ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
তৃতীয় অধ্যায়
কোম্পানির ব্যবসায় বিকাশ এবং উন্নয়ন
ব্যবসা করার অধিকার অর্জনে সমস্যা এবং স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলায় কোম্পানির ব্যবসা বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অধিকাংশ ঐতিহাসিক বলেছেন যে শুল্কবিহীন শর্তে ব্যবসা করতে গিয়ে কোম্পানিকে বাতসরিক ৩০০০ টাকা কেন্দ্রিয় সরকারকে দিতে হত। আমরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুল্ক না দিয়ে ব্যবসার যে মিথ তৈরি হয়েছে, আমরা সেই বিষয়টি বিচার করব কোম্পানির মহাফেজখানার নথিপত্র অনুসরণ করে। সেই সব নথিপত্র থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, কোম্পানি ১৭১৭-র আগে শুল্ক ছাড়ে ব্যবসা করার একটাও শাহি ফারমান পায় নি। ব্রিটিশদের শুল্ক ছাড়া ভারতবর্ষজুড়ে ব্যবসা করার দাবি আদতে একটা ঐতিহাসিক মিথ — এই দাবির বিন্দুমাত্র আইনি বৈধতা ছিল না।
কোম্পানির কর্তাদের ধারণা ছিল, মুঘল হিন্দুস্তানজুড়ে ব্যবসা করতে শুল্ক ছাড়ের নির্দেশিকা পাওয়া জরুরি। এই ফরমান জোগাড় করতে না পারলে এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ ব্যবসা বিকাশে প্রভূত প্রতিবন্ধকতা তৈরি তৈরি হবে। শুরু থেকেই তাদের চেষ্টা ছিল যে কোনও প্রকারে দিল্লির দরবার থেকে শাহী ফরমান জোগাড় করা, যে শুল্ক বিহীন ব্যবসা করার নির্দেশিকার বলে সে শুধু মুঘল হিন্দুস্তানে ইওরোপিয় ব্যবসায়ীদের থেকে কয়েকধাপ এগিয়ে থাকবে না, দেশিয় ব্যবসায়িদেরও প্রতিযোগিতা থেকে কয়েক কদম এগিয়ে যাবে। আমাদের আলোচ্য সময়সারনীতে ব্রিটিশেরা দাবি করে এসেছে, তাদের অধিকারে দিল্লি থেকে জারি করা ফরমান, আঞ্চলিক সরকারগুলি থেকে জারি করা নিশান এবং চিঠিপত্রের অধিকারের সব কটা নির্দেশনামাই তাদের হাতে রয়েছে। এই দাবি তারা বারবারই করে এসেছে। কিন্তু আমরা দেখব এই দাবি ভুয়ো এবং অবিবেচনাপ্রসূত। ফলে শুল্ক ছাড় পাওয়া নিয়ে স্থানীয় আধিকারিকদের সঙ্গে কোম্পানির নিয়মিত ঝামেলা হয়েছে। পণ্য পরিবহন করার সময়, স্থানীয় আধিকারিকেরা শুল্ক ছাড়ের মুল অনুজ্ঞাপত্র, ফরমান, নিশান ইত্যাদি দেখতে চাইলেই ঝামেলা বাধত। এই গোলোযোগের সুযোগে শাহী আমলারা কোম্পানির থেকে উপঢৌকন ইত্যাদি নিয়ে শাহী খাজানার পরিমান বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। প্রশাসনের এই ধরণের আমলাতান্ত্রিকতা নানাভাবে রোধ করার চেষ্টা করেছে ব্রিটিশ কোম্পানি। কিন্তু আলাপ আলোচনা যখন শেষ পর্বে পৌঁছে যেত, যখন তারা মনে করত আলাপালোচনা করে সমাধানের অধরা থাকছে, তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিত। ১৬৮৬ সালে একবার এই গণ্ডগোলে মোঘলদের সঙ্গে ব্রিটিশদের যুদ্ধ লেগেছিল এবং যুদ্ধের পরে যে শান্তিচুক্তি হয় তাতে লাভ হয় কোম্পানির। এই সময়ের পরে কোম্পানির ব্যবসা আকাশ ছুঁয়েছে।
