ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
দ্বিতীয় অধ্যায়
বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসাকর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
এখানে আমরা কিছুটা থেমে, একটি যৌক্তিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। বাংলায় পণ্যের শস্তা দাম এবং বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ এবং সফল ব্যবসায়িক উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি কেন বাংলায় কুঠি খুলতে অনেকটা দেরি করল। তা ছাড়াও বাংলায় পর্তুগিজেরা বহুকাল বিপুল লাভের ব্যবসা করছে, ডাচ আর ডেনেরাও সমুদ্রপথে বিরাট লাভের ব্যবসা করছে, এই জমিনি বাস্তবতাটা ব্রিটিশদের জানা ছিল না এমন তো নয়। মনে হয় উত্তর এমনটা হতে পারে লন্ডন, মূলত গোলকুণ্ডার ক্যালিকো আর কিছু দক্ষিণী কাপড় ইওরোপের বাজারের জন্যে চেয়ে পাঠাত। বাংলার বেশকিছু পণ্য, যদি দরকার হত সেটি মুসলিপত্তনমে, মাদ্রাজের হাতের কাছেই পাওয়া যেত। এমতাবস্থায় পর্তুগিজ যুদ্ধ জাহাজের চোখ রাঙানি দেখে কোন দুঃখে বাংলায় ব্যবসা করতে যাবে এই যুক্তিটা অন্য প্রদেশের কুঠিয়ালদের মাথায় ঢুকছিল না।
কিন্তু দক্ষিণে কয়েক দশক ব্যবসা করার পর একটা বিষয় তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে মুসলিপত্তনমে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য বাড়তে থাকা ব্রিটিশ ব্যবসা মার খাচ্ছে। ব্রিটিশদের ১৬২৮ সালে সেখানকার ব্যবসার পাট চুকিয়ে দিতে হয়। ১৬৩০ সালে সরকারি নীতি পরিবর্তিত হলে তারা আবার সেখানে ফিরে যাবে তারা। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা এবং আরও কিছু জুড়ে থাকা বিষয় তাদের নতুন করে বাংলায় ব্যবসা করার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে উৎসাহ দিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হুহুকরে বাড়ছিল দক্ষিণের উপকূল এলাকায় বিশেষ করে মাঝেমধ্যে মন্বন্তরের জন্যে চাল, তেল, মাখন ইত্যাদি উচ্চলাভের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে ব্যবসার একটা সুযোগ ব্রিটিশদের চোখে পড়ছিল। এর পাশাপাশি কোরা রেশম আর সুতি তাঁতিদের বাড়তে থাকা মৃত্যুর হার কাপড়ের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছিল। ফলে ব্রিটিশ কোম্পানির মুসলিপত্তনমের কুঠিয়ালেরা বাংলায় এই পণ্যগুলি নিয়ে ব্যবসা করার কথা চিন্তা শুরু করে সক্রিয়ভাবে। ব্রিটিশদের দক্ষিণ ছাড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারন হল কোম্পানি আমলাদের উচ্চলাভের ব্যক্তিগত ব্যবসা। ব্যক্তিগত ব্যবসায় কোম্পানির