ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
দ্বিতীয় অধ্যায়
বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসাকর্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
এখানে বলা দরকার বাংলা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে কুঠিয়ালেরা যে লড়াই চালাচ্ছিল, সেটা যতটা না কোম্পানির স্বার্থে, তার থেকে বেশি আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থ রক্ষায়(ডে এবং অন্যান্য মুসলিপত্তনম কুঠিয়ালের ব্যক্তিগত ব্যবসা নিয়ে খোলাখুলি জানিয়েছিল ১৬৪৪ সালে ত্রুম্বল, দেখুন ও সি, ১৭৮৪, ১৮ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৪২-৪৫, ৭২)। যাই হোক না কেন, ডে’র প্রস্তাবে কোম্পানির কুঠিয়ালদের কানে জল গেল এবং ১৬৪৪ সালে ফোর্ট সেন্ট জর্জের একটি চিঠি থেকে জানতে পারি, ওলটনকে আরও দুজন সাহায্যকারীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলা ব্যবসা দেখাশোনার জন্যে পাঠানো হয়। বাংলায় এই সময়ে কোম্পানির পণ্য কেনার বিনিয়োগ ছিল ২হাজার পাউন্ডের একটু বেশি (ও সি, সেপ্ট ১৬৪৪, ১৮৮৫, ১৯ খণ্ড; হেজেসেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৮২; ইএফআই, ১৬৪২-৪৫, ১৯১)।
কিন্তু তখনও পর্যন্ত ভারতে থাকা কোম্পানির এজেন্টরা ঠিক করতে পারছিল না তারা বাংলায় ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাবে কি যাবে না। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তারা লন্ডনের কোর্ট অব কমিটির হাতে ছেড়ে দিল, কিংকর্তব্য বুঝতে না পেরে। ইতোমধ্যে কতগুলি নতুন নতুন চলক এসে কোম্পানিকে বাংলা ব্যবসায় মাথা ঢোকাতে বাধ্য করল এবং বাংলার ব্যবসা যে কোম্পানির লাভের অন্যতম বড় উপায় সে কথাটা তাদের ভাবিয়ে ছাড়ল। মাদ্রাজ আর মছলিপত্তনমের আশেপাশের এলাকায় লাগাতর মন্বন্তরের পরিবেশ এবং স্থানীয় ছোট রাজা আর সামন্তদের নিজেদের মধ্যে লেগে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতি কোম্পানির করমণ্ডল ব্যবসাকে ঠেলে দিচ্ছিল তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে। ব্রিটিশেরা দক্ষিণের ব্যবসা করার অনুপযোগী পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এসে নতুন ব্যবসা অঞ্চল খোঁজার দিকে নিজেদের সমস্ত উৎসাহ নিয়োজিত করে (জে ব্রুস, এনালস অব দ্য অনারেবল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, খণ্ড ১, ৪০২, ৪১০, ৪২৪, ৪৩০)। আমলদের নতুন কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শান্ত উৎপাদন এলাকা খোঁজের চক্কর শেষ হল বাংলা অঞ্চলে আসার পরিকল্পনায়। কোম্পানির আওল্লারা শেষ পর্যন্ত বাংলা ভূখণ্ডে কুঠি তৈরি করা এবং কুঠি থেকে ব্যবসা বাড়াবার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল সর্বসম্মতিক্রমে (ও সি, ১৪ ডিসে ১৬৫০, ২১৮৬, ২২ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৪৬-৫০, ৩৩২; হেজেসেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৮৪)। এই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে