ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
পঞ্চম অধ্যায়
শিল্পের সংগঠন
উত্তরে বাংলার কুঠিয়ালেরা জানাল প্রথম পরিকল্পনাটি রূপায়িত করা যেতে পারে, কিন্তু অন্য দুটি কোনওক্রমেই বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। মাদ্রাজে তাফেতা বানানোর প্রশ্নে জানানো হল, গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা দুটির প্রথমটা হল খরচ, কারণ মাদ্রাজে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সর্বনিম্ন, সেটা বাংলার কাশিমবাজার বা হুগলীর থেকে তিনগুণ বেশি আর দ্বিতীয়ত তাঁতি এবং অন্যান্য কারিগর যারা ওখানে থাকবেন, তাদের দুয়ের তিনভাগ খরচ কমাতে হবে, নাহলে তারা মাদ্রাজে টিকতে পারবে না। আর কাশিমবাজারের তাঁতিদের কোম্পানির শহর মাদ্রাজে বসবাস করতে বলা যাবে না, কারণ যদি তারা নোনা এলাকায় বাস করতে যায় তাহলে তারা জাত এবং বংশগতির জন্যে তাদের অঞ্চলে জন্মাগত অধিকারগুলো হারাবে। একইভাবে কাশিমবাজার থেকে হুগলীতেও তাঁতিদের নিয়ে এসে তাফেতা আর রেশমের বানানোর কাজ করানো খুব কঠিন কাজ। হয়ত ব্যবসায়ী আর তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে পণ্য হুগলীতে আনানোর ব্যবস্থা করা গেলেও যেতে পারে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, ফোর্ট সেন্ট জর্জ, ১৪ খণ্ড, ১৪৯, ১৭৬-৭৭; ই এফ আই, ১৬৬১-৬৪, ৬৫)।
কিন্তু কোম্পানি রেশম আর তাফেতা জোগাড় করার জন্যে কাশিমবাজারের কুঠি তুলে দেয় নি। ১৬৯১ সালে ফোর্ট জেনারেল চিঠিতে বলা হল মাদ্রাজে তাফেতা তৈরি করার কোনও সুযোগ নেই, কারণ বাংলার থেকে এখানে উৎপাদন ব্যয় অন্তত ৫০% বেশি পড়ে যাবে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনিয়াস, খণ্ড ৩এ, ১৭৯)। ১৬৯৫তে কলকাতা কাউন্সিল তিন চারজন অভিজ্ঞ তাঁতিকে তুঁত গাছ এবং গুটি দিয়ে মাদ্রাজে পাঠাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, কলকাতা, খণ্ড ৬, অংশ ১, ১০)। কুঠিয়াল লিখলেন এই কারিগর বাঙ্গালিদের ভাল মাইনে ইত্যাদির সুযোগসুবিধের কথা বললেও তাদের জন্মস্থান ত্যাগ করে যেতে রাজি নয় (প্রাগুক্ত, খণ্ড ৬, অংশ ২, ৭৬)। অথচ স্থানীয় শিল্প বৈদেশিক রুচি, আকার, স্বাদের বরাত ইত্যাদি অনুসারে নিজেদের কাজ কিন্তু ঢেলে সাজিয়ে নিয়েছিল খুব সহজেই। বালেশ্বরের কুঠিয়াল লিখছেন ১৬৬৯ সালে – দ্য সানোজ, গিঙ্গহ্যাম ইটিসি প্রোভাইডেড এবাউট দিস প্লেস ক্যাননট বি মেড অব লেংথ এন্ড ব্রেথ বিয়ন্ড দোজ নাউ সেন্ট, আনলেস দ্য প্রাইস বি অগমেন্টেড ইন আ লার্জ প্রোপোরশন দ্যান দ্য ডায়মেন্সন্স, সিনিস ইউজ এন্ড কাস্টম এমংস্ট দিজ উইভার্স ইজ নট ট বি অল্টার্ড উইদাউট আ চেঞ্জ (ফ্যাক্টরি রেকর্ডস, মিসলেনিয়াস, খণ্ড ৩, ৯৯)।
