ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
শিল্পের সংগঠন
রপ্তানি পণ্য — রপ্তানি পণ্যের মধ্যে কোম্পানির ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণগুলো যেমন কোরা রেশম, তাফেতা, সোরা ইত্যাদি গুণমান অনুযায়ী সংগ্রহ করার জন্যে কোম্পানিকে এই শিল্পগুলি সংগঠিত করার উদ্যোগ নিতে হয়েছে। কোম্পানি যেহেতু মূলত ইংলন্ড এবং ইওরোপের ক্রেতাদের বিক্রির জন্যে পণ্য সংগ্রহ করত, তাই সেই সব অঞ্চলের ক্রেতার স্বাদ রুচি অনুযায়ী পণ্যগুলিকে ঢেলে সাজাতে হয়েছে। কোরা রেশম এবং তাফেতা ইওরোপিয় বাজারে পাঠানোর জন্যে সরবরাহ করা পণ্যগুলির আকার, রং, ঔজ্জ্বল্য ইত্যাদি পরখ নিতে হত। একই সঙ্গে বাংলা থেকে কেনা কোম্পানির রেশম যেহেতু ফরাসী এবং ইতালিয় রেশমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত ইওরোপিয় বাজারগুলোয়, তাই তাকে নিশ্চিত হতে হত, ইতালিয় এবং ফরাসী রেশমের গুণমানের প্রতিযোগিতায় যাতে বাংলার রেশম পেরে ওঠে। এই জন্যে কোর্ট অব ডায়রেক্টর্স সব সময় রেশম এবং তাফেতার রং এবং বুনন কি হবে তার লিখিত নির্দেশ, নমুনা পাঠাত। সোরা শিল্প ক্ষেত্রে বলতে পারি কোম্পানি বহু সময় পরিস্রবনের কাজটা নিজেই করে নিয়েছে।
১৬৬৩ সালেই লন্ডনের কর্তারা কি ধরণের তাফেতা এবং রেশম আশা করছে তার একটা নির্দেশাবলী বাংলায় পাঠিয়েছিল। বাংলা কাউন্সিলকে বলা হল, তাফেতাগুলিকে যতটা পারা যায় ইতালিয় রেশম সুতো আর কাপড়ের গুণমানের কাছাকাছি নিয়ে যেতে (ডি বি, ২ জানু ১৬৬৩, ৮৬ খণ্ড, ২০২)। যেহেতু বাংলার তাঁতিরা কোম্পানির চাহিদা মত রেশম এবং তাফেতা বুনত না, বাংলা কাউন্সিল কোম্পানির কর্তাদের অনুরোধ করল রঞ্জক, সুতো পাকদেওয়া পেশাদার এবং তাঁতিদের পাঠাতে, যাতে তাদের মাধ্যমে দেশিয় পেশাদারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইওরোপিয় চাহিদার মত আকার, রং এবং মসৃণ কাপড় বোনা যায়। ১৬৬৮তে কর্তারা বাংলায় প্রচুর নমুনা ইত্যাদি সঙ্গে করে পাঠালেন রজার ফাউলার নামে একজন দক্ষ পেশাদার রঞ্জককে (ডি বি, ২০ নভে, ১৬৬৮, ৮৭ খণ্ড, ২০২) যাতে আরও ভাল উৎপাদন করা যায়। এরপর থেকে কোম্পানি, বাংলা কাউন্সিলের চাহিদামত বাংলায় প্রচুর রঞ্জক, তাঁতি পাঠিয়েছে যাতে রেশম এবং তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও ভাল তাফেতা আর রেশম উৎপাদন এবং বোনা যায়। ১৬৮৯ সালে তারা লিখল ব্রিটিশ রঞ্জকদের সাহায্যে তাফেতার কালো এবং অন্যান্য রঙের কাপড় ছোপানোর গুণমান আরও ভাল হয়েছে (ডি বি, ১৬৭৯, ৮৯ খণ্ড, ১৩০। বাংলার তাঁতিরা