তারা হুগলীতে প্রথম কুঠি খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬৫০ সালে এই সিদ্ধান্ত অনুসারে লায়োনেস নামক জাহাজ বাংলায় পাঠানো হয় ব্রুকহেভেনের নেতৃত্বে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তেও তারা কিছুটা ভিন্ন মত হলেও মাদ্রাজ কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নেয় রাস্তায় দুর্যোগের আশংকা থাকায় জাহাজ বালেশ্বরের বেশি এগোবে না। কিন্তু একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হল, হুগলীতে কুঠি তৈরি করার জন্যে মালপত্র কেনা, রসদ জোগাড় করা, বা নবাবের থেকে অনুজ্ঞাপত্র নেওয়া ইত্যাদির সিদ্ধান্ত ক্যাপ্টেন সুযোগ সুবিধে মত নিজেইই নেবেন (ও সি, ১৮ জানু ১৬৫১, ২২০০, ২২ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৫১-৫৪, ১৬-১৭; হেজেসেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৮৭)।
হুগলীতে কুঠির জন্য কুঠিয়ালেরা একটা ভাড়া করা জাহাজ করে হুগলীর দিকে রওনা হলেন। ২৮ আগস্ট ১৬৫০-তে বালেশ্বরে পৌঁছলেন। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যখন জাহাজটি ফিরে আসার সময় হল, তখন হুগলীতে কুঠি তৈরির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ব্রিজম্যানের নেতৃত্বে ব্রুকহেভেন, আর দুজন অন্য কুঠিয়ালকে কোম্পানির নির্দেশগুলো বুঝিয়ে হুগলীর দিকে রওনা করিয়ে দিলেন (ও সি, ১৪ ডিসে ১৬৫০, ২১৮৬, ২২ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৪৬-৫০, ৩৩২-৩৪; হেজেসেস ডায়েরি, ৩ খণ্ড, ১৮৪-৮৬)। কুঠি খোলার নির্দেশনামা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হল, বাংলা থেকে কোম্পানি প্রাথমিকভাবে তিনটে পণ্য সোরা, রেশম এবং চিনি কিনতে আগ্রহী ছিল। পণ্য কেনার প্রথম তালিকায় মোটা কাটা কাপড়ের নাম ছিল না। যদিও পরেত সময় এই মোটা কাপড়ই পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে ব্যবসার অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে গণ্য হবে। একটা তথ্য পরিষ্কার প্রথমের দিকে মুঘল হিন্দুস্তানের পূর্ব উপকূলে ডাচ এবং ব্রিটিশদের থানা গাড়ার মুল উদ্দেশ্য ছিল বাংলা নির্ভর ব্যবসাকে মশলা দ্বীপের কাপড়ের চাহিদা নির্ভর করে ঢেলে সাজানো; কিন্তু ব্রিটিশেরা বাংলায় এসেছিল ভারতে পা দেওয়ার চার দশক পরে; বাংলায় পা দিয়ে ব্রিটিশেরা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ব্যবসাকে খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে বাংলাকে তাদের ইওরোপ ব্যবসার ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে ব্রুকহেভেনের নির্দেশ পালন কর কর্মচারীরা হুগলীতে পৌঁছে কুঠি তৈরি করে বাংলার রাজধানী রাজমহলের দিকে রওনা হল। শাহ সুজার প্রিয় চিকিৎসক গাব্রিয়েল বাউটনের সক্রিয়তায় ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলার সাময়িকভাবে ব্যবসা করার প্রাথমিক বিশেষ ছাড়পত্র পেল। প্রতম যুগে হুগলী কুঠিয়ালেরা কী ধরণের ব্যবসায়িক কাজকর্ম করছিল, সে বিষয়ে আজ আর তথ্য পাওয়া