কোম্পানির শুল্ক ছাড় বিষয়ে ঐতিহাসিকরা কোম্পানির ছড়ানো যে গল্প উল্লেখ করেছেন সেটি এখন আমরা আলোচনা করব। কোম্পানির বক্তব্য, গ্যাব্রিয়েল বটন নামে এক শল্য চিকিতিসকের বদান্যতায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় শুল্ক-বিহীন বাণিজ্যাধিকার লাভ করে। গ্যাব্রিয়েল বটন প্রথমে সে সময়ের বাংলার সুবাদার শাহজাদা শাহ সুজার চিকিৎসা করে রোগ নিরাময় ঘটান এবং তারপরে জেনানা মহলের মহিলাদেরও রোগমুক্তি ঘটান। তার কাজের যথোপযুক্ত উপহার দেওয়ার সময় এলে বটন ব্যক্তিগত উপহার নিতে অস্বীকার করেন। কোম্পানির দাবি, বটন তখন নবাব নাজিম শাহ সুজাকে বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিছুই চান না, তার দেশের বণিক সংঘ বাংলায় বহুকাল ধরে ব্যবসা করতে আগ্রহী হয়েছে, তাঁরা সুবাদারের থেকে বাংলায় ব্যবসা করারর অধিকার চান (চার্লস স্টুয়ার্ট, হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, ২৫১-৫২; রবার্ট ওরমে, হিস্ট্রি অব মিলিটারি ট্রাঞ্জাকশান অফ দ্য ব্রিটিশ নেশন ইন ইন্দোস্তান, খণ্ড ১, ৮; হেজেস ডায়েরি, খণ্ড ৩, ১৬৭। বটন এবং বাংলার বাণিজ্যাধিকার সম্বন্ধে বিশদে জানতে দেখুন উইলিয়াম ফস্টার, গ্যাব্রিয়েল বটিন এন্ড দ্য গ্রান্ট অব ট্রেডিং প্রিভিলেজেস অব দ্য ইংলিশ ইন বেঙ্গল, ইন্ডিয়ান এন্টিকুইটি, সেপ্ট ১৯১১, ২৪৭-৫৭)। এই গল্পটির বেশ কয়েকটা সুলভ সংস্করণ ইতিহাসের বাজারে বহুকাল ধরেই চালু। এইভাবেই বছরের পর বছর শুল্ক-মুক্ত ব্রিটিশ বাণিজ্যের পরস্পরবিরোধী গল্প বাজারে ঘুরপাক খাচ্ছে (টমাস বাউরি, প্রাগুক্ত, ২৩৩-৩৪; ওরমে ম্যানুসক্রিপ্টস, ও ভি, ১২, ৩-১০; ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, ফোর্ট সেন্ট জর্জেস, ৩০ খণ্ড, ৩৫-৪০; হোম মিসলেনি, ৬৮ খণ্ড, ২৭-৩৪)। যুক্তিপূর্ণভাবে এই ঘটনা বোঝার চেষ্টা এবং বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে বটন সাধারণভাবে ব্রিটিশদের ব্যবসার জন্যে নয়, নিজের ব্যক্তিগত লাভের জন্যে শাহ সুজা থেকে বাংলায় বাণিজ্যাধিকার অর্জন করেছিলেন, কোম্পানির হয়ে বাণিজ্যাধিকার লাভের দাবি ভুয়া।
বাউরি বলেছেন ব্রিটিশদের এই সময় সাধারণ বাণিজ্যাধিকারের সুযোগ সুবিধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্য ঐতিহাসিকের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে একটা বিষয় প্রমান হয়, কোম্পানির জন্য নয়, বটন নিজের জন্যে, আদতে ব্রুকহেভেনের প্রথম যাত্রার খরচ তোলার জন্যে বাংলার নবাবের থেকে বাণিজ্য বিশেষাধিকার অর্জন করেছিলেন। পরের গল্পের সংস্করণটি অনেকটা ঘটনার মূলানুগ। এই বর্ণনা জেমস ব্রিজম্যান এবং অন্য কুঠিয়ালকে দেওয়া কোম্পানির জারি করা নির্দেশের কাছাকাছি, যাদের ব্রুকহেভেন হুগলীতে কুঠি তৈরি করার জন্যে ১৬৫০-এর ডিসেম্বরে বালেশ্বরে পাঠিয়েছিলেন। কোম্পানির এই নির্দেশনামায় গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছিল, যে হোক করে শাহ সুজার থেকে বাংলায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অধিকারের নিশান আদায় করতে হবে। এই ঘটনা থেকে পরিষ্কার তখনও ব্রিটিশ শাহজাদার থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি শুল্ক ছাড়ের ব্যবসা করার সুবিধে আদায় করতে পারে নি। এরপরে গল্প সূত্রে বলা হয়েছে বটন কোম্পানির আমলাদের হয়ে বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি আদায় করে দেন, নবাবের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ আর ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে (ও সি, ২১৮৬, ২২ খণ্ড, ১৪ ডিসে ১৬৫০; ইএফআই, ১৬৪৬-৫০, ৩৩৩)। এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে শাহ সুজা