ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
ষষ্ঠ অধ্যায়
সোরা
বাংলায় কোম্পানির ব্যবসার শুরুর সময় থেকেই ইংলন্ডে এবং ইওরোপের অন্যান্য দেশে রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে সোরার বড় ভূমিকা ছিল। বারুদের অত্যাবশ্যক উপাদান ছিল সোরা আর যুদ্ধে বিধ্বস্ত ইওরোপে সোরার বিপুল চাহিদা ছিল। এছাড়াও যাত্রা পথে সোরার অন্যতম উপযোগিতা ছিল জাহাজের ভরকেন্দ্র স্থির রাখার জন্যে [অর্থাৎ কাঠের জাহাজ সমুদ্রের ঝড়ে যাতে ডুবে না যায়, তার জন্যে জাহাজের খোলের তলায় ভারি পণ্য রাখা হত] এবং অতিবিক্রিযোগ্য উপাদান হিসেবে কোম্পানিকে সোরা প্রভূত সুবিধে দিয়েছে, না হলে কোম্পানিকে লোহার মত অনর্থনৈতিক পণ্য পরিবহন করে ক্ষতি সইতে হত। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শুরুতে ইংলন্ডে সোরার ব্যাপক অভাব দেখা দেয় এবং বহু খুঁজেও যখন এই পণ্য পাওয়া গেল না তখন সিদ্ধান্ত নেয় ভারত থেকে এটা আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিল। প্রথম সরবরাহ ইংলন্ডে পৌঁছয় ১৬২৬ সালে (কোর্ট বুক, ৯, ৩২০, ৫ জানু ১৬২৭; উদ্ধৃত হয়েছে কে এন চৌধুরীর প্রাগুক্ত বইতে, ১৮৯ পাতায়)। ইংলন্ডে এই প্রথম সোরা পৌঁছবার পরে কোম্পানিকে আর ফিরে তাকাতে হয় নি, বিপুল চাহিদা তৈরি হয় সোরার। তবে সোরার সব থেকে বড় চাহিদা ইংলন্ডেই তৈরি হয় গৃহযুদ্ধের পরেই।
চারের দশক পর্যন্ত ইংলন্ডে করমণ্ডল এবং গুজরাটের সোরা রপ্তানি হত। ফরাসী ব্যবসায়ী থেভেনো (Thevenot) ১৬৬৬ সালে লিখছেন, সোরা আজমেরে প্রক্রিয়াকৃত হয়ে পশ্চিম ভারতের সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং এই পণ্যগুলো ইওরোপিয় ব্যপারীরা জাহাজের ভরকেন্দ্র ঠিক রাখার জন্যে ব্যবহার করে এবং এগুলো ইওরোপের বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় (এস এন সেন সম্পাদিত, ইন্ডিয়ান ট্রাভেলস অব থেভনো এন্ড কারারি, ৭৪)। চল্লিশের দশকের আগে পর্যন্ত কিন্তু করমণ্ডল ইওরোপের সোরা চাহিদার মুল সরবরাহকারী ছিল। ১৬২৪ এবং ১৬২৫ সালে করমণ্ডল থেকে ডাচেরা যথাক্রমে ২,৭০,০০০ এবং ২,৮৬,৪৩৪ পাউন্ড সোরা বাটাভিয়ায় রপ্তানি করে। ত্রিশের দশকের শেষের দিকে ক্রমশঃ বাংলার সোরা করমণ্ডলকে স্থানচ্যুত করতে থাকে এবং প্রধান সোরা যোগানের সুত্র হয়ে উঠতে থাকে।
বাংলা সুবায় সোরা পাটনা অঞ্চলে বিপুল পরিমানে তৈরি হত। এই সূত্রটি আবিষ্কার করায় সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে, এবং অষ্টাদশ শতকের প্রথম পাদে কোম্পানির ব্যবসা ক্ষেত্রে বিপুল বিপ্লব ঘটে যায়। ১৬৮৮ সালের ডাচ সূত্র (কে এ, ১৩৪৩, ৭৪৯ভিও, দেখুন এপেন্ডিক্স ৬) থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারছি — যেমন বাৎসরিক উতপাদনের পরিমান, সোরা উতপাদনকারী পরগণাগুলির নাম, এবং যে সব প্রশাসনিক