প্রায় সব আমলাই জড়িয়ে ছিল। তাই দক্ষিণের রাজনৈতিক উথালপাথালের জন্যে বিনিয়োগ ফেরতের নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছিল না। ১৬৩২ সালে মুঘলেরা পর্তুগিজদের হাত থেকে হুগলী বন্দরের দখলদারি কেড়ে নিয়ে তাদের উপমহাদেশিয় ব্যবসা থেকে বের করে দেওয়ার ফলে, বিপুল ব্যবসায়িক শূন্যতা তৈরি হল বাংলার পশ্চাদভূমিজুড়ে। এই সব কারণগুলোকে তুল্যমূল্য করে কোম্পানির আমলারা স্থির নিশ্চিত হল বাংলায় ব্যবসা করার সুবর্ণ সুযোগ এসে উপস্থিত হয়েছে।
আবার আমাদের গল্পে ফিরে যাই। ১৬৩৩ সালের যে উদ্যমটি নেওয়া হয়েছিল বাংলার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনে, সেটি তার আগের উদ্যমের মত পুরোপুরি ব্যর্থ হয় নি। ছয় ব্রিটিশ ২১ এপ্রিল জাহাজে হরিশপুরে এসে পৌঁছয়। এর কয়েকদিন আগে কার্টরাইট এবং দুজন ব্রিটিশ ওডিসার নবাব আগা মহম্মদ খানের থেকে ব্যবসার পরওয়ানা জোগাড় করেন। সেই পরওয়ানার বলে তারা ঐ অঞ্চলে শুল্কমুক্ত ব্যবসা এবং কুঠি আর জাহাজ তৈরির অনুমতি পেল (উইলিয়াম বার্টন, নিউজ ফ্রম দ্য ইস্ট ইন্ডিজ অর আ ভয়েজ টু বেঙ্গাল (William Burton, News from the East Indies or a Voyage to Bengal), ৩-২১। এই অভিযানে অংশ নেওয়া ছ-জনের মধ্যে বার্টন অন্যতম। এই উদ্যমের মূলসূত্র তার যাত্রাপথের বর্ণনা)। এই সুযোগকে হাতিয়ার করে কটক এবং তাদের বন্দর হরিশপুরের মাঝামাঝি হরিহরপুরে তারা অবতরণ করে। হরিশপুরে যে সব ব্রিটিশ ছিল, তাদের তারা সেখানে ডাকিয়ে নিয়ে আসে (ব্রিটিশদের বাংলার প্রথম কুঠি যে হরিহরপুর, এবং এটি ১৬৩৩ সালেই তৈরি হয় এই তথ্যটি নতুন করে প্রমানিত হয় ওয়াল্টার ক্লাভেলের ১৬৭৬-এর সূত্রে, দেখুন মাস্টার্স ডায়েরি, ২ খণ্ড, ৮৪)। পরে কার্টরাইট এবং আরও দুজন বালেশ্বরের দিকে রওনা হন। ইতিমধ্যে সোয়ান হরিহরপুরে গেলে সেখানে কাউকে দেখতে না পেয়ে বালেশ্বরের দিকে রওনা হয়ে সেখানে থানাগেড়ে বসা কার্টরাইটের দেখা পায়। ১৬৩৪ সালের টমাস জয়েস এবং ন্যাথানিয়েল উইচের চিঠি থেকে পরিষ্কার ১৬৩৩ সনে ব্রিটিশেরা বালেশ্বরে কুঠি তৈরি করে ফেলেছে (ইয়ুল বলছেন বালেশ্বরে কুঠি তৈরির তারিখ ১৬৫১, যা ঠিক নয়, দেখুন এইচ ইয়ুল, হেজেস ডায়েরি, খণ্ড ৩, ১৯৪; উইলসন বালেশ্বর কুঠি তৈরির তারিখ বলেছেন ১৬৩৩, দেখুন সি আর উইলসন, প্রাগুক্ত, খোণ্ড ১, ১৩)। তারা লেখেন বাংলায় কুঠি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে আমরা উপকূলে ফিরে আসার পর।
