ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
দ্বিতীয় অধ্যায়
বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসাকর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
বারো বছর পর অদ্ভুত এক প্রশাসনিক ভুলে পাটনায় কুঠি তৈরি করার পথ খুলে গেল। ব্রিটিশ কোম্পানির করণিক নতুন কুঠি তৈরি স্থানের নাম পাঞ্জাবের সুমনা লিখতে গিয়ে পাটনা লিখে ফেলেছিলেন। তো, পাটনা কুঠির দায়িত্ব দেওয়া হল পিটার মুণ্ডিকে। তিনি পাটনায় পৌঁছলেন। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মুণ্ডি বুঝেছিলেন তাঁকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটা স্বাভাবিক সিদ্ধান্তে ঘটে নি, ঘটেগিয়েছে করণিক ভুলের জন্যে। হয়ত তাঁকে এই ভুলের মাশুল গুণতে হতে পারে। পাতনায় ব্যবসা ব্যর্থতার দায় যাতে তাঁর কাঁধে না আসে, তার জন্যে প্রথম থেকেই তিনি, তাঁর ওপরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতাও করলেন, ব্যর্থাত্র দায় ঝেড়ে ফেলার জন্যে পাটনায় না যাওয়ার যুক্তি খাড়া করলেন (আর সি টেম্পল, দ্য ট্রাভেলস অব পিটার মুণ্ডি ইন ইওরোপ এন্ড এশিয়া, খণ্ড ২, ট্রাভেলস ইন এশিয়া, ১৩৮-৪১)। আগরা কুঠিয়াল ফ্রেমলেন দুটি উদ্দেশ্যে তাকে পাটনা অভিযানে পাঠাচ্ছিলেন, পারদ (কুইকসিলভার) আর সিঁদুরের (ভার্মিলিয়ন) বাজার খোঁজা। এই দুটি পণ্য আগরা কুঠিতে অবিক্রির অবস্থায় বহুকাল পড়েছিল পড়েছিল। দ্বিতীয়ত সুরাট কাউন্সিল ইংলন্ডের বাজারের জন্যে মোটা কাপড় সরবরাহের জন্যে বড় উৎপাদন এলাকা খুঁজছিল (ঐ, ১৩৮-৩৯)। পারদ আর সিঁদুর ভারতের বাজারে নিয়ে এসেছিল ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীরা ১৬৩১ সালে। এই দুটি পণ্য অনারেবল কোম্পানির বিপুল ক্ষতি আর বখেড়া খাতায় দেখানো ছিল। ১৬৩২ সালে এগুলিকে সুরাট থেকে আগরায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় যাতে পণ্যগুলির চাহিদা বাড়ে আর মূল্যমানও না কমে। কিন্তু আগরাতেও (যা তখনকার উত্তর ভারতের সব থেকে বড় পাইকারি বাজার ছিল) এই দুই পণ্যের বাজারও পাওয়া গেল না আর দামও মিলল না। ফলে ফ্রেমলেন এই দুই পণ্যের দায় নিজের কুঠির কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে পাটনায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর মনে হল নতুন বাজারে এই দুই পণ্যের দাম পাওয়াগেলেও পাওয়া যেতে পারে (ঐ, ১৩৮)। ইতিমধ্যে আরও বড় একটা দুর্ঘটনা ঘপটেগেছে। ১৬৩০-৩২এ ভয়াল মন্বন্তরে গুজরাটের সমৃদ্ধি ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে কোম্পানি গুজরাটের বিনিয়োগ আর আগামী দিনের বিনিয়োগ অন্য কোনও বাজারে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। উতপন্ন কাপড়ের নতুন সরবরাহ কেন্দ্র খোঁজা আর সেখানে বিনিয়োগ বাড়াবার কাজ তীব্রভাবে শুরু হল।
