ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
রপ্তানি দ্রব্য সংগ্রহ
কোম্পানি অভিজাতদের সঙ্গে বিতর্কে নামলে মাঝেমধ্যে তাদের পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হত, তখন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে তারা সাহায্য সংগ্রহ করত। ১৭১১ সালে কাশিমবাজার কুঠিকে ব্যবসা করায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল, তখন কোম্পানি ফতেচাঁদ শাহের সঙ্গে ৬.৭৫ শতাংশ দস্তুরিতে ৮৩,০০০ টাকার পণ্য সরবরাহের চুক্তি করল। এই চুক্তি অনুসারে আড়ঙ্গের সব অনাদায়ী ঋণের জন্যে জামিন থাকবেন ফতেহচাঁদ এবং তিনি কলকাতায় সেইগুলি পণ্য সরবরাহ করবেন (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ২, ১০৯, ১১২এ; ডি বি, ২ ফেব ১৭১৩, খণ্ড ৯৭, ৭৮৩)। নানান সময় যখন কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হত তখন তারা অন্যান্য কুঠি থেকে রেওয়ান্না বা দেশিয় বণিকদের নামে শুল্ক দিয়ে পণ্য হুগলীতে পাঠাত (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৮, অংশ ২, ১৮৫-৮৬; অংশ ৩, ৪; ও সি, ২৪ ডিসেম্বর, ১৭০২, ৮০৯৭, ৬৫)।
অন্যান্য ইওরোপিয় কোম্পানি, ইন্টারলোপার এবং দেশিয় ব্যবসায়িদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও রপ্তানি পণ্য জোগাড় করার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করেছে। আমরা দেখেছি কিভাবে দাদনি বণিকদের অগ্রিম দেওয়া অর্থে কেনা পণ্য, দেশিয় বণিকেরা বিদেশিয় বাণিকদের বিক্রি করার ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় (দেখুন অধ্যায় ৪, ১)। কোম্পানি তাঁতিদের থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করলেও, তাকে একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে; তারা তাঁতিদের যথেষ্ট এবং সারা বছরের জন্যে দাদন দিয়ে রাখত, যাতে তাঁতি অন্যদের, বিশেষ করে ডাচেদের কবলে না চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, মালদা কুঠিয়ালেরা নিয়মিত অর্থ চেয়ে কোম্পানিকে লিখত, যাতে তাঁতিরা অন্যদের শিবিরে ভিড়ে না যায়। কুঠিয়ালেরা ডাচেদের নিয়ে নিয়ত শঙ্কায় থাকত, কেননা তারা তাদের ভাষায় রোজ ‘অনৈতিকভাবে চেষ্টা করত আমাদের কবল থেকে তাঁতিদের ছিনিয়ে নিতে’ (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মালদা, খণ্ড ১, ১৭ অক্টো, ২৫ অক্টো ১৬৮০)। দক্ষ তাঁতি হারানোর কুঠিয়ালদের এই ভয়ের জন্যে, কর্তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমান দাদনি চাওয়ার তথ্য অমূলক নয়। ১৬৮২ সালে মালদার কুঠিয়াল লিখল, ডাচেরা আমাদের সব পাইকার আর তাঁতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং তাদের লোভনীয় দাদনি দিয়ে রাখে এবং একটা বড় অংশ তাদের দিকে ভিড়ে যায় (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মালদা, খণ্ড ১, ডায়েরি, ২০ এপ্রিল ১৬৮২)।