ব্যবসার আর শিল্পের সংগঠনে যে সব প্রকরণ ব্রিটিশ কোম্পানি নিয়েছিল, সেগুলি সে সময়ে বাংলায় অনুসৃত হত। তবুও ইওরোপিয় কোম্পানি ব্যবসা এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় বেশ কিছু নতুন ধারনা নিয়ে আসে, যদিও সে সব বড় আকারের ছিল না। সেই সব নীতিমালা যে হেতু সামগ্রিকভাবে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে নি, সীমাবদ্ধ ছিল কোম্পানির কাজকর্মে, তাই সে সব নীতিমালাগুলোকে আমরা উদ্ভাবন বলতে পারি কিনা ভেবে দেখা দরকার। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি বাংলায় আবির্ভূত হবার আগে এশিয় ব্যবসায়ি এবং পর্তুগিজেরা বাংলার বাজারগুলো থেকে, এমন কী কারিগরদের থেকে যক্সে পণ্য পাওয়া যেত সেই পণ্যই কিনত। কিন্তু একচেটিয়া সওদাগরি বড়পুঁজি ইয়োরোপীয় বাজারে ভারতীয়ত্ব খোঁজার বাতিকের ঝড়ে বিপুল দামে ভারতীয় পণ্য বিক্রি করতে শুরু করে। সেই পণ্যগুলোর আকার তারা চলতি আঙ্গিক থেকে পাল্টে নিজেদের মত করে প্রমিত আকার, রং, গুণমা ঢেলে সাজিয়ে, ইওরোপিয় বাজারে আরও নতুন ধরণের চাহিদা তৈরি করে যা সে সময় ইওরোপ এবং বাংলাতেও নতুন রকমের ছিল। এই ধারণাকে খুব বেশি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না, তার কারন হল, প্রথমত এই ব্যবস্থার খুব বেশি প্রভাব বাংলার কারিগরি উৎপাদন ব্যবস্থায় পড়ে নি, কোম্পানিগুলোর পণ্য প্রমিতিকরণের পরিকল্পনায় স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা খুব বেশি সাড়া দেয় নি, দ্বিতীয়ত বাজারে যেহেতু অনেক ধরণের ক্রেতা ছিল (এবং ব্রিটিশেরা খুব বড় ক্রেতা ছিল না — অনুবাদক) তাই উৎপাদকেরা বা ব্যবসায়ীরা সামগ্রিকভাবে কোনও প্রমিতিকরণের প্রচেষ্টাকেই গুরুত্ব দেয় নি কারণ তারা নিশ্চিত ছিল তাদের পণ্য কেউ না কেউ কিনে নিয়ে যাবে।
ইওরোপিয়দের বাংলায় উপস্থিত হওয়ার আগেই এশিয় এবং পর্তুগিজ ব্যবসায়িরা দাদন দেওয়ার সময় পণ্যের নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করত না বরং কারিগরেরা পণ্য সরবরাহ করতে এলে দাম দরকষাকষি করে পণ্যের দাম তৈরি হত। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি কারিগর বা মধ্যস্থদের আগে একটি নমুনা কাপড় দিয়ে দিত এবং দাদন দেওয়ার সময় সেই নমুনা অনুসরণে দাম ঠিক করা হত। এটাই দীর্ঘ পরম্পরার ব্যতিক্রম। তারা কাপড়ে ব্লিচিং রং রেশম গোটানো, পাকানো ইত্যাদির জন্যে নিজেরাই প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করছে। এই ব্যবস্থায় তারা কারিগরদের মজুরি শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করে ইওরোপ থেকে নানা ধরণের কারিগর নিয়ে এসে তাদের মত করে উতপাদনের কাজ করিয়েছে। এই ব্যবস্থা স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে বিস্তৃত করলেও এই ধরণের উৎপাদন ব্যবস্থা এদেশে খুব নতুন কিছু ছিল না। তখনও শাহী কারখানা ছিল, যদিও তারা খোলা বাজারের জন্যে উৎপাদন করত না। কিন্তু আমাদের ধারনা এই ধরণের কারখানা ইওরোপিয় ব্যবসায়িদের মডেল হিসেবে কাজ করেছে। খুব ছোটস্তরে হলেও সপ্তদশ শতকে সেগুলি ভারতজুড়ে চালু ছিল।