কালো, সবুজ বা অন্যান্য এক রঙের কাপড় খুব বেশি উৎপাদন করত না, তাদের দক্ষতা ছিল নানান রঙের কাপড় তৈরির। অথচ কোম্পানির চাহিদা অধিকাংশ সময়েই থাকত এক রঙের কাপড়ের, দেখুন ডি বি, ১৮ ডিসে, ১৬৭১, ৮৭ খণ্ড, ৫০৬)। কিন্তু মাঝেমধ্যে তারাই ভয়ে ভয়ে থাকত বাংলার সহজ স্বচ্ছল পরিবেশে পড়ে এই বিদেশি পেশাদারেরা কুঁড়ে না হয়ে যায় (কোর্ট অব ডায়রেক্টদের বক্তব্য এখানে তুলে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে হল, বাট সাচ আর দ্য টেম্পটেশনস এন্ড এভোকেশন ফ্রম বিজনেস অব দ্যাট লাক্সারিয়াস কান্ট্রি এন্ড সাচ ইজ দ্য হাই প্রাইড এন্ড লেজিনেস অব মেনি অব ওয়ার কান্ট্রিমেন, হোয়েন দে গো এব্রড টু ইজ এন্ড প্লেন্টি ডমিনিয়ান এন্ড কমান্ড ওভার স্লেভস, দ্যাট দে সেল্ডম প্রুভ ইন্টেন্ট আপন দেয়ার বিজনেস অলদো দে ডিড ওয়ার্ক হার্ড ফর দেয়ার ব্রেড এট হোম এন্ড মেনি টাইমস কুড নট ফাইন্ড টু আর্ন দেয়ার ব্রেড বাই, দেখুন ডি বি, ৩ ডিসে, ১৬৭৯, খণ্ড ৮৯, ১৩০)। তারা আরও লিখল যে কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার পরে তারা বুঝল যে দেশিয় কারিগরদের, বিদেশি কারিগরদের থেকে রং ছোপানী নিয়ে শিক্ষা নিবিশী করার আর প্রয়োজন নেই (ডি বি, ৩ ডিসে, ১৬৭৯, ৮৯ খণ্ড, ১৩০)। তবুও কোম্পানি বাংলায় মাঝেমধ্যে তাঁতি আর রঞ্জকদের পাঠাত (হোম মিসলেনি, খণ্ড ৮০৩, ৪২৯; ও সি, ১৮ ফেব, ১৭০১, ৭৪৪৯, ১২, ৬০ খণ্ড)।
শুরুর সময় থেকেই, সোরা পরিস্রবন কোম্পানির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৬৫২ সালে কুঠিয়ালের লিখছেন, যদিও সোরা আরও শস্তায় এবং বেশি পরিমানে বালেশ্বরে আর হুগলীতে উতপাদিত হত, তদের কাছে যেহেতু উতকৃষ্ট তামার পাত্র ছিল না, সেহেতু ভাল সোরা পাওয়া যেত না এই জায়গাগুলোয় তাই সোরা পরিস্রবনের সপমস্যা ছিল। যেসব চিনি প্রস্তুতকারকের আসাদায় পাঠানো হয়েছে তাদের ফেরত পাঠাবার দাবি জানাল কোম্পানি। কুঠিয়ালেরা লিখলেন, এই ধরণের পাত্র ছাড়া আমাদের অপরিশ্রুত সোরা দেশে পাঠাতে হবে, তার জন্যে পাঠানর খরচ শুল্ক সব বাড়বে। দেশিয় পরিস্রবন পদ্ধতি ছিল বিশাল বিশাল মাটির পাত্রে অপরিশুদ্ধ সোরা ফোটানো। পদ্ধতিটি পরিশ্রম এবং সময়সাধ্য এবং ঝামেলাদার ছিল কেননা মাঝেমধ্যে এই বিশালাকায় পাত্রগুলি ফেটে যেত। কোনও এক সময় ৬০০টা থলের সোরা পরিস্রবণ করতে গিয়ে ২০০টা পাত্র ফেটে গিয়েছিল (ও সি, ১৪ জানু, ১৬৫২, ২২৪৬, খণ্ড ২২; ই এফ আই, ১৬৫১-৫৪, ৯৫)। সেন্ট হেলেনায় লেখা এক চিঠিতে কোর্ট বর্ণনা করছে পাটনা পদ্ধতি(সাধারণ পাতন