ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
রপ্তানি দ্রব্য সংগ্রহ
পণ্যের শ্রেণী বিভাগ করার মতই জটিল কাজ ছিল পণ্যের দাম নির্ণয়। পণ্যের দাম বাড়া নিয়ে সাধারণত কোম্পানির সঙ্গে কাজ করা ব্যবসায়িরা রাজনৈতিক এবং আর্থিক পরিমণ্ডলের দোহাই দিত। সব থেকে বেশি উল্লিখিত হত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ১৬৭৭ সালে ব্যবসায়ীরা গত বছরের দামে কোম্পানির সঙ্গে রুমাল সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ হতে অস্বীকার করে কারণ অনিমিত বর্ষার জন্যে তুলো ভাল উৎপাদন হয় নি, তাই দাম বেড়েছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১, ডায়েরি, ৭ আগস্ট ১৬৭৭)। পাটনায় সোরা ব্যবসায়িরা ১৬৮৪ সালে বেশি দাম হাঁকল কারণ নবাব আর তার আমলারা সব সোরার দখল নিয়েছে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১০, ১৯৪)। অনেক সময় দাম বাড়াবার দাবি নিয়ে ব্যবসায়ীরা সফলভাবে জোটবদ্ধ হত। দাম নিয়ে বহু সময় কোম্পানি আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক এবং দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে এটাও সত্য। ১৬৮৪-র জানুয়ারিতে মালদা কুঠিয়াল কোম্পানির কর্তাদের জানালেন তারা যুক্তিসঙ্গতভাবে দাম নির্ধারণ করার চেষ্টা করলেও, তাদের সঙ্গে কাজ করা শম্ভুনাথ এবং ঘনশ্যাম, এই দুই ব্যবসায়ীর চাপে পাইকার এবং তাঁতিরা তাদের তৈরি করা পণ্যে, তাদের নির্ধারিত দামে দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে দৃঢ়বদ্ধ হয়ে রয়েছে — আমরা যদি তাদের শর্তে রাজি হই, তাহলে আগামী দিনে কুঠিটি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং কোম্পানির বিপুল ক্ষতি হবে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১০, ১০)। পাইকারেরা ঢাকার ফৌজদার শ্রীমন মল্লিকের থেকে পরওয়ানা নিয়ে ব্রিটিশদের আদালতে টেনে নিয়ে যায় এবং রাজার মাকিম এবং নারকিকে দিয়ে রেশমের দাম নির্ধারণ করান (মাকিম আর নারকি হল এক ধরণের রাষ্ট্র সিদ্ধ মধ্যস্থ)। এই যে দাম নির্ধারণের জন্যে নবাবের পরওয়ানা জারির ব্যতিক্রমী ঘটনাটা ঘটল, তাতে কুঠিয়ালের উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন এবং তারা জানালেন এই ঘটনা ভবিষ্যতে বে অঞ্চলে কোম্পানির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে, কেউই ব্রিটিশদের শ্রদ্ধা, সম্মান করবে না, বিশেষ করে নবাব আর আদালতের মধ্যস্থতা তাদের মাথা খারাপ করে দেয়। তারা হুগলী কাউন্সিলকে লিখল, নবাবের দালাল যদি আমাদের পণ্যের দাম নির্ধারণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা, প্রত্যেক কুঠিয়ালের পণ্যের দাম নির্ধারণ করার একান্ত অধিকারটি হারাব … যা কোম্পানির অব্যক্ত ক্ষতি, ভবিষ্যতে ব্যবসায়ীরা আমাদের ওপর তাদের ইচ্ছেমত দাম চাপিয়ে দেওয়ার জন্যে খবরদারি করবে।
কোম্পানির ক্ষেত্রে ঘটনাটা আরও হতবুদ্ধিকর হল কেননা, কাশিমবাজারের যে মুকিম পরওয়ানার সূত্র ধরে দাম নির্ধারণ করল, তার নাম নয়নসুখ, সে কোম্পানির কুঠির অনুমোদিত পাইকার এবং শম্ভুনাথের ব্যবসায়িক জোটের এক অংশ (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খঞ ১০, ৪১, ৫০)। এই বিতর্কে মাত হয়ে রইল কাশিমবাজার বহুকাল। কোম্পানির অভিযোগ, স্থানীয় বিচারক শুধুই যে ব্যবসায়ীদের কোম্পানির থেকে প্রাপ্ত দেড় লক্ষ টাকার দোষস্খালন করেন নি, বরং কোম্পানিকে আরও ৪৩,০০০ টাকা ব্যবসায়ীদের দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। কাশিমবাজারের প্রধান কুঠিয়াল জোব চার্ণক এই পরিমান অর্থ দিতে অস্বীকার করলে ব্যবসায়ীরা আবার নবাবের দরবার থেকে পরওয়ানা আনাল যাতে জোব চার্ণককে ঢাকায় বন্দী করা যায়। চার্ণক এই পরওয়ানা অস্বীকার করে হুগলী পালিয়ে যান। এই ঘটনায় অবিলম্বে দেওয়ান সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির কাশিমবাজার কুঠির সমস্ত লেনদেন বন্ধ করে দেন এবং কোন পাইকার তাঁতি যাতে কোম্পানির সঙ্গে কাজ না করে, সে বিষয়ে নির্দেশ জারি করেন (ও সি, ১৯ ডিসে, ১৬৮৪, ৫২৮৭, ৪৪)। তবে এত গোলোযোগের মধ্যেও কোম্পানি, আমাদের আলোচ্য সময় জুড়ে তার দাম নির্ধারণ করার অধিকার ছাড়ে নি।
