া থেকে বাঁচাতে পারত। নির্দিষ্ট মরশুমে যে সব জাহাজ ইওরোপের দিকে ছাড়তে পারত না সে সবগুলো বন্দরে ছমাস বসিয়ে রাখতে হত এবং এর ফলে মেরামতির জন্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় হত। এমতাবস্থায় কোম্পানি তার কর্মচারীদের বলল বসে থাকা জাহাজগুলি ব্যবহার করে আন্তঃএশিয় ব্যবসা আর জাহাজ ভাড়া দেওয়ার ব্যবসায় প্রবেশের দিকে নজর দিতে। এই সব ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় কোম্পানির বাংলার ব্যবসায়ে নগদের অভাব অনেকটা মিটে গেলেও, নির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে আজ আর বলা সম্ভব নয় এই উদ্যম থেকে বাংলা ব্যবসার জন্যে কত বিনিয়োগ কোম্পানির জোগাড় হত। আমাদের আলোচ্য সময়ে কোম্পানি বাংলা-পারসিক ব্যবসায় জুড়ে ছিল। ১৬৫২ সালে কোম্পানি তার বাংলা কুঠিয়ালদের থেকে পারস্য ব্যবসা শুরু করার নির্দেশ দেয় (ও সি, ১২ ফেব, ১৬৫২, ২২৫৭, খণ্ড ২২; ই এফ আই, ১৬৫১-৫৪, ১১১)।
১৬৫৭ সালে লন্ডনের কোর্ট বাংলার কুঠিয়ালদের নির্দেশ দেয় বছরে অন্তত একটা জাহাজ পারস্যের দিকে প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে রওনা করিয়ে দিতে (ডি বি, ৩১ ডিসে, ১৬৫৭, খজণ্ড ৮৫, ১৫-১৬)। এই প্রকল্প অনুসারে এন নাম্নী জাহাজ ১৬৫৯ সালে বেশ ভাল পরিমানে কোম্পানির পণ্য এবং সঙ্গে বহু ব্যবসায়ীর ভাড়ার পণ্য নিয়ে বাংলা থেকে গম্ব্রুনে রওনা হয়ে যায়ন (ও সি, এপ্রিল, ১৬৫৯, ২৭৩০, ২৬ খণ্ড)। কিন্তু এটাও পরিষ্কার করে বল্কা দরকার কোম্পানির কলকাতা কুঠিয়ালেরা নিয়মিতভাবে বাংলা-পারস্য নৌপথে জাহাজ চালাবার জন্যে খুব বেশি উদ্যম নেয়নি। ১৬৮২ সালে গম্ব্রুনের কুঠিয়ালেরা বাংলার কুঠিয়ালদের অনুরোধ করে বছরে একটা কিম্বা দুটো জাহাজ নিয়মিতভাবে বাংলা থেকে গম্ব্রুনের দিকে পাঠাতে। তাদের বক্তব্য ছিল ডাচেরা বাংলার কাপড় এবং চিনি নিয়ে বছরে অন্তত একটা দুটো জাহাজ গম্ব্রুনে আসে এবং এই উদ্যমে কোনও সময়ই ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের কমে লাভ করে না। এই সূত্রে ৪০০ টনের এজটি জাহাজ বাংলা থেকে যাওয়া ৫০-৬০০০০ টাকা লাভ করতে পারে, তার সঙ্গে যোগ করতে হবে গম্ব্রুন থেকে পণ্য সুরাটে পাঠানোর ফিরতি পথের খরচও (ও সি, ১৬ মে, ১৬৮২, ৪৮২০, খণ্ড ৪২)। ১৬৮৩ সালে ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলার থেকে পারস্যের দিকে দুটো জাহাজ পাঠায় যার একটার নাম হ্যারে,
২১৭৩৩.৪ টাকা মূল্যের ২১৭১ থলে চিনি বয়ে নিয়ে যায়। এবং আরেকটি হেনরি এন্ড উইলিয়াম ২৮২১ থলে চিনির সঙ্গে অন্যান্য পণ্য — মোট ৫৬৭৬০ টাকা মূল্যের নিয়ে পারস্যের দিকে রওনা হয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৬, অংশ ২, ৪-৫)। পারস্যের ব্যবসাজাত লাভে পাওয়া আব্বাসি রূপো এবং সোনার ডুকাটের একটা বড় অংশ বাংলা ব্যবসায় লাগানো হয়।