পদ্ধতির সঙ্গে সূর্যালোকে শুকিয়ে) ছাড়াও যে পদ্ধতি বাংলার কুঠিয়ালেরা নকল করে লিখলেও সেটা বাংলায় প্রয়োগ করেন নি (ডি বি, ১ আগ, ১৬৮৩, ৯০ খণ্ড, ১৯২; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস হুগলী, ১০ খণ্ড, ১১৬। তাভার্নিয়ে সপ্তদশ শতকের ছয়ের দশকে ডাচেদের সোরা পরিশ্রুত করার অদ্ভুত এবং ব্যতিক্রমী পদ্ধতির কথা আলোচনা করেছেন – ডাচেরা ছাপড়ায় একটি কুঠি-ডিপো তৈরি ক’রে সেখানে সোরা পরিশ্রুত করত। ফোটানোর জন্যে পাত্র হল্যান্ড থেকে আমদানি করত এবং পরিস্রবন করার কারিগর নিজেদের কোম্পানি থেকে নিয়োগ করত। কিন্তু তারা সেই কাজে সফল হয় নি কারণ এদেশের মানুষ দেখল, তারা পরিস্রবনের জন্যে অর্থ পাবে না, ফলে তারা সোরা সরবরাহ বন্ধ করে দিল। এই সোরা ছাড়া কোনওভাবেই ব্লিচ করা যায় না, দেখুন তাভার্নিয়ে, প্রাগুক্ত, খণ্ড ২, ১২)। আমরা যে সময়টি নিয়ে আলোচনা করছি, সেই সময়ের শেষের দিকে কোম্পানি ফোর্ট উইলিয়ামে সোরা পরিস্রবন করার উদ্যোগ নিলেও সেটি খরচ সাপেক্ষ দেখে বন্ধ করে দেয় এবং যেখানে এটি উৎপাদন হয় (যথা, পাটনা) সেখানেই সিদ্ধান্ত নেয় পরিস্রবন করানোর, যেখানে একটু বেশি অর্থ দিলেই সহজে কাজটা হয়ে যাবে (ডি বি, ৩ ফেব ১৭২০, ১০০ খণ্ড, ২২৪)।
বে [বঙ্গোপসাগর] অঞ্চলের কুঠিগুলির খরচ কমানো আর অনাদায়ী ধারের প্রবণতা বৃদ্ধি রোখার জন্যে কোম্পানি এক সময় মাদ্রাজ এবং হুগলীতে রেশম এবং তাফেতা তৈরির কারখানা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কারন এখানে কোম্পানির অবস্থা কাশিমবাজারের তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত। ১৬৬১তে বাংলা কাউন্সিলকে এক চিঠিতে লন্ডনের কর্তারা লিখলেন, কোম্পানি তাঁতিদের বহু আগেই যে অগ্রিম দিচ্ছে, যেখানে আমাদের কোনও ক্ষমতা কাজ করে না, এবং শেষে আমাদের বিপুল ক্ষতি হয়। তারা বাংলা কাউন্সিলকে কতগুলো পরামর্শ দিল, যদি সম্ভব হয় কাশিমবাজারের কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করে পণ্যগুলি হগলীতে নেওয়া যায় কি না, এবং কাশিমবাজারের কুঠিটাকে তুলে দেওয়া যায় কি না। না হলে তারা বাংলার রেশম এবং কাশিমবাজারের তাঁতিদের ফোর্ট সেন্ট জর্জে তুলে নিয়ে রেখে, সেখানে তাদের দিয়ে তাফেতা বোনাতে পারে কি না। এই দুটোর একটাও যদি করানো যায় তাহলে ব্যবসা বিপুল পরিমানে বাড়বে। আর যদি এই দুটির কোনও একটাও করা না যায় তাহলে তাঁতিদের হুগলীতে নিয়ে গিয়ে সেখানে তাফেতা বোনানো হোক (ডি বি ২৮ জান, ১৬৬১, ৮৫ খণ্ড, ৩৬৭-৬৮; ই এফ আই, ১৬৬১-৬৪, ৬২-৬৩)। (চলবে)