আমলা এগুলির ব্যবস্থাপনা এবং মালিক ছিল তাদেরও নাম। এই সূত্র জানাচ্ছে বাৎসরিক এখানে ২,২৬,২০০ মণ অপরিশ্রুত সোরা উৎপাদন হত এবং সেটা পরিশ্রুত হয়ে দাঁড়াত ১,২৭,২৩৮ মণ। এই সূত্রটি আরও জানাচ্ছে এর মধ্যে ১২০০ মণ হুগলীতে যেত, ৩০০০ মণ ঢাকায় যেত এবং ৭,০০০ মণ পাটনার বারুদ কারখানায় রাখা থাকত — বাকি ১,০৫,২৩৮ মণ রপ্তানির জন্যে রেখে দেওয়া হত (কে এ, ১৩৪৩, ৭৪৮ভিও-৭৪০ভিও)।
পাটনায় অতিউচ্চ গুণমানের সোরা উৎপাদন হত। সেই সোরা বারুদ তৈরির মূল উপাদান হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছে। এছাড়া পাটনার সোরা জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটাও বড় কারণ ছিল বাংলার সোরার দাম অন্যান্য এলাকার সোরার দামের তুলনায় অনেক কম (বলা হত পাটনায় ৭৪ পাউণ্ডে যে মণ হিসেব হত তা আহমেদাবাদের ৩৭ পাউণ্ডের সমান অর্থাৎ অর্ধেক দাম। ফ্রম আকবর টু আওরঙ্গজেবে মুরল্যান্ড ১২১ পাতায় এই তথ্য বলছেন। উপকূলে এক টন সোরার দাম ৮-৯ পাউন্ড, হুগলীতে সেটা ৬ পাউন্ড, দেখুন, ডি বি, ২৮ জানু, ১৬৫৯, খণ্ড ৮৪, ৪১১-১২; প্রাগুক্ত, ১৬ সেপ্ট ১৬৬০, ৮৫ খণ্ড, ৩৩৪)। ১৬৫০ সালের হিসেবে জানতে পারছি প্রতি মণ পাটনা সোরার দাম ছিল ১ টাকা এর সঙ্গে শুল্ক, পথ কর ইত্যাদি জুড়লে দাম হত ১ টাকা ১২ আনা প্রতি মণ (ও সি, ১৫ ডিসে, ১৬৫১, ২১৮৮, ২২ খণ্ড)। পরিবহনের দৃষ্টিভঙ্গীতে বাংলার সোরার আরেকটি সুবিধে ছিল, পাটনা থেকে সেটিকে গঙ্গা বাহিত করে হুগলী পাঠিয়ে ইওরোপগামী জাহাজে তোলা এবং ব্যালাস্ট হিসেবে মাদ্রাজে পাঠানোর কাজ অনেক সোজা এবং শস্তা ছিল। এই সবের কারণে ইওরোপ এবং ইংলন্ডে বাংলার সোরার চাহিদা বাড়িয়ে দিতে থাকে এবং কোম্পানিও এই বিপুল চাহিদার বানে ভেসে যেতে যেতে তাদের সোরা রপ্তানিও বাড়াতে থাকে।
সোরার শ্রেণী বিভাগ। সাধারণত সোরা তিন প্রকারের, প্ররিস্রুত দোবারা-কাচেসা বা কলমি, দুবার ফোটানো দোবারা এবং সাধারণ কাঁচা সোরা (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ১০, ২২)। ইওরোপিয় কোম্পানিগুলি পরিস্রুত সোরাই রপ্তানি করত কেননা পরিস্রুত সোরা দিয়ে সরাসরি বারুদ তৈরি করা যেত। এছাড়া অপরিস্রুত সোরা রপ্তানি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ছিল না কারণ দুটিরই শুল্ক একই ছিল (ডি বি, খণ্ড ৯৫, ২৩২এ বলা হচ্ছে যে সোরা আপনারা কিনছেন সেটা ভাল করে পরীক্ষা করে নেবেন, পরিস্রুত বা কাঁচা সবকটার শুল্ক এবং পথ কর একই। কিন্তু কাঁচা আর পরিস্রুত সোরার পার্থক্য মোমবাতির সামনে ধরলেই বোঝা যায়)। অনেক সময় কোম্পানিগুলি তাদের কুঠিতে সোরা পরিস্রবনের পরিকাঠামো তৈরি করেত। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাটনা থেকে বিপুল পরিমান সোরা সংগ্রহ করে হুগলী বা পিপলিতে পরিস্রুত করে বাটাভিয়ায় পাঠাত। ১৬৪০-৪১ সালে ডাচেরা পিপলিতে একটি সোরা পরিস্রবন কারখানা তৈরি করে ফেলেছিল হল্যান্ড থেকে তামার পাত্র আনিয়ে (টি রায়চৌধুরী, প্রাগুক্ত, ১৬৯-৭০)। সপ্তদশ শতকের ষাটের দশকে তাভার্নিয়ে বলে গিয়েছেন যে ডাচেরা গঙ্গার ডান পাড়ে, পাটনা থেকে ২০ মাইল দূরে বড় আকারের গ্রাম ছাপড়ায় সোরা পরিস্রবন কাঠামো তৈরি করেছে (তাভার্নিয়ে, প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, ২২)। ব্রিটিশেরাও সিঙ্ঘি বা পাটনাতে একটা পরিস্রবন কারখানা করে(যতদূর সম্ভব ব্রিটিশেরা সিঙ্ঘি, পাটনা থেকে ১০-১২ মাইল উত্তরেতে একটি কারখানা তৈরি করে, যতদূর সম্ভব পাটনায় নয়, কারণ হিসেবে দেখুন ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, মিসলেনি, খণ্ড ৩, ৬৩; ফ্যাক্টি রেকর্ডস, মিসলেনি, খণ্ড ১৪, ৩৩১-৩২)।
সোরা থেকে বর্জ্যপদার্থ বার করার কাজ করা হত ভারতীয় উদ্বায়ীকরণ পদ্ধতিতে যেখানে মাটির পাত্র ব্যবহৃত হত। আমরা আগেই ব্রিটিশ সূত্র থেকে লিখেছি যে এই কাজটি খুব শ্রমসাধ্য ছিল এবং কাজের মাঝখানে মাটিরপাত্রগুলো ফেটে বিপদ ডেকে আনত (পঞ্চম অধ্যায়, ৩)। কাজের তামার পাত্র স্থানীয়ভাবে পাওয়া যেত না বলে কোম্পানি ঠিক করল, মাদাগাস্কারের আসাদায় চিনি তৈরির কাজে পাঠানো পাত্র আনার ব্যবস্থা করতে হবে (ও সি, ১৪ জানু, ১৬৫২, ২২৪৬, ২২ খণ্ড; ই এফ আই, ১৬৫১-৫৪, ৯৫)। তবে পরিস্রবন করার খরচ খুবই নগণ্য ছিল প্রতি মণে এক আনার তিনের চার অংশ মাত্র (বি পি সি, রেঞ্জ ১, খণ্ড ৬, ৪৮৮এ)। আগেও লিখেছি ব্রিটিশেরা পরিস্রবন খুব খরুচে হিসেব করে সেই কাজ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছিল (পঞ্চম অধ্যায়, ৩)।
সোরা বরাতের যে নির্দেশ ইংলন্ড থেকে আসত সেগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে দুটি কারণে বরাতের পরিমান বেড়েছে। যুদ্ধের সময় বাংলা থেকে সোরার রপ্তানি বাড়ত আর শান্তির সময় কমে যেত। দ্বিতীয়ত জাহাজের সংখ্যার ওপর নির্ভর করত সোরার বরাত, কারণ আগেই বলেছি জাহাজের ভরকেন্দ্রকে স্থির রাখার জন্যে সোরা পরিবহন করার দরকার হত। সোরা শুধু বাংলার জাহাজেই ব্যবহার হত না, মাদ্রাজ, মুসলিপত্তনম, ব্যান্টাম আর বেঙ্কুলিন থেকে ছাড়া জাহাজেও বাংলার সোরা ব্যালাস্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৬৫১ সালে বাংলায় ব্রিটিশ কুঠি তৈরি হওয়ার সময় থেকে যে সোরার বরাত বৃদ্ধি শুরু হয়েছিল, সেটি ১৬৮১ পর থেকে ক্রমশঃ বরাতের পরিমান কমতে থাকে। বরাত কমার কিছু নির্দিষ্ট কারণ আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রাথমিকভাবে ইওরোপে যুদ্ধের প্রকোপ কিছুটা কমে যাওয়ায় চাহিদা কমতে থাকে। দ্বিতীয়ত, আমরা দেখব ১৬৮১ থেকে হঠাৎই বাংলার রেশম আর সুতির থান কাপড়ের ইওরোপে চাহিদা বাড়তে থাকে ফলে সোরা বয়ে নিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা কমে যায়। (চলবে)