কিভাবে কাশিমবাজারে রেশম এবং তাফেতার দাম নির্ধারণ করা হয় সে বিষয়ে স্ট্রেইনশ্যাম মাস্টার বিশদে লিখেছেন ১৬৭৬এ (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনি, খণ্ড ১৪, ৩২৬-৩০; মাস্টার্স দায়েরি, খণ্ড ২, ৯-১৪)। রেশম কেনার ক্ষেত্রে মাস্টারের সমীক্ষা বলছে, যখন বন্দ উৎপাদন হয়ে যেত, তখন কুঠিয়ালেরা কুঠিতে এই ধরণের সুতো কেটে দেখতেন, কত খরচ হচ্ছে। তারপর তারা সেই দামে রেশম উতপাদকেদের সঙ্গে পাইকার এবং রেশম ব্যবসায়ীদের কথা শুরু করার জন্যে নির্দেশ দিতেন। প্রত্যেক পাইকার সেই মরশুমে কত পরিমান রেশম জোগাড় করতে পারবে সেই পরিমান লিখিত ভাবে দিতেন (বিল), এর সঙ্গে জানিয়ে দিতেন সেটি জমা দেওয়ার সম্ভাব্য সময়ও। সাধারণত চুক্তি সম্পাদনের থেকে তিন মাস মত সময় দেওয়া হত। রেশমের প্রত্যেক বেলের (গাঁটরি) জন্যে পাইকার কোম্পানির থেকে নির্ধারিত দামের অন্তত ২০ টাকা কম মূল্য পেতেন, কারণ কোনও কারণে দাম হ্রাস পেলে কোম্পানির হাতে কিছু থাকে। কোম্পানি এই সতর্কতা অবলম্বন করত কারণ, রেশমের দাম নির্ধারণ এবং তার হিসেব ঠিক রাখার জন্যে। পাইকারদের যে পরিমান সংগ্রহ করতে দেওয়া হয়েছিল সেই পরিমানের বেশি যদি পাইকার কোম্পানিকে জমা দিত, তাহলে তাকে পুরো অর্থ মিটিয়ে দেওয়া হত। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই সূত্রটি বলছে, যখন কোন বড় পরিমান পণ্য গুদামে এসে হাজির হত, সেটি প্রধান কুঠিয়াল, তার সহকারী এবং তৃতীয় পদের কুঠিয়াল যিনি আবার গুদামের অধীক্ষ তাদের উপস্থিতিতে গাঁটরিগুলি খোলা হত। একসঙ্গে দুটি বেল অর্থাৎ ৪ মণ রেশমের লাছি ধরে এই তিনজন পদাধিকারীর সামনে ছুঁড়ে ফেলা হত। এরা সেই বিশাল পরিমান থেকে পাঁচটি বা ছয়টি লাছি (skeins) নিয়ে পরীক্ষা করত এবং পাইকারকে দেয় নমুনার সঙ্গে সরবরাহ করার রেশম সুতোর মান তুলনা করত। এইভাবে প্রত্যেকটি গাঁটরির রেশম পরীক্ষা করা হতে থাকে, এবং প্রত্যেকে আলাদা আলাদা কাগজে নিজেদের মত করে দাম নির্ধারণ করে — নমুনাটির সঙ্গে সরবরাহ করা পণ্য একই মানের হল কি না, না হলে কতটা খারাপ হল, এবং সে প্রাথমিকভাবে স্বীকৃত দামের সঙ্গে কি হেরফের হতে পারে সেটাও নির্ধারিত হত। যখন প্রত্যেকটা বেল পরীক্ষা করা হয়ে যাবে, তখন প্রত্যক পাইকারের আলাদা আলাদা রেশম তুলনা করে এক সঙ্গে যোগ করা হয়ে সে দাম তৈরি হয় সেটিই পণ্যটির সামগ্রিক দাম।
তাফেতার দাম নির্ধারণও খুবই আকর্ষনীয় এবং এখানে উল্লেখের দাবি পেশ করে। কোম্পানি সাধারণত তিনট প্রকারের তাফেতা কিনত মিহি, সাধারণ এবং কটা (ব্রাউন) — ব্লিচ না করা। এগুলি শহরের আশেপাশে বাস করা দাদন পাওয়া কারিগরদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হত। সব কটাই বরাতই তিন চার মাসের মধ্যে এসে যেত। তাদের দাম ঠিক হত কপড়ের ঔজ্জ্বল্য, ওজন, মিহিত্ব, এবং মসৃণতার গুণাগুণ নির্ভর করে। দাম ঠিক করার জন্যে তাঁতিদের বয়ে আনা প্রত্যেকটি বৈচিত্রের কাপড়ের মাপ নেওয়া হত, ওজন নেওয়া হত অন্তত একজন কুঠিয়ালের উপস্থিতিতে এবং তিনি সেগুলির বিশদ বর্ণনা লিখে নিতেন। সেই তথ্যপঞ্জী প্রধান কুঠিয়ালকে দেওয়া হত। তিনি আরেকটি কাগজে কাপড়ের প্রত্যেকটি প্রকারের দৈর্ঘ, ওজন, কি কি খুঁত আছে আর কারিগরের নাম। প্রধান কুঠিয়াল এই তথ্যগুলি তাঁতিদের ওয়েস্ট বুক (waste book)-এ বসাতেন এবং প্রত্যেকটি কাপড়ের একেএকে ঔজ্জ্বল্য, ওজন, মিহিত্ব, এবং মসৃণতা ইত্যাদি পরীক্ষা করতেন। (চলবে)