বাংলায় কুঠি তৈরি করা এবং সেটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হবার বেশ কিছু কারণ ছিল। প্রথমটি দাক্ষিণাত্যে কাপড়ের অভাব এবং তার দাম বৃদ্ধি (৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল)। বাংলায় কুঠি স্থাপনের কাজে প্রাথমিকভাবে কুঠিয়ালদের উৎসাহী করেছিল কারণ বাংলায় কাপড় অসামান্য শস্তা। এর পাশাপাশি তারা দেখল বাংলার চাল, ঘি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মুসলিপত্তনম এবং করমণ্ডল উপকূলে উচ্চলাভের বিপুল ব্যবসা দেবে কোম্পানিকে। এই ব্যবসায় দেশি ছোট জাহাজও কাজে লাগানো যেতে পারে। তারা দেখল বাংলায় ব্যবসা চালিয়ে মুসলিপত্তনম এবং আমারগাঁওতে যে কুঠি চলছিল তার খরচ উঠে অনেক বেশি উদ্বৃত্ত তৈরি হবে। এছাড়াও বাংলার সাদা থান ইওরোপের বাজারে ছেয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পারস্যের দেশগুলো আর দক্ষিণের রাজ্যগুলোতেও সেগুলো পাঠানো যেতে পারে। আমলারা বুঝল বাংলার চিনি পারস্যের বাজারের জন্যে অতি উত্তম পণ্য হিসেবে পরিগণিত হবে এবং চিনি-সহ কয়েকটা পণ্য নিয়ে বান্টামে জাহাজ নিয়ে যাওয়া লাভজনক ব্যবসা হয়ে ওঠার সম্পূর্ণ সুযোগ তাদের সামনে উপস্থিত। গঁদ আর লাক্ষা অতীব শস্তা। এই দুটি পণ্য মাকাসসার আর পারস্যের বাজারের জন্যে উত্তম দামে বিক্রি হতে পাররে। রেশম বিপুল পরিমানে ক্রয় করতে হবে। পারস্যের বাজারের জন্যে বহু প্রজাতির বাংলার কাপড় ধরণের কাপড় এখান থেকেই যেতে পারে। ফলে বাংলা একদিকে ইওরোপিয় বাণিজ্য এবং অন্যদিকে আন্তঃএশিয় বাণিজ্য চালাবার পক্ষে অন্যতম আদর্শ ভূখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হল। এছাড়াও ব্রিটিশরা ভাবল, যদিও সেই ভাবাটা ভুল, বাংলা ইওরোপিয় পণ্যের একটা বড় বাজার হতে পারে। বালেশ্বরে তারা যে সব ব্রড ক্লথ পাঠিয়েছিল সেগুলো বহুকাল ধরে অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকে। তারপরে সেসব পাটনায় পাঠানো হয় — সেখানেও খুব ভাল বিক্রি হল না (ও সি ২৫ অক্টো, ১৬৩৪, ১৫৩৬, ১৫ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৩৪-৩৬, ৪০-৪৩)।
কিন্তু অমিত উৎসাহ, প্রচুর উদ্যম নিয়ে বাংলায় ব্যবসার চেষ্টা প্রথমের দিকে যথেষ্ট ফল প্রদান করে নি। হরিহরপুর কুঠির দায়িত্বে থাকা টমাস কুলি ১৬৩৩-এর ২৫ আগস্ট মারা যান (বার্টন, প্রাগুক্ত, ২৬)। এক বছরের মধ্যে ছয় জনের মধ্যে পাঁচ জন কুঠিয়ালই বাংলার আবহাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ল। এছাড়া পর্তুগিজ আরাকানি জলদস্যুদের হাতে মাঝেমধ্যেই ব্রিটিশ পণ্যবাহী জাহাজ আক্রান্ত হচ্ছিল। সম্প্রতিককালে মুঘলদের হাতে মার খেয়েও বাংলার সমুদ্র ব্যবসা জগতে পর্তুগিজদের প্রতাপ কমে নি। সঙ্গে ছিল ডাচেদের বাণিজ্য বিরুদ্ধতা। এই সবের মধ্যে ব্রিটিশদ্দের কাছে সব থেকে বড় ধাক্কা