১৬২০তে পাটনা ঘুরতে যাওয়া ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা সেখানে ১০০ জন রেশম গোটানো কারিগর নিয়ে একটি Corconna তৈরি করার ভাবনা ভেবেছিলেন (ই এফ আই, ১৬১৮-২১, ১৯৭-৯৮) অবশ্যই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনুসরণ করেই। বার্নিয়েও যতদূর সম্ভব এই ধরণের ব্যক্তিগত উদ্যমের কারখানার কথা বলেগিয়েছেন — তিনি বলছেন ধনী ব্যবসায়ী আর সওদাগরেরা …কারিগরদের বেশ উঁচু বেতন দেয় (বার্নিয়ে, প্রাগুক্ত, ২২৮-২৯)। ১৭০২-৩ সালে বাংলায় আসা মুসাফির লুইলিয়ার (Luillier) মন্তব্য করছেন বড় ব্যবসায়ীর মধ্যস্থ থাকা সত্ত্বেও তারা কারিগরদের নিয়োগ করেছিলেন, যারা নগণ্য মজুরিতেই কাজ করত (ইন্দ্রানী রায়ের ইন্ডিয়ান ইকনমিক এন্ড সোসাল রিভিউতে প্রাগুক্ত প্রবন্ধ, ৫০)। এটা পরিষ্কার যে ব্যক্তিগত উদ্যমে ছোটছোট কারখানা ছিলই এবং ইওরোপিয়রা এসে সেই ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠনিক রূপ দিল।
মনে রাখা দরকার দাদন ব্যবস্থা সে সময়ের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এ ছাড়াও কিছু কিছু ব্যতিক্রমী উদ্যমে আমাদের আলোচ্য সময় জুড়ে পুটিং আউট পদ্ধতিরও বিকাশ ঘটেছে। মনে রাখা দরকার বৈদেশিক একচেটিয়া পুঁজি বাংলার উৎপাদন ব্যবস্থায় সর্বব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে নি, এটা একটা একটা অঞ্চলের অর্থনীতির কয়েকটি ক্ষেত্রে যেমন রেশম, সোরা, সুতিবস্ত্রের রপ্তানি বাণিজ্যে খুব সামান্য প্রভাব ফেলেছিল। খুব নগণ্য চরিত্রের সওদাগরী বৈদেশিক পুঁজি কারিগরি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শ্রম বিভাজনকে মুছে ফেলতে পারে নি। আমরা জানি যে পুটিং আউট পদ্ধতি উৎপাদনের একমুখী, অভিন্ন এবং সরাসরি পদ্ধতি। লাইফম্যানের চোখ খোলা বিশ্লেষণে আমরা জানতে পারছি যে হিজ এম্ফাসিস আপন দ্য ক্যারেক্টার অব দ্য লেবার কন্ট্রাক্ট মে বি একসেপ্টেড এজ বেসিক টু দ্য হিস্ট্রি অব দিস কনফিউজিংলি ভ্যারিড ফর্মস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অরগানাইজেশন। সে পরিমান পুঁজি হয় নিয়োগকর্তা (পুটার) অথবা শ্রমিক যেই লাগাক, সেটা সেই ব্যবস্থার সংজ্ঞা নির্নয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, যদিও ঐতিহাসিক বিকাশে রাইজ এন্ড ডেভেলাপমেন্ট অব দ্য সিস্টেম মেবি এট্রিবিউটেড টু দ্য রিলেটিভ ওয়েলথ অব দ্য মার্চেন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হু এমপ্লয়েড এন্ড টু দ্য পোভার্টি অব দ্য ওয়ার্কার্স হু কম্পিটেড ফর এমপ্লয়মেন্ট বাংলায় পুটিং আউট পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যবস্থায়, পুঁজির খুব গভীরে প্রবেশ করার উদ্যমের সম্পূর্ণ বিকাশলাভ ঘটে নি।
তবুও এটা বলা যায় যে ইওরোপিয় উদ্যমে এই ব্যবস্থায় বিস্তৃতিলাভ করছিল, তবে এই সময়ে সেটা বাংলায় ঘটে নি। আমরা দেখলাম খুব বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবসায়িরা তাঁতি আর কারিগরদের ছোট ছোট কারখানায় নিযুক্ত করছে — যে পদ্ধতিটা ইওরোপিয়রা আত্মীকরণ করে নেবে ভবিষ্যতে। এই ধরণের একটি কারখানা ছিল ডাচেদের। তারা ৪০০ সুতি ও রেশম তাঁতি নিয়োগ করেছিল কাশিমবাজারে। এরা সক্কলে মজুরি শ্রমিক, যাদের কাজ যেমন বোনা, সুতো গোটানো, ব্লিচ করা, রং করার কাজের শ্রমিকের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকত মালিকের। এটা দাদনি ব্যবস্থাও নয় আবার কারিগরি উৎপাদন ব্যবস্থাও নয়। অবশ্যই একটা কেন্দ্রিভবন আর শ্রম বিভাজনের দিকে যাওয়ার সামগ্রিক ঝোঁক দেখা যাচ্ছিল। (চলবে)