ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
রপ্তানি দ্রব্য সংগ্রহ
এ ছাড়াও অন্যান্য বাংলা ব্যবসায় যে সব ঝামেলা কোম্পানিকে পোয়াতে হত, সেগুলি হল দাদনি অগ্রিম নেওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা, ইওরোপের দিকে ফেরত জাহাজ ছাড়ার সময় তাদের চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুত পণ্য সরবরাহ না করতে পারা। শুধু যে ব্যবসায়ী-মধ্যস্থ নির্দিষ্ট সময়ে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের কাজে ব্যর্থ হত তাই না, অনেক সময় লোভনীয় দামে পাওয়ার জন্যে এক কোম্পানির থেকে অগ্রিম নিয়ে কারিগরদের থেকে বানিয়ে এনে, কোম্পানিকে সরবরাহ করার জন্যে তুলে রাখা পণ্য অন্য ইওরোপিয় কোম্পানিকে বিক্রি করে দিত। এই সব সমস্যা সমাধানের জন্যে কোম্পানি নেওয়া পদক্ষেপ খুব একটা কাজে আসে নি। ১৬৭৮ সালে কোম্পানি রামনারায়ণ, রামজীবন এবং রামচাঁদ এই তিন বালেশ্বর নিবাসী ব্যবসায়ীর সঙ্গে নভেম্বরের মধ্যে কোম্পানির গুদামে সরবরাহ করতে হবে, এমন কিছু কাপড় সরবরাহের জন্যে চুক্তি করল এই মর্মে যে যদি ঠিক সময় পণ্য সরবরাহ করার কাজে ব্যর্থ হয় তাহলে তাদের হাতে যা আছে সেই সময় তার ২৫% বেশি কোম্পানিকে জরিমানা দিতে হবে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২ সেপ্ট ১৬৭৮)। ১৬৯৯-তে খাজা সরহদ ইস্রায়েলের সঙ্গে চুক্তি এই সময় অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কারণ তিনি প্রখ্যাত ব্যবসায়ী, আর চুক্তিতে যে সব শর্ত ধারা হিসেবে ঢোকানো হয়েছে, সেইগুলি মান্য করা শুধুই যে তার দায় নয়, কোম্পানিরও দায়ও বটে। এই চুক্তি অনুযায়ী, তিনি কোম্পানিকে ২,৫০,০০০ টাকার নানান ধরণের পণ্য সরবরাহ করবেন, কিন্তু এর সঙ্গে এটাও ঠিক হল যে যদি কোন পক্ষ চুক্তি অমান্য করে তাহলে সে অন্য পক্ষকে ১০০০ টাকা জরিমানা দেবে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৩, অংশ ২, ২২৮-২৯)। যতদূর সম্ভব এটি এমন একটি ব্যতিক্রমী চুক্তি যেখানে কোম্পানিও তাদের ব্যর্থতার জন্যে জরিমানা দিতে রাজি হল (ডি বি, ৯ জানু, ১৭১০, ৯৬ খণ্ড, ৬৬২)।
কিন্তু কোম্পানির দাবি ছিল ব্যবসায়ীরা শুধুই তাদের সঙ্গে কাজ করুক। এই নিয়ে তারা ব্যবসায়িদের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। বহু চেষ্টা করেও ব্যবসায়ীদের ইন্টারলোপারদের সঙ্গে কাজ বন্ধ করাতে পারল না তারা। কোম্পানির অধিকাংশ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী যেমন বালেশ্বরের খেমচাঁদ এবং চিন্তামন, হুগলীর মথুরাদাস এবং কাশিমবাজারের চতুরমল ইন্টারলোপারদের সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করল না। তারা বহু সময় একটু বেশি মূল্য পেলেই কোম্পানির বরাত দেওয়া পণ্য ফরাসী বা ইন্টারলোপারদের বেচ দিয়ে কোম্পানির বিনিয়োগ পরিকল্পনায় ঘটতি তৈরি করত। তারা যেহেতু নিজেদের ব্যবসার জোরে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তাই তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেও কোম্পানির লাভ হত না। বড় ব্যবসায়িদের চাপ দিতে না পেরে তারা প্রতিশোধ নিতে ছোট ব্যবসায়িদের জরিমানা করা শুরু করল। ১৬৮৩ সালে ছোট ব্যবসায়ী শম্ভুনাথ, মালদার ব্রিটিশ ডিলারদের ফ্যাক্টর জেনারেল হিসেবে কাজ করত। সে পণ্য সরবরাহের জন্যে কোম্পানির কাছে দাদনি পেত। দাদনি নিয়ে গোলমালের জেরে সে ঠিক করল তার সব বরাত দেওয়া পণ্য হুগলীর ইন্টারলোপারদের বিক্রি করবে। ব্রিটিশ কোম্পানি খবর পেয়ে ঘণশ্যাম, মণিরাম, এবং শম্ভুনাথের অন্যান্য সাথীকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে স্থানীয় ফৌজদারের থেকে পরওয়ানা চাইল, যাতে শম্ভুনাথের ব্যবসায়িক জোটকে আর তার পরিবারকেও শিক্ষা দেওয়া