এমন কি ডাচেরা যাতে সোরা কারিগরদের ফুসলে না নেয়, তার জন্যে কোম্পানি সারা বছর ধরে তাদের দাদন দিয়ে রাখত (ডি বি, ২৯ অক্টো, ১৬৭০, ৮৭ খণ্ড, ৪০১)। ১৬৭৩ সালে কোর্ট অব ডিরেক্টর্স বাংলা কাউন্সিলকে লিখল, যদিও ইওরোপে যুদ্ধের জন্যে বাজার মন্দা, তাসত্ত্বেও কুঠিয়ালরা যেন সারা বছর পিটারম্যান [সোরা উতপাদক] এবং তাফেতা তাঁতিদের কাজে লাগিয়ে রাখার জন্যে দাদন দিয়ে রাখে, এবং এই সময়ের ডাচ আমলারা কর্মহীন তাঁতিদের ফুসলিয়ে না নিয়ে যেতে পারে (ডি বি, ৭ জুলাই, ১৬৭৩, ৮৮ খণ্ড, ৪৮)। বিদেশি ব্যবসায়ী এবং কোম্পানির প্রতিযোগিতায় বহু সময় পণ্যের দাম বেড়ে যেত এবং এর জন্যে শস্তায় পণ্য কেনার কোম্পানির উদ্যম মার খেত। ১৬৮২ সালে লন্ডনের কর্তারা বিপুল পরিমান রেশমের বরাত দিলেও হুগলী কুঠিয়ালেরা জানাল তারা পুরো পরিমান রেশমের বরাত দিয়েছে; কিন্তু বিদেশি বণিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র, ফলে রেশমের প্রায় সব কটি প্রজাতির দাম বাড়বে — তারা লিখল গুজরাটি বণিকেরা রেশম উতপাদকেদের ওপর তীব্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে রাখায় কোম্পানিরে আমলারা চেষ্টা করলেও রেশমের দাম কমে নি, এবং তাদের উদ্যোগে দাম পড়ার সুযোগ তৈরি হলেও আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে (হোম মিসলেনি, খণ্ড ৮০৩, ৩৬৭)। ১৬৮৪ সালে ইন্টারলোপাররা রেশমের বাজারে উপস্থিত না হলে পাটনায় সোরার দাম কমে যায়(ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, ১০ খণ্ড, ২৩৫)। কুঠিয়ালেরা লিখল ডাচেরা পাটনা ছেড়ে গেলে সোরার দাম মণ প্রতি দেড় টাকা পড়েছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ১১ খণ্ড, অংশ ২, ২-৩)।
বাংলায় রপ্তানিযোগ্য পণ্যগুলির দাম বিদেশি চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে উঠত পড়ত। এর একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, ১৭১৬ সালে কোম্পানি জানাল ফরাসী জাহাজ যদি না আসে তাহলে তারা অনেক কম দামে পণ্য কিনতে পারবে (সি এন্ড বি, এবস্ট্রাক্ট, খণ্ড ২, ৭১)। অন্য দিকে যখনই ইন্টারলোপার বা বিদেশি কোম্পানির হয়ে মধ্যস্থরা সক্রিয় হয়ে উঠত তখনই পণ্যে দাম বেশ বেড়ে যেত (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১০, ২০৭; ডি বি, ৯ জানু, ১৭১০। খণ্ড ৯৬, ৬৭৬; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, ৩ খণ্ড, অংশ ১, ১০৬)।
ইওরোপের পথে যাওয়া ফিরতি জাহাজে পণ্য তোলার ক্ষেত্রে এই সব ঝামেলার মুখোমুখি হওয়ার সঙ্গে জুড়ত আরও কিছু জটিলতম কাজ যেমন পণ্য পরীক্ষা, রেশম আর থানগুলির শ্রেণীবিভাগ এবং সেগুলোর দাম ঠিক করা ইত্যাদি। এই বিষয়ে প্রায়শই কোম্পানির আমলা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হত। ভারত থেকে পণ্য রপ্তানির তিনিটি প্রধান কেন্দ্র ছিল মাদ্রাজ, সুরাট এবং বাংলা। প্রত্যেকটি অঞ্চলের কর্মপদ্ধতি প্রায় কাছাকাছি ছিল। কোর্ট অব ডায়রেক্টরেরা জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে পরের বছরের বরাত ভারতের বিভিন্ন কুঠিতে আলাদা আলাদা তালিকা পাঠিয়ে দিতেন। ইংলন্ডে পণ্য পৌঁছবার দুবছর আগে এই তালিকা তৈরি করা হত, যাতে কুঠিয়ালেরা পণ্য পাঠ্যাবার আগে দরকষাকষি, চুক্তি স্বাক্ষর এবং ব্যবসায়ী-মধ্যস্থ মার্ফত পণ্য সংগ্রহ করে ইংলন্ডের ফিরতি জাহাজে পণ্য পাঠাতে হাতে যথেষ্ট সময় পান। যখন বাংলা কাউন্সিল যৌথ তালিকাটি পেত, তারা প্রত্যেক পণ্যের বরাতের তালিকা প্রত্যেক কুঠিতে পাঠিয়ে দিত যাতে সেই কুঠি পাঠানো নমুনা অনুযায়ী পণ্যটি সংগ্রহ করতে পারে। এবারে কুঠি ব্যবসায়ি-মধ্যস্থদের (কিছু কিছু ক্ষেত্রে দালাল আর মালদার ক্ষেত্রে তাঁতি) সঙ্গে দরকষাকষি করে একটি দামে উপনীত হয়ে নমুনা অনুযায়ী অগ্রিম দাদন দিত। বাংলা আর মাদ্রাজের পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য হল, মাদ্রাজের কাউন্সল জয়েন্ট স্টক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি করতে, বাংলায় সেরকম কোন বিধিবদ্ধ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি তৈরি করে উঠতে পারে নি কুঠিয়ালেরা। বাংলায় চুক্তি হত ব্যক্তি ব্যবসায়ীর সঙ্গে, এবং তারা পণ্য সরবরাহে একইরকম চুক্তিতে আবদ্ধ হতে সম্মতি জানাত।
ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট সময়ে কুঠিতে পণ্য সরবরাহ করার সময়ে, চুক্তির নমুনা অনুযায়ী এই পণ্যগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যে সব সদস্য পরীক্ষা কত, তাদের মধ্যে ছিল অন্তত দুজন কাউন্সিল সদস্য, যাদের মধ্যে অবশ্যই একজন গুদাম পরিচালক। পণ্যগুলি যদি চুক্তি আর নমুনার গুণমানে না মিলত এবং ব্যবসায়ী যদি তুলনামূলকভাবে দাম কমাতে রাজি না হত, তাহলে সেগুলি বাতিল করে দেওয়া হত। নমুনা অনুযায়ী পরীক্ষার ব্যাপারে কোম্পানি খুব কড়া অবস্থান নিত এবং এ বিষয়ে সদা সতর্ক থাকত। ব্যবসায়িদের প্রত্যেক প্রকারের পণ্য সরবরাহ থেকে দুটি করে নমুনা বেছে নিয়ে, সেইটি দাম লিখে, কতগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে তার পরিমান লিখে, কোম্পানির পাঞ্জায় ছাপ মেরে, প্রত্যেক শ্রেণীবদ্ধ প্যাকেটের সংখ্যা লিখে প্রত্যেক বছর লন্ডনে পাঠানো হত। কোম্পানির স্থির নির্দেশ অনুযায়ী গুদামকর্মী তার শ্রেণীবিভাগ করার সহকারী এবং আরেক দেশিয়/ব্রিটিশ সহকারীর সঙ্গে কোম্পানির গুদামে শ্রেণীবদ্ধ কাপড় আবার পরীক্ষা এবং শ্রেণীবিভাগ করত। প্রত্যেক ছোট কুঠির আমলারা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সরবরাহ করা পণ্য একইভাবে শ্রেণীবদ্ধ এবং পরীক্ষা কাজ করতেন। ব্রিটিশ কোম্পানির কড়াভাবে শ্রেণী বিভাগ এবং পরীক্ষা করা তাঁতি এবং ব্যবসায়িদের পছন্দ ছিল না, তাদের বক্তব্য ছিল তারা যে ধরণের পণ্য সরবরাহ করে অন্যান্য কোম্পানি সোনামুখ করে সেগুলি নিয়ে নেয়। কাউন্সিলও বহু সময় কর্তাদের কাছে এই ধরণের মন্তব্য করে বলত, করা প্রতিযোগিতার কারণেই তারা কোনওভাবেই পণ্যের গুণমান বজায় রাখতে পারছে না। (চলবে)