ছিল পর্তুগিজদের বাণিজ্য বিরুদ্ধতা, এবং বালেশ্বরে টমাস কুলির স্থলভিষিক্ত হওয়া। জন পাউলি একটি চিঠির ভাষায় এই দ্বিধা স্পষ্ট, …আমরা যদি পর্তুগিজদের হুগলী থেকে তাড়িয়ে দিইও, শাহজাহান তাদের খুবই পছন্দ করেন… তাই হুগলীতে আমাদের খুব বেশি আশা না করাই ভাল (ও সি, ১৭ জুলাই, ১৬৩৩, ১৫১০, ১৪ খণ্ড; হেজেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৭৭; ইএফআই ১৬৩০-৩৩, ৩০৮)। কার্টরাইট বাস্তব অবস্থা বুঝে খুব কিছু করে উঠতে পারলেন না, এবং প্রায় এক দশক ধরে হরিহরপুর এবং বালেশ্বর ব্রিটিশদের বাংলা ব্যবসার প্রধান কুঠি হিসেবে কাজ করতে থাকে। জগন্নাথ (পুরী) এবং পিপলিতে কুঠি করার সমস্ত আসা ত্যাগ করতে হল। হিজলি থেকে ১৬৩৬ সালে পর্তুগিজদের হঠিয়ে দেওয়া এবং পিপলির পতনের ফলে ব্রিটিশদের সামনে বাংলায় ব্যবসায় প্রবেশ করার আরেকটি সুযোগ এসে গেল (মাস্টার্স ডায়েরি, ২ খণ্ড, ৮৪)। কোম্পানি সেই সুযোগও নিতে পারল না। কোর্ট অব কমিটিকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে যোগ্য কুঠিয়াল এবং ডাচেদের মত দুতিনটে পিনাশ নৌকো পাঠাবার আবেদন করলেও কাজের মানুষ বা নৌকো কিছুই এসে পৌঁছল না (ও সি, ২৫ অক্ট ১৬৩৪, ১৫৩৬, ১৫ খণ্ড; হেজেসেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৭৯)।
১৬৪০-এ ব্রিটিশেরা ফোর্ট জর্জে একটি শক্তসমর্থ কুঠি তৈরি করায় কোম্পানি ব্যবসায় বিপুল জোর এলেও বাংলা ব্যবসায় তেমন কোন জোর দেখা যায় নি, ১৬৪১ সালে ধার শোধ করতে (বাংলা কুঠিতে ধার ছিল ৮০০০ টাকা, দেখুন ইএফআই, ১৬৩৭-৪১, পাতা ৩৪) এবং বাকি কুঠিয়ালদের নিয়ে আসতে (ও সি ১৬৪১, ১৭৮৭, ১৮ খণ্ড, হেজেসেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৮১) ডায়মন্ড নামে জাহাজ পাঠানো হয়। ১৬৪২ সালে যতদূর সম্ভব হরিহরপুরের কুঠিটা মোটামুটি বন্ধ করে দেওয়া হয় নদীতে পলি পড়ে নাব্যতা হারানোর জন্যে এবং সেখান থেকে সমুদ্রে পণ্য পাঠানোর সমস্যার কারণে (ইএফআই ১৬৪২-৪৫, ২৭, ১২৬; পাদটিকা ১; মাস্টার্স দায়েরি, খণ্ড ২, ৮৪)। বালেশ্বরে ফ্রান্সিস ডে সমীক্ষায় এসে ৩ নভেম্বর ১৬৪২-এ একটা মন্তব্য লেখেন, আমি মনে করি সব কিছুই শেষ হয়ে যায় নি, এই অঞ্চল যতটা খারাপ ভাবা হয়েছিল ততটা খারাপ নয়, এটি স্বচ্ছল এলাকা, এবং এখান থেকে সব পণ্যই বিনা শুল্কে রপ্তানি করতে পার। এখানে যদি দুচারজন কর্মী আমলা থাকে, এই কুঠিকেই লাভজনক করে তোলা যায় যদিনা প্রচুর মাল জমিয়ে ফেলে (ও সি, ৩ নভেম্বর, ১৬৪২, ১৭৯৭, ১৮ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৪২-৪৫, ৬৫; হেজেসেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৮২)। (চলবে)