ভাড়ার জাহাজ সাধারণত সুরাট এবং পারস্য রাস্তায় চলাচল করত। কোম্পানি সুরাট থেকে পারস্যের পথে ভাড়ার পণ্য কম পেলে নিজেদের পণ্য দিয়ে জাজাহ ভর্তি করে পাঠিয়ে দিত। ১৬৯০তে ভাড়ার পণ্য ছাড়াও দেখাগেল অন্তত ২০০ টনের পণ্য প্রয়োজন কেম্পথর্ন নামক জাহাজ ভর্তি করতে। টনেজের ঘাটতি মেটাতে কোম্পানি ৫০০০ থেকে ৬০০০ মণ চাল ১০০০ মণ গম নিয়ে সুরাট থেকে রওনা দিল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ১, অংশ ১, ৩৬)। ব্যক্তি দেশিয় ব্যবসায়ী প্রায়শঃই কোম্পানির জাহাজ ভাড়া নিত সুরাট পারস্য রাস্তায়, কখোনো একজন কখোনো অংশিদারিতে। এই ধরণের কয়েকটি জাহাজের যাত্রার বিষয় নিয়ে আলোচনা করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না এখানে। ১৭০১এ মথুরাদাস, বৃন্দাবনদাস, খাজা পেত্রুস, খাজা ফ্যানাওসএর মত হুগলী ব্যবসায়ীর যৌথ একটি কোম্পানি জাহাজ সুরাটের দিকে পাঠাবার জন্যে ২০০০০ টাকায় ভাড়া নেয় (ও সি, ২৩ ডিসে, ১৭০১, ৮৭০৭, খণ্ড ৬৩; ২৭ জানু, ১৭০২, ৭৮৩৭, ৬৩ সংখ্যা)। ১৭০২ সালে খাজা সরহদ ইস্রায়েল, সে সময়ের প্রখ্যাত বাংলা ভিত্তিক আর্মেনিয় ব্যবসায়ী, ৩৮০০০ টাকায় কোম্পানির ক্লচেস্টার নামক জাহাজ গম্ব্রুন এবভং বসরা পাঠানোর জন্যে ভাড়া নেয় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৪, অংশ ১, ১৮, ২০-২২)। কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণতম মধ্যস্থ জনার্দন শেঠ ১৭০৭ সালে কোম্পানি জাহাজ হেস্টার পারস্যের ব্যবসার জন্যে ৩০০০০ টাকায় ভাড়া নেন (ডি বি, ৭ এপ্রিল, ১৭০৮, ৯৬ খণ্ড, ২৫৫-৫৬)।
খাজা সরহদ হাউল্যান্ড নামক জাহাজ একই পথে যাওয়ার জন্যে ৩৪০০০ টাকায় ভাড়া নেন (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ১, ৪১১)। ভাড়াই হোক বা নিজেদের জাহাজই হোক, এই সব জাহাজ থেকে রোজগার কোম্পানির খুব কম হত না। ১৭১৪-তে হ্যানোভার নামে জাহাজ সুরাট যাত্রায় ৫৯৫৪৮ টাকা রোজগার করে (সি এন্ড বি, এবস্ট্রাক্টস, খণ্ড ১, ৪১১)। একই বছরে পারস্যে পাঠানো কার্ডিগান নামক জাহাজ থেকে রোজগার হয় ৪৮০০০ টাকার বেশি (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ২, ৩৯৯)। ১৭১৭য় সুরাটে যাওয়া ছোট জাহাজের রোজগার করে ১৭০০০ টাকা (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনিয়াস, খন্ড ৭, ৩৭)। যদিও কোম্পানি নানান সময় বাংলা থেকে চিন, জাপান, অচিন, এবং ইস্ট ইন্ডিজের (ডি বি, ২৫ জুলাই, ১৭০১, ৯৪ খণ্ড, ৩০৪-৫; ও সি, ৮ জানু, ১৭০২, ৭৮২০, স্তবক ১১, খণ্ড ৬৩; ২৫ জাবু, ১৭০৩, ৮১১০, ১১-১২, খণ্ড ৬৫; ২৯ ডিসে ১৭০১, ৭৮১০। ৯-১০। ৬৩ খণ্ড) নানান এলাকায় জাহাজ পাঠাবার পরিকল্পনা করলেও সেগুলি আমাদের আলোচ্য হয় সারণীতে বাস্তবায়িত হয় নি, যদিও করমণ্ডল উপকূল থেকে শুরু হওয়া চিনের ব্যবসা বেশ ভাল পরিমানে লাভ তৈরি করত (আর এন ব্যানার্জী, দ্য কমার্সিয়াল প্রোগ্রেস এন্ড এডমিনিস্ট্রেটিভ ডেভেলাপমেন্ট অব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অন দ্য করমন্ডল কোস্ট ডিউরিং দ্য ফারস্ট হাফ অব দ্য রিটিন্থ সেঞ্চুরি, অপ্রকাশিত গবেষণা, লন্ডন ইউনিভার্সিটি, ১৯৬৫, ২১৩-১৭)। (চলবে)