বটনকে ব্যক্তিগত স্তরেই বাণিজ্য সুবিধেটা দেন, তিনি ইংরেজ কোম্পানিকে বাণিজ্য সুবিধে দেন নি। বাংলায় ব্রিটিশ বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা জানি, অক্টোবর ১৬৮৪ থেকে আগস্ট ১৬৯৫ পর্যন্ত ব্রিটিশ কোম্পানির বাংলার এজেন্ট হিসেবে কাজ করা জন বেয়ার্ড (উইলিয়াম ফস্টার, ইন্ডিয়ান এন্টিকুইটি, প্রাগুক্ত, ২৫৩) ১৬৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলায় ব্যবসা করার নির্দিষ্ট কিছু সুবিধের কথা লেখেন। জন বেয়ার্ড লিখলেন — তিনি (শাহজাদা শাহ সুজা) বটনকে বলেন, বটন যদি চান তাহলে তিনি বাংলায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অধিকার ব্যবহার করতে পারেন – তার কাছে বাংলা সরকার কোনও রকম শুল্ক রাজস্ব আদায় করবে না, এবং তিনি তাকে এই মর্মে দুটি আলাদা আলাদা নিশান জারি করেন (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, ফোর্ট সেন্ট জর্জ, ৩০ খণ্ড, ৩৬, ওরমে পাণ্ডুলিপি, ও ভি, ১২, ৩-১০)। ওপরের আলোচনায় একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে, ১৬৫০ সালে বটনের নিশান বহন করে আসা ব্রুকহেভেনের জাহাজ সব ধরণের শুল্ক দেওয়ার থেকে ছাড় পেয়েছিল। এই আলোচনায় আরও একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে ব্যক্তিগত ব্যবসায় লিপ্ত কুঠিয়ালেরা, শুল্ক ছাড় পাওয়ার জন্যে জাহাজের সব পণ্য যে বটনের ব্যবসার জন্যে আনা হয়েছে, সেটা দেখাবার চেষ্টা করেছিলেন।
শাহ সুজার থেকে ১৬৫১ সালের আগস্ট মাসে বাংলায় ব্যবসা করার প্রথম নিশান পান জেমস ব্রিজম্যান এবং এই নিশানটি তিনি পান তার আগের বছরে শাহ সুজার থেকে ডেভিজ (Daviege)-এর নিশান পাওয়া নিদর্শনের ওপর ভর করে। পরেরটির পরিষ্কার মানে ছিল (বি এম, এডি ম্যানুস্ক্রিপ্টস, ২৪০৩৯, ৫; ইএফআই, ১৬৫৫-৬০, ৪১৪-১৫), অযোধ্যা (আউধ), আগরা ইত্যাদি স্থানে কোম্পানি যে পণ্য কিনছে, সেই পণ্য পশ্চিম উপকূলে জাহাজে তোলার জন্যে তাদেরকে পথ কর বা রাহাদরি সরকারকে দিতে হবে না। এটা দিল্লির জন্যেও প্রযুক্ত হত না, এবং কোনও রকমভাবে এই ফরমানটির মানে বাড়িয়ে চড়িয়ে টেনে টুনে বাংলা থেকে কেনা পণ্যের রপ্তানির বিন্দুমাত্র শুল্ক মুক্তির কথা বলে না। কিন্তু ব্রিজম্যান শাহ সুজাকে মাত্র ৩০০০ টাকা উপঢৌকন দিয়ে যে নিশানটি পেলেন সেটি তাদের ক্ষেত্রে হয়ে গেল বাংলা থেকে রপ্তানি করা যে কোন পণ্যের জন্যে প্রযুক্ত সব কটি শুল্কমুক্তির অধিকার (বি এম, এডি ম্যানুস্ক্রিপ্টস, ২৪০৩৯, ৬; ইএফআই, ১৬৫৫-৬০, ১১১)। ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা লিখল, এইটি (সুবিধেটি) যদি আমরা পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে আমরা কিছু সময়ের মধ্যেই শুল্ক দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি পেয়ে যাব (ও সি, ২২৪৬, ২২ খণ্ড, ১৪ জান ১৬৫২; ইএফআই, ১৬৫১-৫৪, ৯৭)। ১৬৫৬ সালে ব্রিটিশেরা শাহ সুজার থেকে আরেকটি নিশান পেল, যাতে সে তার আগের অধিকার বজায় রাখতে পারে (বি এম, এডি ম্যানুস্ক্রিপ্টস, ২৪০৩৯, ৭; হোম মিসলে, ৬২৯ খণ্ড, ৫-৮; ইএফআই, ১৬৫৫-৬০, ১১১, ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস মিসলেনি, ১৪ কগণ্ড, ৩৪৬; হেজেজেস ডায়েরি, প্রাগুক্ত, ৩ খণ্ড, ১৮৯; মাস্টার্স ডায়েরি, প্রাগুক্ত, খণ্ড ২, ২১)। (চলবে)