যায় না। আমরা ধরে নিতে পারি, তারা ব্রুকহেভেনের নির্দেশানুযায়ী কর্মসম্পাদন করছিল বাংলায়। অরিজনাল করস্পন্ডেন্স নামক চিঠি আদান প্রদানের খণ্ডগুলির প্রকাশনা থেকে জানতে পারি যে বাংলায় ১৬৫১ সালে প্রথম হুগলীর কুঠি স্থাপিত হয় (ও সি, ২২০৮, ২২১৯, ২২২৮, ২২ খণ্ড; ও সি ২৩৬০, ২৩ খণ্ড; ইএফআই, ১৬৫১-৫৪, ৪৫, ৬৩, ৮৪)। হুগলীতে কুঠি তৈরি করা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা ব্যবসায় একটি মাইলফলক। সমগ্র সপ্তদশ শতক ধরে এটি ব্রিটিশ ব্যবসার মুল কেন্দ্র হয়ে উঠবে। হুগলীকেটিকে ভিত্তি করে ব্রিটিশেরা পাটনা, কাশিমবাজার, ঢাকা, মালদায় কুঠি বানাবে এবং বাংলায় বিপুল ব্যবসা জাল তৈরি করবে।
তৃতীয় অধ্যায়
কোম্পানির ব্যবসায় বিকাশ এবং উন্নয়ন
বাংলায় কোম্পানির ব্যবসায় ধীর, নিয়মিত এবং দৃঢ়ভাবে উন্নতি ঘটছিল। বাংলায় কোম্পানির কুঠি স্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা যে সময় নিয়ে এই বইতে আলোচনা করছি, সেই সময় জুড়ে কোম্পানির আমলা, ইন্টারলোপারদের ব্যক্তিগত ব্যবসা, অর্থ লালসা, নিয়মিত বাণিজ্য পুঁজির ঘাটতি, কোম্পানির সঙ্গ ছাড়ে নি। এই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হয়েছে সারা ভারতেই। এইসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কোম্পানির বাংলার ব্যবসার পরিমান বিপুলভাবে বাড়তে শুরু করেছে। প্রাথমিক বছরগুলিতে স্বভাবিকভাবে অনেক আগে থেকে ব্যবসা শুরু করা ডাচ কোম্পানির বিনিয়োগের তুলনায় ব্রিটিশ কোম্পানির বাংলায় বিনিয়োগ খুবই কম ছিল। সেসময়ের ডাচেদের বিপুল ব্যবসার তুলনায় ব্রিটিশ কোম্পানির ব্যবসাকে প্রায় তুচ্ছ মনে হত। কিন্তু মাত্র তিন দশকে বাংলায় অবস্থানকালে কোম্পানির ব্যবসা ডাচেদের ব্যবসা ছাড়িয়ে যায় (ফ্রাক্ট্রি রেকর্ডস, হুগলী, খণ্ড ৮, ৩ পর্ব, ১৩-এ)। দুটি কোম্পানির ব্যবসা পরিমান তুলনা করলে এই বক্তব্যকে অবশ্যই অতিরঞ্জিত মনে হবে, তবুও বলা দরকার সপ্তদশ শতাব্দের আটের দশকে বাংলায় ব্রিটিশ বিনিয়োগ ডাচেদের ইওরোপে রপ্তানির বিনিয়োগের খুব বেশি পিছনে ছিল না। পরিমানগতভাবে ব্রিটিশ কোম্পানির বাংলা ব্যবসা কিন্তু খুব বেশি না হলেও, সেই শতাব্দ শেষে বাংলা ব্যবসা কোম্পানির উপমহাদেশিয় ব্যবসায় বেশ বড় ভূমিকা পালন করতে থাকে। ব্রিটিশদের বাংলার গুরুত্বটা হল এটা বাড়তে থাকা ব্যবসা — কোম্পানির কুঠিয়ালের ভাষায় ভারতে সব থেকে বেশিরূপে উন্নতি করতে থাকা ব্যবসাক্ষেত্র (ও সি ২৩ নভে ১৬৫৯, ২৮৩০, ২৬ খণ্ড; ইএফআই ১৬৫৫-৬০, ২৯৬)।
বাংলায় কোম্পানির ব্যবসার বাড় ও বৃদ্ধি বিভিন্নভাবে দেখা হয়েছে, প্রথমত বাংলায় ব্যবসা করার অনুমতি আদায় এবং একই সঙ্গে স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্ক। দ্বিতীয়ত ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে কুঠি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এবং তৃতীয়ত, বাংলা ব্যবসার বাড়বৃদ্ধি বাৎসরিক বিনিয়োগের প্রেক্ষিতে এবং বিনিয়োগের স্তরের সঙ্গে জুড়ে থাকা নানান চলকগুলির প্রভাবের দায় বোঝা থেকে। (চলবে)