তাঁকে পাটনা পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুণ্ডি কোম্পানির আভ্যন্তরীণ প্রশাসনে লড়াই করার কারন ছিল কী বিক্রি না হওয়া পারদ আর সিঁদুর, ঠিক দামে বিক্রির জন্যে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া? ঠিকঠাক কারন আর আজ জানা সম্ভব নয় (কিন্তু মুণ্ডির এই আশংকার কারণ ছিল না। সে নিজেই বলেছিল এই দুটি পণ্য পাটনায় পাঠানোর কারণ হল (প্রখ্যাত গুজরাটি ব্যবসায়ী) বির্জি ভোরার কুঠিয়াল নুরহর (নরহরি?) এবং অন্যান্যরা পারদ আর সিঁদুরের দাম প্রত্যায়িত করে জানিয়েছিল যে ব্রিটিশেরা পাটনায় এই পণ্য দুটোর ৪টাকা থেকে সাড়ে ৪টাকা প্রতিসেরের দাম পাবে, দেখুন পিটার মুণ্ডি, প্রাগুক্ত, ২ খণ্ড, ১৩৮), কিন্তু বাস্তব হল আগরার কুঠিয়ালেরা সেই পণ্যগুলো খোলা বাজারে ঠিক দাম পাচ্ছিল না কারণ সারা হিন্দুস্থানজুড়েই এই ধরণের পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করত পাইকারেরা – খোলা বাজারে দাম নির্ধারণ হত না। পাটনায় সুতিবস্ত্র কেনার ব্যাপারে মুণ্ডির বক্তব্য ছিল, তার হাতে মাত্র ৭৫ দিন আছে কাজটা করার জন্যে যার মধ্যে ৪০-৪৫ দিন চলে যাবে রাস্তায়, ওই কম সময়ে নতুন কুঠির দায়িত্ব নিয়ে, কোম্পানির বিনিয়োগের বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা করা তার পক্ষে কঠিন। এছাড়া আম্বার্তি সুতির কাপড় ছাড়া অন্য কোনও কাপড় পাটনায় তৈরি হয় না। ফলে এই বিনিয়োগ করার জন্যে উপযোগী স্থান পাটনা নয়। এই কাপড় উতপন্ন হয় আগরা থেকে কিছু মাইল দূরে দারিয়াবাদ বা খইরাবাদে।
১৭৩২ সালের সেপ্টেম্বরে মুণ্ডি আগরায় পৌঁছেলেন। আম্বার্তি কাপড়ের জন্যে মধ্যস্থদের কাছে নমুনা চাইলেন। তার ধারণা হল, মধ্যস্থরা যে ধরণের নমুনার কাপড় এনেছেন, তার গুণমান ঠিক নয়, অন্য অঞ্চলের তুলনায় দামি। রি কাপড় তাদের কাজে লাগবে না। এই ব্যর্থতার পরে, ব্রিটিশ কুঠিতে যখন আর একজনও মধ্যস্থ এল না, মুণ্ডি ২৯ সেপ্টেম্বর লাকওয়ারে দুজন দেশিয় মধ্যস্থ পাঠালেন। এখানে আম্বার্তি কাপড় সব থেকে বেশি তৈরি হয়। উদ্দেশ্য যুক্তিসঙ্গতভাবে অর্থ বিনিয়োগ করে বস্ত্র কেনা। ৫ অক্টোবর গঙ্গারাম নামে এক মধ্যস্থ ফিরে এল। সঙ্গে নিয়ে এলেন মোটা লিনেন কাপড়ের সব থেকে বড় পাইকার। তিনি মুণ্ডিকে বললেন, বললেন আম্ব্রাতি কাপড়ে বিনিয়োগ করা লাভচজনক ঠিকই, কিন্তু তার জন্যে খুব কম করে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ দিন হাতে রাখতে হয়, শুধু ব্লিচিং করতে অন্তত একমাসের বেশি সময় দরকার। মুণ্ডি বুঝলেন এই পথে এগোনো লাভ জনক হবে না। খুব বেশি হলে কয়েকটি হাতে গোণা নমুনা সংগ্রহ হবে। তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে (প্রাগুক্ত, ১৪৫-৪৬)। পারদ আর সিঁদুর বিক্রির বিষয়ে মুণ্ডির উদ্যমে সফলতা মিলল না। পণ্যদুটির চাহিদা না থাকা এবং দিনের পর দিন এইগুলির দাম পড়তে থাকায় তাকে ক্ষতি করেও এইগুলি বেচতে হল (প্রাগুক্ত, ১৪৭-৪৯)।