যায়। কোম্পানির এই প্রার্থনা ফৌজদার খারিজ তো করলেনই, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখলেন যাতে এই ব্যবসায়ীকে কোম্পানির কোনও রকম ফ্যাসাদে না ফেলতে পারে, তিনি ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার যথেষ্ট ব্যবস্থা করলেন। মালদার ব্রিটিশ কুঠিয়াল তখন হুগলী কাউন্সিলকে অনুরোধ করল শম্ভুনাথের সমস্ত পণ্য দখল নিয়ে মালদায় গ্রেফতার করে পাঠিয়ে দিতে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৯, ১৪৩) — আমরা যদি শাস্তি দেওয়ার কাজে সফল হই তা হলে আগামী দিনে যে কোন পরিকল্পনার ঘাড় মটকানো যাবে, ব্যবসায়িদের মধ্যে সন্ত্রাসের আবহাওয়া নামিয়ে আনা যাবে, অন্যান্য ব্যবসায়ী জোটকে এই কাজে বিরত করা যাবে। কিন্তু এই ছোট ব্যবসায়ী জোটের বিরুদ্ধেও কোম্পানি কিছুই করে উঠতে পারল না। নভেম্বর ১৬৮৩ সালে মালদা কুঠিয়ালেরা লিখল, শম্ভুনাথের হুগলী পালিয়ে যাওয়া খুব খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকল, এবং সে লুকিয়ে অনারেবল কোম্পানির জন্যে উদ্দিষ্ট পণ্য ইন্টারলোপারদের বিক্রি করল, এবং এর ফলে যে সব পাইকারদের অর্থ অগ্রিম দেওয়া ছিল, তারাও অদৃশ্য হয়ে গেল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৯, ১৭৬)।
ইওরোপের দিকে ফেরত জাহাজের পণ্য বোঝাই করার কাজেও সমস্যা তৈরি করত বাংলার কিছু পণ্যে একচেটিয়া ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করা শাসক অভিজাতরা। তারা কোম্পানির কুঠিগুলি থেকে কলকাতা বা হুগলী বন্দরের দিকে জাহাজে তৈলার জন্যে, নানান অজুহাত সৃষ্টি করে পণ্য চলাচলে বাধা সৃষ্টি করত। আমরা আগেই জেনেছি কিভাবে মীর জুমলা বা সায়েস্তা খান সোরা ব্যবসা দখল নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং তাদের এই কাজ কোম্পানির সোরা ব্যবসায় প্রভূত প্রভাব ফেলেছিল (সুপ্রা, ৩, ১; আর দেখুন ও সি, জুন ১৬৬৪, ৩০২৯, খন্ড ২৮; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, কনসালটেশন, ১১ জুলাই ১৬৬৪)। এমন কি সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে শাহজাদা আজম কিছু স্থানীয় ব্যবসা দখল নেওয়ার চেষ্টা করেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৩ খণ্ড, অংশ ২, ৮৭)। তবে এই ঝামেলা খুব একটা কোম্পানির দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথার কারণ হয় নি কারণ, শাসক অভিজাতরা তাদের ব্যবসার দম বেশি দিন টিকিয়ে রাখতে পারেন নি। এর থেকে আরও মাথা ব্যথার কারণ ছিল তাদের নৌকোগুলো স্থানীয় প্রশাসন নানান অজুহাতে দীর্ঘকাল দাঁড় করিয়ে রাখা। বিভিন্ন চৌকিতে এই নৌকোগুলি দাঁড় করিয়ে রাখার জন্যে ঠিক সময়ে জাহাজে পণ্য তোলা সমস্যা হয়ে যেত এবং জাহাজ ছাড়ার সময় দেরি হত।
যদিও কোপম্পানির দাবি এই থামিয়ে রাখার জন্যে দায়ি স্থনীয় প্রশাসনের খামখেয়ালি মনোভাব, এবং এই কাজ বেআইনি এবং অযথা কিন্তু অধিকাংশ সময় বিতর্ক উঠত শুল্ক না দেওয়ার অভিযোগে। কোম্পানির দাবি বিনা শুল্কে ব্যবসা করার জন্যে নানান সময় প্রশাসনের পক্ষে তাদের ফরমান এবং নিশান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোম্পানির এই দাবিকে প্রশ্ন চিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল প্রশাসন (এই বিষয়ে আরও জানতে দেখুন সুপ্রা, অধ্যায় ৩, ১)। স্থানীয় প্রশাসকদের অভিযোগ ছিল দেশিয় ব্যবসায়ীরা কোম্পানির দস্তক ইত্যাদি নিয়ে — অধিকাংশ সময় নকল করে শুল্ক ছাড়ের দাবি জানাত বিভিন্ন চৌকিতে তাদের সরকার প্রচুর আইনি প্রাপ্য পেত না। এই রকম অবস্থায় পড়ে বহু সময় কোম্পানি ঘুষ ইত্যাদি দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছে। এই অভিযোগ উঠলেও কোম্পানি কোনও সময়েই সেনা বল প্রয়োগ করে নি। (চলবে)