কেন পাটনায় কুঠি খোলা হবে না, কর্তাদের এই যুক্তি মুণ্ডি পুরপুরি উড়িয়ে দিতে পারলেন না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, কর্তাদের চাপে এই মুহূর্তে পাটনায় কুঠি খোলা কোম্পানির স্বার্থ বিরোধী কাজ হবে। কেননা সেই সময় আম্বার্তি সাদা জমির মোটা কাপড় সাধারণ বাজার দরের তুলনায় বেশ বেশি ছিল। অধিকাংশ তাঁতি বাদশাহী পরিবারের জন্যে মিহি লিনেন বুনতে ব্যস্ত ছিলেন। নির্দিষ্ট নমুনায় নির্দিষ্ট পরিমান কাপড় তৈরি করতে বহু মাসের প্রস্তুতি এবং উদ্যম লাগে। মাথায় রাখতে হবে এই আম্বাতি কাপড় গুজরাটি কাপড়ের মত হবে না কারণ গুজরাটি কাপড় দামে কম এবং বুননেও মিহি। তিনি দেখলেন পাটনা বাজারের তুলনায় কোরা রেশম, নীল, লাক্ষা এবং সোরা অন্য বাজারগুলোয় আরও ভাল গুণমানে এবং কম দামে পাওয়া যেতে পারে (প্রাগুক্ত ১৫১)। দ্বিতীয়ত তার মনে হল পাটনার মত দূরত্বের বাজার থেকে থেকে স্থলপথে বা জলপথেও পণ্য পাঠানো অস্বাভাবিক এবং বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। পাটনা বাজারের পণ্য গঙ্গা নদী বয়ে সমুদ্রপথে এবং কিছুটা স্থলেও যেতে পারে। কিন্তু দুটি স্থল পথেই ঝুঁকি আছে তাঁর মনে হল দেশে বিদ্রোহী আর ডাকাতে ভর্তি। তৃতীয়ত লোভী, ভীতিপ্রদ আবদুল্লা খানের জন্যে পাটনায় নিশ্চিন্তে ব্যবসা করা সম্ভব হবে না — আইনের শাসন এবং মনুষ্যত্বের ওপর আবদুল্লা খানের বিন্দুমাত্রও আস্থা নেই। মুণ্ডির শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত করলেন, এক্ষুনি পাটনায় কুঠি খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া অসমিচীন হয়ে যাবে, এখন নানান পণ্যের কিছু নমুনা নেওয়া যাক এবং বাড়িঘরদোর দেখে রাখা যাক, কুঠি খোলার সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে (প্রাগুক্ত, ১৫১-৫২)।
ইতোমধ্যে সুরাটের প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ১৬৩১ সালে মুসলিপত্তনমের ফ্যাক্টরেরা হোপওয়েল নামক একটা জাহাজ বঙ্গোপসাগরের তটবেয়ে বাংলার দিকে পাঠাল। যদিও জাহাজ আর বাণিজ্য দলের মুল লক্ষ্য পিপলি বন্দর নজরদারি করা, কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার জন্যে এই যাত্রার সুফল মিলল না, যদিও বলা হল এই যাত্রাটি ভাল ব্যবসা ভবিষ্যতের শুভসূচনার বিন্দু হয়ে রইল (ও সি, ১৪১১, ১৩ খণ্ড, ইএফআই, ১৬৩৯-৩৩, ১৮৩, ২০৩)। পরের বছর হোপওয়েলের রাস্তা অনুসরণ করে পার্ল নাম্নী একটি জাহাজ পাঠানো হল, এটিও খারাপ আবহাওয়ার জন্যে বাংলার বন্দরে ঢুকতে পারল না। কোম্পানি তবুও বাংলায় ব্যবসা করার উদ্যমে ক্ষান্তি দিল না। নরিসের জায়গায় এজেন্ট অব কোস্ট হিসেবে স্থলাভিষক্ত হলেন টমাস জয়েস। তাকে বলা হল আরমাগাঁও থেকে বাংলায় ব্যবসা করার বিষয়ে উদ্যম নিতে। ১৬৩৩ সালে কোম্পানি আরও দুটো উদ্যম নিল বাংলা ব্যবসা সংযোগ স্থাপনের। অন্য দিকে সোয়ান নামক জাহাজ কাজহীনভাবে বসে থাকায় মুসলিপত্তনম কুঠিয়ালেরা পরীক্ষামূলকভাবে সেটিকে বাংলার দিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়াও আটজন ব্রিটিশারের একটি দল, যার মধ্যে ছিল ব্যবসায়ী র্যালফ কার্টরাইট, এবং টমাস কোলি যিনি দ্বিতীয় পদাধিকারী, বাংলার দিকে একটা দেশিয় জাহাজ পাঠালেন। এই উদ্যমগুলি আগেরটির — অর্থাৎ স্থায়ী কুঠি তৈরির থেকে অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ছিল। (চলবে)